গান্ধীর হত্যাকারীদের উত্তরসূরিরা আজ রাজ্য ও দেশের ক্ষমতায়

Somnath Bhattacharya
বিজেপির চালিকা শক্তি আরএসএস যে কত ভয়ঙ্কর, দেশের আম জনতার জন্য কতটা সর্বনাশা তার কয়েকটা উদাহরণ এই লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আরএসএস যে আপাদমস্তক কমিউনিস্টবিরোধী এতে আমরা কোন দোষ দেখি না। পৃথিবীতে যুগে যুগে, কালে কালে ফ্যাসিস্টরা কমিউনিস্টবিরোধী

জন্ম ২ অক্টোবর ১৮৬৯। মৃত্যু ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ বিকেল ৫টা বেজে ১৭ মিনিট। হিন্দুত্ববাদী নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হলেন আজন্ম হিন্দুধর্মের পূজারী, ধর্মপ্রাণ রামভক্ত, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। বেরেটা এম ১৯৩৪ পিস্তলের তিন তিনটে গুলি স্তব্ধ করে দিয়েছিল মহাত্মার জীবন। যিনি মৃত্যুর পূর্বমূহুর্তে নাকি অস্ফুটে উচ্চারণ করেছিলেন 'হে রাম'। গান্ধী তার জীবন বলিদানের মধ্য দিয়ে রক্ষা করে গেলেন দেশকে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকে।

গান্ধী হত্যার ব্যাপারে একটা কথা অবশ্যই বলা দরকার নাথুরাম গুলিটা চালালেও গান্ধী হত্যা তার একার পরিকল্পনা ছিল না। এটা ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের একটা পুরো টিম সেখানে কাজ করেছিল। এর আগে পাঁচ পাঁচবার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ষষ্ঠবার তারা সফল হলো। বিচারক আত্মা চরণের এজলাসে গান্ধীহত্যার অভিযোগকারী হিসেবে জড়িত কয়েকটি নাম ও শাস্তিটা ছিল এইরকম। নাথুরাম গডসে (ফাঁসি), নারায়ণ আপ্তে (ফাঁসি), বিষ্ণু কারকারে (যাবজ্জীবন কারাদণ্ড), মদনলাল পাওয়া (যাবজ্জীবন কারাদণ্ড), গোপাল গডসে (যাবজ্জীবন কারাদণ্ড), দিগম্বর বাগে (রাজসাক্ষী হবার কারণে ক্ষমা পান), বিনায়ক সাভারকার (পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে খালাস) ... । এরা প্রত্যেকেই হিন্দু মহাসভা বা আরএসএস-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

পরে ১৯৬৫ সালে জীবনলাল কাপুরের নেতৃত্বে গঠিত কাপুর কমিশনের রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলা হয় মূল বিচারে খালাস পেলেও সাভারকার ও তার দলবল যে এই ষড়যন্ত্রে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন তার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ আরএসএসকে ভারত সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়,

(১) দেশে ঘৃণা ও হিংসার পরিবেশ সৃষ্টি করার পেছনে এই সংগঠনের ভূমিকা আছে। এবং
(২) গান্ধী হত্যার পর দেশের বেশ কিছু জায়গায় আরএসএস কর্মীদের বিরুদ্ধে মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ করার অভিযোগ ওঠে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তৎকালীন আরএসএস প্রধান মাধব সদাশিব গোলওয়ালকারকে লেখেন, আরএসএসের বক্তৃতায় যে বিষ ছড়ানো হয়েছে তারই ফলশ্রুতিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

হিন্দু মহাসভাকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও এর প্রধান প্রধান নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ধীরে ধীরে এই সংগঠনটি ভারতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারায়। ১৯৪৯ সালের ১১ জুলাই পর্যন্ত নিষিদ্ধ থাকার পর শর্তসাপেক্ষে আরএসএস-র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
শর্তগুলি হলো :
(ক) আরএসএসকে একটি লিখিত সংবিধান গ্রহণ করতে হবে।
(খ) সংগঠনটিকে কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নেওয়া চলবে না।
(গ) কার্যকলাপের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বজায় রাখতে হবে। এই সব ক'টি শর্ত সাপেক্ষে আরএসএসকে নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হতে হয়।

