|
‘ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়’ – পর্ব ৩Webdesk |
কমিউনিস্টদের “দেশদ্রোহী” বলে দাগিয়ে দিতে চায় আরএসএস। ব্রিটিশ শাসকের সমীপে ক্ষমাভিক্ষার মুচলেকা লেখা সাভারকর’রা হয়ে ওঠে বীর, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও তার ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার, গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। শাসককে খুশি করতে লেখা ইতিহাস বইয়ের পাতা দেশের স্বাধীনতার লড়াই’র ঐতিহ্যকে বিকৃত করতে চায়। ভুলিয়ে দিতে চাওয়ার রাজনীতি যেমন চলছে, তার প্রতিরোধে তথ্যনিষ্ঠ, প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার রাজনীতিও চলবে। সে ভাবনা থেকেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য সৈনিক যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে, পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের জীবন ও কাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত, ধারবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ চলছে। |
স্বাধীনতা সংগ্রামী সুকুমার সেনগুপ্ত। কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় সারা পৃথিবীর মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শের সংস্পর্শে আসা এবং সেই জেলে বন্দী থাকা অবস্থাতেই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়া -এ ঘটনা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অঙ্গাঙ্গি উপাদান। আন্দামান জেলের ডা: নারায়ন রায় সহ একাধিক কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা কত যে স্বাধীনতা সংগ্রামীর জাতীয়তাবাদী মননে বিপ্লববাদের সঞ্চার করেছেন তার হিসাব নেই। কমরেড সুকুমার সেনগুপ্তও তাঁদেরই একজন। উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে ১৯১৩ সালে এই বীর সৈনিকের জন্ম। মামাবাড়িতে জন্ম হলেও তাঁর আদি বাড়ি বর্ধমানে। বাবার কর্মসূত্রে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ বিহারে। বিহার থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে চলে আসেন মেদিনীপুরে কাকার বাড়িতে। মেদিনীপুর তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। মেদিনীপুর এসে সুকুমার সেনগুপ্ত দুই বন্ধুর মাধ্যমেই যুক্ত হন সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে। সেই কারণেই যোগ দেন বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সে। কংসাবতী নদীর পাড়ে চাঁদমারি গ্রামে বিপ্লবীরা পিস্তল চালানো অভ্যাস করত। স্বদেশী কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য টাকার দরকার - সুকুমার সেনগুপ্ত নিজের বাড়ি থেকে গয়না লুকিয়ে এনে এই কাজের জন্য দিয়েছিলেন। মেদিনীপুরের মাটিতে ১৯৩১-৩৩ এর মধ্যে পরপর তিনজন ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কে হত্যা করেছিল বেঙ্গল ভলেন্টিয়াররা। জেমস প্যাডি, রবার্ট ডগলাস, বার্নাড বার্জ কে হত্যা করেছিল তারা। এই বার্জকে হত্যার মামলায় সুকুমার সেনগুপ্ত সহ ১২ জনকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে। বিচারে ১৯৩৪ সালে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয় সুকুমার সেনগুপ্তের। এরপর আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, ঢাকা সেন্ট্রাল জেল হয়ে তিনি পৌঁছান আন্দামান সেলুলার জেলে। সেখানেই বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, ডা নারায়ন রায়দের সাথে পরিচয়। রাজনৈতিক বন্দীর মর্যাদা ও রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে টানা ৩৭ দিন জেলে অনশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এরপর আবার তাদের আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয় এবং জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৩৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন।১৯৩৯ সালেও মুক্তির দাবীতে অনশন করেন টানা ৩৬ দিন। ১৯৪৬ সালে সুকুমার সেনগুপ্ত মুক্তি পান। তারপর পার্টির নির্দেশেই চলে যান মেদিনীপুরে। জেল থেকে বেরিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামী সুকুমার সেনগুপ্ত পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন। মেদিনীপুর জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি ও ভিত্তি গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। ১৯৪৭ সালের দ্বিতীয় জেলা সম্মেলন থেকে পার্টির জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৮ এ মেদিনীপুর জেলার সম্পাদক নির্বাচিত হন। স্বাধীন ভারতেও কমিউনিস্ট পার্টি করার অপরাধে কারাবন্দী হন। ১৯৪৮ এ কমিউনিস্ট পার্টি বে আইনি ঘোষিত হলে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে, সংশোধনবাদের বিরূদ্ধে লড়াইয়ে অবিচল কমরেড সুকুমার সেনগুপ্ত মেদিনীপুর জেলায় আবার নতুন করে কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়ে তোলেন। সি পি আই (এম) - এর রাজ্য কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং মেদিনীপুর জেলার সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমৃত্যু তিনি পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য ছিলেন। মেদিনীপুর সহ সারা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য নজির পরপর তিন বছর তিনজন ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা। বেঙ্গল ভলেন্টিয়ারর্সের অন্যতম সদস্য সুকুমার সেনগুপ্ত আজীবন মানূশের মুক্তির লড়াইয়ে সামিল হয়ে ১৯৯৩ সালে মারা যান। বাংলার নতুন সরকার ইতিহাসকে পুর্নলিখন করতে চাইছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস প্রমাণ করে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা কমিউনিস্ট মতাদর্শেই বলীয়ান হয়ে সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের জন্য লড়ে গেছেন। কমরেড সুকুমার সেনগুপ্ত তাঁদেরই একজন। প্রকাশের তারিখ: ২০-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|