ও জোগো বনিতো

Author
ওয়েবডেস্ক প্রতিবেদন

যার বা যাদের খেলা দেখে এই শব্দবন্ধ তৈরি হ'য়েছিল, পরবর্তীতে ধারাভাষ্যে তিনিই বিশ্বজুড়ে তার দেশের এই পরিচিতি ছড়িয়ে দেন। এরান্টস ড্যু নাসিমেন্টো বা পেলেই একে খেলার মাঠে নিজস্ব শৈলীতে রচনা করেছিলেন সতীর্থদের সাথে, আর পরে একে জনপ্রিয় করেন তিনিই, ধারাভাষ্যে, লে

O JOGO BONITO

শমীক লাহিড়ী

এই পর্তুগীজ শব্দবন্ধটা শুনলেই মনে হয়, এবার ফুটবল পায়ে সাম্বা নাচ দেখতে পাওয়া যাবে।

যার বা যাদের খেলা দেখে এই শব্দবন্ধ তৈরি হ'য়েছিল, পরবর্তীতে ধারাভাষ্যে তিনিই বিশ্বজুড়ে তার দেশের এই পরিচিতি ছড়িয়ে দেন। এরান্টস ড্যু নাসিমেন্টো বা পেলেই একে খেলার মাঠে নিজস্ব শৈলীতে রচনা করেছিলেন সতীর্থদের সাথে, আর পরে একে জনপ্রিয় করেন তিনিই, ধারাভাষ্যে, লেখায়,বক্তৃতায়।

তবে প্রথম কে ব্যবহার করেছিলেন এটা, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। অনেকেই বলেন, ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে সবুজ মাঠে হলুদ-নীল পাখীদের ডানায় যে ছন্দ তৈরি হ'য়েছিল, তা দেখে আপ্লুত হ'য়ে স্টুয়ার্ট হল নামে এক ব্রিটিশ সাংবাদিক নাকি ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে আপ্লুত হ'য়ে এই শব্দবন্ধ প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। তবে এ নিয়ে ভিন্ন মতও আছে।

১৯৫৮'র বিশ্বকাপে ব্রাজিল দল দেখে আপ্লুত হবে নাই বা কেন! ফরোয়ার্ড লাইনটা দেখলেই বোঝা যায়, কারা সেদিন সবুজ মাঠে হলুদ-নীল আল্পনা এঁকেছিলেন 'গোল চামড়া' দিয়ে।

গ্যারিঞ্চা, ভাভা, ডিডা, জাগালো, পেলে, পেপে, জোয়েল আর মিডফিল্ডে ডিডি। এদের কারোরই খেলা দেখার সুযোগ হয়নি কোনও দিনই। কিন্তু চোখ বুঝলেই নীল-হলুদ পাখীদের উড়তে দেখি কিভাবে, কে জানে!! হয়তো ঐ 'যোগো বোনিতো' শব্দবন্ধটাই কল্পনার জগতে ফুটবল মাঠের ক্যানভাসে দি ভিঞ্চির 'মোনালিসা'র সৌন্দর্যের ছটা ছড়িয়ে দেয়।

'ও যোগো বনিতা' র অর্থ - সবচেয়ে সুন্দর খেলা। আর এর মানেই তো মাঠে বেটোফেনের সুরের উন্মাদনা, চাইকভস্কির ঝঙ্কার, বিলায়েত- বিসমিল্লার যুগলবন্দীতে মোহিত হ'য়ে থাকা।

ব্রাজিলের ফুটবল ফুটবল প্রেমীদের মাতাল করে আসছে বিগত ৬০/৭০ বছর ধরেই। তার সাথে পাল্লা দিয়েই অন্যান্য অনেক দেশের তারকা, ফুটবলকে এক শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। যেখানে আবেগ, বিষ্ময়, পাগলামি, কান্না-হাসির দোলার সাথে অঙ্ক-বিজ্ঞান- প্রযুক্তি মিলেমিশে একাকার হ'য়েই লাখো লাখো মানুষের হৃদয়ে একটা আলাদা অনুভুতি- মুগ্ধতা মস্তিষ্কের উর্বরতায় আরও সার ঢেলে, দু'চোখে এক স্বপ্নিল আবেশ তৈরি করে।

হাজারো জীবন যন্ত্রণা, দুঃখ-কষ্ট, জীবনের ওঠাপড়ার মাঝে এড্রিনালিন হরমোন ঢেলে মনটাকে বসন্তের বাতাসের চাইতেও রঙিন ক'রে দেয় ফুটবল মাঠের লড়াই।