তখন তারা তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করে। যা ১৯৮০ সালের ৬ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত বিজেপি-র পূর্বসূরী।
তাই যে কথাটা আজ মানুষের কাছে সুস্পষ্টভাবে বলা দরকার তা হলো গান্ধীর হত্যাকারীদের উত্তরসূরিরাই আজ দেশের ক্ষমতায়, রাজ্যের ক্ষমতায়। এদের চিনতে দেশবাসীর যেন কোন ভুল না হয়ে যায়!

গান্ধীর বিরুদ্ধে এই হিন্দুত্ববাদীদের প্রধান অভিযোগগুলি হলো দেশভাগের পর, পাকিস্তানের প্রাপ্য ৫৫ কোটি টাকা দেবার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, অহিংসার নীতি গ্রহণ যা হিন্দুদের দুর্বল করেছিল এবং সমাজে যাদের তারা অস্পৃশ্য বলে মনে করে তাদের 'হরিজন' বলে সম্বোধন করা।
 দেশভাগের ভিত্তি দ্বিজাতিতত্ত্বকে সাভারকরই সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থে উপস্থিত করেন ১৯৩৭ সালে আমেদাবাদের কর্ণাবতীতে অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভার ১৯তম অধিবেশনে। সভাপতির ভাষণে বিস্তারিতভাবে তিনি সেই তত্ত্ব উপস্থিত করেন। (Hindu Rashtra Darshan : V.D. Savarkar) পরে ১৯৪০ সালে জিন্নাহ একে দেশভাগের সংকল্পে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যান।
 সংসার ভাঙলে যেমন সম্পত্তি ভাগ হয় সেভাবেই দেশভাগের পর পাকিস্তানের বকেয়া পাওনা ছিল ৫৫ কোটি টাকা। সেই টাকা দেবার জন্য গান্ধীজী সরকারকে চাপ দেন। এটিকে তারা গান্ধীর মুসলিম তোষণ নীতি বলে মনে করে।

আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ আদৌ হিন্দু ধর্ম নয়। হিন্দু ধর্ম যখন 'বসুধৈব কুটুম্বকম' অর্থাৎ সকল মানুষকে নিজের আত্মীয় বলে মনে করার কথা বলে, হিন্দুত্ববাদ তখন ধর্মের নামে হিংসার কথা বলে। ওদের কথা Hinduise Politics and Militarize Hindudom অর্থাৎ রাজনীতির হিন্দুকরণ ও হিন্দু সমাজের সামরিকীকরণ।
অথচ গান্ধীজী বলতেন, "হিন্দু ধর্মের কোনো সুনির্দিষ্ট মতবাদ নেই। হিন্দু ধর্ম ব্যাখ্যা করতে বললে আমি শুধু বলব অহিংসার পথে সত্যের সন্ধান।" ( What is Hindu Religion : M.K. Gandhi 1924)। যা ছিল নাথুরাম, সাভারকারদের একেবারেই না-পসন্দ্।
মনুবাদী আরএসএস মনে করে ব্রাহ্মণরা উৎকৃষ্ট বাকিরা নিকৃষ্ট। এসসি, এসটি, ওবিসিরা অতি নিকৃষ্ট। কারণ সেটাই মনুর বিধান। (মনুসংহিতা, প্রথম অধ্যায়, শ্লোক ৩১)। অথচ গান্ধী সমাজের এই তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষদের 'হরিজন' বলে সম্বোধন করেন। তাদের জন্য ন্যায্য অধিকার দাবি করেন। খুব স্বাভাবিক কারণেই এসব তো হিন্দুত্ববাদীদের সহ্য হবার কথা নয়!
এগুলোর সঙ্গে গান্ধীর আরো বড় একটা অপরাধকে ওরা ক্ষমা করতে পারেনি। রামভক্ত গান্ধী 'রামধুন' গাইবার সময় বলতেন, ঈশ্বর আল্লাহ তেরো নাম/ সবকো সম্মতি দিয়ে ভগবান/ রঘুপতি রাঘব রাজা রাম। রামের মধ্যেই তিনি ঈশ্বরকেও পেতেন আবার আল্লাহকে পেতেন। এত বড় অপরাধ কি আরএসএস ক্ষমা করতে পারে? কখনোই নয়। তাই সুপরিকল্পিত উদ্যোগে সংঘটিত হল গান্ধী হত্যা।

