মিড ডে মিল ও মিড ডে মিল কর্মী ও আগামী দিনেের আন্দোলন

Sunil Nati
সারা দেশে প্রায় ২৫ লাখ মিড ডে মিল কর্মী মিড মিল স্কীমে কাজ করেন। তারা দেশের ১২কোটি শিশুর জন্য মিড মিল তৈরি করে।এবং দেশের ভবিষ্যত তৈরিতে নিয়োজিত।দরিদ্র শ্রমিক, খেতমজুর, দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই মহিলা।

 সারা দেশে গ্রাম ও শহরে বহু মানুষ দিন মজুরি খেটে সংসার চালান, একজন যা আয় করেন তাতে সংসার চালানো সম্ভব নয়,তাই এই অংশের মানুষেরা পরিবারের সবাই দৈনিক শ্রম- শক্তি বিক্রি করার জন্য সকাল হতেই বেরিয়ে পড়েন কিছু আয় করার জন্য । ৫-৭ বছরের শিশুরাও বাদ যায় না।
   ফলে বাড়িতে ( কোনো ক্ষেত্রে শিশুদের রাখার অবস্থা না থাকায় মায়েরা পিঠে গামছা বেঁধে শিশুদের বয়ে নিয়ে কাজে যায়। বাড়িতে যারা রয়ে গেলেন তাদের দুপুরের আহারের ব্যবস্থা বিলাসিতার নামান্তর। ফলে শিশুদের পুষ্টি এবং শিক্ষা অধরাই থেকে যায়। এটাই আমাদের দেশের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৪০ কোটির দেশে দারিদ্র সীমার নিচে যে মানুষগুলো বাস করেন, তাদের সবারই এক অবস্থা। সরকারি হিসাবে ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ২১.৯% মানুষ দারিদ্রসিমার নিচে বাস করেন। আর ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী সরকারি হিসেবে ২৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করেন। আসলে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। কারণ সরকারি হিসেবে শহরে ২৬ টাকা, গ্রামে ২২ টাকা যাদের আয় ,তারাই গরিব।
    কেন্দ্রীয় সরকার এর আইন অনুযায়ী, এর ওপরে যারা আয় করেন তারা নাকি বড়লোক।
এই কোটি কোটি মানুষের পরিবারের শিশু/বালক, বালিকারা অ- পুষ্টির শিকার তো বটেই, শিক্ষার আলো থেকে ও এরা বঞ্চিত।

    মিড ডে মিলের উদ্দেশ্য কি?
১) ৫ বছর বয়স থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে মেয়েদের পুষ্টি জোগানো।
২) দুপুরের খাদ্য বিদ্যালয়ে দিলে ঐ বয়সীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ বাড়বে এবং তারা শিক্ষা লাভ করবে 
১৯৯০-৯১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের ১২ টি রাজ্যে মিড ডে মিল প্রকল্প চালু হয়, কিছুটা আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তায়। কিন্তু অন্ধ্রপ্রদেেশ ও রাজস্থানে এই প্রকল্প চালু হয় সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থে। 

   ৫-৮ বছরের শিশুদের পুষ্টি জোগানোর ক্ষেত্রে ১২৫ টি দেশের প্রতিনিধিরা ' শিশুদের অধিকার' - এর প্রশ্নে একটি কনভেনশনে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় যে তারা নিজ নিজ দেশে শিশুদের পুষ্টি জোগানো ও শিক্ষার আঙিনায় আনাকে নিশ্চিত করবে । (article 24. Paragraph 2c) ভারতবর্ষ ও এই কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী ছিল ।
   কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছাড়া আর কিছু এই দেশের সরকার করেন নি। উপরন্তু ভারতবর্ষ গরিব দেশের তকমা গায়ে লাগিয়ে বিদেশি সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়। 

