|
“সাথী মোদের, বন্ধু মোদের '' রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়Doct.Propa Day |
দুর্ঘটনা অনভিপ্রেত, অনাহূত কিন্তু দুর্ঘটনার একটা প্রেক্ষিত থাকতেই পারে যেমন সৃষ্টিশীল, বুদ্ধিজীবীরা সুজেটের ধর্ষণের প্রেক্ষিত খুঁজেছিলেন, কামদুনি বা আরজিকরে প্রতিবাদের আগেই তাঁদের অনেকেরই গলা শুকিয়ে কাঠ। |
| এই তিনটে শব্দের মধ্যে দিয়ে কত অকারণ সময়ের অপচয়কে গুটিয়ে এনে কোনরকমে দায়িত্বটুকু পালন করা যায়। সোশ্যাল ডিলেমার নাগপাশে আড়ষ্ট আমি ও আমরা, অসময়ে, অপ্রত্যাশিতভাবে চলে যাওয়াকে বহু মানুষের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা এই তিনটি বর্ণবন্ধে প্রকাশ করেছি কত কতবার। সময়ের অভাবে দুকলম লেখা বা অনুভূতি প্রকাশ করার চেয়ে এই বেশ। চটজলদি মানবিকতার শর্টকাট মোচড়। কিন্তু কেন জানিনা, গত পরশু থেকে শারীরিক, মানসিক সবদিক দিয়ে তোলপাড় হয়ে চলেছে। উফফফ, এত কঠিন জল, এত কুৎসিত নিসর্গ সমুদ্রতীরের শোভা, এত নিষ্ঠুর হতে পারে মনোরম ঢেউ? রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় এর সঙ্গে পরিচিতি আমার ছোটবেলায় বাংলা সিরিয়ালের হাত ধরে, তার বহু পরে টের পেয়েছিলাম তার “চিরদিনই” খ্যাত বাংলা জুড়ে পপুলারিটি। সিনেমাটা একটি তামিল সিনেমার রিমেক এবং যখন আমি অরিজিনাল সিনেমাটি তামিলনাড়ুতে বসে দেখেছিলাম, তখন আমার ধারণা ছিল প্রেমঘটিত বিয়ের এরকম বিয়োগান্ত পরিণতি উত্তম- সুচিত্রা, প্রসেনজিত- দেবশ্রী, ভিক্টর-অপর্ণার বাঙালী দর্শক মেনে নেবেন না। যাই হোক, আমার মত দুর্বল ক্রিটিকের ক্রিটিক্যাল থিন্কিং এর ফোরকাস্টে ছাই দিয়ে সিনেমা সুপারহিট। অসহায় ভালবাসার ইমোশনাল টানাপোড়েন মানুষকে কাঁদালো, দর্শক কাছে টেনে নিল নতুন জুটি রাহুল-প্রিয়াঙ্কাকে । তার পরে আরো বহু নিত্যনতুন চরিত্রে রাহুল হয়ে উঠলো পরিচিত এক মুখ। রাহুলের সাথে আমার স্বল্পদৈর্ঘ্যের পরিচিতি, মনে না থাকাই স্বাভাবিক। বয়সে আমার থেকে ছোট রাহুলের সঙ্গে আবার দেখা পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে, কখনো বা শূণ্য পাওয়া দলের ভোটের প্রচারে, লাল পতাকার ভিড়ে, চন্দ্রবিন্দুর কোন একক অনুষ্ঠানে, কখনো বা কোন টক শোতে শ্রোতা হিসেবে। কোন চোখ রাঙানির তোয়াক্কা না করে, যারা নিজের রাজনৈতিক মত স্পষ্ট করে মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছে বারংবার, রাহুল তাদের মধ্যে অন্যতম। বিজয়গড়ের খুব সাধারণ একটি বাংলা মিডিয়াম স্কুলের ছেলে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিল যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়, রাজনীতি মানেই দুরভিসন্ধি নয়। রাজনীতি মানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস বুকের কোনায় জমতে দেওয়া, সাহস সঞ্চয় করা, শিরদাঁড়া