নভেম্বর বিপ্লব

Manabesh Chowdhury
কমিউনস্ট মতাদর্শ সহ বিপ্লব সম্পকৃত বিষয়গুলোর নিবিড় পুনরালোচনা শুরু হলো। পার্টির মধ্যে আলোচনা,   মতদ্ধৈতার বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতে থাকলো। পার্টি নতুন প্রাণ শক্তি নিয়ে, সাম্রজ্যবাদী স্বার্থে লিপ্ত যুদ্ধে, যে সৈন্যরা অনিচ্ছাসত্বেও ট্রেঞ্চের কদর্য জীবন অতিবাহিত করছিলেন, তাঁদের সংগঠিত করতে শুরু করলেন। 

  
এক
অনেক দিন আগে আমার লেখা একটি দীর্ঘ পদ্যের কয়েকটি লাইন। তা দিয়েই কথারম্ভ করলাম।
“এখন বৈশাখ মাস (কমরেড লেনিনের জন্মদিন পড়েছে এপ্রিল মাসে, তাই) /তপ্ত ঝঞ্জার মাস /মাঝে মাঝে খরার দুপুর/ লেনিনের মাস এটা /কত স্বপ্ন দেখেছেন তিনি/ স্বপ্নময় তাঁর সে জগৎ/প্রীতিময় তাঁর যে সংসার/ কত তাঁর মনের বৈভব/ বহুপর্ণী তার কত রঙ।
“কত কষ্ট মানুষের বুকে/ কত কষ্ট উৎসারিত/ কত কষ্ট অবরুদ্ধ/ যন্ত্রণায় বিদ্ধ সে মানুষ / লেনিনের আপনার জন।/ মানুষ মানুষ করে পাগল হলেন/ মানুষ মানুষ করে ঘর ছাড়লেন/ মানুষ মানুষ করে কোন সুদূরের / সম্ভবনার এক মৃদু আভা দেখে/ কত কত বেদনার পথ হাঁটলেন।” 
আমরা কমরেড লেনিনের কথা এতো বলছি! অন্য কোন কী নেতা কী ছিলেন না! অবশ্যই ছিলেন। না থাকলে এতো বিশাল কাজ সমাধা করা যায়!  
 কমরেড লেনিন। তাঁর দাদা আলেজাণ্ডার উলিয়ানভ একটা রোমাঞ্চকর হটকারি কাণ্ড করলেন। ভাবলেন এই পথেই সমাজ ভালোর দিকে বদল হবে। মানব মুক্তি ঘটবে। জারের এক প্রতিনিধিকে হত্যা করলেন। মা মুষড়ে পড়লেন। লেনিনও। কিন্তু লেনিনের তখন মাত্র ১৭ বৎসর বয়স হলেও, মার্কসবাদী তাত্বিক জ্ঞান আত্মস্ত হয়েছে। দ্বন্দ্বমূলক ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। তিনি দাদার পথে গেলেন না। সমাজ বিপ্লবের জন্য মার্কসবাদী পথে হাঁটতে শুরু করলেন। 

১৮৯৫ সালে রুশ দেশে সর্বহারা বিপ্লবী পার্টির সূচনা হচ্ছে। ১৮৯৮ তে সামারায় তিনি সমমনা সাথিদের সঙ্গে বসলেন। ঠিক হলো শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে কৃষক সমাজের দুস্থ অংশ নিয়ে সারা দেশে বিপ্লব করা হবে। তারই অনুসরণে মার্চ ১৮৯৮ সালেই রুশদেশের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠিত হলো। কমরেড লেনিন সেই পার্টির কর্তব্য বিষয়ে ইস্তেহার লিখলেন। ১৯০৩ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বলসেভিকবাদের উদয় হলো। মানে কমিউনিস্ট কাজ কর্ম আরও দৃঢ় হতে শুরু হলো। 

