|
সঙ্ঘ নারী সংগ্রাম-৪Chandan Das |
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন অনেক বীর নিজেদের সমর্পণ করেছেন। কল্পনা দত্তর মতো অনেকে বেছে নিয়েছেন কমিউনিজমের পথ। কিন্তু যা তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো, দেশের মুক্তির সংগ্রামে ধর্মের বিভাজনকে সেই নারীরা হেলায় ছুঁড়ে ফেলে গেছেন লড়াইয়ে। |
নোটের পিঠে গান্ধীর ছবি। আর কাগজে, চ্যানেলে, খেলার মাঠে ছয়লাপ নাথুরামের পরবর্তী প্রজন্মের সহায়ক নীতা আম্বানীদের গর্বিত মুখমন্ডল। এর মাঝে আমি বরাবর ‘জননী জন্মভূমিশ্চ’-র হিসাবটা গুলিয়ে ফেলি— ‘রানী’ জানেন। ‘রানী’র বৈশিষ্ট্য— তিনি আমাকে চেনেন। জানেন। আমার, আমাদের দুর্বলতা, তার ফলে আমাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া রাগ, নৈরাশ্য এবং ফেটে পড়ার প্রবল ইচ্ছা — সবই ‘রানী’র সামনে আনত। আমি রোজাকে দেখিনি। শুনেছি তাঁর কথা। আমি গলিত ইস্পাতের মতো রীতা উস্তিনোভিচকে পড়েছি অস্ত্রোভস্কির উপন্যাসে। কিন্তু আমার হৃদয়ের বড় কাছাকাছি যিনি, সবসময় আমাদের ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’-য় স্নিগ্ধ মুহুর্তকে লাট খাওয়া ঘুড়ির মত বেতাল করে দিতে তিনি হাজির হন। তিনি সূর্য সেনের স্নেহের ‘রানী’। তিনি প্রীতিলতা। হ্যাঁ— ওয়াদ্দেদার। পদবীতে কী যায় আসে? ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের চক্রান্তের পরে বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবের প্রচেষ্টা গতি পায়। ১৯১১-তে বঙ্গভঙ্গ রদ। এর মাঝে দুটি বৈশিষ্ট্য বাংলার ইতিহাসে যুক্ত হয়। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সদলবলে গঙ্গা স্নানের পরে মুসলমান গাড়োয়ানদের আস্তাবলে ঢুকে রাখী পড়িয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সেই প্রয়াস দেখে আশঙ্কায় বাড়ি চলে এসেছিলেন অবনীন্র্্নাথ। বাঙালি মধ্যবিত্তদের বড় অংশ বঙ্গভঙ্গের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত রুখে দিতে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। তবু চক্রান্ত মাফিক সাম্প্রদায়িক বিভাজনের একটি রেখা বাংলায় এঁকে দিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সফল হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র বিপ্লবীদের মূলমন্ত্র দেশের স্বাধীনতা হলেও কোন পথে তা হবে তা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও নীতিতে তাঁরা পৌঁছতে পারেননি। ‘হিন্দু পুনর্জাগরণ’র ছোঁয়া ছিল সশস্ত্র সংগ্রামীদের একাংশের মধ্যে। পরবর্তীকালে কয়েক বছর পর ফের বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবের পথে জোয়ার আসে। পিছনে মূলত মন্দায়, চাকরি না পাওয়ায় বিধ্বস্ত দেশপ্রেমিকরা। সেই ধারার শেষ প্রবল প্রভাব ফেলা লড়াই চট্টগ্রামে। যুব বিদ্রোহে। সর্বাধিনায়ক— সেই খর্বকায়, কিন্তু ইতিহাসে এক দীর্ঘ ছায়া রেখে যাওয়া মানুষটি। সূর্য সেন। সেই মাস্টারদার সরাসরি অ্যাকশনে নারীদের অন্তর্ভুক্তির নিয়ে দ্বিধা ছিল। আস্তিক, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষটিকে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখার বৈঠকে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর এই প্রশ্নে রাজি করান গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ। বেশ কয়েকজন তরুণী তারপর ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মিতে যুক্ত হন। তাঁদেরই দু’জন প্রীতিলতা এবং কল্পনা দত্ত। এখানে প্রীতিলতার কথাই বলি। মাস্টারদা তাঁকে পাঠাতে চাননি ইউরোপিয়ান ক্লাবের অভিযানে। কিন্তু তাঁর যুক্তি এবং আবেগের সামনে নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেননি চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের সর্বাধিনায়ক। তার কিছুদিন আগে কল্পনা দত্ত ধরা পড়ে যান, সেটিও কারণ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে সেই অ্যাকশনে বেছে নেওয়ার পিছনে। ‘রানী’ নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনিই হয়েছিলেন পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব অভিযানের কমান্ডার। চমৎকার রান্না করতেন। মহিলাদের রান্না করতেই হবে, এই ধারণা থেকে এটি লিখলাম না। তবে সেই সময়ে সমাজ মহিলাদের রান্না করাকে আবশ্যিক বলে মনে করতো। সেই সমাজের প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার দুর্দান্ত রিভলবার চালাতেন। ইংরেজি সাহিত্য আর দর্শনে ছিলেন অনুরক্ত। মেধাবী, একরোখা এবং বাইরে শান্ত, ধীর— এমনই ছিলেন তিনি। বেথুন কলেজ থেকে একাধিক লেটার পেয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক। তার মধ্যে দর্শন, ইংরেজি ছিল। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আই এ পরীক্ষায় ছাত্রীদের মধ্যে ১ম। বৃত্তি পেয়েছিলেন ২০টাকা। ১৯২৯। তার আগেই, ১৯২৭ থেকে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির কর্মী। ধলঘাটের যে সংঘর্ষে নির্মল সেন শহীদ হন, সেদিন সেখানে সূর্য সেন গেছিলেন ‘রানী’র সঙ্গে আলোচনা করতে। দিনটি ছিল ১৯৩২-র ১৩ই জুন। সেদিন দুটি ব্রিটিশ অফিসারের দেহ ফেলে দিয়েছিলেন বিপ্লবীরা। মাটির বাড়ির দোতলা থেকে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নির্মল সেন। সেদিন ‘ভোলা’ প্রীতিলতাকে সাবিত্রীদেবীর বাড়িতে, বিপ্লবীদের গোপন হাইড আউটে নিয়ে গেছিলেন। সেখানে প্রীতিলতা সবার জন্য রান্না করেন। গেছিলেন কেন? সূর্য সেন, নির্মল সেনকে রান্না করে খাওয়াতে নিশ্চয়ই নয়। রানীর দাবি ছিল। জোরালো দাবি। নেতৃত্বের কাছে। কী দাবি? সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণে নারীদের সমানাধিকার চাই। সর্বাধিনায়কের সামনে এই দাবি রেখেছিলেন ভারতের মুক্তি সংগ্রামের অনির্বাণ অগ্নিশিখা। সূর্য সেন মানতে বাধ্য হন। তাই ইউরোপিয়ান ক্লাব অভিযানের নেতৃত্ব তিনি তুলে দেন প্রীতিলতার কাঁধে। ধলঘাটের সংঘর্ষের পরে ব্রিটিশ জানতে পারে ঘটনাস্থলে সূর্য সেন এবং প্রীতিলতা ছিলেন। শুরু হয়েছিল প্রীতিলতার আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন। শেষ হয় ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমনের দিন। ১৯৩২-র ২৩শে সেপ্টেম্বর। পটাসিয়াম সায়নাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন গুলিবিদ্ধ ‘রানী’। তাঁর দেহের পাশে ৬টি জিনিস পাওয়া যায়। মাথার পাগড়ি, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের প্ল্যান, শহীদ রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছবি, নিজের ছবি সংবলিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির একটি বিজ্ঞপ্তি, একটি হুইসেল এবং তাঁর একটি বিবৃতি। প্রীতিলতা আর কোনও ছবি, কোনও বানী নিয়ে যাননি। ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির আদর্শে মন্ত্রগুপ্তি নিয়েছিলেন সংগঠনের সংবিধানে হাত রেখে। অন্য কিছুতে নয়। তাৎপর্যপূর্ণ সেই বিবৃতিটি। দীর্ঘ বিবৃতি। শুধু একাংশ দেখা যাক। প্রীতিলতা লিখছেন, ‘‘... দেশের মুক্তিসংগ্রামে নারী ও পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়াছিল। যদি আমাদের ভাইয়েরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন উহা পারিব না?... নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়াছে যে তাহারা আর পশ্চাতে পড়িয়া থাকিবে না। নিজ মাতৃভূমির মুক্তির জন্য যে কোন দুরূহ বা ভয়াবহ ব্যাপারে ভাইদের পাশাপাশি দাঁড়াইয়া সংগ্রাম করিতে তাহারা ইচ্ছুক— ইহা প্রমাণ করিবার জন্যই আজিকার এই অভিযানের নেতৃত্ব আমি গ্রহণ করিতেছি।” সেদিনও চট্টগ্রামে মুসলমানরা বেশি ছিলেন। ততদিনে দেশে দ্বি-জাতি তত্ব হাজির হয়েছে। সঙ্ঘের প্রচার চলছে। মুসলিম লীগেরও। কিন্তু ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির ভাবনায় ছিল শুধু পূর্ণ স্বরাজ, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত। সেই বাহিনীর সদস্যা ছিলেন প্রীতিলতা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন অনেক বীর নিজেদের সমর্পণ করেছেন। কল্পনা দত্তর মতো অনেকে বেছে নিয়েছেন কমিউনিজমের পথ। কিন্তু যা তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো, দেশের মুক্তির সংগ্রামে ধর্মের বিভাজনকে সেই নারীরা হেলায় ছুঁড়ে ফেলে গেছেন লড়াইয়ে। কিন্তু মাধব সদাশিব গোলওয়ালকারের প্রীতিলতাদের সম্পর্কে উপলব্ধি কী? রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)’র দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক তাঁর সেই উপলব্ধি রেখে গেছেন ’উই অর আওয়ার ন্যাশানহুড ডিফাইনড’ বইয়ে। বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৩৯-এ। প্রথম প্রকাশের মুখবন্ধে গোলওয়ালকার জানিয়েছেন যে, ১৯৩৮-র নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বইটির পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে ছাপতে দেরি হয়েছে। ততদিনে মাস্টারদার ফাঁসি হয়ে গেছে। ফাঁসি হয়ে গেছে তারকেশ্বর দস্তিদারের। তাঁদের দেহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভাসিয়ে দিয়েছিল সাগরে। তখনও জেলে কল্পনা দত্ত। নিজের সেই বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ের শেষ অনুচ্ছেদে সঙ্ঘের গুরুজী লিখছেন, ‘‘শুধুমাত্র সেই আন্দোলনগুলিই সত্যিকারের ‘জাতীয় যেগুলি বর্তমান অসাড়তা থেকে হিন্দু ধারণার পুনর্গঠন, পুনর্জাগরণ এবং মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত। তারাই জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক, যারা, হিন্দু জাতিকে এবং রাষ্ট্রকে হৃদয় দিয়ে গৌরবান্বিত করার উদ্দীপনায় কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন এবং লক্ষ্যপূরণে সংগ্রাম করছেন। বাকি সবাই হয় জাতীয় স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতক অথবা শত্রু, অথবা, দাতব্য ধারণার বশবর্তী, বোকা।” প্রীতিলতা ‘বিশ্বাসঘাতক? বোকা? প্রকাশের তারিখ: ২৯-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|