গান্ধীজীকে নানা জনে নানা ভাবে চিত্রিত করেছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যখন পাঞ্জাবে হাজার হাজার সশস্ত্র সেনা ও পুলিশ দাঙ্গা থামাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন গান্ধীজি একাই বাংলায় অবস্থান করে দাঙ্গা শান্ত করেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাঁর এই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁকে "One-Man Boundary Force" বা 'একাকী এক সীমান্ত বাহিনী' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

বিশিষ্ট গান্ধী গবেষক জুডিথ ব্রাউন তাঁকে 'Prisoner of Hope' বা 'আশার বন্দী' বলে বর্ণনা করেছেন। 
গান্ধীজীর নানা সময়ের নানা পদক্ষেপ নিয়ে কমিউনিস্টদের ভিন্নতা ছিল, ভিন্নতা আছে। আর সেই ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। তাঁরাও তাঁদের মত করে গান্ধীজীকে দেখেছেন এবং মূল্যায়ন করেছেন। 

ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The Mahatma and the Ism'-এ বললেন, গান্ধীজি ছিলেন ভারতের বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এমন এক ‘মহৎ কিন্তু সীমাবদ্ধ ঐতিহাসিক চরিত্র’, যিনি সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই জাগরণকে সমাজতান্ত্রিক বা বিপ্লবী পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে দেননি।
তাঁর মূল্যায়নে ইএমএস গান্ধীর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করলেও (যেহেতু তিনি রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করতেন), দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় গান্ধীর আত্মত্যাগ ও সাহসিকতাকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বিশিষ্ট মার্কসবাদী পণ্ডিত সৈয়দ শাহেদুল্লাহ 
'লেনিনবাদীর চোখে গান্ধীবাদ’ বইটিতে দেখালেন — গান্ধীবাদ ছিল ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের এক অপরিহার্য পদক্ষেপ। যা গণমানুষকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাগিয়েছিল। কিন্তু তাঁর নীতিগত ও শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা শোষিত মানুষের সামগ্রিক মুক্তির (সমাজতন্ত্র) পথ দেখাতে পারেনি। কিন্তু একই সঙ্গে শাহেদুল্লাহ ঐ বইতেই বলছেন, ভারতের কোটি কোটি গ্রামীন কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে গান্ধীজির ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। 
এটাই ছিল মার্কসবাদীদের গান্ধীজী সম্পর্কে দ্বান্দ্বিক মূল্যায়ন। 
তবে পূর্বোক্ত যে প্রশ্নগুলোতে হিন্দুত্ববাদীরা তাঁর বিরোধিতা করেছে সেই প্রশ্নগুলোতে আমাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে গান্ধীজীর পক্ষে এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে।
বিলেতে জ্যোতি বসুদের কমিউনিস্ট হবার হাতে খড়ি দিয়েছিলেন যে রজনীপাম দত্ত তিনি গান্ধীজীর নানা অবস্থানের কড়া সমালোচক ছিলেন। কিন্তু তিনিও বলেছেন, একমাত্র গান্ধী ভারতীয় গরীব জনসাধারণের কুঁড়ে ঘরে এবং তাদের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পেরেছেন। যেখানে ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী কখনোই ঢুকতে পারেনি। (জাতীয় আন্দোলন : মতাদর্শ ও ইতিহাস চর্চা - ইরফান হাবিব)।