    কমরেড লেনিন বলশেভিক (কমিউনিস্ট) পার্টি, সোভিয়েত বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক ছিলেন। ছিলেন নবীন সোভিয়েত রাষ্ট্র নির্মাণের মূল স্থপতি। মার্কসবাদকে উপজীব্য করে, সমাজ ও জীবনকে অনুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষন করে তিনি যুগোপযোগি তাত্বিক ভীত নির্মাণ করেছিলেন। যাকে বলে – লেনিনবাদ। সেজন্যই সারা পৃথিবীতেই বলা হয় মার্কসবাদ –লেনিনবাদ। এই কারণে, তিনি শুধু সোভিয়েত রাশিয়ার নন, সারা পৃথিবীর সমাজ বিপ্লবের নেতা। সে জন্যই তো সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন – “বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।“ বলেছিলেন – “এখানেও আয়োজন পূর্ণ করে নিঃশব্দে লেনিন।”
আমি এই লেনিন নিয়ে বিশ্লেষণ করে নিবন্ধ লিখতে পারঙ্গম নই। সোভিয়েতের মজুর চাষিদের তিনি কত প্রিয় ছিলেন, পক্ষান্তরেও তিনিও তাদের কাছে - সেই সংক্রান্ত অনেক বই আছে ।   

 
জার রাজ বংশের অধিনে রুশদেশে ভূমি দাস প্রথা ছিল। ১৮৬৫ সালে তা ‘উচ্ছেদ’ হয়। ‘মীর’ - গালভরা নামের একটা প্রশাসনিক সংস্থা তৈরি করা হলো – কৃষক কমিউন। সেখানে আবার গড়ে তোলা হলো ‘জেমস্তোভা’ নামে ফসলের ভাণ্ডার। 
কিন্তু গ্রামগুলো যে তিমিরে ছিলো, সেই তিমিরেই থাকতে বাধ্য হলো। ক্ষেতের মজুর, গরিব কৃষক, মাঝারি কৃষকদের কষ্টের কোন নিরসন হলো না। অপর দিকে অভিজাত আর ও কুলাকদের সম্পদ বাড়তেই থাকলো।   
প্রথমে রুশ দেশের সমাজবদলের লড়াই দিয়েছে রুশ স্যোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। তাঁরা শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কাজ করতে করতে সংগ্রাম করতে গ্রামের দিকে মুখ ফেরালেন। কমরেড লেনিন ১৯০৩ সালে তিনি লিখলেন, তাঁর বিখ্যাত পুস্তক ‘গ্রামের গরিবদের প্রতি’ ।
 জারের শাসনাধীন গ্রামীণ কৃষকেরা তখন এক অদ্ভূত কষ্টের মধ্যে দিন গুজরান করতেন। সেখানে গ্রামের সব থেকে নিচের স্তরটাকে বলতো ‘ভোলস্ত’। এর ওপরে ছিল ‘উয়েজদ’ এবং তার ওপরে ‘গুর্বেনিয়া’। জার রাশিয়ার অভিজাত প্রধানদের নির্বচিত করা হত এই দুই প্রশাসনিক ক্ষেত্র থেকে। তাদের ওপরে ছিল কুলাক। কমরেড লেনিন এরকম সজ্ঞা দিয়েছেন, ‘মজুর খাটিয়ে অথবা সুদে টাকা ধার ইত্যাদি দিয়ে যে (যে) ধনী কৃষকরা অপরের শ্রমের ওপর পীড়ন চালায়।’’ এরাই ছিল সব থেকে বড় ভূমধ্যিকারী।   এঁদের সবার অবস্থান ও ভূমিকা ছিল বিশাল।  

প্রতিষ্ঠা কাল থেকে যাঁদের শিক্ষক ও সাথি হিসাবে পেয়ে তিনি চলছেন এই অবসরে তাঁদের নাম গুলো বলা যাক – প্লেখানভ, এ এ বাগদানোভ, ভি ভি ভোরভক্সি, আর এস জেলিনাস্কায়া, পি এ ভার্ভিকভ, এন কে স্ক্রপ্সকায়া, এম এম লিটিনভ, এ ডি লুনাচারস্কি, এম এন লিয়াডভ, এম জি টাক্সায়া প্রমুখ। 
পরে দিন যত এগিয়েছে ততো যুগন্ধর নেতৃত্ব সামিল হয়েছেন। যেমন, ছিলেন গ্রিগরি জিনোভিয়েভ, আলেকজান্ডার বগদানভ (প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের মধ্যে অন্যতম) স্তালিন, ট্রটস্কি, নিকোলাই বুখারিন, ফেলিক্স জার্জিনস্কি, আলেকজান্দ্রা কোল্লনতাই, ইয়াকভ সভের্দলভ, এঁদের সবার অবস্থান ও ভূমিকা ছিল বিশাল। অবশ্য সবাই শেষ পর্যন্ত নিজস্ব ভুল, জেদ ও একগুঁয়েমির জন্য থাকতে পারেন নি।
 
