|
একুশে ফেব্রুয়ারির ইস্তেহার - বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য...Unknown |
|
২১ শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ ‘বাহন উপযুক্ত না হলে কেউ তার উপযুক্ত স্থানে পৌঁছাতে পারেনা। লক্ষ্য লাভ করতে হলে সাহিত্যের বাহন উপযুক্ত হওয়া চাই, যে বাহন হবে মাতৃভাষা’ – ডঃ শহিদুল্লাহ।
সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার। ভাষা দিবস মানেই এই শহীদ চতুষ্টয় বাঙালি। এদের মধ্যে আবার বরকত দেহে প্রাণে দ্বিখণ্ডিত। তার স্মৃতি সৌধ এক বাংলার ঢাকাতে কিন্তু তার দেহ শুয়ে আছে আরেক বাংলার মুর্শিদাবাদে। দেশভাগ তথা বাংলাভাগের পরে বরকত ছিলেন ‘ভারতীয়’ ছাত্র যিনি মুর্শিদাবাদ থেকে পড়তে গেছিলেন ঢাকাতে এবং ৫২র ভাষা আন্দোলনে শহীদ হন। ফলে অখণ্ড বাংলার বাঙালীকে দেখতে হলে শুধু উগ্র কিছু মোল্লা আর গোঁড়া কিছু হিন্দু ধর্মান্ধদের দেখলে হবে না, দেখতে হবে এই বরকতদেরই। দুই বাংলার এক অভিন্ন প্রতিনিধি যেন এই বরকতই। আকাশ ভাঙা বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় বরকতের রক্তে গঙ্গা পদ্মার এপার ওপার প্লাবিত। দেহ ছাড়া প্রাণ আমরা ভাবতে পারি না । কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বরকতের মন ওপার বাংলার ঢাকার মাটিতেই। একুশের আন্দোলন শুধুমাত্র শোকে বা জয়লাভে শেষ হয়নি, তা পরিণত হয়েছে শপথে। তাই একুশের প্রাণ যেখানে ঐতিহ্যও সেখানে - বিদ্রোহে। স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে আপামর জনসাধারণের বিদ্রোহ, অন্য সব দিনের চেয়ে তাই ঐতিহ্যগত ভাবে আলাদা একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলা নববর্ষের দিনটির চেয়েও স্বতন্ত্র একুশে – কারণ ঐ ইতিবাচক বিদ্রোহ ।
তবে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা সংগ্রাম আত্মত্যাগের পর মায়ের ভাষাকে যে ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা গেছে, এই সময়ে অতীব প্রয়োজন তার যথার্থ ও সাবলীল সম্প্রসারণ। রবি ঠাকুর লিখে গেছেন – ‘ইউরোপীয় বিদ্যা ইংরাজি ভাষার জাহাজে করে এ দেশের শহরে বন্দরে আসতে পারে। কিন্তু পল্লীর আনাচে কানাচে তাকে পৌঁছে দিতে হলে দেশী ডিঙি নৌকার প্রয়োজন’। আসলেই জাগতিক সমস্ত সম্পদ হারিয়েও মানুষ পৃথিবীতে থাকবে যদি তার মাতৃভাষা সুরক্ষিত থাকে। আর যদি সেই ভাষা অবদমিত হয় তাহলে সে সবই হারাবে। মাতৃভাষার জোর এমনই। সময়ের সাথে সাথে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির উপনিবেশের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পরেও স্বাধীন দেশগুলোর অন্দরে কিন্তু রয়ে গিয়েছে অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সেই সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদের জোরালো স্বর। রবি ঠাকুর বহু আগেই তার আগমন প্রত্যক্ষ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কিত হয়ে বলবার চেষ্টা করেছিলেন যে - এক আইন এক প্রভু হলে স্বাধীনতার পক্ষে সঙ্কট। খণ্ড খণ্ড দুর্বল করে যে কোন দেশ ও জাতিকে গ্রাস আর অবাধ ভোগ করাটাই চরম লক্ষ্য। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে সেই আশঙ্কাই ধরা দিচ্ছে । ভাষার নিজস্ব কোন শ্রেণিচরিত্র নেই কিন্তু ভাষার প্রয়োগেই শ্রেণী চরিত্র ধরা দেয়। মাতৃভাষাই তৈরি করে দেয় লড়াই সংগ্রামের ইস্তেহার । একুশের আন্দোলন সেদিন যাদের বিরুদ্ধে ছিল আজও তাদেরই বিরুদ্ধে। শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের লড়াই। একুশের আন্দোলন সংস্কারে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে সমাজবিপ্লবেই। একুশের দৃপ্ত পথে শ্রেণিচেতনার আলোকে এই লড়াই জারি থাকুক। ![]() প্রকাশের তারিখ: ২১-ফেব্রুয়ারি-২০২২ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|