|
পাতে নাই ভাত, স্বপ্নে ঘিয়ের কমতি নাইSamik Lahiri |
দেশের কতজন মানুষের হাতে খাবার আছে? জোয়ান ছেলের হাতে কাজ আছে তো? ৬,৭৬৯টি স্কুলের ২,২৯,৫৬৯ জন শিশুর সামনে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে তো? আর ৪,১৩৩টি স্কুলের ১৯,৫০২ জন শিক্ষকের সামনে ছাত্র আছে তো? |
মশাই, আজকাল আমাদের দেশের সবচেয়ে জরুরি আঞ্চলিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক সমস্যাটি কী বলুন দিকি? আজ্ঞে না, ভুল প্রশ্ন করলেন! পেট খালি কি ভরা, কর্মসংস্থান আছে কি নাই - ওসব বহু পুরোনো ও ব্যাকডেটেড ফ্যাশন। এখন আসল প্রশ্ন হলো - আজ রাতে আপনি নিরামিষ খেয়ে সোজা স্বর্গলোকের টিকিট কাটবেন, নাকি আমিষ খেয়ে নরকের আগুনে রোস্ট হবেন? সম্প্রতি এই চরম বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রশ্নের ফয়সালা করতে এক মহামান্য বাবাজির পদধূলি পড়েছিল এই বঙ্গদেশে, রাজ্য সরকারের আনুকুল্যে। তিনি এলেন, হাত-পা ছুঁড়ে অমূল্য জ্ঞান বর্ষণ করলেন। টেলিভিশন হাঁ করে শুনল, সোশ্যাল মিডিয়া লালা ঝরাল। আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে ডজন খানেক মন্ত্রী-আমলা পরম ভক্তিভরে হাঁটু গেড়ে বসে সেই গুরুগম্ভীর জ্ঞানামৃত পান করলেন। তারপর বাবাজি যথারীতি কাজ গুটিয়ে রাজ্য ছাড়লেন, আর যাবার সময় আমাদের দিকে কৃপাদৃষ্টি হেনে গাল পেড়ে গেলেন - ‘পাখণ্ডী!’ অবশ্য কথাটা তিনি বঙ্গ সমাজকে বললেন, না নিজের প্রতি আত্মউপলব্ধি প্রকাশ করলেন, তা নিশ্চিত হওয়া গেল না! তবে একটা লাভ হলো। কিছুদিন যাবৎ রাজনৈতিক বাজারে অক্সিজেনের খুব টান চলছিল, বাবাজি এসে সেখানে পুরো এক সপ্তাহের সিলিন্ডার জুগিয়ে দিয়ে গেলেন। এখন বেকারত্ব, চাল-চিনির দাম, চাকরি নাই - এসব ফালতু বিষয় নিয়ে কেউ আর কথা বলে না। বঙ্গকুল এখন মহা ব্যস্ত ‘আমিষ বনাম নিরামিষ’ মহাযুদ্ধে। ব্যাপারটি কতকটা সেই লোকটির মতো - যার মাথার ওপর ছাদ নেই, কিন্তু তাকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, ‘ভাই, ঘরের ছাদের রংটা গেরুয়া করবে, না সাদা’। এর পরপরই অবশ্য আরও এক মহাজাগতিক ও পরম গুরুভার সমস্যা সামনে এসে দাঁড়াল -দুর্গাপ্রতিমার হাত! এগারোটি হাত! দেশের বাকি সব ঝামেলা এখন একটু হাতজোড় করে লাইনে দাঁড়াক। আগে মায়ের হাত গুনতে হবে - এক, দুই, তিন... এগারো! অমনি সংবাদমাধ্যমে উত্তাপ, সোশ্যাল মিডিয়ায় সুনামি, আর রাজনৈতিক মঞ্চে বজ্রপাত। কার ধর্মবোধ কত সেন্টিমিটার বেশি, তা নিয়ে একদম চুলচেরা বিশ্লেষণ। ঠিক সেই মুহূর্তেই, ওদিকে এক বোকা ছোকরা সরকারি চাকরির ফর্ম মেলাচ্ছে। বাবার পকেটে রেস্তো নেই, চোখে তার শর্ষে ফুল। ছোকরা ভাবছে, মায়ের এগারোখানা হাত হলে শক্তি বাড়ে বটে, কিন্তু আমার এই দুটো হাত দিয়ে যদি একটা কনস্টেবল বা ক্লার্কের চাকরি জুটত, তবে ঘরের হাঁড়িটায় অন্তত চাল ফুটত! আহা, কী চমৎকার আমাদের এই সভ্যতা! যেখানে আলোচনা হতে পারে আপনি থালায় পাঁঠা চড়াবেন না পনির, কিন্তু আপনি কেন না খেয়ে আছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত অশ্লীল! টেলিভিশনে দেবীর হাতের সংখ্যা নিয়ে প্রাইম-টাইমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুদ্ধ চলতে পারে, কিন্তু রাজ্যের স্কুলে শিক্ষক কেন নেই, সেই প্রশ্ন তুললেই আপনি একেবারে ‘অসামাজিক’। সরকারি খাতা-কলমের