তাই তো ব্রাজিলের ত্রেস কারাকোস গ্রামের দরিদ্র ফুটবলার ডোনডিনহো নিজের ছেলেকে ভালো ফুটবলার তৈরির স্বপ্ন দেখলেও, অর্থের অভাবে ছেলেকে এক চায়ের দোকানে কাজে ঢোকাতে বাধ্য হয়েছিলেন। খেলতে না পারার যন্ত্রণাবিদ্ধ ঐ শিশুর মাঝে জ্বলতে থাকা আগুনই তাঁকে পেলে বানিয়েছিল।

আর একজনের ঠাকুর্দা ছিলেন ক্রীতদাস। ব্রাজিলের পাও গ্রান্ডে'র ক্রীতদাস পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুর অপুষ্টি জনিত কারণে, একটা পায়ের চাইতে আর একটা পা ছিল ৬সেমিঃ ছোট, আর দু'টো পা এমনকি মেরুদণ্ডটাও ছিল ঈষৎ বাঁকা, অর্থাৎ খানিকটা deformative child। কিন্তু ফুটবল পায়ে 'দাস মালিক'দের নাস্তানাবুদ করার মাঝেই লুকিয়ে ছিল গ্যারিঞ্চা'র প্রতিশোধের স্পৃহা।

আবার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলারদের অন্যতম 'ব্ল্যাক প্যান্থার' এর জন্ম তৎকালীন পোর্তুগীজ উপনিবেশ পূর্ব আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুতু'র রেল শ্রমিকদের ঘেটো বা বস্তিতে। চূড়ান্ত দারিদ্রতায় কেটেছে তাঁর শৈশব। ক্লাব ফুটবলে শুধুমাত্র পর্তুগীজ ক্লাব বেনফিকার হ'য়েই ৭১৫ টা ম্যাচে ৭২৭টা গোল, ৬৬ সালের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা, দেশের হ'য়ে খেলা ৬৪ টা ম্যাচে ৪১ টা গোল এই সংখ্যাতত্বে ইউসেবিও দ্য সিলভা ফেরেইরা'কে খোঁজার চেষ্টা করলে এই মহান ফুটবল শিল্পীর ছোঁয়ায় আফ্রিকা- ইউরোপ- লাতিন আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আল্পনাগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিজের শৈশবের দারিদ্রমাখা মাপুতু'র ঘেটোয় বারবার গেছেন, নিজের ভেতরের আগুনটাকে জ্বালিয়ে রাখার জন্যই।

একই ইতিহাস বাঁ পায়ের সব চেয়ে বড় জাদুকর দিয়েগো'র। "If I hadn’t been born in a villa, I wouldn’t have been Maradona. I had the freedom to starve, struggle and play”। বুয়ানেস আয়ার্স এর অদূরে আজমোর স্ট্রীটের বিদ্যুৎ -পানীয় জল- রাস্তা- নর্দমাহীন এক ঘিঞ্জি বস্তিতে থাকা এই ফুটবল শিল্পী শৈশবে ফেলে দেওয়া টিনের কৌটো আর পিচবোর্ডের কার্টুন কুড়িয়ে বিক্রি করতেন, দরিদ্র পরিবারে অর্থের সংস্থানের জন্য।

ড্রাগ-চুরি- ছিনতাইবাজ প্রতিবেশী কিশোরদের পাল্লায় না পড়ে, যে ধনীদের জন্য তাঁদের এই দারিদ্র্য, তাঁদের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্রোধ আছড়ে দিতেন ৩ কাঠির জালে, সব প্রতিবাদ ভাষা পেতো বাঁ পায়ের জাদুতে।

প্রায় সব মহাতারকা সৃজনশীল ফুটবল শিল্পীদের শৈশবের কাহিনী এমনই। দারিদ্র্য তাঁদের মধ্যে ক্রোধের আগুন জ্বেলেছে। যা দিয়ে তৈরি হয়েছে - The Most Beautiful Game।

আজও তাই ভূগোলার্ধের সব প্রান্তেই ৫০০ কোটি মানুষ জেগে দেখেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব বিশ্বকাপ ফুটবল।

শুধু তাই নয়, চটকলের শ্রমিক ৮ ঘন্টা রক্ত নিংড়ানো শ্রমের কাজ শেষে সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে দাঁড়িয়ে পড়েন রাস্তার ধারে, পাড়ার ফুটবল ম্যাচ দেখতে কিসের নেশায়, কি খুঁজে পান বল কাড়ার মরণপণ কিন্তু সৌভ্রাতৃত্বের এই লড়াইয়ে!