 জন্মাবধি ইস্ক্রা পত্রিকা ১৮০৫ সাল থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। পরে পরে প্রাভদা, ইজভেস্তিয়া ইত্যাদি রাশিয়ার এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়ার অন্যতম পত্রিকা ছিল প্রাভদা। ম্যাক্সিম গোর্গির বিশ্ব-আদৃত ‘মাদার’ বা ‘মা’ ঊপন্যাসের অনেকটা জুড়ে পার্টির গোপন সময়ে পার্টি পত্রিকার প্রচার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে।  
১৯০৫ সালে বুর্জোয়া – সামন্তি কাঠামোর মধ্যে যে রকম বিপ্লব করা সম্ভব, সেরকম বিপ্লবের জন্য ঝাঁপিয়ে পরা হলো। কিন্তু তা বুর্জোয়াদের দ্বারা সংগঠিত বিপ্লব নয়। পার্টির নাম যাই হোক, আসলে তা কমিউনিস্ট তথা শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে জার শাসন হঠানোর বিপ্লব। অত্যচার আক্রমণ রক্তের প্লাবনে সেই বিপ্লবকে তখনকার মতো বিধ্যস্ত করতে পারলো শত্রুরা।
নিজেদের সামলে নিলেন বলসেভিকরা। আবার কমিউনস্ট মতাদর্শ সহ বিপ্লব সম্পকৃত বিষয়গুলোর নিবিড় পুনরালোচনা শুরু হলো। পার্টির মধ্যে আলোচনা,  
মতদ্ধৈতার বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতে থাকলো। পার্টি নতুন প্রাণ শক্তি নিয়ে, সাম্রজ্যবাদী স্বার্থে লিপ্ত যুদ্ধে, যে সৈন্যরা অনিচ্ছাসত্বেও ট্রেঞ্চের কদর্য জীবন অতিবাহিত করছিলেন, তাঁদের সংগঠিত করতে শুরু করলেন। 
কৃষকদের নতুন বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবীত ও সংগঠিত করা শুরু হলো। তাঁদের সঙ্গে শ্রমিক সংহতি অনেক বাড়ানো হলো। একের পর এক পার্টির সম্মেলন, মহাসম্মেলন (Party Congress) সংঘঠিত হতে থাকলো। 

