নভেম্বর বিপ্লব, লেনিন: শেখালেন তিনি শেখালেন (তৃতীয় পর্ব)

Kaninika Ghosh
। পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ করতে বামপন্থীরা, তারা ওই সরকারে অংশ নেয়নি। কিন্তু মেনশেভিকদের  নেতা কেরেনেস্কি প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছিলেন।এই সরকার ছিল এক জগাখিচুরি সরকার। নতুন সরকারে  একমাত্র বামপন্থী ছিলেন কেরেনেস্কি।
তৃতীয় পর্ব

বিপ্লব আরম্ভ হবার পর প্রথম কয়েক দিনেই সর্বহারা শ্রেণী শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত তৈরি করে।এগুলিই ছিল  নভেম্বর  বিপ্লবের প্রাথমিক ভ্রূণ।  বিপ্লবের প্রাথমিক সাফল্যে আত্মহারা হওয়ার ফলে এবং এখন থেকে সব ঠিকঠাক  চলবে বলে  মেনশেভিক ও সোশালিস্ট রিভোলিউশনারিরা আশ্বাস  দিয়েছিল অনেকেই তা বিশ্বাস করে। পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ করতে বামপন্থীরা, তারা ওই সরকারে অংশ নেয়নি। কিন্তু মেনশেভিকদের  নেতা কেরেনেস্কি প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছিলেন।এই সরকার ছিল এক জগাখিচুরি সরকার। নতুন সরকারে  একমাত্র বামপন্থী ছিলেন কেরেনেস্কি।সেই সরকার থেকে বুর্জোয়া  বিপ্লবের গতে বাঁধা  চিত্রনাট্য অনুযায়ী সব চলছিল, শুধু ব্যতিক্রম ছিল পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত। সরকারের কাজ ছিল বিপ্লবী বক্তৃতা দিয়ে বিপ্লবের অবসান ঘটানো এবং বুর্জয়াদের হাতে  ধীরে ধীরে ক্ষমতা তুলে দেয়া। কেরেনেস্কি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার কথা বলেন কিন্তু লেনিনের নেতৃত্বে একমাত্র বলশেভিকরা  যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। সৈন্যরা বুঝল তাদের কথা বলছে একমাত্র বলশেভিকরা।   জারের রাশিয়া ছিল অবদমিত জাতিগুলোর জেলখানা বলশেভিকরাই বলেছিল স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দাও কৃষকদের হাতে জমি দাও, শিল্প দাও শ্রমিকদের হাতে। এই দাবিগুলো আদায় করার মতন শক্তি তখনো বলশেভিকদের হয়নি কিন্তু এগুলো ছিল মানুষের দাবি এবং ছিল সোভিয়েতগুলোর দাবি বিশেষত পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতেরও দাবী।

লেনিন তখন ছিলেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। ফেব্রুয়ারী তথা মার্চ বিপ্লবের পর থেকে লেনিন দেশে ফেরার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু তখন জার সরকারের চোখে লেনিন এক নম্বর শত্রু। লেনিন অনেক কষ্টে ৩রা  এপ্রিল লেনিন পৌঁছালেন পেট্রোগ্রাডে।লেনিন ছাড়া পার্টির নেতৃত্ব ট্রটস্কি,জিনোভিয়েভ,কামেনভ, স্তালিন  সবাই রাশিয়ায়  ছিলেন কিন্তু তারা কেন্দ্রে বসে  বিপ্লব কে যেভাবে বুঝেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো করে  বিপ্লবের চরিত্র সম্ভাবনা বুঝেছিলেন লেনিন, অথচ তিনি ছিলেন বাইরে। তাইতো  লেনিনই নভেম্বর বিপ্লবের প্রাণপুরুষ।  তার গোটা প্রস্তাব তিনি শুরু করলেন ক্ষমতা দখল দিয়ে। আশ্চর্য হলেন সবাই। নিজের পার্টিতেও লেনিন হাতেগোনা সংখ্যালঘিষ্ঠ। খসড়া তিনি করে এনেছিলেন জুরিখ থেকে। ৩রা এপ্রিল লেনিন পৌঁছালেন  আর ৭ ই এপ্রিল থেকে প্রাভদাতে  প্রকাশিত হতে শুরু করল 'এপ্রিল থিসিস।' সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ব্লু প্রিন্ট। সেখানেই তিনি বললেন কেন ক্ষমতা দখল করতে হবে। অন্তবর্তী কালীন সরকার একটি বুর্জোয়া সরকার। সৈন্যবাহিনী ও সরকারের নির্দেশে চলে না চলে  সোভিয়েতের নির্দেশে। বিপ্লবী শ্রমিকরা এমনকি কৃষক এবং অন্য জাতিগুলো সোভিয়েতকেই মেনে চলে কিন্তু রাশিয়াকে পরিচালনার ভার  সোভিয়েতের হাতে নেই লেনিন নভেম্বর বিপ্লবের প্রধান স্লোগান হাজির করলেন, "সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতা চাই।" বললেন ক্ষমতা কখনো অ ব্যবহৃত পড়ে থাকে না, সোভিয়েত যদি নিজের হাতে ক্ষমতা তুলে না নেয় প্রতিক্রিয়ার হাতে যাবে ক্ষমতা। ধ্বংস হবে বিপ্লব।