প্রকল্প:-
  আমরা এর আগে পর্যন্ত প্রকল্প শব্দটি ব্যবহার করিনি। কারণ প্রকল্প বলতে আমরা বুঝি যে একটি কর্মসূচি যা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হবে। আর সেই প্রকল্পটি রূপায়িত হবার পর তার কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। কিন্তু মিড ডে মিল কি একটি প্রকল্প ? না একটি স্থায়ী কর্মসূচি ? কোনো মূর্খ ও মনে করেন না যে ভারতের শত কোটি গরিব মানুষ অনতিবিলম্বে ধনী লোকে পর্যবসিত হবেন আর টিফিন বাক্স ভর্তি করে প্রোটিন যুক্ত খাবার নিয়ে ছাত্র - ছাত্রীরা বিদ্যালয়ে আসবে। আমাদের মতো দেশে এই ব্যবস্থা স্থায়ী একটি কর্মসূচি। 

তাহলে প্রকল্প বলা হচ্ছে কেনো ?
   ১) কোনো প্রকল্প হলে , সম্পুর্ণ আর্থিক দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকার কে নিতে হয় না। 
   ২) যেমন, বর্তমানে এই কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় সরকার দেয় ৬০% আর রাজ্য সরকার দেয় ৪০% ।
   ৩) প্রকল্প যেহেতু অস্থায়ী তাই এর সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা অস্থায়ী। ফলে মিড ডে মিল কর্মীদের বেতন, ভাতা, অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার কোনো দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বর্তাবে না। 

    অথচ, সারা দেশে প্রায় ২৫ লাখ মিড ডে মিল কর্মী মিড মিল স্কীমে কাজ করেন। তারা দেশের ১২কোটি শিশুর জন্য মিড মিল তৈরি করে।এবং দেশের ভবিষ্যত তৈরিতে নিয়োজিত।দরিদ্র শ্রমিক, খেতমজুর, দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই মহিলা। এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বিধবা ,স্বামী পরিত্যক্তা অবিবাহিত মহিলা 
এটা খুবই দুঃখজনক যে কেন্দ্রীয় সরকার যারা মহিলাদের ক্ষমতায়নের দাবি করেন গত ১৪ বছরে মিড ডে মিল কর্মীদের সম্মানি এক টাক ও বাড়ায়নি।২০০৯ সালে তৎকালীন ইউ পি এ সরকার মাসে ১০০০ টাকা সাম্মানি ধার্য করেছিল। এখনও বহু রাজ্যে এই ১০০০ টাকা সাম্মানিতে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।অন্য দিকে  প্রকল্পটির নাম পরিবর্তন করে পি এম পোষন যোজনা।উন্নত পুষ্টির নামে এই নাম পরিবর্তন হলেও কেন্দ্রীয় সরকার বাজেটে বরাদ্দ বাড়ায়নি।আসলে  বেশ কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি অনুপাতে বাজেট হ্রাস পেয়েছে।
আমাদের দেশের ২৩ কোটি মানুষ এখনও  দারিদ্র সীমার নিচে অপুষ্ট ও ক্ষুধা  বেড়েই চলেছে। 

দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই প্রকল্প টি বড় বড়  কর্পোরেট এন জি ওকে দিয়ে বেসরকারিকরণ করা হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় রান্না ঘরের প্রচার করা হচ্ছে।কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP)-2020 নিয়ে এসেছে ।এই নীতির নির্দেশে কম বাচ্চা নিয়ে চলা স্কুল গুলি একীভূত করা হচ্ছে বা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর বেশিরভাগই প্রাথমিক স্কুল। এর বেশিরভাগই  এস সি,এস টি,ওবিসি বস্তি এলাকায়।গত ১০ বছরে কয়েক  হাজার স্কুল বন্ধের ফলে প্রায় ২ লক্ষ মিড ডে মিল কর্মীকে তাদের কাজ থেকে ছাটাই করা  হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কাজ মিড ডে মিল কর্মীদের দিয়ে করান হচ্ছে। এই কাজের জন্য প্ররয় পুরো দিন স্কুলে থাকতে হচ্ছে।অথচ নির্ধারিত সম্মানী নিয়মিত  পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ১০ মাসের জন্য সম্মানি পাই যখন আমাদের প্রায় ১১ মাস কাজ করতে হয়। আমাদের ও শিক্ষক এবং অন্যান্য কর্মীদের মতো ১২ মাসের বেতন পাওয়া উচিত এবং এটি ২৬,০০০ টাকার কম হওয়া উচিত নয়। এই প্রকল্পটি প্রায় ৩০ বছর ধরে চলছে কিন্তু এই প্রকল্পে বছরের পর বছর ধরে কাজ করা কর্মীরা অবসর নেওয়ার সময় এক টাকাও পান না। স্কুলে ডিউটির সময় খাবার তৈরি করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় শ্রমিকরা আহত হয়, বা শ্রমিকরা মারা যায়। কিন্তু কোনরকমের আর্থিক সহায়তা তাদের নেই। 