হিসেবটা শুনবেন? সরকারি তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ৬,৭৬৯টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন! আর সেই একক-শিক্ষকচালিত স্কুলগুলিতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কত জানেন? ২,২৯,৫৬৯ জন! অর্থাৎ, একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, কেরানি, আবার ছুটির ঘণ্টা বাজানো দফতরি - সব চরিত্রেই অভিনয় করতে হচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক বিধাতারা যদি দেবীর এগারোটা হাতের মতো ওই একা-শিক্ষক মহাশয়দের স্কন্ধে আর গোটা আটেক হাত ফিট করে দিতেন, তবে বোধহয় শিক্ষা ব্যবস্থা উদ্ধার হতো! আবার এর উল্টো আধ্যাত্মিক দৃশ্যটাও দেখুন। রাজ্যে ৪,১৩৩টি সরকারি স্কুলে নাকি একজনও ছাত্রছাত্রী নেই! অথচ সেখানে ১৯,৫০২ জন শিক্ষক পরম শান্তিতে কর্মরত ও মাইনেপ্রাপ্ত! একেই বলে ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন! যেখানে ২ লাখের বেশি ছাত্র হাঁ করে বসে আছে, সেখানে গুরুমশাই নেই; আর যেখানে সাড়ে ১৯ হাজার গুরুমশাই অধিষ্ঠান করছেন, সেখানে শিক্ষার্থী উধাও! তবে এই অভিনব শিক্ষানীতি নিয়ে কিন্তু ওই অন্তর্যামী সরকারি বাবাজি একটা বাক্যও ব্যয় করেননি। করবেনই বা কেন? ওতে তো টিআরপি নেই! আমিষ নিয়ে কথা বললে একদল খেপে যায়, নিরামিষ বললে অন্য দল খিঁচিয়ে ওঠে, আর দুর্গার হাত নিয়ে বললে সবাই রেগে আগুন। কিন্তু যেই আপনি বেকারত্ব নিয়ে কথা বলবেন, অমনি সবাই একযোগে এমন এক খাসা ঘুম দেবে যে, কুম্ভকর্ণও লজ্জায় পড়ে যাবে! অথচ সরকারি PLFS-এর ২০২৫ সালের হিসেব কী বলছে? পশ্চিমবঙ্গে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের বেকারত্বের হার সাধারণ কর্মস্থিতি (Usual Status) অনুযায়ী ১০.৬ শতাংশ! আর ২০২৫-এর জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকের গত এক সপ্তাহের কর্মস্থিতি (Current Weekly Status) অনুযায়ী এই বেকারত্বের হার গিয়ে ঠেকেছে ১২.৬ শতাংশে! অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন জোয়ান ছেলের মধ্যে ১২-১৩ জন কাজ না পেয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। পকেটে গড়ের মাঠ, কিন্তু বাবাজির সস্নেহ প্রশ্ন - আগে বলো বাবা, তুমি সকালে কাঁঠালবিচি খেয়েছ না পাঁঠার মাংস? নীতি আয়োগের খাতায় অবশ্য লেখা আছে, দেশে নাকি দারিদ্র্য কমেছে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ২০১৫-১৬ সালের ২৪.৮৫ শতাংশ থেকে কমে ২০১৯-২১ সালে ১৪.৯৬ শতাংশে নেমেছে। আর ২০২২-২৩ সালের জন্য তা আরও কমে ১১.২৮ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। এসব সরকারি পরিসংখ্যান অবশ্য, যা স্বভাবতই বাস্তব থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। তাও ভারী আনন্দেরই কথা! কিন্তু দারিদ্র্য কমা মানেই কি দারিদ্র্য শেষ হয়ে যাওয়া? দারিদ্র্য তো আর শুধু পকেটের শূন্যতা নয় মশাই! নীতি আয়োগের সূচকেই বলা আছে - পুষ্টি, স্কুলে উপস্থিতি, পানীয় জল, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, বাসস্থান এইসব মিলেই দারিদ্র্য। অর্থাৎ মানুষ শুধু পেটের খিদে নিয়েই গরিব হয় না; সে তথ্যের ক্ষুধায়, শিক্ষার ক্ষুধায়, কাজের ক্ষুধায় এবং সম্মানের ক্ষুধাতেও গরিব। কিন্তু এসব অনাধ্যাত্মিক খিদে নিয়ে কোনো