|
পরিবেশ রক্ষার লড়াই ও বাংলা বাঁচাও যাত্রাAnjan Mukhopadhyay |
পশ্চিমবঙ্গে পরিবেশবাদী আন্দোলনকে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে শক্তিশালী করে তোলা দরকার। এতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশেরও সুরক্ষা হবে। এ সংগ্রাম হবে আগেকার তুলনায় অধিকতর রাজনৈতিক, কারণ এটি পুঁজিবাদের উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণীবৈষম্যের বিরুদ্ধে গণজাগরণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। |
পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা বিশ্বেই আজ পরিবেশ রক্ষার দাবী ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের বড় হয়ে ওঠার সময়কার অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যায়, কীভাবে আমাদের চারপাশের আবহাওয়া পরিবর্তন হওয়া থেকে শুরু করে গুরুতর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ১৫৫ মিলিয়ন মানুষ যত দুষণ নির্গমনের জন্য দায়ী, মাত্র ৫০ জন ধনকুবের তার চাইতে বেশি দুষণ নির্গমন করেন
![]() ধনীরা তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলে আদৌ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। আয়ের স্তর অনুসারে বিশ্বের জনসংখ্যা, ১৯৫০-২০২১
জলবায়ু ঝুঁকির সংস্পর্শে আসা-
নির্দিষ্ট জলবায়ু জনিত সমস্যাগুলি-
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব-
একটি কথা বলে রাখা আবশ্যক যে, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি ঘনবসতি সম্পন্ন রাজ্যে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও তাকে রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
পুঁজিবাদের উৎপাদন সম্পর্ক ও পরিবেশ সংকট
পুঁজিবাদ একটি উৎপাদন সম্পর্ক যা মূলত মুনাফা বৃদ্ধি ও মূলধন সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত শোষণমূলক শিল্পায়ন ও নগরায়ন, বিশেষত কলকাতা, হাওড়া, হলদিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলে, পরিবেশের উপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি করেছে। লাভের স্বার্থে বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলো তদারকি ছাড়াই বর্জ্য নির্গত করছে, নদী ও মাটিও দূষিত হচ্ছে। এই উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক সংস্থানকে পুঁজি হিসেবে বিবেচনা করে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, পরিবেশ কোনো স্বাধীন অর্থনৈতিক সত্তা না; বরং এটি পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক বাজারের ব্যবহৃত উপকরণ। তাই, পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে লাভের চাকা চালানোর জন্য আরেক ধরনের শোষণ। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চল যেমন হাওড়া বা কলকাতায় শিল্প বর্জ্যের ধারে ধারে জমা, বায়ুদূষণের কারণে মানবজীবনের প্রাথমিক চাহিদা যেমন শুদ্ধ বায়ু, পরিষ্কার জল ইত্যাদির সহজ লভ্যতা হ্রাস পেয়েছে। শ্রমিক ও পরিবেশ পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক শ্রেণী সাধারণত শিল্পক্ষেত্রে নিযুক্ত, যারা নিগ্রহ ও শোষণের শিকার। এই শ্রমিকরা একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণেরও বলি, কারণ তারা দূষিত ও স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়। স্বাস্থ্যগত সমস্যা যেমন শ্বাসকষ্ট, ত্বকের বিভিন্ন রোগ, ক্যান্সার,সিলিকোসিস ইত্যাদি তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। পরিবেশ দূষণের কারণে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতাও কমে যায়, যেটা শোষণকারী কারখানা মালিকদের ক্ষতি করছে না, বরং শ্রমিকদের দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যহানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ, শ্রমিক শ্রেণী ও প্রকৃতির দুই পক্ষেই পুঁজিবাদের অপব্যবহার তাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা বসাচ্ছে। পুঁজিবাদই সৃষ্টি করেছে সামাজিক ও পরিবেশগত বৈষম্য পুঁজিবাদের যুগে সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে যা পরিবেশের অধিকার ও ব্যবহারে হলে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। পরিবেশ দূষণের প্রকোপ নিম্নবর্গ, শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীর ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। তারা শুধুমাত্র স্বাস্থ্যহানির মুখোমুখি নয়, বরং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষ্কার পানীয় জল, দূষণমুক্ত বাতাস থেকে বঞ্চিত হয়। পুঁজিবাদের বাজার দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক উপকার হয় অধিকাংশ সময় ধনী পুঁজিপতিরা লাভবান হয়, আর সাধারণ মানুষের পরিবেশগত অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। এটি সারা বিশ্বের মতই পশ্চিমবঙ্গেও পরিবেশ সংকটকে শ্রেণীভিত্তিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে। রাষ্ট্র ও পরিবেশ নীতি: পুঁজির মালিকদের স্বার্থে বাধা রাষ্ট্র মূলত শ্রেণীশাসনের হাতিয়ার যা পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষায় কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গে যদিও কিছু পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি ও আইন আছে কিন্তু আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে পুঁজিপতি শক্তির দাপটের কারণে তারা কার্যত নুলো হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, শিল্প বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে আইন থাকলেও, ক্ষমতাধর শিল্পপতিরা প্রভাব খাটিয়ে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। রাষ্ট্রের এই পক্ষপাতিত্ব পুঁজিবাদের উৎপাদন সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই আমাদের পরিবেশ রক্ষার দাবী রাষ্ট্রের উন্নয়ন নীতির বিকল্প পথ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও সামাজিকীকরণের গুরুত্ব ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা সম্ভব নয়’। অর্থনৈতিক উৎপাদন সমাজের সার্বিক মালিকানায় আসতে হবে, যাতে সম্পদের ব্যবহার সম্পূর্ণ সমাজের কল্যাণে হয়। পশ্চিমবঙ্গে পরিবেশ রক্ষার জন্য সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি, তারাই শ্রমিক ও কৃষক হিসাবে প্রকৃতির সরাসরি সংস্পর্শে রয়েছেন। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, পরিবেশ বান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি এবং বাস্তুসংস্থানের উন্নয়ন সমাজের তুলনামূলক সুবিধা বাড়াতে পারে, এটা শুধুমাত্র পুঁজিপতিদের মুনাফার জন্য নয়। পরিবেশের জন্য সংগ্রাম শ্রেণী সংগ্রামের নতুন দিক পরিবেশগত ন্যায়ের দাবী শ্রেণী সংগ্রামের এক নতুন ধরনের অংশ হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে পরিবেশবাদী আন্দোলনকে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে শক্তিশালী করে তোলা দরকার। এতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশেরও সুরক্ষা হবে। এ সংগ্রাম হবে আগেকার তুলনায় অধিকতর রাজনৈতিক, কারণ এটি পুঁজিবাদের উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণীবৈষম্যের বিরুদ্ধে গণজাগরণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ রক্ষার দাবী বাস্তবায়নে এ দৃষ্টিভঙ্গির কার্যকর ভূমিকা সম্ভাবনাময়। পরিবেশ ও শ্রেণী সংগ্রামের এই সংমিশ্রণ কেবল পরিবেশ সুরক্ষার মাত্রা বাড়ায় না, বরং সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে। পরিবেশবান্ধব সংগ্রাম ও শ্রেণীবিভাজন সমাজে মূল দ্বন্দ্ব ঘটে মূলত উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণীবিভাজনের কারণে। পশ্চিমবঙ্গের শ্রমজীবী, কৃষক ও গরিব জনগোষ্ঠী পরিবেশ দূষণের জন্য অল্পস্বল্প মধ্যবিত্ত ও ধনী শ্রেণীর তুলনায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। ফলে, পরিবেশবাদের দাবী যদি শুধু পরিবেশ সুরক্ষার ছিল, তা হলে সাধারণ মানুষের—বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষকদের জীবন ও অর্থনৈতিক জীবনের দুর্দশার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারতো না। তবে, যখন পরিবেশবান্ধব আন্দোলনকে শ্রেণী সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তখন এটি পুঁজিবাদের উৎপাদন সম্পর্ক আর শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অংশ হিসেবে দাঁড়ায়। শ্রমিক ও কৃষকরা তাদের পরিবেশগত অধিকার রক্ষার জন্য সংগঠিত হলে, তারা অন্যায়, শ্রমিক শোষণ, জমির অল্পসংখ্যক মালিকদের জমি অভিজাত ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে প্রবেশ করে। পরিবেশের সংকট ও সামাজিক অবিচারের সম্পর্ক পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চল ও নগর এলাকাগুলোতে বায়ু ও জল দূষণের কারণে শ্রমিক-কৃষকদের স্বাস্থ্য গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে। এমন দূষণ তাদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে, চিকিৎসার খরচ বাড়ায় এবং পরিশেষে দারিদ্র্য ও অসুস্থতা বৃদ্ধি করে, যা শ্রেণী বৈষম্যের আরেক মাত্রা তৈরি করে। তাই পরিবেশবাদের দাবি শুধুমাত্র প্রকৃতি সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মূলত শ্রমিক-শ্রেণীর অধিকার, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবিকার নিরাপত্তার দাবী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, পরিবেশবাদের সঙ্গে শ্রমিক-কৃষকদের জীবন সংগ্রামের মিলন ঘটে। নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে পরিবেশগত ন্যায়ের ধারণা পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিক, কৃষক এবং সামাজিক আন্দোলনগুলি পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ঐক্যবদ্ধ হলে এটি কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের উপজাত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেবে। এই ধরনের সংগ্রামে শ্রমিক ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে, পুঁজিপতি শ্রেণীর শোষণ ও পরিবেশের অবনতি উভয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর স্বাছন্দ্য ও প্রকৃতির সমবণ্টন উভয়ই সম্ভব হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট পশ্চিমবঙ্গে অনেক সময় শিল্পায়নে শ্রমিকদের জীবনের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ে। পরিবেশ দূষণের ফলে তাদের স্বাস্থ্যহানি, কাজের পরিবেশ খারাপ হওয়া এবং স্থানীয় জনজীবনের অবনতি ঘটছে। ফলে, শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়া এক ধরনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, কৃষকরা জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস ও বিষাক্ত বর্জ্য সমস্যার কারণে রাস্তায় অবস্থান নিচ্ছেন। এখানেও পরিবেশ সচেতন আন্দোলন কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই মিলন পরিবেশবান্ধব শ্রেণী সংগ্রামের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ পরিবেশবান্ধব শ্রেণীসংগ্রাম পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা শাসক শ্রেণীর মুনাফা ভিত্তিক উন্নয়নের নীতি ও চলতি শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধে এক পাল্টা শক্তির নির্মাণ করবে। এ লড়াই সফল করতে:
পরিবেশবান্ধব আন্দোলন যখন শ্রেণী সংগ্রামের সঙ্গে মিলিত হয় পশ্চিমবঙ্গে, তা শুধুমাত্র প্রকৃতি সংরক্ষণ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচারের জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। এটি পুঁজিবাদের অবাধ শোষণ ও পরিবেশ অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন শক্তিশালী করে তুলতে পারে। সার্বিকভাবে, পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ সংকট, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর অধীনে উৎপাদন ও বণ্টনের বৈষম্যের সরাসরি ফলাফল। তাই পরিবেশ রক্ষণ ও সার্বিকরূপে দীর্ঘমেয়াদী (সাস্টেইনেবল) উন্নয়নের জন্য ব্যবস্থার পরিবর্তন ও সামাজিকীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস অপরিহার্য।
প্রকাশের তারিখ: ২৩-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|