ইরফান হাবিব মনে করেন, গান্ধীজীর জীবনের শেষ এক বছরের অবদান এক কথায় অনবদ্য। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত। তাই যখন দেশ স্বাধীন হচ্ছে তখন তিনি দিল্লীতে নেই। রয়েছেন কলকাতায়। বেলেঘাটার একটি মুসলিম পাড়ায়। হায়দারি মঞ্জিল নামের এক ভগ্নপ্রায় বাড়িতে। আজ যেটা গান্ধী ভবন।
গান্ধী হত্যার পর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় কমরেড জ্যোতি বসু এক অনন্য বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি বলেন, "সারা দেশের সঙ্গেই আমার পার্টিও গান্ধীজীর হত্যায় শোকাহত। .... এই শতাব্দীর চতুর্থাংশ জুড়ে ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবল প্রভাব সর্বজনবিদিত। গত কয়েকমাসে গান্ধীজী তাঁর অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আমরাও এসেছিলাম। গভীর দূরদৃষ্টিতে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, সাম্প্রদায়িক হানাহানি আবার একবার পরাধীনতার নয়া সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল আমাদের পায়ে পরিয়ে দেবার পথ প্রশস্ত করবে। যখন ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ আমাদের মন ছেয়ে ফেলেছিল, হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুর যন্ত্রণাবিদ্ধ চীৎকারে বাতাস যখন ভারি হয়ে উঠেছিল, .... তখন নিজস্ব সহজসরল পথে গান্ধীজী নোয়াখালি, কলকাতা, দিল্লি, দেশের সর্বত্র সাধারণ মানুষের দরজায় দরজায় তাঁদের মৌলিক মনুষ্যত্বের দরবারে আবেদন জানিয়ে ফিরেছেন। ..... তিনি জীবনের সর্বোত্তম আত্মত্যাগের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। কি হিন্দু, কি মুসলিম, ভারতে কি পাকিস্তানে, সর্বত্র সাধারণ মানুষ তাঁর ডাকে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছিল। এটা নিশ্চিত যে এই মহান কর্তব্য সম্পূর্ণ করার মধ্যেই গান্ধীজী তাঁর জীবন উৎসর্গ করলেন, খুন হয়ে গেলেন সাম্প্রদায়িক হিন্দু মহাসভার আততায়ীর নোংরা হাতে।"

কমিউনিস্টদের পত্রিকা স্বাধীনতায় গান্ধী হত্যা নিয়ে সম্পাদকীয় লেখা হয়। এভাবেই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায়, বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে কমিউনিস্টরা গান্ধীজীর মূল্যায়ন করেছেন। 
আমাদের উৎকন্ঠা আজ এ রাজ্য ও  দেশের শাসকদের নিয়ে যারা গান্ধীহত্যার সেই উত্তরাধিকার বহন করছে আরও অনেক বেশি ক্ষমতা নিয়ে, আরও অনেক বেশি আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে। ওদের নীতি কর্পোরেট তোষণ ও আম জনতার শোষণ।

তাই এই সংগ্রামে আরএসএস ও তাদের প্রস্তাবিত হিন্দু রাষ্ট্রের স্বরূপটা চিনতে ভুল হয়ে গেলে আরও অনেক বড় মাশুল আমাদের গুণতে হবে।
আরএসএসের দ্বিতীয় সরসংঘচালক মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার ১৯৩৯ সালে একটি বই লিখেছিলেন যার নাম, "We or Our Nationhood Defined" সেখানে তিনি বললেন হিন্দু ধর্মের তিনটে শত্রু। মুসলমান, খ্রিস্টান ও কমিউনিস্ট। তাহলে হিন্দুরাষ্ট্রে কেন মুসলমান আর খ্রিস্টানদের ভোটাধিকার থাকবে না সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, ব্রহ্মার মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য আর পদতল থেকে শূদ্রের সৃষ্টি হয়েছে। (মনুসংহিতা, প্রথম অধ্যায়, শ্লোক ৩১)। তাই হিন্দুরাষ্ট্রে ব্রাহ্মণ সবার ওপরে আর শূদ্র সবার নীচে থাকবে। 
নারী সম্পর্কে মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, "নারী বাল্যে পিতার অধীন, যৌবনে স্বামীর অধীন আর বার্ধক্যে পুত্রের অধীন।" (মনুসংহিতা, পঞ্চম অধ্যায়, শ্লোক-১৪৮)। অর্থাৎ নারীর কোনও স্বাধীন সত্ত্বা নেই। তাই হিন্দুরাষ্ট্রে নারী হবে উনমানব। অর্থাৎ মানবের চেয়ে কম বা আরও পরিষ্কার করে বললে পুরুষের চেয়ে কম। নারীর জন্য নির্দিষ্ট করা হবে তিনটে জায়গা। রান্নাঘর, ঠাকুরঘর আর আঁতুরঘর।