সোজা রেখে। সেই রাজনীতির প্যালেটে রঙ থাক বা নাই থাক। রাহুল খুব সাধারণ আপনার, আমার পাশের বাড়ির ছেলে যে রোজ অভাব অভিযোগকে মানিয়েও স্বপ্ন দেখে, সেলিব্রিটি হয়েও নস্টালজিয়ার আবেশে বাঁচে, যে কটা কথা মুখে বলে উঠতে পারে না, সেগুলো কলমের খোঁচায় এপিটাফ করে রেখে যায় আগামী প্রজন্মের জন্য। দুর্ঘটনা অনভিপ্রেত, অনাহূত কিন্তু দুর্ঘটনার একটা প্রেক্ষিত থাকতেই পারে যেমন সৃষ্টিশীল, বুদ্ধিজীবীরা সুজেটের ধর্ষণের প্রেক্ষিত খুঁজেছিলেন, কামদুনি বা আরজিকরে প্রতিবাদের আগেই তাঁদের অনেকেরই গলা শুকিয়ে কাঠ। মিছিলে হেঁটে আবার পরে সেটা অদৃশ্য রাজনৈতিক চাপে গলাঃধকরণ করেছেন। শ্রেয়া ঘোষাল অথবা অরিজিৎ সিং ভরা দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে অভয়ার বিচার চাইলেও, আমাদের লোকাল সেলিব্রিটিরা কনসার্টে, একক অনুষ্ঠানে অভয়ার অ টুকু উচ্চারণ করেন নি। একদিক থেকে অবশ্য বেঁচে গেছেন, কোন বিজেপি প্রার্থী আজ তাদের দিকে অভয়ার নাম ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা অর্জনের অথবা অতিরিক্ত টিকিট বিক্রির আঙুল তুলতে পারবেন না। তখন অবশ্য উদার নাগরিকেরা রাজনীতির জটিল জিলিপির প্যাঁচ দেখতে পান নি, শুধু হাততালি শুনতে পেয়েছেন। রাহুল প্রথম নন, রাহুল শেষ ও নন। রাহুলের আগে বহু মানুষ তলিয়ে গেছেন ঢেউ এর টানে, হয়তো নিজেদের অসাবধানতার জন্য হয়তো বা একদম দুর্ঘটনা বশত। এত দুর্ঘটনার পরেও দীঘার মত জনবহুল সমুদ্রসৈকত অসুরক্ষিত, তালসারির মত ভাঙা গড়ার মধ্যে তৈরী হওয়া বালুতট, চোরাবালি ঘেরা জায়গায় কোন প্রস্তুতি ছাড়াই শুটিং এর মত সিরিয়াস কাজ কি করে হতে পারে সেটাই আশ্চর্য। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নুলিয়াদের দল ছাড়া, সিপিআর দিতে জানা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ডাক্তার, প্যারা মেডিকাল স্টাফ অথবা সাধারণ মানুষ যদি আজ এরকম দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় শুটিং দলের সাথে যুক্ত থাকেন তাহলে হয়তো এই অন্যায়ভাবে চলে যাওয়াগুলো আটকানো যায়। কে কে র মত বিশ্ববিখ্যাত গায়কই হোক কিম্বা আমাদের রাহুল তাদের জন্যে যদি ন্যূনতম সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সাধারণ মানুষ যাদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কোন হেডলাইন হয় না, তাদের কথা কে ভাববে? আবার সেই লুপে পড়ে গেলেন তো? রাহুল চলে গেলেও তাই রাহুলের প্রশ্নগুলো হারিয়ে যায় না। সব বিষয়ে সাদা নীলের গেরুয়া আস্ফালন বন্ধ হোক, প্রশাসন কাজ করুক, টালিগঞ্জের মাথার ওপর অকালপক্কদের ছড়ি ঘোরানো বন্ধ হোক। শিল্পীরা, রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে নিজেদের আত্মসম্মানকে জাগিয়ে তুলুন। আত্মসমর্পণ করে নিজেদের বিবেককে বিক্রি করে