লেনিন  বললেন এই পেট্রোগ্রাডে  প্রধান শক্তি ছিল মেনশেভিকরা। লেনিন বললেন তারা এ কাজ করবে না, করতে হবে বলশেভিকদের। মেন শেভিকরাও মনে করতেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি বুর্জোয়া সরকার কিন্তু তারা বলেছিলেন এর মাধ্যমে রাশিয়ায় পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে শ্রমিক শ্রেণী সেই পুঁজিবাদকে ধ্বংস  করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু লেনিন বুঝেছিলেন এবং তিনি তা প্রতিষ্ঠা করলেন সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিবাদ কোন বিপ্লবী সম্ভাবনার জন্ম দেবে না, তাই অপেক্ষা করার  দরকার নেই, এখনই ক্ষমতা দখল করতে হবে। পাল্টা আঘাত করল প্রতিক্রিয়ার শক্তি।পেট্রোগ্রাডে শ্রমিক ও সৈনিকদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বেরোয় ৩ রা জুলাই  বলশেভিকরা এ মিছিলের  ডাক দেয়নি। মিছিল ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।তবু তারা চেষ্টা করেছে মিছিল যেন শান্তিপূর্ণ থাকে। কিন্তু সরকারি বাহিনী এ মিছিলের ওপর গুলি চালায়,  সরকার লেনিনসহ নেতাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। লেনিন দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, চলে যান ফিনল্যান্ড। বলশেভিক নেতারা গ্রেফতার হন। লেনিন আত্মগোপন করেন। এই অবস্থায় লেনিন লেখেন 'রাষ্ট্র ও বিপ্লব' যাতে তিনি আপসহীন  বিপ্লবের কথা বলেন।  এগুলির মধ্যে দিয়েই লেনিন হয়ে ওঠেন গোটা রাশিয়ার সমস্ত শোষিত মানুষের নেতা, আর বলশেভিক পার্টি  শক্তি বাড়িয়ে নেয়।রুটি, শান্তি, জমির স্লোগান দেয় তারা।  যা ছিল মানুষের মনের দাবি।কেরেনেস্কি  বলশেভিকদের  থামিয়ে রাখতে পারেননি। তাদের সঠিক স্লোগানে লেনিনের নেতৃত্বে সমস্ত মানুষ আকৃষ্ট হলো। মার্চে রাশিয়ায় ২৪২ টি সোভিয়েত ছিল তার মধ্যে ২৭  টিতে বলশেভিকরা  সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, আর নভেম্বরে  সারা দেশে বলশেভিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয। 

