|
নাদেজদা ক্রূপস্কায়া নভেম্বর বিপ্লবের নেত্রীMadhuja Sen Roy |
১৯৭০ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে চালু হয় ইউনেস্কো নাদেজদা কে. ক্রূপস্কায়া লিটারেসি প্রাইজ। শুধুমাত্র শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, নারী শ্রমিকদের দুর্দশা চিহ্নিত করে সেগুলির সমাধানের প্রশ্নেও ক্রূপস্কায়া ছিলেন যত্নবান। ১৮৮৯ সালে তিনি 'দ্যা উইমেন ওয়ার্কার' নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। এই পুস্তিকায় তিনি তুলে ধরেন, নারী শ্রমিকেরা তৎকালীন রাশিয়ায় পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পেতেন। |
| নাদেজদা ক্রূপস্কায়া... আমাদের মত আধা পুঁজিবাদী - আধা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশে তাঁর প্রধান পরিচয় হতো, তিনি ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের স্ত্রী। কিন্তু, সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার ইতিহাসে তিনি একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, যিনি বিপ্লবের প্রস্তুতি পর্বে কারাগারে বন্দী হয়েছিলেন, নির্বাসিত হয়েছিলেন এবং গোপনে শ্রমিকদের কাছে বিপ্লবী ইশতেহার বিতরণ করেছেন। তৎকালীন রাশিয়ার শ্রমজীবী মহিলাদের সমস্যাবলীর উন্মোচন তাঁর লেখনীতে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৮৬৯ সালে জার শাসিত রাশিয়ায় একটি প্রগতিশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাদেজদা। কিশোরী বয়স থেকেই শিক্ষয়িত্রী হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু হয়। মূলতঃ ধর্মীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সানডে স্কুলগুলি পরবর্তীকালে বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ক্রূপস্কায়াদের উদ্যোগে। এই সানডে স্কুলগুলিতে প্রতি রবিবার শ্রমিকদের শিক্ষিত করার কাজ চলতো। মূলতঃ বয়স্ক শিক্ষার মোড়কে শ্রমিক শ্রেণীকে বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজ চলছিল। মহিলা শ্রমিকদের জন্য আলাদা সানডে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রায় ৬০০ শ্রমিক যুক্ত ছিলেন এই স্কুলগুলোর সাথে। 'লেনিনের স্মৃতি' বইতে ক্রূপস্কায়া উল্লেখ করেন, "যদিও প্রত্যেক ক্লাসেই গোয়েন্দা থাকতো, তথাপি স্কুলে আমরা যা খুশি আলোচনা করতে বাধ্য ছিলাম না। কেবল ‘জার’, ‘ধর্মঘট’ ইত্যাদি সাংঘাতিক শব্দ বাদ দিলে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে বাধা ছিল না।" বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে আলোচনা করার সুযোগ যাতে হাতছাড়া না হয় সেজন্য ক্রূপস্কায়া অভুক্ত থেকে স্কুলে উপস্থিত হতেন। এই স্কুলগুলিতে শুধুমাত্র শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি দাওয়া বা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতো না, রাজনৈতিক পরিবর্তন ছাড়া অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের যে সম্ভাবনা নেই, সে উপলব্ধি জাগিয়ে তোলাও ছিল এই স্কুলগুলির অন্যতম লক্ষ্য। সেই সময় সেন্ট পিটার্সবার্গ জুড়ে লেনিনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল পাঠচক্র। এই স্কুলগুলি থেকে নির্বাচিত শ্রমিকদের সেই পাঠচক্রে যুক্ত করা হতো। সানডে স্কুলগুলির মাধ্যমে শ্রমিকদের একটি ভরসাস্থলে পরিণত হচ্ছিলেন পার্টির কর্মীরা। ক্রূপস্কায়া ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। শিক্ষাদানের পদ্ধতি সম্পর্কে বিপ্লবের আগেই তিনি প্রায় 40টি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গতে বাঁধা শিক্ষায় ছাত্রদের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। ক্লাসগুলিতে একমুখী বক্তৃতার পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক পাঠদান ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করতে অনেক বেশি কার্যকরী বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর রচনা 'পাবলিক এডুকেশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি' ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, "যতদিন পর্যন্ত শ্রমজীবী মানুষের শিক্ষার দায়িত্ব বুর্জোয়াশ্রেণির হাতে থাকবে, ততদিন শিক্ষাকে একটি অস্ত্র হিসেবে শ্রমিকশ্রেণির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। শুধুমাত্র শ্রমিকশ্রেণিই পারে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের কাজে শিক্ষাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে।" ক্রূপস্কায়া বিশ্বাস করতেন, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। বিপ্লব পরবর্তীকালের রাশিয়ায় Narkompros (শিক্ষামন্ত্রক) এর দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি। সাক্ষরতা বলতে ক্রূপস্কায়া শুধুমাত্র লিখতে এবং পড়তে পারাকে বুঝতেন না। তিনি এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যা সাধারণ শ্রমিককে তাঁদের ব্যক্তিত্ব গঠনে, মতামত নির্মাণে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে অংশগ্রহণে সহায়তা করবে। তিনি চেয়েছিলেন শ্রমিক শ্রেণীকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে, যাতে তারা বাস্তব পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে এবং নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি রাশিয়ার শিক্ষা দপ্তরের ডেপুটি কমিশার (মন্ত্রী) হিসেবে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার তত্ত্ব ও তার প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর মতে, সমাজতান্ত্রিক মানুষ তৈরি করতে না পারলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সফল হতে পারে না। সমাজতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার জন্য প্রয়োজন নতুন চিন্তাভাবনায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক। তাই তিনি শিক্ষক শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। নিরক্ষরতা সমাজের অভিশাপ। তাই সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য সরকার বিনামূল্যে শিক্ষা, প্রতি এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, বয়স্কদের জন্য রাতের বিদ্যালয় স্থাপন এবং সমস্ত শ্রমিকদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও নিজস্ব চিন্তাভাবনা গড়ে তোলার প্রতি নজর দেওয়া, সমাজতান্ত্রিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলা, শিশুকে ছোটোবেলা থেকেই বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তোলা, উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করা, পলিটেকনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, ছাত্র ও অভিভাবকদের বিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত করা এবং সকলের জন্য বই পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাঠাগার তৈরি করা—এই বিষয়গুলোর ওপর ক্রূপস্কায়া বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষাব্যবস্থার একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। সারা পৃথিবীর কাছে বয়স্ক শিক্ষার প্রশ্নে ক্রূপস্কায়া এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। ১৯৭০ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে চালু হয় ইউনেস্কো নাদেজদা কে. ক্রূপস্কায়া লিটারেসি প্রাইজ। শুধুমাত্র শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, নারী শ্রমিকদের দুর্দশা চিহ্নিত করে সেগুলির সমাধানের প্রশ্নেও ক্রূপস্কায়া ছিলেন যত্নবান। ১৮৮৯ সালে তিনি 'দ্যা উইমেন ওয়ার্কার' নামক একটি পুস্তিকা রচনা করেন। এই পুস্তিকায় তিনি তুলে ধরেন, নারী শ্রমিকেরা তৎকালীন রাশিয়ায় পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পেতেন। তাঁদের আবাসস্থল ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং অপরিচ্ছন্ন। 10 থেকে 12 ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো, যার প্রভাব পড়েছিল তাঁদের স্বাস্থ্যের ওপর। কারখানায় কাজ করা নারী শ্রমিক এবং তাঁদের শিশু সন্তানেরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হতেন। শিশুদের বেড়ে ওঠায় এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। ক্রূপস্কায়া সর্বাধিক কঠিন অবস্থার মধ্যে ছিলেন গ্রামীণ শ্রমিক এবং গৃহ সহায়িকাদের। তাঁর মতে, কারখানাগুলিকে কেন্দ্র করে শিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করলে তাঁদের মায়েরা অনেক বেশি নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন এবং এর ফলে উৎপাদনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ১৯০৮ সালে আমেরিকায় বিখ্যাত দর্জি শ্রমিকদের ধর্মঘটের প্রায় কুড়ি বছর আগে ক্রূপস্কায়া লিখেছিলেন, আটঘন্টা কাজ, স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন কাজের পরিবেশ, সমকাজে সমমজুরির দাবি। এই পুস্তিকায় তিনি দাবি তুলেছিলেন, কর্মক্ষেত্রের নির্দিষ্ট কাজের পরে বাড়তি কোনো কাজ মহিলাদের দেওয়া যাবে না, যাতে ঘরে ফিরেও তাঁদের কাজ করতে না হয়। তিনি ১২ সপ্তাহ মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি তুলেছিলেন। এই পুস্তিকায় তিনি লেখেন, নারী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় প্রণীত আইনসমূহ যদি মানা না হয়, তবে নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। ক্রূপস্কায়া তাঁর জীবনে তিন হাজারেরও বেশি প্রচার পুস্তিকা, প্রবন্ধ ও বই প্রকাশ করেছেন। ইস্ক্রার দায়িত্ব সামলেছেন। তাই ক্রূপস্কায়া শুধুমাত্র শিক্ষাবিজ্ঞানী নন, বরং রাশিয়ার বিপ্লবের ইতিহাসে তিনি শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী বাহিনীর সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্লান্তিহীন যোদ্ধা। সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের নির্মাণে বিপ্লবের নারী নাদেজদার ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকাশের তারিখ: ১৫-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|