হিন্দুরাষ্ট্রের সংবিধান হবে মনুসংহিতা। দেশ চলবে মনুর বিধানে। কেমন সে বিধান? মনু বলেছেন, "স্বামী দুশ্চরিত্র, কামুক বা গুণহীন হলেও তিনি স্ত্রীর দ্বারা দেবতার ন্যায় সেব্য।" (মনুসংহিতা, পঞ্চম অধ্যায়, শ্লোক-১৫৪)।
স্তম্ভিত হবার মত কথা!
মনুসংহিতা আরও বলছে, শূদ্র যদি ব্রাহ্মণকে কটু কথা বলে তার জিভ কেটে নাও। (মনুসংহিতা, অষ্টম অধ্যায়, শ্লোক ২৭০)। কি নৃশংস কথা ভাবতে পারেন!
ওদের গুরু গোলওয়ালকার বলেছেন, প্রতিটি বিবাহিত নারীর উচিত প্রথমে নাম্বুদ্রি সম্প্রদায়ের মত উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণের সন্তান নিজের গর্ভে ধারণ করা। তারপর নিজের স্বামীর সন্তানের জন্ম দেওয়া। (Organiser 2nd January 1961, page-5) । যে কথা শুনলে আপনার আমার বিবমিষার উদ্রেক হয়, গা রি রি করে জ্বলতে থাকে, সেইসব ভাবনা আরএসএসের মত হিন্দুত্ববাদীরা অবলীলায় করতে পারে। এরা যেমন দেশের সংবিধানকে মানে না, তেমনই দেশের জাতীয় পতাকাকেও মানে না। অর্গানাইজার লিখেছিল, তেরঙ্গা পতাকা আমরা মানিনা, কারণ তিন সংখ্যাটা অশুভ। (Organiser, 14th August 1947) । এই কারণেই চন্দ্রযান ২-এর ব্যর্থ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল 'তেরঙ্গা'।
এরা আবার নিজেদের দেশপ্রেমিক বলে দাবী করে! যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে কুটো নেড়ে দুটো করেনি, যারা দেশের সংবিধানকে মানে না, যারা জাতীয় পতাকাকে সম্মান করে না, যারা রবীন্দ্রনাথের লেখা জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তন চায় তারা নাকি দেশপ্রেমিক? এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কী হতে পারে?
যেখানে যা কিছু নিকৃষ্ট ভাবনা আছে তার সম্পৃক্ত ভাণ্ডার হল আরএসএস আর বিজেপি যা মানবতাকে পদদলিত করে, মনুষ্যত্বকে অসম্মান করে।

আরএসএস-র স্বরূপ: রুটি-রুজির বিরোধিতা
বিজেপির চালিকা শক্তি আরএসএস যে কত ভয়ঙ্কর, দেশের আম জনতার জন্য কতটা সর্বনাশা তার কয়েকটা উদাহরণ এই লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আরএসএস যে আপাদমস্তক কমিউনিস্টবিরোধী এতে আমরা কোন দোষ দেখি না। পৃথিবীতে যুগে যুগে, কালে কালে ফ্যাসিস্টরা কমিউনিস্টবিরোধী। কারণ কমিউনিস্টদের কাছে ওদের যেভাবে পরাজিত ও পর্যুদস্ত হতে হয়েছে তাতে ওরা কমিউনিস্টবিরোধী না হলে সেটাই আশ্চর্যের হত।
তাই কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ওদের বিদ্বেষ ও ঘৃণা ওরা সুযোগ পেলেই সোচ্চারে প্রকাশ করে।