আমাদের রাজ্যে ছাত্র -কর্মীর অনুপাত বজায় রেখে  ২ লক্ষ ৩৩ হাজার পোস্ট মিড ডে মিল কর্মীদের জন্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ জায়গাতেই স্বয়ংবর গোষ্ঠী মিড ডে মিলের কাজ করার ফলে একটি পদ (post) পিছু একাধিক সংখ্যায় কর্মী কাজ করেন, ফলে রাজ্যে এখন ৮ থেকে ৯ লক্ষ কর্মী কাজ করছেন।
রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন হওয়ার পর পূর্ণ বাজেটে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মিড ডে মিল কর্মীদের জন্য ১০০০ টাকা ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়েছে যা ১লা অক্টোবর থেকে ৩০০০হাজার হবে।অ থচ বিজেপির শাসিত  হরিয়ানাতে কর্মীদের সাম্মানিক ৭০০০, উড়িষ্যাতে ৪০০০, বিহারের ৩৬০০, হিমাচল ৪৫০০, কর্নাটকে ৪৭০০, কেরলে প্রতিদিন ৬৭৫ টাকা।

শহরতলীতে মিড ডে মিল ও লড়াই আন্দোলন
রাজ্য সরকার বাজেটে হাজার টাকা ঘোষনার পাশাপাশি কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় মিড ডে মিলকে বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেবার প্রয়াসও গ্রহণ করেছে এবং সরকার এই প্রকল্পের কাজের দায়িত্ব কোনরকম নিয়ম-নীতি না মেনে ইসকনের উপর দেওয়ার সিদ্ধান্ত করে ফেলেছে। কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় ৩৬৬৯ জন কর্মী মিড ডে মিল প্রকল্পের অধীনে কাজ করছে। প্রকল্পটি বেসরকারিকরণ হবার সাথে সাথে এই কর্মীদের কর্মচ্যুত হওয়ার একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার অনেক আগে থেকেই গোটা দেশে কর্পোরেট সংস্থাগুলির উপর মিড ডে মিলের দায়িত্ব দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং দেশের সমস্ত রাজ্যেই এই প্রকল্পটিকে বেসরকারিকরণ করার একটি চক্রান্ত চালাচ্ছে। যে সমস্ত রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে সেখানে এইভাবে বেসরকারিকরণ করার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় রান্নাঘর (Central kitchen)  তৈরি করে স্কুলগুলিতে খাবার সরবরাহ করা হবে। বিজেপি সরকারের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সি আই টি ইউ র নেতৃত্বে মিড ডে মিল কর্মীদের সংগঠন দেশ জুড়ে আন্দোলন করছে। পশ্চিমবঙ্গ মিড ডে মিল কর্মী ইউনিয়ন সি আই টি ইউ , রাজ্যে মিড ডে মিল কর্মীদের স্বার্থের জন্য ক্রমাগত লড়াই করছে। তাই এই বেআইনী ভাব বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে ,২৬ হাজার টাকা বেতন ,কর্মীর স্বীকৃতি,  উৎসবকালীন বোনাসের দাবীতে আগামী ১০ই জুলাই বেলা ১২ টায় শিয়ালদহ স্টেশনে বিক্ষোভ সমাবেশে ও রাজ্য সরকারের কাছে ডেপুটেশনে সামিল হবার জন্য আবেদন করছি।
প্রকাশের তারিখ: ০৪-জুলাই-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org