ধুমকেতু’র গল্প

Samik Lahiri
সমগ্ৰ জাতির অন্তর যখন বাঁধা অসির ঝনঝনায় তখন ঝঙ্কার তোলে। তখন সেখানে ঐক্য১তান সৃষ্টি করছ। তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি।

২২ শে শ্রাবণ ১৩৪৮। মধ‍্যগগনে সূর্য তখন আরূঢ়। কবিগুরুর মৃত‍্যুসংবাদ তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। গুরুদেবের মৃত‍্যুর পরই, কবি নজরুল ইসলাম লিখলেন,

"বিশ্বের রবি ভারতের কবি
শ‍্যামবাংলার হৃদয়ের ছবি
তুমি চলে যাবে বলে "

রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি কতখানি সস্নেহ ছিলেন তা প্রমাণিত হয় ১৯৩৪ সালের ১৭ই আগস্ট হেমন্তবালা দেবীকে দেওয়া তার চিঠির মাধ‍্যমে । সেই চিঠিতে লিখেছিলেন, "তোমার মেয়ে হয়ত আমার কবিতার চেয়ে নজরুলের কবিতা ঢের বেশী পছন্দ করে। সেই কারণে আমি তাকে বিন্দুমাত্র কম স্নেহ করি নে।সমকালীন কবিদের মধ‍্যে নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের একটা আকর্ষণ ছিল। তবে উভয়ের মধ‍্যে কবে কোথায় প্রথম দেখা হয়েছিল সেই তথ‍্য সর্বাংশে আমার জানা নেই। রফিকুল ইসলামের মতে ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে সুধাকান্ত চৌধুরী উভয়ের মধ‍্যে সাক্ষাৎ ঘটিয়েছিলেন। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত মুখোপাধ‍্যায় ১৯২১সালের পূজাবকাশের পরের সময়কালকেই চিহ্নিত করেছেন। নজরুলের যৌবনদীপ্ত রূপ দেখিয়া তিনি কিছুটা মোহিত হয়ে পড়েন। তবে প্রভাতবাবু সেখানে লিখেছেন তখন তিনি বিদ্রোহী কবি বলে খ‍্যাত। কিন্তু ১৯২১ সালে বিদ্রোহী কবিতা টি লেখাই হয় নি, ইতিহাস তাই বলে। অবশ‍্য এ বিষয়ে যারা গবেষণা করেন তারাই শেষ কথা বলবেন।

নজরুলের #অগ্নিবীণা ও সঞ্চিতা সরকারী রোষে পড়েছিল। এর অন‍্যতম কারণ ছিল বিদ্রোহী কবিতাটি। অনেকে ভুল তথ‍্য পরিবেশন করে বলেন‌ অগ্নিবীণা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। সঞ্চিতা সম্পর্কেও তাদের এক‌ই অভিমত। তবে গবেষকরা দেখিয়েছেন বাজেয়াপ্ত হয় নি কিন্তু পড়েছিল সরকারী রোষে যা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সেইসময় যে কোন জনগণের কাছেই ব‌ই দুটি পেলেই গ্ৰেপ্তার করা হত।

ছোটোতে নজরুল পাঁচিলে বসে থেকে দেখেছেন বাসন্তী পূজো, শুনেছেন যাত্রাগান, ঢোলক বাজাতেন লেটোর দলে। সেইসময় অবিভক্ত বঙ্গে পংক্তিভোজনে ব্রাম্ভ্রণ ও অব্রাম্ভ্রণ রীতিটি কার্যকরী হত। সিয়ারশোল রাজস্কুলের শিক্ষক  নিবারণচন্দ্র ঘটক তাঁকে বিপ্লবী রাজনীতিতে শিক্ষাদান করেন। নিবারণ বাবুর মাসিমার নাম ছিল এককড়ি দেবী। অস্ত্র‌ আইনে ব্রিটিশরা তাঁকে গ্ৰেপ্তার করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবী ধারার লড়াইয়ে প্রথম বাঙালী মহিলা এককড়ি দেবীর নাম উচ্চারণ করা যেতে পারে। কম: মুজ:ফর আহমেদ ছিলেন নজরুল ইসলামের খুব কাছের মানুষ। ফলত: ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনায় সংস্কারহীন চেতনায় নজরুলের কবিতা গান নতুন ধারায় শাণিত হত। উল্লেখ করা যায় , "এস ভাই হিন্দু! এস মুসলমান! এস বুদ্ধ! এস খ্রীস্টান! আজ আমরা সব গন্ডী কাটাইয়া সব সংকীর্ণতা , সর্বস্বার্থ, সর্বমিথ‍্যা চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আমরা কোন কলহ করিব না। চারিদিকে চাহিয়া দেখ বীর ভ্রাতৃগণের শব"।

