|
নভেম্বর বিপ্লব, লেনিন: শেখালেন তিনি শেখালেনKaninika Ghosh |
১৮৭১ সালে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে সেখানকার শ্রমিকশ্রেণী প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করে। মার্কস প্রথমে বাস্তব অবস্থা বুঝে এতে মত দেন নি, কিন্তু পরবর্তীতে শ্রমজীবীদের অদম্য উৎসাহে তিনি সে লড়াইয়ের পাশে সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়ান। প্যারির শ্রমজীবিদের এই চেষ্টা ইতিহাসে 'প্যারিকমিউন' নামে খ্যাত। |
প্রথম পর্ব মার্কস এঙ্গেলস্ তাদের জীবিতকালে বাস্তবে এই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখে যেতে পারেননি, তাদের মতাদর্শকে অবলম্বন করে কমরেড লেনিন অক্টোবর তথা নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তা সফল করেছিলেন। এর জন্য লেনিনকে রাশিয়ায় এক দুর্বার লড়াই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল আর সে লড়াই সংগ্রামের পথেই লেনিন পড়েছেন - লড়েছেন - বলেছেন - লিখেছেন যা চিরকাল সমাজ পরিবর্তন করতে চাওয়া মানুষের কাছে শোষণ মুক্তির পথে অবিস্মরণীয় শিক্ষা হয়ে থাকবে। মার্কস এঙ্গেলস এর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ প্রচারের পর এই মতবাদের ভিত্তিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষতঃ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে শ্রমজীবি মানুষের আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে সেখানকার শ্রমিকশ্রেণী প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করে। মার্কস প্রথমে বাস্তব অবস্থা বুঝে এতে মত দেন নি, কিন্তু পরবর্তীতে শ্রমজীবীদের অদম্য উৎসাহে তিনি সে লড়াইয়ের পাশে সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়ান। প্যারির শ্রমজীবিদের এই চেষ্টা ইতিহাসে 'প্যারিকমিউন' নামে খ্যাত। যদিও এই চেষ্টা সফল হয়নি। বুর্জোয়াদের হিংস্র আক্রমণে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেও পরাস্ত হন কমিউনিস্টরা। রক্তস্রোতে ভেসে যায় প্যারি কমিউন। ৭১ দিন বাদে এর পতন ঘটে। কিন্তু প্যারি কমিউন ইতিহাসে রেখে যায় এক চিরস্থায়ী পদচিহ্ন, যার বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কথা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের মানুষের মধ্যে। ১৯১৭ সালে জার শাসিত রাশিয়ায় কমরেড লেনিনের নেতৃত্বেই প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয় যা রাশিয়ার পুরনো ক্যালেন্ডারে অক্টোবর বিপ্লব (যাতে ১৩ দিনের পার্থক্য ) এবং পৃথিবীতে নম্বর বিপ্লব নামে খ্যাত।মার্কস এঙ্গেলস বলেছিলেন যে এগিয়ে থাকা পুঁজিবাদী দেশ তথা শিল্পোন্নত দেশেই আগে বিপ্লব হবে। তবে মার্কস-এঙ্গেলস যখন একথা বলেন তখন পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। তাই তখন এ ধারণাই সঠিক ছিল কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় পুঁজিবাদ তার সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদে প্রবেশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী দেশ গুলি গোটা পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করার যুদ্ধে লিপ্ত হয় আর সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই লেনিন বললেন, এটা ঠিক জার শাসিত রাশিয়া শিল্পোন্নত নয়, এটা ঠিক রাশিয়া ইউরোপের উঠোন কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে রাশিয়া অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের এই দুর্বলতম গ্রন্থিতেই শ্রমিক শ্রেণীকে আঘাত হানতে হবে। এবং সে কথা সত্য হয়। এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন লেনিন। জারের শাসনে রুশ দেশ অন্য দেশের তুলনায় অনেক দেরিতে পুঁজিতান্ত্রিক অগ্রগতির পথে আসে। ভূমিদাস প্রথা আর তার ভিত্তিতে বড় বড় জমিদারী ছিল তখনকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান রূপ। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে দুর্বল জারের সরকার চাষীদের বিদ্রোহে শঙ্কিত হয়ে ১৮৬১ সালে ভূমিদাস প্রথা উঠিয়ে দিতে বাধ্য হয় কিন্তু তারপরও চাষীদের ওপর জমিদারের অত্যাচার চলছিল। পার্থক্য শুধু ছিল এই যে চাষীরা এখন স্বাধীন হল।