|
সাধারণ মানুষের কল্যাণের বিনিময়ে “আর্থিক বিচক্ষণতা”Sanjoy Roy |
রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনায় ১৫০০ কোটি টাকা , পিএম পোষণে (PM POSHAN) ১৯০০ কোটি টাকা , পিএম শ্রী-তে (PM SHRI) ৩০০০ কোটি টাকা , পিএম আবাস যোজনা (শহরে ১২,২৯৪ কোটি টাকা ও গ্রামে ২২,৩২২ কোটি টাকা), আয়ুষ্মান ভারতে ৪০৬ কোটি টাকা এবং আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো প্রকল্পে ১,৭৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ গত বছরের বাজেট থেকে কমিয়ে ব্যয় করা হয়েছে..... |
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষের জন্য তাঁর নবম বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটে দেশের আনুমানিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ধরা হয়েছে ৩৯৩ লক্ষ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবর্ষে অনুমিত ৩৫৭ লক্ষ কোটি টাকার তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। বাজেট ঘোষণার আগে পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রক ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষের জন্য জিডিপি-র প্রথম অগ্রিম অনুমান প্রকাশ করে (জানুয়ারি ২০২৬) এবং ২৯ জানুয়ারি প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি আনন্দ নাগেশ্বরন অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫–২৬ সংসদে উপস্থাপন করেন। এই সমস্ত নথি, বাজেট বক্তৃতা এবং বাজেট সংক্রান্ত দলিল মিলিয়ে ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনীতির অবস্থা এবং ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষে সরকারের আর্থিক নীতির প্রস্তাবগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষে প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশ এবং টাকার অঙ্কে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ। এর ফলে অন্তর্নিহিত মুদ্রাস্ফীতি মাত্র ০.৬ শতাংশের মতো কম বলে ধরা পড়ে। এই বৃদ্ধির হার বিশ্বে দ্রুততমগুলির মধ্যে অন্যতম এবং মধ্যমেয়াদে প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। তবে সমীক্ষায় বিশ্বের আর্থিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথাও স্বীকার করা হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, রাজ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে তোলার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। সাধারণভাবে আশা করা হয়েছিল যে, বাজেটে এসব চ্যালেঞ্জের কার্যকর সমাধান থাকবে—যেমন বেসরকারি করপোরেট খাতে বিনিয়োগের অনীহা দূর করা, গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) বেসরকারি অংশ বাড়ানো, আয়-বৈষম্য কমানো এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় বাড়িয়ে দক্ষ ও সুস্থ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা। কিন্তু কম মুদ্রাস্ফীতি কখনও কখনও মূল্যপতনের ইঙ্গিত বহন করে, যা বিনিয়োগকারীদের কম মুনাফার আশঙ্কায় বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে সরকারি আয় কমে যেতে পারে এবং প্রকৃত ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কৃষি ও খনিসহ প্রাথমিক খাতে চলতি দামে নামমাত্র বৃদ্ধির হার মাত্র ০.২ শতাংশ, যেখানে ধ্রুব ২০১১–১২ সালের দামে প্রকৃত বৃদ্ধি ২.৭ শতাংশ—যা মূল্যপতনের পরিস্থিতির প্রতিফলন। অর্থনীতির পরিস্থিতি প্রথম অগ্রিম অনুমান এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষা জানায় যে, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষের তুলনায় উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে প্রকৃত মোট মূল্য সংযোজন (জিভিএ) বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু কৃষি ও সহযোগী খাত, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জল সরবরাহ এবং নির্মাণ খাতে বৃদ্ধির হার কমেছে। মোট জিভিএ-র ১৫.২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং ১২.৮ শতাংশ শিল্প উৎপাদন খাত থেকে। অর্থাৎ ভারতের অর্থনীতি এখনও পরিষেবা খাতের উপর নির্ভরশীল, যা জিডিপি-র ৫১.১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে।চলতি বছরে কারখানাজাত শিল্প উৎপাদন খাতে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে, যা আগের বছরের ৪.৫ শতাংশের তুলনায় বেশি। কিন্তু খনন খাতে সংকোচন দেখা গেছে এবং কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৪.৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.১ শতাংশ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে পরিষেবা খাত ৯.১ শতাংশ হারে বেড়েছে। এর মধ্যে আর্থিক পরিষেবা, রিয়েল এস্টেট ও পেশাগত পরিষেবা, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য পরিষেবায় প্রায় ৯.৯ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। চাহিদার দিক থেকে ব্যক্তিগত ভোগব্যয়, যা জিডিপি-র ৬১.৫ শতাংশ, ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট স্থায়ী মূলধন গঠন (Gross Fixed Capital Formation), যা জিডিপি-র ৩০ শতাংশ, বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ। সমীক্ষায় ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাওয়ার প্রবণতার কথাও বলা হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে এফডিআই উচ্চ প্রযুক্তিখাতে সরে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখ করা হয়েছে।