১৯১৭ সাল – ফেব্রয়ারিতে অস্থায়ী কেরেনেস্কি সরকার গঠিত হলো। ইতিমধ্যে এপ্রিল মাসেই দেখা গেলো যে, গ্রামীন এলাকায় কৃষক সোভিয়েত, শহরে কারখানায় শ্রমিক সোভিয়েত ও সৈনিক ব্যারাকে সৈনিক সোভিয়েত অর্থাৎ কেরেনেস্কি সরকারের সমান্তরাল শাসন কাঠামো তৈরি হয়ে গিয়েছে। তারপর তো ৭ ই নভেম্বর – অরোরা জাহাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বর্জনির্ঘোষ দিগিন্ত কাঁপিয়ে দিল। তারপর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’। ঘোষিত হলো রুটি, জমি ও শান্তির ডিক্রি।
  কমরেড লেনিন বলশেভিক (কমিউনিস্ট) পার্টি, সোভিয়েত বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক ছিলেন। ছিলেন নবীন সোভিয়েত রাষ্ট্র নির্মাণের মূল স্থপতি। মার্কসবাদকে উপজীব্য করে, সমাজ ও জীবনকে অনুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষন করে তিনি যুগোপযোগি তাত্বিক ভীত নির্মাণ করেছিলেন। যাকে বলা হয় – লেনিনবাদ। শুধু মার্কসবাদ নয় -  মার্কসবাদ –লেনিনবাদ। এই কারণে,  তিনি শুধু সোভিয়েত রাশিয়ার নন, সারা পৃথিবীর সমাজ বিপ্লবের নেতা। সে জন্যই তো সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন – “বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।“ বলেছিলেন – “এখানেও আয়োজন পূর্ণ করে নিঃশব্দে লেনিন।”
এখানে আরেকটা কথা বলার – কমরেড লেনিন কবিও। ১৯০৭ সালের গ্রীষ্মকালে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন ফিনল্যাণ্ডে। দীর্ঘ দেড় বৎসরের আত্মগোপন কালে তিনি  যে অবসর পান, তখন লেখেন প্রায় ৩০০ লাইনের এক দীর্ঘ কবিতা – ‘সে এক ঝড়ো বছর’। কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন কবি অরুণ মিত্র। 
আমি এই লেনিন নিয়ে বিশ্লেষণ করে নিবন্ধ লিখতে পারঙ্গম নই। সোভিয়েতের মজুর চাষিদের তিনি কত প্রিয় ছিলেন, পক্ষান্তরেও তিনিও তাদের কাছে। সেই সংক্রান্ত অনেক বই আছে।   
সোভিয়েত রাশিয়ার বিপ্লব পর্ব শুরু হবার প্রাথমিক পর্ব বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে বাংলার পত্র-পত্রিকা ও লেখকদের তা আকর্ষণ করে। দি বেঙ্গলী, ঊষা, ভারত মহিলা, ঐতিহাসিক চিত্র, প্রবাহ, মহিলা, বিজলী, প্রবাসী ইত্যাদি নানা পত্রিকায় অনেক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। বই আকারে বেরোয় ‘রুশ-জাপান যুদ্ধের ইতিহাস’, বিনয় কুমার সরকার লেখেন নবীন রাশিয়ার জীবন প্রভাত, ননীবালা ভৌমিকও বই লেখেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো দিকপাল লেখকরাও নিবন্ধ লেখেন।
১৯১৭ সালের বিপ্লব সমাধা হলে দৈনিক বসুমতি, দি স্টেটসম্যান, হাইমস অফ ইণ্ডিয়া, অমৃত বাজার পত্রিকা, দি ইংলিশম্যান ইত্যাদি পত্র পত্রিকায় নানা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সব প্রসংশাসূচক না হলেও, বেশিরভাগই সোভিয়েত বিপ্লবের পক্ষেই। উৎসাহী পাঠক দেবব্রত ভট্টাচার্যের লেখা ‘সমকালীন বাঙালীর দৃষ্টিতে সোভিয়েত দেশ’ পুস্তকটা পড়লে এ সংক্রান্ত অনেক বিষয় জানতে পারা যাবে।

  
দুই
জন রীডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন” আমাদের পাঠকদের সবারই পড়া।   আমি তার বঙ্গানুবাদ থেকে উদ্ধৃতি দেব। তখন অনুবাদকরা মস্কোতে বা তাসখন্দে বঙ্গানুবাদের কাজ করতেন, বিদেশি ভাষায় সাহিত্য প্রকাশণালয়ে বা রাদুগা প্রকাশনীতে। তারা এক একজন বাংলাভাষার দিকপাল গদ্যকার, সাহিত্যিক। অনুবাদও যে এত সাহিত্যগুণ মণ্ডিত হতে পারে, তা ভাবলে ঐ সব অনুবাদকের প্রতি মস্তক স্বতই নম্য হয়। 
জন রীড পেত্রগ্রাদে ছিলেন বিপ্লবের ঝড়ো দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনের মধ্যে কয়েক দিন। তাঁর কথায় – “দুই শতাব্দী ধরে সরকারের পাদপীঠ হওয়া সত্বেও পেত্রগ্রাদ তখনও একটা কৃত্রিম নগর। আর মস্কো হল আসল রাশিয়া, রাশিয়ার অতীত ভবিষ্যৎ এখানেই। মস্কোতেই আমরা হদিশ পাব বিপ্লব সম্পর্কে রুশ জনগণের আসল মনোভাবের। জীবন এখানে আরও প্রখর।“
অতএব যাত্রাপথের নানা কষ্ট স্বীকার করে তিনি মস্কোতে এলেন। এক পর্যায়ে এলেন ক্রেমলিনের একটা কক্ষে। সেখানে তখন কী হচ্ছে? – “জন পঞ্চাশেক মেয়ে বসে কাটাকুটি করে সেলাই করে তুলছে বিপ্লবী শহীদদের অন্ত্যেষ্টি-অনুষ্ঠানের ফেস্টুন আর পতাকা। জীবনের দুঃসহতম পর্বের মধ্য দিয়ে আসায় মুখগুলো তাদের সবই যেমন রুক্ষ, ক্ষতবিক্ষত; কঠোর মনোযোগে এখন কাজ করে চলেছে তারা, অনেকের চোখই কান্নায় লাল। লাল ফৌজের ক্ষতি হয়েছে অনেক।“