এই লক্ষ্যেই আরএসএসের বাংলা মুখপত্র 'স্বস্তিকা' ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ 'কমিউনিস্ট বিরোধী' সংখ্যা প্রকাশ করেছে। সেখানে তাদের কমিউনিস্ট বিদ্বেষের প্রকট পরিচয় দিতে তারা কোন ফাঁক রাখেনি। প্রচ্ছদটি কালো রংয়ের যার মধ্যিখানে কাস্তে-হাতুড়ির ছবি কঙ্কালের হাড় দিয়ে বানানো। আর হাতুড়ির মাথাটা একটা মড়ার খুলি।
এই সংখ্যার উত্তর সম্পাদকীয় লেখায় শিবেন্দ্র ত্রিপাঠী লিখেছেন, "পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থানের পর থেকে কমিউনিস্টরা একটি স্লোগান বারে বারে প্রচার করে চলেছে। মানুষের লড়াই ভাতের জন্য জাতের জন্য নয় অর্থাৎ ধর্মের জন্য নয়।"
ওই লেখায় আমাদের ভাতের জন্য এই লড়াইকে কটাক্ষ করে বলা হলো, কমিউনিস্টরা হচ্ছে 'ভাত দে গ্যাঙ'। সেখানে স্পষ্ট করে লেখা হল, "ভারতবর্ষ ধর্মের দেশ, ভাতের দেশ নয়। এদেশে ভাতের থেকে জাতের অর্থাৎ ধর্মের মহত্ত্ব বেশি।" ভাতের জন্য লড়াই করার কারণে কমিউনিস্টদের তারা পশুর সঙ্গে তুলনা করেছে। সেখানে বলা হল, "এ দেশের চিরন্তন সংস্কৃতির দৃষ্টিতে এই 'ভাত দে' তত্ত্বের অনুসরণকারী কমিউনিস্টরা ঠিক মানুষ নয়, মানুষের রূপধারী কোন পশুই হবে।"
যাঁরা এই লেখা পড়তে পড়তে ভাবছেন ঠিক পড়ছেন কিনা বা উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে কোন ভুল হল কিনা, তাঁদের বলছি আপনি একদম সঠিক পড়ছেন এবং উদ্ধৃতিতেও কোন ভুল নেই। আসলে এটাই আরএসএস। এই ভাবনা নিয়েই তারা চলে আর বিজেপিকে চালায়।

আরএসএস ভাত আর রুটি রুজির লড়াইয়ের প্রশ্নে সুতীব্র সমালোচনা করতে করতে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল। ওরা বলল, "যারা বলেন জাত ধর্ম কোন ফ্যাক্টর নয় তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন। মানুষের জীবনে ধর্ম একটা ফ্যাক্টর এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। মানুষ চাইলে ভাত ছেড়ে দিতে পারে কিন্তু জাত ধর্ম কখনোই নয়। লড়াইটা কোনদিন ভাতের ছিল না। চিরকালই ছিল জাতের। আমাদের লড়াই জাতের (ধর্মের) জন্য, ভাতের জন্য নয়। যদি জাত-ধর্ম বাঁচে তবে দুবেলা দুমুঠো ভাত ঠিকই জুটে যাবে।”
তাই আমাদের সতর্ক হতে হবে। গত ১২ বছর ধরে আমাদের দেশ গান্ধী হত্যাকারীদের উত্তরসূরীদের হাতে। আর চরম লজ্জার হলেও সত্য রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ-র বাংলাও  এখন তাদেরই হাতে।
তাই গান্ধীজীর চশমা দেওয়া স্বচ্ছ ভারতের বিজ্ঞাপন দেখে বা ২ অক্টোবর গান্ধী মূর্তিতে মালা দেবার ধুম পড়ে গেলে আমরা যেন ভুলে না যাই গান্ধী হত্যাকারী কারা!

তাই গান্ধীজীর আত্মত্যাগের শিক্ষাকে মাথায় রেখেই লড়তে হবে বিজেপি আরএসএস সহ সব ধরণের সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে। বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে। কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে। ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়ার লক্ষ্যে। 
এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।


প্রকাশের তারিখ: ০২-অক্টোবর-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org