দেবেন না। যে কোন সমুদ্র সৈকতে, অথবা, ভরা কনসার্টের স্টেজে, মাঠে, ঘাটে মানুষের অসুস্থতা খুবই স্বাভাবিক হলেও, তার একটা প্রোটোকল থাকা উচিত। রাজ্যরে সেরা সরকারী হাসপাতালগুলিতে যদি হোটেলের মত সমস্ত পরিকাঠামো সহ পেল্লায় প্রমাণ স্যুট অনন্তকালের জন্য বিশেষ কিছু প্রিভিলেজড দেবাদেবীর জন্য বুকিং করে রাখা যায়, তাহলে আর বাকিদের জন্য ভাবার সময় পাওয়া যায়? বাকিরা উৎসবে, এ্যাওয়ার্ডে আর নিত্যনতুন হেডলাইনে ব্যস্ত থাকলেই হয়। মানুষএখন প্রাণহীন ট্যাক্সপেয়ার আর কখনো কখনো ভোটার তাই হাসপাতালের নিজস্ব ডিপার্টমেন্টের জায়গার অভাব থাকা সত্ত্বেও সরকারী জমিতে প্রাসাদোপম প্রাইভেট হসপিটাল তৈরী করতে দেওয়া যায়, নিরাপত্তা সুরক্ষাকে কলা দেখিয়ে দিব্যি রাজ্য চালানো যায়। অচিরেই দেখি গণতন্ত্রের ঘাড় মটকে রাজতন্ত্র বাসা বেঁধেছে অগোচরে। রাহুলেরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে, করে চলেছে আজও। শারীরিক অসুস্থতার কারণেই হোক কিম্বা অবাক করে দেওয়া ঘটনার ভয়াবহতায় আমার লেখার ক্রম ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। পাঠকেরা নিজগুণে সেই ত্রুটি মার্জনা করে দেবেন। রাহুল তাই শুধুমাত্র একজন অভিনেতা, লেখক অথবা শিল্পী নন, তাই কাব্য করে তার শেষ বিদায় যে হবে না সেটাই স্বাভাবিক। এই মানুষটি চিরকাল একটি রাজনৈতিক মতে বিশ্বাস করে এসেছেন, পাইয়ে খাইয়ে দেওয়া রাজনীতির আঙিনায় থেকেও ক্যা ক্যা ছি ছি না করে, নিজের বিশ্বাসকে সম্মান করেছেন যুক্তি দিয়ে। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন রোজ নিজের লেখনী দিয়ে, সমালোচনা করেছেন , সমাজ সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি রেখে গেছে তার পডকাস্টের মাধ্যমে। সেই আপাদমস্তক কমিউনিস্ট চিন্তাধারার মানুষটির শেষ যাত্রায় সব মানুষ প্রাণের টানে ছুটে এসেছে, লাল পতাকা সম্মানের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেছে তাকে, স্লোগানে আর ইন্টার্ন্যাশনাল গানের সুরে গমগম করে উঠেছে চারিদিক। “সাথী মোদের, বন্ধু মোদের… লালে লাল লাল সেলাম” রাজনীতির অন্দরে, বাইরে তার বন্ধুরা তাকে জড়িয়ে থেকে, ভেজা চোখে বিদায় জানাল কাল। তাই কাল কমরেড রাহুল এর শেষ বিদায়ের ভিড়ে রাজনীতি খুঁজতে যাবেন না। অসংখ্য অসঙ্গতি আর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে গেল যে প্রাণশক্তি, আসুন সেগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করি, প্রশ্ন করি। রাহুল এবং তার মত আরো অনেক ঘটনা, দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণ শান্তি পেলেও আমাদের জ্যান্ত চিন্তাভাবনাগুলো যেন অবসর না পায়। লেট আস নট রেস্ট ইন পিস। প্রকাশের তারিখ: ৩১-মার্চ-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|