জন রীডের দেখা হল মস্কো ধাতু শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক, এখন  লড়াইয়ের সময় হয়েছেন সামরিক বিপ্লবী কমিটির এক কমিশার’র সঙ্গে –“ জ্বলজ্বলে কয়েকটি কাহিনী শোনা গেল তার কাছ থেকে। তুহিন ধূসর একটা দিন, দাঁড়িয়ে আছেন তিনি নিকিৎস্কায়ার কাছে, মেসিনগান গুলির ঝড় বইছে। একদল বাচ্চা ছুটেছে সেখানে – রাস্তার সেই সব হাঘরে ছেলে, কাগজ বেচত যারা। তাদের কাছে যেন এক নতুন খেলা, উত্তেজনায় তারস্বরে চিৎকার করে অপেক্ষা করছে তারা কখন গুলিবর্ষণে একটু ঢিলে পড়বে, ঢিল পড়তেই ছুটে রাস্তা পেরবার চেষ্টা করছে সবাই – অনেকেই মারা পরে, কিন্তু বাকিরা বেপরোয়ার মতো পরস্পর পালা দিয়ে এপার ওপার ছোটাছুটি করে গেছে........”
তারপরেই ক্রেমলিনের সামনেকার লাল ময়দানের শহীদদের অন্ত্যেষ্টির কথা, যা পড়তে পড়তে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে থাকে।

“ধুলোবালি ইঁট পাথরের পাহাড়। বিরাট দুটি গর্ত – দশ কি পনের ফিট গভীর, পঞ্চাশ গজ লম্বা, শত শত সৈনিক ও শ্রমিক এখানে বড়ো বড়ো অগ্নিকুণ্ডের আলোয় মাটি খুঁড়ছে।“......
একজন ছাত্র বলছে আমাদের যারা জার, সেই জনতা নিদ্রা যাবে এখানেই”
 “লাল সমাধিতে পৌরোহিত্যের নেই কোন পাদ্রী দোকানপাটও বন্ধ, ধনীরা ঘর থেকে বেরোয় নি; অবিশ্যি অন্য কারণে। এ যে জনগণের দিবস। তাদের আগমন ধ্বনি গর্জে উঠেছে সমুদ্র ঝাপটের মতো।
“সবকটি রাস্তা জুড়ে জনস্রোত এসে পৌঁছেছে লাল ময়দানে, আসছে হাজারে হাজারে দেখতে তারা গরিব মেহনতী।”
“সেই রুক্ষ অমার্জিত লোকগুলোর মুখ বেয়ে নামছে চোখের জল, তার পেছু পেছু ফোঁপাতে ফোঁপাতে, চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আসছে মেয়েরা, নিস্প্রাণ বিবির্ণ মুখে পা ফেলে যাচ্ছে যন্ত্রের মতো।
“ব্যাণ্ডে বাজছিল বৈপ্লবিক অন্ত্যেষ্টি মার্চ আর মাথার টুপি খোলা বিশাল জন সমুদ্রের সঘন সঙ্গীতের পাট ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছিল অশ্রুরুদ্ধ সুর ”
তারপর ‘ভ্রাতৃ সমাধি’র বর্ণনা। হিসাবে মনে হয় এই তারিখটি ১৭ই নভেম্বর।
“ধীরে ধীরে কফিন এসে পৌছলো সমাধির কাছে, বোঝা নিয়ে ঢিবির ওপর উঠে নেমে এল গর্তে। তাদের অনেকেই নারী – শক্ত, সমর্থ, গাঁট্টাগোট্টা প্রলেতারীয় নারী। “পাঁচ শত শ্রমিক ও সৈনিক শহীদকে সেই গর্তে শায়িত করা হল। 