জমিদারদের অত্যাচারের দরুন চাষবাস ব্যবস্থাও উন্নত হত না ফলে অজন্ম হত,দুর্ভিক্ষ দেখা দিত, যে কর ও মুক্তিপণ জমিদারদের দিতে হত তাতে চাষীরা নিঃস্ব হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে জীবিকার জন্য কলকারখানায় কাজ করতে গেল ফলে তা সুলভ শ্রমের উৎস হল। জারের আমলে দৈহিক নিপীড়ন করা হত এমনকি চাবুক মারা হত। মজুর ও কৃষকের ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকার ছিল না ফলে জারের স্বৈরশাসন ছিল জনগণের সবচেয়ে বড় শত্রু। ভূমিদাস প্রথা উঠে গেলে, আগের রেশ থাকলেও, রুশ দেশে পুঁজিবাদী শিল্পের বিকাশ মোটামুটি দ্রুত গতিতে বিকাশ লাভ করে ফলে শ্রমিকের সংখ্যা প্রচুর বাড়ে, যারা ছিল আধুনিক শিল্পের সর্বহারা শ্রমিক। আগেকার সমযেই হাতের কাজ করা বা ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজ করাদের তুলনায় এরা ছিল আলাদা। পুঁজিবাদী শিল্পতে কাজ করায় এদের মধ্যে এক সমস্বার্থ বোধ জন্মায় ও সংগ্রামশীল বিপ্লবী গুন দেখা যায় যা অবশ্যই আগেকার থেকে আলাদা। এই সমস্ত অত্যাচারের বিরুদ্ধে গত শতাব্দীর অষ্টম দশকে রুশ দেশের শ্রমিক শ্রেণী জেগে উঠেছিল এবং নবম দশকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। তারা একত্রিত হয় ও বুঝতে পারে তাদের পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সফল হতে গেলে প্রয়োজন সংগঠন। তাই তৈরি হতে শুরু করে শ্রমিক ইউনিয়ন - এরকম ইউনিয়ন গুলির কোন নেতা মার্কস পরিচালিত প্রথম আন্তর্জাতিক সম্বন্ধেও ওয়াকিবহাল ছিলেন - বাড়তে লাগলো ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা একই সাথে বাড়ল দমননীতি। তবু থামলো না লড়াই। আর এই একই সময়ে পশ্চিম ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাবে রুশ দেশে প্রথম মার্কসবাদী সংঘগুলি গড়ে উঠতে থাকে। এর আগে নারদনিকেরা রুশদেশে বিপ্লবী কাজ করত কিন্তু তারা ছিল মার্কসবাদ বিরোধী। একজন নারদনিক ছিলেন লেনিনের দাদা। জার তৃতীয় আলেকজান্ডার কে খুন করার ষড়যন্ত্রের জন্য তার তার প্রাণ দণ্ড হয়। মায়ের কাতর অনুরোধ সত্বেও লেনিনের দাদা আলেকজান্ডার প্রাণ ভিক্ষা করতে অস্বীকার করেন।২০শে মে ১৯৮৭ তার প্রাণদণ্ড কার্যকর হয়। এইরকম এক পটভূমিতে লেনিন যার পূর্ব নাম ভেলোদ্যা তার হৃদয়ে লেনিনের অবয়ব গড়ে উঠতে শুরু করে বলে জন রীড লিখেছেন।আলেকজান্ডারের এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ লেনিন কে গুপ্তহত্যা পন্থী করে তোলেনি কিন্তু তাকে উলিয়ানভ পরিবারের ক্ষুদ্র গণ্ডির বাইরে বের করেছিল। বৃহত্তর রুশ সমাজের সঙ্গে তাকে যুক্ত করেছিল। বাবার চোখে যে রাশিয়া তিনি এতদিন দেখেছিলেন,দাদার চোখে ধরা পড়া অন্য রাশিয়া এবার তার চোখে পড়ল। এই সমাজ বদলানো দরকার, যে ধরনের বদলের স্বপ্ন দেখতেন তার বাবা, এটা সেই বদল নয় এটা জার মুক্ত রাশিয়া, যা তার দাদা দেখতে চেয়েছিলেন। এই বোধ তখন থেকেই লেনিনের মনের মধ্যে আসে, কিন্তু দাদার লড়াইয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে তার সম্মতি ছিল না। তাই তিনি রাস্তা খুঁজেছেন। এই সময়ই বৌদ্ধিক জগতে তাকে আলোড়িত করেছে মার্কসবাদ, যা রাশিয়ার তখনকার পপুলিস্ট এবং ইকোনোমিস্ট মতবাদ থেকে আলাদা। এই পথে তার শিক্ষাগুরু ছিলেন প্লেখানভ যিনি আগে নারদনিক ছিলেন কিন্তু পরে সেই পথ পরিত্যাগ করে রাশিয়ায় শ্রমিক মুক্তি সংঘ গড়ে তোলেন। এই শ্রমিক মুক্তি সংঘ মার্কস এঙ্গেলস এর মতবাদ প্রচারের কাজে রুশদেশে আত্মনিয়োগ করে। এই বিষয়গুলি লেনিন কে প্রভাবিত করে। প্লেখানভের আদর্শ অনুপ্রাণিত হন। লেনিন শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে রুশদেশে মার্কসবাদ এর মিলন ঘটান। ১৮৯৩ সালের শেষে লেনিন সেন্ট পিটার্সবুর্গে যান, সেখানকার মার্কসবাদী চক্রগুলোতে তার বক্তৃতা সকলকে মুগ্ধ করে। মার্কসের রচনাবলী সম্বন্ধে তার অনন্য ব্যুৎপত্তি, তৎকালীন রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রয়োগের বিষয়ে তার দক্ষতা, শ্রমিকদের আদর্শের সুনিশ্চিত জয় সম্পর্কে তার ঐকান্তিক অবিচল বিশ্বাস, সংগঠক হিসেবে তার অসাধারণ প্রতিভা এই সবকিছুর কারণে তিনি সেন্টপিটার্সবুর্গের মার্কসবাদীদের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। ১৮৯৫ সালে তিনি সেন্টপিটার্সবুর্গের যাবতীয় মার্কসবাদী শ্রমিক চক্রকে একটি দলে একত্রিত করেন যার নাম দেন 'লিগ অফ স্ট্রাগেল ফর দ্য ইম্যানসিপেশন অফ দি ওয়ার্কিং ক্লাস 'এভাবে তিনি মার্কসবাদী শ্রমিক পার্টি গঠনের পথ প্রস্তুত করেন। প্রকাশের তারিখ: ১১-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|