বর্তমান প্রেক্ষাপটে নভেম্বর বিপ্লব

ডঃ নুরুল ইসলাম
ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতেও শ্রমজীবী গরিব মানুষের জন্য নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমুখী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, এই ভয়ে যে যাতে সে দেশগুলিতে রাশিয়ার মতো বড় ধরণের আন্দোলন বা বিপ্লব ঘটে একচেটিয়া ধনীক শ্রেণীর চরম ক্ষতি হয়।

জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার শাসনের বিরুদ্ধে এবং অক্টোবরে ভ্লাদিমির লেলিনের নেতৃত্বে হওয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় দীর্ঘকালের জার শাসনের অবসান হয়। সেইসাথে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে কোনো কমিউনিস্ট পার্টি। দ্রুতই রুশ বিপ্লবের প্রভাব রাশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে আরো অনেক দেশে। যুগান্তকারী সব বিল্পবের পেছনে থাকে- শত বছর পুরনো পটভূমি, একটু একটু করে জমতে থাকা মজলুম নিপীড়িত সর্বহারা জনতার দুঃখদুর্দশার হাজারো হাজারো দুঃখ কষ্ট গ্লানি আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত হয় বিপ্লবের আকারে।
রাশিয়ায় তখন জার (Czar) বা সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসের একচ্ছত্র স্বৈরাচারী শাসন চলছিল। দেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ ও ভূমিহীন কৃষকরা (Serfs) চরম দারিদ্র্য এবং অসাম্যের শিকার। সমাজের অতি ক্ষুদ্র অভিজাত ও ভূস্বামী শ্রেণি সমস্ত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও উপভোগ করত, অন্যদিকে কোটি কোটি কৃষক ও শ্রমিকের জীবন ছিল বড় করুণ মানবেতর প্রাণীতুল্য। কৃষকদের ওপর চলতো নিদারুন নির্যাতন নিপীড়ণ চড়া হারে খাজনা আদরের জন্য। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় শিল্পায়ন বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি ছিল খুবই কম এবং কাজের পরিবেশ ছিল করুণ শোচনীয়। উনিশ শতক জুড়ে নানা ধরণের আন্দোলন ঘটেছে, কিন্তু বড় কিছু পরিবর্তন শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে হয়নি। ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটলেও সিংহভাগ জমিই ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে।
১৯০৫ সালে নারী অধিকার ও খাদ্যের দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর জারের বাহিনী গুলিবর্ষণ করে যা ব্লাডি সানডে বা রক্তাক্ত রবিবার নামে ঘৃণিত। এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে জারের বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া জড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকট, চরম মুদ্রাস্ফীতি এবং সৈন্যদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। জার শাসনের প্রতি জনগণের মোহ চিরতরে হারিয়ে যায়। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসের শুরুতে (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৩ ফেব্রুয়ারি) পেট্রোগ্রাডের রাস্তায় নারী শ্রমিকরা রুটি এবং খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এই গণআন্দোলন দ্রুত বিপ্লবের রূপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও বিদ্রোহে যোগ দেয়। এর ফলে জার দ্বিতীয় নিকোলাস বাধ্য হয়ে সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং শতবর্ষী জারতন্ত্রের পতন ঘটে এবং বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যবিত্ত একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় কিন্তু তারা জনগণের মূল সমস্যা অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধ করা বা খাদ্যের অভাব মেটাতে ব্যর্থ হয়। ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটায় এবং শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের সমন্বয়ে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
রুশ বিপ্লবের পর দীর্ঘ সত্তর বছরের বেশি সোভিয়েত রাশিয়া একত্রিত ছিল। রুশ বিপ্লবের প্রভাবে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুধু তাই নয় ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতেও শ্রমজীবী গরিব মানুষের জন্য নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমুখী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, এই ভয়ে যে যাতে সে দেশগুলিতে রাশিয়ার মতো বড় ধরণের আন্দোলন বা বিপ্লব ঘটে একচেটিয়া ধনীক শ্রেণীর চরম ক্ষতি হয়। সেই সঙ্গে বিশ্বের নানা প্রান্তে স্বাধীনতাকামি ও মুক্তিকামি মানুষের আন্দোলনও সাফল্য পায়, বহু দেশ ব্রিটিশ ফ্রান্স স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাধীন হয়। পৃথিবীর মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরী হয়। ভারতের মতো বহু উন্নয়নশীল দেশে মৌলিক পরিকাঠামো নির্মাণে ও সার্বিক উন্নয়নে সোভিয়েত রাশিয়া পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনাগুলিতে এবং ইস্পাত শিল্প নির্মাণে বড় ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া আদর্শ থাকায় ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা স্বাধীনতা আন্দোলনের সাধারণ বৃহৎ মঞ্চ কংগ্রেস দলের সঙ্গে থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা সহ জনগণের নানা রকম কল্যাণমূলক আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলও হন।
৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিপর্যয়ের পর সারা বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভর কেন্দ্র একতরফাভাবে চলে যায় আমেরিকার নেতৃত্বে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির হাতে। ফলে এই কয়েক দশক ধরে দেশে দেশে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জীবন জীবিকার জন্য আন্দোলন বহু ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের জীবন ধারণের মান দিন দিন নিম্নগামী। কলকারখানায় শ্রমিক শ্রেনীর উপর শোষণ নিপীড়ন দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মজুরী বাজার অনুপাতে বাড়ছে না, অথচ কাজের চাপ ও সময় বেড়ে চলেছে। আজকের সারা বিশ্বব্যাপী বেকারত্বের সমস্যা ভয়াবহ, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতী আজ বড় দিশেহারা। দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মানুষকে সামাজিক অর্থনৈতিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধর্মীয় ভেদাভেদ সংঘাতে নিয়ে যেতে চক্রান্ত করেছে। চরম ঘৃণা বিদ্বেষের রাজনীতি তাদের শক্তিকে বৃদ্ধিও করছে কোথাও কোথাও। আবার কোথাও কোথাও সাধারণ গণতান্ত্রিক মানুষ তাকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে যা আমরা বাংলাদেশের সম্প্রতি নির্বাচনে লক্ষ্য করলাম চরম সাম্প্রদায়িক জামিয়াতে ইসলাম দলের চরম পরাজয়ের মাধ্যমে।
সম্প্রতি চরম সংকটপূর্ণ আর্থসামাজিক রাজনৈতিক অবস্থায় শ্রীলঙ্কায় বামপন্থী দলের ক্ষমতায় এসে আর্থসামাজিক রাজনৈতিক সংকটকে কাটিয়ে ওঠা বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করে।
তার মধ্যেও ভারতে সফল কৃষক আন্দোলন কৃষক বিরোধী আইনকে প্রত্যাহার করতে মোদি সরকারকে বাধ্য করা ভারতের কৃষিজীবী মানুষের বিরাট জয় এবং এই জয় এসেছে বামপন্থী কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বেই।
আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের মেয়র রূপে মামদানির বিরাট জয় ও সাধারণ দুর্বল মানুষের জন্য বাসস্থানের অঙ্গীকার সারা বিশ্বের মেহনতি মানুষকে উৎসাহিত করে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকান দলের বিপর্যয় এবং ডেমোক্রাট দলের সাফল্য দেখে আমরা বিশ্বের শান্তিপ্ৰিয় মানুষ আশার আলো দেখছি।
দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল বলিভিয়া সহ বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থী সরকারকে উৎখাত করে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিষ্ঠা বিশ্বের গণতান্ত্রিক মানুষের আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করে।
মধ্যপ্রাচ্যের তৈল খনিগুলি অবৈধভাবে দখল করার জন্য ইসরাইলকে সহযোগী করে আরব দেশগুলি একাংশের প্রভুত্ব স্বীকারের কারণে আমেরিকা যেভাবে ইরানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং ব্যর্থ হয়ে মার্কিন সরকারের ইরানের কাছে নতি স্বীকার ও বিপুল অংকের ক্ষতি প্রদান আমাদের বড় উৎসাহিত করে। পাশাপাশি সম্প্রতি ইসরাইলে ঘটে গেল সাধারণ নির্বাচনএবং রাষ্ট্রপ্রধান নেতানেয়াহুর দলের বিপর্যয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক মানুষকে উৎসাহিত করে। ভারতে সম্প্রতি পরীক্ষার দুর্নীতি সহ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সারা দেশ জুড়ে উত্তাল আন্দোলন ভারত সহ সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে একটি স্পষ্ট সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাবার ইঙ্গিত বার্তা দেয়। গত কয়েক বছরে ব্রিটেন ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেশে দক্ষিণপন্থী দলের সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের গআন্দোলন শ্রমজীবী মানুষের কাছে একটি বড় আশার আলো দেখায়।তাই আজকের নভেম্বর বিপ্লবের বার্তা হোক আগামী পৃথিবী হবে, শ্রমজীবী মানুষের,খেটে খাওয়া মানুষের, শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক মানুষের। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
প্রকাশ: ০৬-নভেম্বর-২০২৬
শেষ এডিট:: 06-Nov-26 18:52 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-november-revolution-in-the-current-context
Categories: Fact & Figures
Tags: november revolution, octoberrevolution
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (184)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (167)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (92)
- Highlight - হাইলাইট (103)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (156)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (19)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নভেম্বর বিপ্লব
- ডঃ নুরুল ইসলাম
আলো দিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: অপটোজেনেটিক্সের গল্প
- বাবান নন্দ
আলো দিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: অপটোজেনেটিক্সের গল্প
- বাবান নন্দ
ভোটাধিকার বনাম চীন-জুজু: নজর ঘোরানোর কৌশল?
- সাম্য পাল
আলো দিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: অপটোজেনেটিক্সের গল্প
- বাবান নন্দ