ভারতে গবেষণা ও উন্নয়নে (আর অ্যান্ড ডি) ব্যয় জিডিপি-র মাত্র ০.৬৪ শতাংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ৩.৪৮ শতাংশ, চীনে ২.৪৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪.৯১ শতাংশ। ভারতে মোট R&D ব্যয়ের মাত্র ৪১ শতাংশ বেসরকারি খাত বহন করে। তুলনায় চীনে এই হার ৭৭ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ শতাংশ এবং কোরিয়ায় ৭৯ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয় যে, সরকারি সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও ভারতের বেসরকারি করপোরেট খাতের ঝুঁকি নিতে অনীহা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগে পিছিয়ে। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার বিশ্ব উদ্ভাবন সূচকেও ভারতের অবস্থান ৩৯তম; শীর্ষে রয়েছে সুইৎজারল্যান্ড, সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্র, আর চীনের অবস্থান ১১তম।প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মারিয়ানা মাজুকাতোর “উদ্যোগী রাষ্ট্রের” ধারণার কথা বলেন এবং উচ্চ-প্রযুক্তির শিল্প ক্ষেত্রগুলিতে রাষ্ট্রকে বিনিয়োগ করার কথাও বলেন যেখানে বেসরকারি ক্ষেত্র কোনো সুবিধা করতে পারেনি। এই কথা বলেও তিনি শিল্পপতি শ্রেণি কেন পুঁজির পক্ষে রাষ্ট্রনীতি বহাল থাকার পড়েও বিনিয়োগ করতে পারল না, সেই সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। বাজেট ২০২৬–২৭ বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলির মূল দিকগুলি বাজেটে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি এটি বিশেষ আশ্চর্যের কথা নয়। বাজেট অনুযায়ী, সংশোধিত হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিট কর রাজস্ব বাজেট অনুমানের তুলনায় ১.৬ লক্ষ কোটি টাকা কম এসেছে। তবুও জিডিপি-র ৪.৪ শতাংশে রাজস্ব ঘাটতি সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এমন ব্যয় কমিয়েছে যা সাধারণ মানুষের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।আয়কর আদায় ১.২৬ লক্ষ কোটি টাকা এবং জিএসটি আদায় ১.৩১ লক্ষ কোটি টাকা কম হয়েছে। শুল্ক ও আবগারি থেকে কিছুটা ঘাটতি পূরণ হলেও কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষক প্রকল্পগুলিতে ১.২১ লক্ষ কোটি টাকার কাটছাঁট করা হয়েছে। এই কাটছাঁট ধনী শ্রেণির তুলনায় দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের উপর বেশি প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে ২০২৬–২৭ সালের বরাদ্দ আগের সংশোধিত কম বরাদ্দের সমান বা সামান্য বেশি রাখা হয়েছে। গত বছরে রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনায় ১৫০০ কোটি টাকা , পিএম পোষণে (PM POSHAN) ১৯০০ কোটি টাকা , পিএম শ্রী-তে (PM SHRI) ৩০০০ কোটি টাকা , পিএম আবাস যোজনা (শহরে ১২,২৯৪ কোটি টাকা ও গ্রামে ২২,৩২২ কোটি টাকা), আয়ুষ্মান ভারতে ৪০৬ কোটি টাকা এবং আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো প্রকল্পে ১,৭৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ গত বছরের বাজেট থেকে কমিয়ে ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়ন খাতেও ব্যয় হ্রাস করা হয়েছে। এমএনরেগা (MNREGA) খাতে ৫৮,০০০ কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে এবং নতুন VB-GRAMG প্রকল্পে ৯৫,৬৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান আর অধিকার হিসেবে নিশ্চিত না থাকা এবং প্রকল্পের ৪০ শতাংশ ব্যয় রাজ্য সরকারগুলিকে বহন করতে হওয়ায় বাস্তব ব্যয় কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনিতেই রাজ্য সরকারগুলি পণ্য পরিষেবা কর বাবদ আয়ের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছে, তাই আর্থিক সংস্থান জোগানো কঠিন। বাজেটে বাড়তে থাকা বৈষম্য, অপূর্ণ কর্মসংস্থান, বিনা পারিশ্রমিকের শ্রম এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজে শ্রমিকদের ঝুঁকির বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি যদিও আর্থিক সমীক্ষায় এঁদের কথা বলা আছে। দেশের দরিদ্র শ্রেণি এবং শ্রমজীবী মানুষের চরম অনিশ্চয়তা এবং বিপন্নতা থেকে আজ উদ্ধার প্রয়োজন ছিল। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে থাকবে—যা এক বিশাল জনমিতিক সুযোগ। কিন্তু কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৪৪ শতাংশ শ্রমবাজারের বাইরে রয়ে গেছে।হয় তাঁরা কাজে নেই নয়ত তাঁরা কাজ খোঁজেন না। বিশ্বে দ্রুততম আর্থিক বৃদ্ধির দেশে “নিরুৎসাহী শ্রমিক”-এর এই বিপুল সংখ্যা উদ্বেগজনক।কর্মরতদের মধ্যে ৫৪.৯ শতাংশ স্বনিযুক্ত বা পারিবারিক কাজে যুক্ত এবং নিয়মিত বেতনের চাকরিতে রয়েছেন এক-পঞ্চমাংশেরও কম। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগে উচ্চ দক্ষতার প্রয়োজন বাড়লেও বাজেট বরাদ্দে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন কম দেখা যায়।বাজেট বক্তৃতা শুনে বোঝা যায় না যে, ভারত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা দেশ। ![]() প্রকাশের তারিখ: ২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|