অবশেষে আসে ২২শে অক্টোবর (৪ঠা নভেম্বর।) কেরেনেস্কি  আবার মারাত্মক ভুল করেন।বলশেভিকদের উপর বেপরোয়া আক্রমণ শুরু করে।সাঁজোয়া গাড়ি  তাদের আক্রমণ করে, স্তালিনের যোগ্য নেতৃত্বে তা মোকাবিলা করা হয়। লেনিন  ঐদিন রাতে স্মলনিতে আসেন এবং অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ২৫ শে অক্টোবর (৪ নভেম্বর)  রেডগার্ড সেনাবাহিনী, অভ্যুত্থান কারী শ্রমিক ও নাবিকরা রেলস্টেশন, ডাকঘর টেলিফোন, টেলিগ্রাম, সমস্ত সেতু রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গুলোর দখল নেয়। পেট্রোগ্রাড ও  বলশেভিকদের কেন্দ্রীয় কমিটির  দপ্তর স্মলনিই হল বিপ্লবের দপ্তর। লেনিনের নির্দেশে  যুদ্ধজাহাজ অরোরা থেকে কামানের তোপ দেগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা হলো।  ৭ই নভেম্বর দেশের সোভিয়েতগুলো সম্মেলন শুরু। সেখানে বলশেভিক পার্টির পক্ষ থেকে সোভিয়েতের কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে  বলা হল সরকার গঠন করা হোক, এখানে কোন বুর্জোয়া প্রতিনিধি থাকবে না সমস্ত সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা হবে সোভিয়েতের।  কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এসেছিলেন সরাসরি যুদ্ধের ফ্রন্ট থেকে, কারখানা থেকে।বলশেডিকরা জয়ী হলো  শুরু হলো ক্ষমতা হস্তান্তরের।শ্রমিক এবং সৈনিকদের ছিল সোভিয়েত , কিন্তু রাশিয়ার মতো কৃষি প্রধান দেশের গ্রাম এবং কৃষকদের মতামত ছাড়া কোন সরকার গঠিত হতে পারে না। তাদের সম্মেলন ছিল ১৭ই নভেম্বর কিন্তু সেই কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংখ্যা লঘিষ্ঠ ছিল বলশেভিকরা, এখানে প্রাধান্য ছিল সোশ্যাল রিভোলিউশানারিদের। প্রথম থেকে লড়াই শুরু হয়। বামপন্থী সোশ্যাল রিভোলিউশনারিরা বলশেভিদের পাশে এসে দাঁড়ায়। নতুন সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন জানায়।বিপ্লবী  ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়।  আগুনের মত বিজয়ের এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাশিয়ায়। ৭ই নভেম্বর বিপ্লব শুরু, সমাপ্ত হয় ১৭ই নভেম্বর। এটাই ছিল' দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন।' বিপ্লব মানে তো গায়ের জোরে একটি শক্তিকে উচ্ছেদ করে নতুন শক্তির ক্ষমতা দখল, তার মানে তো যুদ্ধ, রক্ত। কিন্তু রাশিয়ার বিপ্লবে এসব ছিল না। 

কেরেনেস্কি  তার মন্ত্রিসভা অনুগত সৈন্য বাহিনীর একটা অংশ থেকে যায়, বলশেভিকরা তাদের ঘিরে বসে থাকে তারপর তাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়।  এখানে ওখানে সংঘর্ষ হয় কিন্তু যুদ্ধে যেতে বলশেভিকরা। এরিক হবসবম তার ' Age of Extremes' এ  লিখেছেন বিপ্লব নিয়ে তৈরি আইজেনস্টাইনের অক্টোবর ফিল্মটি  তৈরি করার সময় যত লোক আহত হয়েছিল তার থেকে অনেক কম লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আসল বিপ্লবের সময়। সাজোঁয়া  গাড়ি নিয়ে  বলশেভিকরা এসেছিল ভয় দেখাতে, কামানের  তোপ দেগে ছিল যুদ্ধজাহাজ অরোরা,  কিন্তু সেটা শ্বেতপ্রাসাদ দখল করতে নয়  তারা ক্ষমতা দখল করেছে সেটা সবাইকে জানান দিতে। বিপ্লবের পক্ষে বিপ্লবের বিপক্ষে অন্তহীন বিতর্ক চলেছে।পরাজিত পক্ষ নিজেদের মতন বলেছে কিন্তু না : তার জন্য তাদের অত্যাচার করা  হয়নি। এই ছিল নভেম্বর বিপ্লব।  প্রতিমুহূর্তে ভিতরে, বাইরে লড়াই এর মধ্যে দিয়ে আর বাস্তব অভিজ্ঞতায়  একদিকে তত্ত্ব উপস্থিত করে অন্যদিকে সঠিক প্রয়োগে, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট  স্লোগান দিয়ে, মানুষকে পক্ষে এনে লেনিন সফল  করেছিলেন নভেম্বর বিপ্লব, পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যা শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক, প্রাসঙ্গিক খেটে খাওয়া, বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত মানুষের জন্য, মেয়েদের জন্য, দলিতদের জন্য, সবার জন্য। তাই লেনিনের শিক্ষা, তার নেতৃত্বের মধ্যে দিয়ে সফল নভেম্বর বিপ্লব অনন্য চিহ্ন রেখে গেছে মানুষের ইতিহাসে।

প্রথম পর্বের লিঙ্ক 

দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক
প্রকাশের তারিখ: ১১-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org