সুদানের যুদ্ধ বিধ্বস্ত মাঠে পুঁতে রাখা মাইনকে ডজ ক'রে নাক দিয়ে প্যাঁটা পড়া কিশোর আধা খুলে যাওয়া বোতামহীন প্যান্ট এক হাতে ধরে নিজেকে মেসির মতো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

নিউইয়র্কের ঝাঁ চকচকে ঝলমলে শহরের নীচেই থাকা হার্লেমের এক চিলতে ফাঁকা জায়গায় বলে লাথি মারার সময়ে নিজেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ভেবে বেঁচে থাকার রশদ খোঁজে কালো চামড়ার কিশোররা।

আফ্রিকার ঘেটো'তে বড় হ'তে থাকা নিজের ফুটবল পাগল সন্তানের মাঝে মহম্মদ সালাহ বা সাদিও মানে'দের খুঁজে পাওয়ার স্বপ্নে ডুবে থাকেন অনেক বাপ-মা।

ভারতে জাত-ধর্ম-ভাষা নিয়ে উস্কে দেওয়া বিভেদের রাজনীতিকে পিছনে ফেলে দেয় - বিশ্ব মিলনের এই উৎসব। হিংসা- দ্বেষকে বুটের স্পাইকে দূরমুশ হ'তে দেখে ভরসা পায় ঘরপোড়া ভারতীয় বৃদ্ধ। 'দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে বিশ্ব ফুটবলের এই আসরে'।

পিছিয়ে পড়ে কেমনভাবে হার না মানা লড়াই চালানো যায় বাঁশির শেষ আওয়াজ পর্যন্ত, তা দেখে আবার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার লড়াইয়ে নামে সদ্য ছাঁটাই হওয়া কারখানা শ্রমিক।

কাজ হারিয়ে চোখেমুখে অন্ধকার দেখা সফটওয়্যার কোম্পানির হোয়াইট কলার এমপ্লয়ী, জাপানের লড়াইয়ে খুঁজে পায় এই অমোঘ সত্য - No one is invincible. কেউ অজেয় নয়, লড়তে জানলে জেতা যায়। আবার ৭ গোল খাওয়া কোস্টারিকা জাপানকে হারিয়ে দেওয়ার খেলা দেখে, ক্রমাগত হারের হতাশার কুয়াশায় ঢাকা যুবক যুবতী বুকের মাঝে বল পায়, তাহলে নিজের জীবনেও এভাবেই হেরে গিয়েও, সব হারিয়েও ফিরে আসার লড়াই করা যায়।

সদ্য ধান কাটা নাড়া ভর্তি জমিতে দঁড়ি বাঁধা হাফপ্যান্ট আর ফ্রক পড়া কিশোর কিশোরীরা ফুটবলে লাথি মেরেই জীবনের আনন্দ কুড়িয়ে নেয়, আর তাদের সাথেই লুঙ্গিতে মালকোঁচা মেরে নেমে পড়ে বাপ কাকারাও। বাড়ন্ত সংসারে সন্তানের মুখে পুষ্টির খাবার তুলে দিতে না পারা চাষীর এই আনন্দ দেখে চোখের কোনটা আনন্দমাখা জলে ভরে ওঠে। গরীব বাপ-মা'রা সন্তানকে বড় করার জন্য, আনন্দ দানের জন্য এই চামড়ার গোলককেই বেছে নেয়, বুকে জড়িয়ে ধরে।

ধন-দৌলত-রূপ- ত্বকের জেল্লার আত্মম্ভরিতায় মজে থাকা ধনী বা হলিউড-বলিউডের নায়ক নায়িকাদের পেছনে ফেলে কালো চামড়ার এমবাপে'দের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় পৃথিবীর সব শিভ্যালরি আর সৌন্দর্য।

এইজন্যই ফুটবল শুধু সবচেয়ে সুন্দর খেলাই শুধু নয়, জীবন খোঁজার খোরাক, বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ।

কান্না-হাসির জীবনকে নিয়েই বাঁচতে শেখায় ফুটবল। বঞ্চনার ক্রোধের আগুনকে জ্বালিয়ে রাখে ফুটবল।

জয় যোগো বনিতো।


প্রকাশ: ২৮-নভেম্বর-২০২২
No English Content

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 28-Nov-22 14:55 | by 6
Permalink: https://cpimwestbengal.org/o-jogo-bonito
Categories: Current Affairs
Tags: brazil, fifaworldcup2022, football, jogo bonito, maradona, o jogo bonito, pele, samba
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড