বিদ্যাসাগরের ধর্মচেতনা

Arindam Mukherjee
বাংলার নবজাগরণের বা রেনেসাঁর আদর্শগত ভিত্তি ছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ (Individulism) ও মানবতাবাদ (Humanism)। রেনেসাঁ পুরুষ বিদ্যাসাগরের চরিত্র বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুটি বৈশিষ্ট্য-ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও মানবতা। মধ্যযুগের চিন্তাধারা ছিল ঈশ্বর ও ধর্মকেন্দ্রিক, রেনেসাঁ যুগের চিন্তাধারা ছিল মানবকেন্দ্রিক ও ইহজগতকেন্দ্রিক-সেই অর্থে এক বৈপ্লবিক চিন্তাধারা।

    বর্তমান সময়কালে ধর্মের রাজনীতিকরণের দাপট চলছে। হিন্দু-মুসলিম সব সাম্প্রদায়িক শক্তিই এই দাপট দেখানোর খেলায় আজ মত্ত। তবে সংখ্যাগুরু হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি-আরএসএস রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার সুবাদে  সবার চাইতে বেশি আগ্রাসী ও বিপজ্জনক ভূমিকায় অবতীর্ণ। এই  সাম্প্রদায়িক শক্তির বেড়ে ওঠার মূল উপজীব্য ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, অলৌকিক চিন্তা তথা মানুষে মানুষে জাত-ধর্ম-ভাষা নিয়ে বিরাজমান ভেদাভেদ। এই প্রেক্ষাপটেই ফিরে দেখতে হবে বিদ্যাসাগরের ধর্মভাবনা, ঈশ্বরভাবনা এবং সমাজের পশ্চাৎপদতা দূরীকরণে তাঁর যাবতীয় প্রয়াসকে।

    নামটি তাঁর ঈশ্বরচন্দ্র হলেও বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন ঈশ্বর বা পরলোকের স্বরূপ সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ কোনও ধারণায় উপনীত হওয়া কখনোই কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়, তা নিয়ে বাদানুবাদ বা বিতর্কে জড়িয়ে পড়া তাঁর কাছে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় নি। তাই তিনি হিন্দুধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবদেবী সম্বন্ধে সারা জীবন মৌন থেকেছেন, কোথাও কোনও মন্তব্য করেন নি। বিদ্যাসাগরের ধর্মমত নিয়ে নিরন্তর জল্পনাকল্পনার মূলে রয়েছে এ সম্পর্কে তাঁর নিজের বিস্ময়কর নীরবতা। শ্রী বিনয় ঘোষ তাঁর 'বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ' গ্রন্থে লিখেছেন, 'জীবনে একটিবারের জন্যও তিনি ধর্ম বিষয়ে প্রকাশ্য আলোচনা করেন নি। ঘরোয়া বৈঠকেও না।' এ সম্বন্ধে তাঁর যেটুকু মন্তব্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার বেশিরভাগই কৌতুক,  শ্লেষ ও বক্রোক্তির মাধ্যমে। যদিও প্রথম জীবনে বিদ্যাসাগর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত ব্রাহ্ম সমাজের কাজে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন কিন্তু পরে এর মধ্যে গোঁড়ামি, মতভেদ ও কলহ দেখে তিনি সেখান থেকে সরে আসেন। আবার নিজের কৈশোর ও যৌবনে বিদ্যাসাগর কলকাতায় শিক্ষা ও কর্মজীবনের সূত্রে খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন 'ইয়ং বেঙ্গল' আন্দোলনের রূপ। নির্বিচারে ভারতীয় ঐতিহ্যের সবকিছু অস্বীকার করে অদম্য ক্ষণস্থায়ী আবেগের বশে পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষা ও কৃষ্টির অন্ধ অনুকরণে মত্ত এই গোষ্ঠীর আন্দোলনের আবর্তে তিনি কোনওদিনই প্রবেশ করতে চান নি।

   বিদ্যাসাগর বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর বিষয়ক তত্ত্বকথা এমনভাবে সংগুপ্ত যে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে তার নাগাল পাওয়া যায় না। তাই তাঁর সমগ্র জীবনে তিনি যুক্তির প্রতি আনুগত্যকে সার বলে মেনেছিলেন, পারমার্থিক চিন্তায় তাঁর আসক্তি ছিল না। তাঁর মতে ঈশ্বরসাধনা বা ধর্মকর্ম একান্তভাবে ব্যক্তিগত ধ্যানধারণার বস্তু, প্রচার বা বিতর্কের বিষয় নয়। বিজেপি-আরএস এস ঠিক উল্টো কাজটাই করে চলেছে। একবার 'শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত'র সঙ্কলক মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বা 'শ্রীম' তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "আপনার হিন্দুদর্শন কেমন লাগে?" উত্তরে বিদ্যাসাগর বলেন, "আমার তো বোধ হয়, ওরা যা বুঝাতে গেছে বুঝাতে পারে নাই।" পরে মহেন্দ্রনাথ তাঁকে ঈশ্বর বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দেন, "তাঁকে তো জানবার জো নেই। প্রত্যেকের চেষ্টা করা উচিত যাতে জগতের মঙ্গল হয়।"

    ব্যক্তিগত জীবনে বিদ্যাসাগর প্রচলিত হিন্দুধর্মের দেবদেবী ও অনুশাসনকে স্বীকার করতেন না যদিও তিনি আজীবন উপবীতধারী ব্রাহ্মণই ছিলেন। যখন চিঠিপত্র লিখতেন তার শীর্ষে 'শ্রীহরি'র নাম স্মরণ করতেন, বাবা-মা'র জীবনাবসান হলে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ সন্তানের মতোই অশৌচকর্ম ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পাদন করেছিলেন। ডিরোজিও'র 'ইয়ংবেঙ্গল' সদস্যদের মতো বা তৎকালীন নাস্তিক ধর্মসংস্কারকদের মতো তিনি হিন্দু রীতিনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন নি একথা ঠিক, তবে অভ্যাস বা সংস্কারের বশেই তিনি বাহ্যিকভাবে আচার অনুষ্ঠান মানতেন। মনের অন্দরে সে সম্পর্কে কোনও সায় থাকত না। সর্বোপরি লোকাচার, দেশাচার তথা সংস্কারবোধের সঙ্গে মানবধর্ম ও হৃদয়ধর্মের বিরোধ বাঁধলে তিনি অবলীলায় লোকাচারকে নস্যাৎ করে হৃদয়ধর্মের পক্ষে দাঁড়াতে পারতেন।

    মজার কথা হল, নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বংশের সন্তান হয়েও এবং উপনয়নের পর অভ্যাস করা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ গায়েত্রী মন্ত্র পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলেন। বেনারসে গিয়ে পান্ডাদের বিশেষ অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করেন নি। উপরোন্তু পান্ডা ও পুরোহিতদের মুক্তকন্ঠে বলেছিলেন, "আমি তোমাদের কাশী বা বিশ্বেশ্বর মানি না।" যখন ব্রাহ্মণরা ক্রোধের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি কী মানেন?" তার উত্তরে তিনি সামনে বসা বাবা-মাকে দেখিয়ে বলেছিলেন, "আমার বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণা উপস্থিত এই পিতৃদেব ও জননীদেবীতে বিরাজমান।"

   ঈশ্বর সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের অনেক ক্ষেত্রেই ছিল নিস্পৃহতা। তবে কোনওক্ষেত্রেই ছিল না উগ্র বিরোধিতা বা সোচ্চার অস্বীকার। একবার এক ভদ্রলোক বিদ্যাসাগরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "আপনি ভগবান মানেন?" উত্তরে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, "উনি যখন আমাকে নিয়ে খোঁচাখুঁচি করছেন না, তখন আমারই বা কী দরকার ওনাকে নিয়ে খোঁচাখুঁচি করা?" একবার কাশীধামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁর কাছে এসে বলেন, "ধর্ম সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করিবার ছিল।" তার উত্তরে বিদ্যাসাগর বলেন, "আমার মত কাহাকে কখনও বলি নাই, তবে এই কথা বলি, গঙ্গাজলে যদি আপনার দেহ পবিত্র মনে করেন, শিবপূজায় যদি হৃদয়ের পবিত্রতা লাভ করেন তাহা হইলে তাহাই আপনার ধর্ম।" অর্থাৎ এই প্রশ্নে বিদ্যাসাগর  ব্যক্তিগত মানসিকতা ও প্রবণতার স্বীকৃতিই প্রদান করেছেন।

   বিদ্যাসাগর রচিত 'বোধোদয়' পুস্তকের প্রথম সংস্করণে নানাবিধ পার্থিব জ্ঞানের পরিচয় থাকলেও ঈশ্বর সংক্রান্ত কোনও উল্লেখ ছিল না। এই দেখে বিদ্যাসাগরের অনুরাগী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রশ্ন তুলেছিলেন, "মহাশয় ছেলেদের জন্য এমন সুন্দর একখানি পাঠ্যপুস্তক রচনা করিলেন, বালকদের জানিবার সকল কথাই তাহাতে আছে, কেবল ঈশ্বর বিষয়ে কোনও কথা নাই কেন?" তার উত্তরে বিদ্যাসাগর বলেন, "যাঁহারা তোমার কাছে ওইরূপ বলেন, তাহাদীগকে বলিও, এইবার যে 'বোধোদয়' ছাপা হইবে, তাহাতে ঈশ্বরের কথা থাকিবেক।" কথামতো পরবর্তী সংস্করণে বিদ্যাসাগর 'বোধোদয়'-এ ঈশ্বর বিষয়ক ক্ষুদ্র নিবন্ধ যোগ করে দেন। তবে তা নিরাকার চেতনায় নির্মিত। ব্যক্তিগত মত যাই হোক না কেন, পাঠ্যপুস্তক নির্মিত হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে, হয়তো এই ভাবনা থেকেই বিদ্যাসাগর এই ধরনের নমনীয় ও বাস্তববাদী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। শিক্ষার গৈরিকীকরণের উদ্দেশ্যে অহরহ এন সি ই আর টি'র পাঠক্রম পরিবর্তনের পান্ডা আরএসএস-বিজেপি মহান শিক্ষাবিদ বিদ্যাসাগরের ভূমিকা থেকে কিছুমাত্র শিক্ষা গ্রহণ করলে  ইতিহাস বিকৃতির করাল গ্রাসের শিকার হয়তো হতে হত না আমাদের মহান ভারত ও ভারতীয় সভ্যতাকে।

   প্রথমে বিদ্যাসাগরকে নাস্তিক বলে  প্রচার করেছিলেন তাঁর শিষ্য ও অনুরাগী  আচার্য  কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য। তবে তাঁর ধর্মচিন্তা ও ঈশ্বরভাবনার টুকরো টুকরো অজস্র ঘটনাবলীকে জোড়া লাগালে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তাতে তাঁর চরিত্রের সঙ্গে 'নাস্তিক' কথাটি বেমানান শোনায়। সেক্ষেত্রে সঠিক কথাটি হতে পারে সংশয়বাদী বা দুর্জ্ঞেয়বাদী (agnostic)।
   বিদ্যাসাগরের অন্যতম জীবনীকার চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে 'তাঁহার নিত্যদিনের আচার-ব্যবহার, ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন নিষ্ঠাবান হিন্দুর অনুরূপ ছিল না, অপরদিকে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের লক্ষণের পরিচয়ও কখনও পাওয়া যায় নাই।' আর এক জীবনীকার বিহারীলাল সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী '---বিদ্যাসাগর কালের লোক। কালধর্মই তিনি  পালন করিয়া গিয়াছেন।' আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মন্তব্যটি এই প্রসঙ্গে অবশ্যই  স্মরণীয়---'স্বর্গের দেবতায় তাঁহার কীরূপ আস্থা ছিল জানি না; কিন্তু স্বর্গাদপি গরীয়ান  জীবন্ত দেবের তুষ্টির জন্য আপনার ধর্মবুদ্ধিকে পর্যন্ত বলিদান দেওয়া সময় বিশেষে প্রয়োজন হইতে পারে, তাহা তিনি স্বীকার করিতেন।' মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য অযৌক্তিক শাস্ত্রবচনকে তিনি তুচ্ছ করতে পারতেন। বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ রদ ও সর্বোপরি বিধবাবিবাহ প্রচলনে তাঁর শাস্ত্র বিশ্লেষণ প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বিরূদ্ধে আঘাত। নির্মম দেশাচারের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। সমাজের পরিবর্তন সাধনে তিনি ছিলেন অমিত মনোবলের অধিকারী। এই সমাজ পরিবর্তনের তাগিদেই তিনি দুর্বল জাতিকে শিক্ষিত করার প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে, বিদ্যালয় স্থাপনে, ছাত্র কল্যাণে, পাঠ্যসূচি ও পুস্তক প্রণয়নে তথা সামাজিক কুপ্রথা ও সংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রামেই তাঁর সারাটা জীবন অতিবাহিত হয়ে গেছে। সেখানে ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে চিন্তা করার অবকাশ কোথায়?