স্বঘোষিত বাবা কোনোদিন বলেন না - হে ভক্তগণ, যেদিন দেশের সবকটা ছেলে চাকরি পাবে, সেদিন আমি পারণ করব! বলবেন কেন? চাকরি দিতে গেলে তো বাজেট লাগে, ট্যাক্সের হিসেব দিতে হয়, কলকারখানা গড়তে হয়। আর নিরামিষ-আমিষ বা দশ হাত-এগারো হাতের গ্যাঁজলা ছড়াতে? শুধু একটা মাইক আর দুটো ক্যামেরা হলেই কেল্লা ফতে! আর সঙ্গে যদি থাকে ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের মোক্ষম প্রপাগান্ডা, তবে তো কথাই নেই। দেশজুড়ে এমন চমৎকার আগুন জ্বলবে যে, পাশের কারখানায় আগুন লাগলেও অত দ্রুত ছড়াবে না। তা কারখানা আর শিল্পের কথা যখন এসেই গেল - তখন প্রশ্ন করতেই পারেন, রাজ্যে নতুন শিল্প কোথায়? উফ! আবার সেই সেকেলে প্রশ্ন! শিল্প নিয়ে কথা বলতে গেলে ফাইল খুলতে হবে, কত টাকা বিনিয়োগ এলো তার হিসেব দিতে হবে, জমি-জল-বিদ্যুতের অঙ্ক মেলাতে হবে। তার চেয়ে কত সোজা - ‘তুমি খাসি না নিরামিষাশী?’ অথবা ‘মা দুর্গার হাত কটি?’ এর জন্য তো আর অর্থনীতির মোটা মোটা কেতাব গিলতে হয় না! সবচেয়ে বড় সুবিধা কী জানেন? খাবার আর ধর্ম নিয়ে মানুষকে খুব সুন্দর দু-ভাগ করে ফেলা যায়। কিন্তু বেকারত্ব দিয়ে ভাগ করা যায় না। এক জন বেকার হিন্দু ছেলে আর এক জন বেকার মুসলমান ছেলের জীবনের যন্ত্রণা আর খিদের জ্বালাটা হুবহু এক। দুজনেরই চাকরি চাই, ডাল-ভাতের সংস্থান চাই, বুড়ো বাবার ওষুধ চাই। এই মিলটাই তো বাবাজিদের রাজনীতির বাজারে ভারী বিপজ্জনক! তাই বুদ্ধিমানরা মাঝখান থেকে একটা এমন মার্বেল ছুঁড়ে দেন, যাতে দুজনে কামড়াকামড়ি করে মরে - তুই কী খাস? তোর দেবীর রূপ কী? আমার চাকরি কই? আমার স্কুলে শিক্ষক নেই কেন? আমার এলাকায় কারখানা নেই কেন? আমার বাড়িতে পানীয় জল নেই কেন? - এসব জিজ্ঞাসা ধীরে ধীরে মহাজাগতিক বিশ্বে বিলীন হয়ে যায়। আসলে, এই দেশে পেট্রোল বা ডেটা সবচেয়ে দামি জিনিস নয় মশাই। সবচেয়ে দামি সম্পদ হলো মানুষের ‘মনোযোগ’। আপনার মনোযোগটা ঠিক কোন দিকে আটকে রাখা হবে, সেটাই হলো আসল রাজনীতি। আপনি যদি সারাদিন টেলিভিশনে বাবাজির বচন শোনেন আর পাতের খাবার নিয়ে চুলচেরা বিচার করেন, তবে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করার সময় আর আপনার থাকবে কোথায়? তাই ওই বাবাজিদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। তাঁরা আসবেন, টুপি পরাবেন, নগদ বুঝে নেবেন এবং চলেও যাবেন। আসল প্রশ্নটা আমাদেরই। আমরা কি প্রতিবার এই একই ফাঁদে পা দেব? ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে যদি আজ কেউ জিজ্ঞেস করে, ভাই, তুমি আমিষ খাবে না নিরামিষ? সে খেপে গিয়ে খিঁচিয়ে উঠবে - আগে থালায় ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো’। আগে পেটে দানাপানি পড়ুক, তারপর না হয় দর্শন আলোচনা করা যাবে। কথাটা কিন্তু তক্তা উল্টানো খাঁটি কথা। কারণ মানুষের প্রথম ধর্ম হলো টিঁকে থাকা। আর টিঁকে থাকার প্রথম শর্ত, পেটে দুটো অন্ন পরা। বাকি সব ঝগড়াঝাঁটি পরে হলেও চলবে। দেবীর হাতও গোনা যাবে, বাবাজির বাণীও শোনা যাবে। কিন্তু তার আগে, আসুন তো ভাই, একবার গুনে দেখি -
নাঃ, এই হিসেবটা বড্ড শক্ত আর খটোমটো! তাই বোধহয় এই অঙ্কটা মেলানোর জন্য আজ পর্যন্ত কোনো বাবাজির আবির্ভাব ঘটল না! প্রকাশের তারিখ: ১৫-সেপ্টেম্বর-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|