“সারা দিন ধরে চলল অন্তিম মিছিল, এল তারা ইবেরিয়ান ফটক দিয়ে, চলে গেল নিকোলাস্কায়া পেরিয়ে, লাল পতাকার এক নদী স্রোত, বহন করে চলল আশা আর ভ্রাতৃত্ব আর বিপুল এক ভবিষ্যতের বাণী, পঞ্চাশ হাজার জনতার এক পটভূমির সামনে দিয়ে, বিশ্বের সমস্ত শ্রমিকজন ও তাদের অনন্ত বংশধরদের দৃষ্টির তলে।
“হঠাৎ   অনুভব করলাম, স্বর্গে পৌঁছবার জন্য ধর্মপ্রাণ রুশীদের আর পুরোহীতদের প্রয়োজন নেই। মর্ত্যে তারা যে রাজ্য গড়তে শুরু করেছে তা কোনো স্বর্গেও পাবার নয়; তার জন্য মৃত্যু বরণ – গৌরবের কথা।“   
জন রীড এই সব বর্ণনার এক জায়গায় লিখেছেন –“পরস্পরকে কত ভালোই না বাসে গরিবেরা।“
 উদ্ধৃতি কন্টকিত হয়ে গেল লেখাট। কিন্তু তা না হলে বিষয়টা পাঠক সমীপে হাজির করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। উল্লিখিত ‘ভ্রাতৃ সমাধি’র বর্ননা সাধারণ সাইজের বইয়ের ১১ পৃষ্ঠা জুড়ে। আমাদের তা সংক্ষেপ করতে হল।   এই বিবরণে আমরা বিপ্লবের কুশীলবদের দেখতে পাচ্ছি – শহীদ, নারী, রাস্তার হা ঘরে কাগজ বেচা বাচ্চারা, সোভিয়েত দেশের নতুন শাসন কর্তা ‘জার’ মানে জনতা, জনগণ। কোন জনগণ?  
পাঠক আমরা জানি শুধু মস্কো ও সন্নিহিত শহর গুলিতে নয়। রাশিয়া ও পরে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়া এসিয়া ভূখণ্ডের প্রদেশগুলিতেও, এক কথায় সমস্ত সোভিয়েত রাশিয়া জুড়েই সেই দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনে ও তার পরবর্তী দিনগুলিতে, এমন কি কোথাও কয়েক বছর ধরে অনেক বীরত্বপূর্ণ লড়াই লড়েছেলিন সাথিরা, শহীদত্ব বরণ করেছিলেন জন রীডের বর্ণিত বিবিধ বর্গের মানুষের সঙ্গে কৃষকরাও। 

“এই সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও পৈশাচিক অর্ধসত্যের আবহাওয়ায় শুধু দিনের পর দিন মন্দ্রিত হয়ে চলল একটি সুস্পষ্ট ধ্বনি, বলসেভিকদের সঘন কোরাসঃ ‘সব ক্ষমতা চাই সোভিয়েতের হাতে! সব ক্ষমতা চাই কোটি কোটি সাধারণ শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিদের হাতে। চাই জমি, রুটি, উন্মাদ যুদ্ধটার সমাপ্তি, গোপন কূটনীতি, চোরাবাজারি, বিশ্বাসঘাতকতার অবসান ”
 
 তিন
কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলাম। শেষে ব্রেটল্ড ব্রেখটের কবিতা - কবি শঙ্খ ঘোষ কৃত বঙ্গানুবাদ দিয়ে শেষ করি।
মায়ের গানঃকম্যুনিজমের গুন কীর্তণ
এ –পথটাই ঠিক, সবাই বোঝে। সহজ।
তুমিও যদি হুজুর না হও, ঠিক বুঝবে।

এতেই তোমার ভালো, ব্যাপারটা সব জানো
নষ্ট একে নষ্ট বলে বোকায় বলে বোকা
এতেই বরং নষ্ট হবে বোকামী – নষ্টামি
হুজুরেরা বলেন একে দুস্কৃতি
আমরা জানি
এই অবসান দুস্কৃতির।
পাগলামি না
এই অবসান পাগলামির
সমস্যা না
এই হলো শৃঙ্খলা ।
সোজা, খুবই সহজ
কঠিন কেবল ঘটিয়ে তোলার দায়।
           
সেই ঘটিয়ে তোলার কঠিন দায় আমাদের নিতে হবে। 
প্রকাশের তারিখ: ১০-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org