   সমাজকল্যাণ, মানবিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন হয়েই বিদ্যাসাগর কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ-শূদ্র নির্বিশেষে সব জাতের ছাত্রদের জন্য। তার আগে কলেজে কেবল ব্রাহ্মণ সন্তানদেরই পড়ার অধিকার ছিল। ছাত্রদের স্বার্থে আধুনিক ইংরাজি ও দর্শন শাস্ত্রের শিক্ষা পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। তাঁর মতে দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী সাংখ্য ও বেদান্ত দর্শনের মতো ভাববাদী ও  ভ্রান্ত দর্শন পড়ানোর বাধ্যতা থাকায় তার প্রতিষেধক হিসেবেই আধুনিক দর্শনশাস্ত্রের বইও পড়ানো প্রয়োজন। এই ভাবনা থেকেই বিদ্যাসাগর বেনারস সংস্কৃত কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষ ব্যালেন্টাইন সাহেব কলকাতার সংস্কৃত কলেজে পরিদর্শক হিসেবে এসে ভাববাদী দার্শনিক বার্কলের পুস্তক পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করলে তার বিরোধিতা করেন এবং  ওই সুপারিশ কার্যকর করা হতে বিরত থাকেন। প্রচলিত ধর্মচেতনায় আচ্ছন্ন থাকলে বেদান্ত দর্শনকে ভ্রান্ত দর্শন আখ্যা দেবার তথা উপরোক্ত পদক্ষেপগুলি গ্রহণের দৃঢ়তা বিদ্যাসাগর দেখাতে পারতেন না।

   বাংলার নবজাগরণের বা রেনেসাঁর আদর্শগত ভিত্তি ছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ (Individulism) ও মানবতাবাদ (Humanism)। রেনেসাঁ পুরুষ বিদ্যাসাগরের চরিত্র বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুটি বৈশিষ্ট্য-ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও মানবতা। মধ্যযুগের চিন্তাধারা ছিল ঈশ্বর ও ধর্মকেন্দ্রিক, রেনেসাঁ যুগের চিন্তাধারা ছিল মানবকেন্দ্রিক ও ইহজগতকেন্দ্রিক-সেই অর্থে এক বৈপ্লবিক চিন্তাধারা। মানবজীবনের মহত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন চিন্তার স্বীকৃতি রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ভাবাদর্শ। কোনও কিছুর অন্ধ অনুকরণ নয়, কোনও কিছুকে না বুঝে, নির্বিবাদে, দ্বিধাহীন চিত্তে গ্রহণ করা নয়, নিজের যুক্তি ও ভাবনার আলোকে প্রতিটি বিষয়ের সত্যাসত্য বিচার করে তার মূল্যায়ন করা-এই ভাবনাই রেনেসাঁর মূল বৈশিষ্ট্য। এই ভাবনার মূলে রয়েছে সংশয় প্রবৃত্তি অর্থাৎ প্রতিটি বিষয়ের সত্যাসত্য ও যথার্থতা যাচাই করে দেখার মনোভাব। যে মনোভাবের পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছিল বিদ্যাসাগরের চরিত্রে।
   বিদ্যাসাগরের সারা জীবনের কর্মধারা তাঁর সমাজবিপ্লবী সত্তার পরিচায়ক। বিশিষ্ট মার্কসবাদী ইতিহাসবেত্তা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, "বিদ্যাসাগর  যুগে মানুষ ও সমকাল প্রস্তুত ছিল না বৈপ্লবিক উদ্যোগের জন্য। এটাই হল বিদ্যাসাগর-জীবনের (এবং অন্যান্য বহু ভারতীয় মহামতির জীবনের) ট্রাজেডি।" এই বস্তুবাদী সমাজবিপ্লবীকে কেবলমাত্র রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধাচরণের মুখে পড়তে হয় নি, তারা তাঁর প্রাণনাশেরও চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন তাঁর আদর্শে অটল। আধ্যাত্মিক জগতের কুহেলিকায় দিগভ্রষ্ট হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না বলেই তিনি দক্ষিণেশ্বরে যাবার জন্য রামকৃষ্ণ পরমহংসের দুর্নিবার আহ্বানকে উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। পুত্র শম্ভুচন্দ্রের বিধবা বিবাহে সম্পূর্ণ  সায় জানিয়ে লেখা চিঠিতে তাই তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে লিখতে পেরেছিলেন-'আমি দেশাচারের দাস নহি, নিজের বা সমাজের মঙ্গলের নিমিত্ত যাহা উচিত বা আবশ্যক বোধ হইবে, তাহা করিব, লোকের বা কুটুম্বের ভয়ে কদাচ সঙ্কুচিত হইব না।'
   বর্তমান রাজনৈতিক,  সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এই দৃঢ়চেতা মানুষটির দেখানো পথেই আমাদের এগিয়ে চলতে হবে।

প্রকাশের তারিখ: ২৬-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org