আজকের দিনে কথাগুলি মূল‍্যবান। অন্নদাশংকর একসময় লিখেছিলেন,

ভুল হয়ে গেছে
বিলকুল
আর সব কিছু
ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয় নি কো
নজরুল।
অবশ‍্য পরে আক্ষেপ করে তিনি লিখেছিলেন,
"কেউ ভাবলো না ইতিহাসে শেষ
ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
এতকাল পরে ধর্মের নামে
ভাগ হয়ে গেল নজরুল।

সাল ১৯২১। মুজফ্‌ফর আহমদ তখন ৩/৪ তালতলা লেনে থাকতেন। ডিসেম্বরে শীতের রাতে দশটার মধ‍্যে শুয়ে পড়লেন। তাঁর সঙ্গে থাকতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সেদিন তিনি তখন জেগে। সারারাত ধরে পেন্সিল নিয়ে লিখে ফেললেন কালজয়ী কবিতা 'বিদ্রোহী'। সকালবেলায় কাকাবাবু ঘুম থেকে উঠলে কবি সর্বপ্রথম তাঁকেই শোনালেন। সেদিন‌ই কবিতাটি শুনে বিজলী পত্রিকার ম‍্যানছজার অবিনাশ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য মহাশয় ছাপার জন‍্য নিয়ে গেলেন। ৬ ই জানুয়ারি ১৯২২ প্রথম প্রকাশিত হল বিদ্রোহী কবিতাটি। ঠিক পরের দিন বিজলী পত্রিকার কপি নিয়ে কাজী সাহেব জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি গেলেন। সেখানে পৌঁছে গুরুদেব গুরুদেব করে চিৎকার শুরু করে দিলেন। ঠাকুর বললেন, ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেন? উপরে এসো। কাজী সাহেব বললেন তোমাকে খুন করবো, তারপর বাচিক ভঙ্গিতে শোনালেন সেই কবিতা। কবিতা শুনে গুরুদেব তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হ‍্যাঁ কাজী তুমি একদিন বিশ্ববিখ্যাত কবি হবে। পরবর্তীতে ২২শে ফেব্রুয়ারি তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য টি বিদ্রোহী কবিকে উৎসর্গ করলেন। তখন নজরুল ইসলাম জেলে। তাঁর সম্পাদনায় ধূমকেতু পত্রিকা থেকে তিনি রাজদ্রোহের অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত। ব্রাহ্মসমাজে এই নিয়ে হলো তীব্র প্রতিক্রিয়া।ব্রাহ্মসমাজে আসলে কোন লেখা নিয়ে বাইরের কাউকে উৎসর্গ করার রেওয়াজ ছিল না। ঠাকুরবাড়ির সভায় কবিগুরু বলেছিলেন নজরুলকে আমি বসন্ত গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গ পত্রে তাঁকে কবি বলে অভিহিত করেছি। কেউ কেউ মন্তব‍্য করলেন মার মার কাট কাট এ অসির ঝনঝনার মধ্যে রূপ ও রসের প্রলেপটুকু হারিয়ে গেছে। কবিগুরু বললেন কাব‍্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না। এও এক অবিচার বটে। সমগ্ৰ জাতির অন্তর যখন বাঁধা অসির ঝনঝনায় তখন ঝঙ্কার তোলে। তখন সেখানে ঐক‍্যতান সৃষ্টি করছ। তখন কাব‍্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি। আমি যদি আজ তরুণ হতাম তাহলে তখন আমার ক্ষেত্রে ঐ সুর বাজত। সাল ১৯৩৫। কবি নজরুল কবিগুরুর কাছে নাগরিক পত্রিকার জন‍্য একটি লেখা চেয়ে অনুরোধ করলেন। কবিগুরু বয়সের ভারে তখন কিছুটা ক্লান্ত। এক চিঠিতে কবিগুরু সস্নেহে লিখলেন, তার বয়স এখন ৭৫। এই বয়সে পৌঁছতে নজরুলের এখন ঢের দেরী। সময়ের কালে পরস্পরের বয়স যদি অদলবদল হতো তাহলে নজরুল বুঝত এই লেখার যন্ত্রণা কত। কবি চিঠিতে লিখলেন শুনেছি বর্ধমান অঞ্চলে তোমার জন্ম। আমরা থাকি তার পাশের জেলায়। কখনও যদি ঐ সীমা পেরিয়ে এদিকে আসতে পারো খুশি হব। স্বচক্ষে আমার অবস্থা দেখতে পাবে। এই চিঠির সূত্র ধরে কাজী সাহেব লিখলেন তীর্থপথিক কবিতা। তাতে লিখলেন,

"হে কবি হে ঋষি অন্তর্যামী আমারে করিও ক্ষমা
পর্বতসম শত দোষ ত্রুটি ও-চরণে হলো জমা"।

প্রকাশের তারিখ: ২৪-মে-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org