|
৮ মার্চ - জারি থাকুক দিন বদলের লড়াইMonalisha Sinha |
কেন্দ্রীয় বাজেটে নারী ও শিশু কল্যাণ দপ্তরের মোট বরাদ্দ ০.৫৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.০৫ শতাংশ করা হয়েছে। মেয়েদের কর্মসংস্থানের কোন পরিকল্পনা নেই। এদের পক্ষে নিশ্চয়ই থাকবেন না আপনি |
| ‘যদি পার্শ্বে রাখো মোরে সংকটে সম্পদে সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে’।.... সেই কবে চিত্রাঙ্গদা কবিতায় বিশ্বকবি বলেছিলেন সমানাধিকারের কথা। আজও সে সমানাধিকারের দাবিতে মেয়েদের লড়তে হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। ইতিহাস লড়াইয়ের ক্যালেন্ডারের স্বাভাবিক নিয়মেই এ বছরেও এসেছে ৮ মার্চ । বসন্তের আবহে মেয়েদের লড়াইয়ের গল্প শোনায় এই ৮ মার্চ। যদিও বর্তমানে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসও উদারবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থায় পণ্যে পরিণত হয়েছে। লড়াইয়ের কথা, আন্দোলনের কথা, ভুলিয়ে দিয়ে এই দিনটি যেন এক নিয়ম রক্ষার দিন, যেখানে নারী দিবস উদযাপন মানে মহিলাদের জন্য গয়না, শাড়ি, বিভিন্ন প্রসাধনীতে ছাড় দেওয়া। কিন্তু এই দিনটি তো মেয়েদের লড়াইয়ের কথা বলে, ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতে। ১৮৫৭ সাল নিউইয়র্কের দর্জি মহিলা শ্রমিকরা কাজের ঘন্টা কমানো আর মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গড়ে তুললেন দুর্বার আন্দোলন। তারও আগে ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয়ে গেছে শোষিত মানুষের বঞ্চনার লড়াইয়ের দলিল - কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার। এই ইস্তেহারে মার্কস-এঙ্গেলস তুলে ধরেছিলেন বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর যুগান্তকারী লড়াইয়ের কথা, শোষিত মানুষের মুক্তি-সংগ্রামের কথা। কিন্তু শোষণ মুক্তির এই সংগ্রাম সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ, যারা অনেকটা আকাশ অধিকার করে আছে তাদের বাদ দিয়ে কি করে হবে! মহিলাদের বাদ দিয়ে শ্রেণী বৈষম্যের অবসান ঘটানো কখনোই সম্ভব নয়। মার্কস-এঙ্গেলস-এর উপলব্ধিও ছিল তাই। তাই ১৮৬৪ সালে শ্রমিক শ্রেণীর প্রথম আন্তর্জাতিক মঞ্চেই মার্কস শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের সাথে নারীর অধিকারের বিষয়টিও তুলে ধরেন। সেই প্রথম আন্তর্জাতিকের মঞ্চ থেকেই শ্রমজীবী নারীরা ট্রেড ইউনিয়নের সভ্য হওয়ার অধিকার পান। ১৮৭১ সালে প্যারী কমিউন। প্যারী কমিউনের রাজনৈতিক লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করলেন বহু শ্রমজীবী নারী, প্রাণ দিলেন অসংখ্য মহিলারা। পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো সংগ্রামেই দেখা যায় পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে থেকেছে মহিলারা। প্যারী কমিউন এই সত্য আরো একবার প্রমাণ করলো। প্যারি কমিউনে নারীদের অবদান উল্লেখ করে কাল মার্কস লিখলেন - ‘সেই রক্তিম বিপ্লবী নারীরা মূর্ত হয়ে উঠেছিলেন — প্রাচীন যুগের নারীদের মতোই মহৎ ও নিবেদিতপ্রাণ। প্যারিসের নারীরা ব্যারিকেড আর ফাঁসির মঞ্চে সানন্দে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।’ অধিকার লড়ে নিতে হয় ১৮৮৯ সালে প্যারিস শহরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন দাবি করলেন নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা। এই দাবিতে আলোড়ন উঠলো গোটা বিশ্ব জুড়ে। এই দাবির সমর্থনে এগিয়ে এলেন অসংখ্য মানুষ। ১৯০৭ সাল জার্মানির স্টুর্টগার্ট শহরে ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হলো প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন। ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ - নিউইয়র্কের দর্জি মহিলা শ্রমিকরা ঐতিহাসিক ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯০৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের মহিলা শ্রমিকদের একটি সভায় নারীর ভোটাধিকারের দাবীতে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৯১০ সাল ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন ও আলেকজান্দ্রা কোলনতাই-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে প্রতিবছর একটি দিন পালিত হবে পূর্ণ বয়স্ক নারীর ভোটাধিকার দিবস হিসেবে। তখনকার দিনে নারীর ভোটাধিকার আন্দোলন ছিল এক বিশেষ ঐতিহাসিক আন্দোলন, কারণ তখনও পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল নারীর ভোটাধিকার। তাই এই দাবিতে বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠে নারী আন্দোলন। এরপর ১৯১১ সাল থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত শ্রমজীবী নারীরা মার্চ মাসের বিভিন্ন দিনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করতে থাকেন। অবশেষে স্থির হয় ১৯০৮ এর ৮ মার্চ যেদিন শ্রমিক মহিলারা ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেই দিনটিকেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করা হবে। তারপর থেকে ৮ মার্চ মেয়েদের সংগ্রামের ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা একটি দিন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জও এই দিনটিকে স্বীকৃতি দেয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে। সমাজতন্ত্রই বিকল্প ১৯১৭ সালে সোভিয়েতে বিপ্লব সংঘটিত হলো। বাস্তবায়িত হল নারীর সমানাধিকারের দাবি, নারীর শ্রম রূপান্তরিত হল সামাজিক শ্রমে, বিশ্বের মানুষ দেখল এভাবেও মহিলাদের অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা করা যায়, মেয়েদের স্বপ্ন সার্থক করা যায়। সোভিয়েতের পতন হয়েছে, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক কিউবা আজও লড়ছে নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান,পার্লামেন্টে উল্লেখযোগ্য মহিলা প্রতিনিধিত্ব রক্ষা করছে। লড়ছে অন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও মহিলাদের অধিকারের স্বপক্ষে। সমাজতন্ত্রই তো নারীর প্রকৃত অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে। শ্রেণী বৈষম্যের অবসান ঘটলে তবেই লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান ঘটবে। সমাজে যেদিন থেকে উৎপাদন ব্যবস্থার রাশ মহিলাদের হাত থেকে পুরুষদের হাতে চলে গেল, মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার শুরু হলো। সেদিন থেকেই মহিলাদের পিছিয়ে পড়া শুরু। এঙ্গেলস একে চিহ্নিত করেছিলেন মেয়েদের ‘ঐতিহাসিক পরাজয়’ হিসেবে। সেই ট্র্যাছডিশন সমানে চলেছে আজও। বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়ে নয়া ফ্যাসিবাদের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে মহিলারা। আমাদের দেশ এবং রাজ্যেও প্রসারিত হয়েছে এদের থাবা। ২০২৬ সালেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের সময়ে আবার মেয়েদের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। বহু সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অর্জিত মহিলাদের ভোটাধিকার এ রাজ্যে আজ বিপন্ন। আরএসএস-বিজেপি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশনের নির্লজ্জ ভূমিকায় এসআইআর-এর লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির অজুহাতে যে ৬০ লক্ষ নাম বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে, তার মধ্যে প্রান্তিক মানুষ এবং মহিলাদের সংখ্যাই বেশি। কৌশলে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে প্রান্তিক মানুষ এবং মহিলাদের ভোটাধিকার, লুঠ হচ্ছে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। সেই কবে ১৯০৮ সালে ভোটাধিকারের দাবিতে লড়াই করেছিলেন নিউইয়র্কের দর্জি মহিলা শ্রমিকরা আর আজ বাংলায় লড়ছেন মোস্তারী বানোরা, তাদের ভোটাধিকার রক্ষা করতে। আমাদের গর্ব মোস্তারি বানো আমাদের সহযোদ্ধা, আরএসএস –বিজেপি’র এসআইআরকে হাতিয়ার করে মহিলা এবং প্রান্তিক মানুষের উপর আক্রমণের এজেন্ডাকে এ রাজ্যে বাস্তবায়িত করছে তৃণমূল কংগ্রেস । আসলে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির নামে মানুষকে আতঙ্কে রাখতে চাইছে তৃণমূল এবং বিজেপি, যাতে রুটি রুজির লড়াইকে পিছনে সরিয়ে বাইনারির ছায়াযুদ্ধকেই সামনে রাখা যায়। আর এসব নিয়ে নাটক করছেন মমতা ব্যানার্জি। তাই এই সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে - কার পক্ষে থাকবেন আপনি? যে বিজেপি আপনার ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাইছে তার পক্ষে? বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো যেখানে কখনো মনীষা বল্মিকী, কখনো বিলকিস বানো, কখনো উন্নাওয়ের নির্যাতিতা, কখনো আসিফা, কখনো হাথরাস-এর মতো ঘটনা ঘটছে - যেখানে সংখ্যালঘু, প্রান্তিক এবং মহিলাদের উপর আক্রমণ হচ্ছে অথচ অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না - তাদের পক্ষে? পহেলগাঁওতে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে নিহত ক্যাপ্টেন নরওয়ালের স্ত্রীর স্বামীর মৃতদেহ কোলে নিয়ে থাকার ছবি নিয়ে প্রথমে দরদ দেখালেও যখন স্ত্রী হিমাংশী নরওয়াল বিজেপির বিভাজনের রাজনীতিতে জল ঢেলে আবেদন করলেন - ‘সব কাশ্মীরি মুসলমানরা সন্ত্রাসবাদী নয়, মুসলিমদের আক্রমণ করবেন না’; তখন তার চরিত্র হননে নামে বিজেপি’র আইটি সেল। কদর্য ভাষায় তাকে আক্রমণ করে তারা – ভাবা যায়, সদ্য স্বামী হারানো স্ত্রীর প্রতি কদর্য অশ্লীল মন্তব্য! মনুবাদ, অধীনতা আরএসএস-বিজেপি কৌশলে মনুবাদকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে। মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করছে। দ্রৌপদী মুর্মু রাষ্ট্রপতি হলেও দলিত এবং মহিলা, তাই নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে তিনি ব্রাত্য। মণিপুরে জাতিবিদ্বেষের নামে গণধর্ষণ করে মহিলাদের নগ্ন করে ঘোরানো হয় – প্রধানমন্ত্রী নীরব। দেশে প্রতি ঘন্টায় ৮৬ জন মহিলা ধর্ষিতা হন। এরা হিন্দুত্বের নামে রাজনীতি করে অথচ আদিবাসী দলিত প্রতিদিন অত্যাচারিত হচ্ছে। জাত, ভাষা, বর্ণ, ধর্ম সবকিছু নিয়েই এরাই আক্রমণ করে। আক্রমণ বাড়ছে প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের উপর, মহিলাদের উপর - এর পক্ষে কি থাকবেন আপনি? মহারাষ্ট্রে আখের ক্ষেতের মহিলা শ্রমিকদের জোর করে বন্ধ্যাত্বকরণ করাচ্ছে মালিকরা কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য – বিজেপি’র সরকার নীরব। এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন না? কোন দিক সাথী কোন দিক বল খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসা এই প্রাথমিক চাহিদাগুলো নিয়ে মানুষ যাতে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে তার জন্য বিভাজনের রাজনীতির আশ্রয় নিচ্ছে রাজ্য ও দেশের সরকার। জমি পাহাড় জল জঙ্গল সবকিছু বিক্রি করে দিচ্ছে কর্পোরেটের হাতে, এরাই মুনাফার জন্য পরিবেশকে ধ্বংস করছে। এরা শ্রমকোড, কৃষি আইনের নামে আসলে শ্রমজীবী, কৃষিজীবী প্রান্তিক মানুষের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে, প্রতিবাদ করার অধিকারও কেড়ে নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় বাজেটে নারী ও শিশু কল্যাণ দপ্তরের মোট বরাদ্দ ০.৫৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.০৫ শতাংশ করা হয়েছে। মেয়েদের কর্মসংস্থানের কোন পরিকল্পনা নেই। এদের পক্ষে নিশ্চয়ই থাকবেন না আপনি। তৃণমূলের আমলে তরুণী শিক্ষার্থী চিকিৎসক ধর্ষিতা হয়ে খুন হয়ে যান কিন্তু সেই তিলোত্তমা আজও বিচার পায়নি। বিজেপি’র সাথে বোঝাপড়া করে তৃণমূল মূল অপরাধীদের বাঁচিয়ে দেয়। এদের আমলে প্রতিদিন পাহাড় জঙ্গল সাগর থেকে সুন্দরবন, প্রতিদিন আমার মা-বোনেরা নির্যাতিতা হচ্ছেন অথচ অপরাধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু শাস্তি হচ্ছে না শুধুমাত্র শাসকদলের নেতা কর্মী অথবা তাদের ছত্রছায়ায় থাকার ফলে। এদের পক্ষ নেবেন আপনি? নারী সুরক্ষা আজ শুধু কথার কথা, কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টি আজ ভীষণভাবেই অবহেলিত। নির্দ্বিধায় এ রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রী ফরমান দেন – রাতে মেয়েরা কাজে বেরোতে পারবে না। আসলে মনুবাদের প্রতি আনুগত্য এবং বিজেপি আরএসএস-এর সাথে একইভাবে মহিলাদের পিছিয়ে রাখার কৌশল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রপ্ত করেছেন। পিতৃতান্ত্রিক মানসিককতা জাতীয় ক্রাইমব্যুরো-এর (NCRB) পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজ্যে নারী নির্যাতন বাড়ছে কিন্তু অভিযুক্ত আসামীর শাস্তিদানের হার অত্যন্ত কম - মাত্র ৩.৭ শতাংশ, যা অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশ কম। গণতন্ত্র আজ আক্রান্ত, পঞ্চায়েত নির্বাচনে খুন হলো ছোট্ট তামান্না অথচ তার অপরাধীরা শাসকদলের কর্মী, তাই আজও অধরা। পুলিশ ওবং সাধারণ প্রশাসনের এক বড় অংশ দলদাসে পরিণত হয়েছে। সামনে বিধানসভা নির্বাচন। আবার কোনও তামান্নার মত ফুল অকালেই ঝরে যাক, আমরা কেউই চাই না। রাজ্যে কোনও বয়সের মহিলারাই নিরাপদ নয়, অথচ কন্যাশ্রী-রূপশী’র বিজ্ঞাপনে এখানে আকাশ ঢাকে। ডেবরায় অনাহারে মারা যাচ্ছে শবর, লোধা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। সেখানে পূর্ণিমার চাঁদ সত্যিই ঝলসানো রুটি। আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার কথা আপনি ভাববেন না? রাজ্যের প্রায় ৮ হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাড়ছে মদের দোকান। বাড়ছে স্কুলছুট ছাত্রীর সংখ্যা, বাড়ছে বাল্যবিবাহ, বাড়ছে নারী পাচার, কন্যা শিশু পাচার। গত বছরে রাজ্যে প্রায় ৫৩ হাজার নারী পাচারের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু অভিযোগ দায়ের হয়েছে মাত্র ৬১টি। বাড়ছে অল্প বয়সে মাতৃত্বের সংখ্যা। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী প্রকল্প ঠেকাতে পারছে না এই প্রবণতা। সরকার কি খোঁজ রেখেছে কেমন আছে প্রকল্প প্রাপকরা ? ঋণের জালে মহিলারা মাইক্রোফিনান্স সংস্থাগুলির কাছে ঋণের দায়ে জর্জরিত এ রাজ্যের মহিলারা। কিন্তু সহজ কিস্তিতে ঋণ পাওয়ার জন্য সরকারি কোনও পরিকল্পনা নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো আদানি আম্বানিদের ঋণ দিচ্ছে। ঋণ খেলাপের করলে কিছুদিন বাদে তা মুকুবও করছে। কিন্তু সহজ কিস্তিতে মহিলাদের স্বনর্ভর করার জন্য ঋণ – না! নৈব নৈব চ। কেন দেবে, তারা তো আর ইলেকশন বণ্ড কিনতে পারে না। বাজেট দেখুন, দেখবেন এরই প্রতিচ্ছবি। তাই মাইক্রোফিনান্স কোম্পানির বাড়বাড়ন্ত। ঠিক যেন ‘সারদা রোজভ্যালি’ লুটের পুনরাবৃত্তি। আমরা কি চুপ করে থাকবো? আর কবে কন্ঠ শক্তি পাবে? কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কাজের অধিকার, স্থায়ী কাজের বদলে বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক কাজ। সেই কাজে মজুরি কম কাজের সময় বেশি। পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই মহিলা, তারাও ভালো নেই। প্রতিদিন শোষিত হচ্ছে চা বাগানের মহিলা শ্রমিকরা। সেখানে আজও লড়তে হচ্ছে সমকাজে সমমজুরির জন্য। স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বেহাল দশা। মহিলাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক যেকোনো ইস্যুই দেশ এবং রাজ্য সরকারের কাছে আজ গুরুত্বহীন। তাই বাড়ছে অপুষ্টি, বাড়ছে রক্তাল্পতা। আমাদের রাজ্যেও ৬৯ শতাংশ মহিলা রক্তাল্পতায় ভুগছেন। বাড়ছে প্রসূতি মা-নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা। সমস্ত রকমের দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে রাজ্যে আপনি কাদের পক্ষে থাকবেন? বামপথ নিও চিনে অন্যদিকে রয়েছে বামপন্থীরা, যারা বিকল্পের কথা বলছে। বামপন্থী মতাদর্শই তো মেয়েদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে শেখায়। ৮ মার্চের লড়াইও তো মর্যাদা পেয়েছিল কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের হাত ধরেই। বামফ্রন্ট সরকার মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে পঞ্চায়েত এবং পৌরসভায় আসন সংরক্ষণ করেছিল। লড়াই চলেছে দীর্ঘদিন বিধানসভা এবং লোকসভায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষনের। মনুবাদী বিজেপি সরকার আসন সংরক্ষণ নিয়ে ধোঁকা দিচ্ছে। তাই এই লড়াইও আমাদের জারি রাখতে হচ্ছে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বামফ্রন্ট সরকারই করেছিল। কর্মসংস্থান, কাজের অধিকার বামফ্রন্টের আমলে সুরক্ষিত ছিল। এসএসসি, পিএসসি-এর মাধ্যমে বহু ছেলে-মেয়ে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু তাদের কোনোদিন চাকরি হারানোর ভয় পেতে হয়নি। আগামী দিনেও মহিলাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে আছে আরও অনেক পরিকল্পনা। তাই আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা শপথ নেবো দিন বদলের, ‘এই ফাগুনের বুকের ভেতর আগুন’ জ্বালাবো আমরা মেয়েরা। আর সেই আগুন পৌঁছে দেব সব বুথে বুথে মেয়েদের কাছে। রক্ষা করতে হবে গণতন্ত্র। রক্ষা করতে হবে আমাদের জন্মভূমিতে আমাদের ভোটের অধিকার। জীবন জীবিকার উপর আক্রমণকে প্রতিহত করে গড়ে তুলতে হবে বিকল্পের লড়াই, ‘তাই ঘরে ঘরে ডাক পাঠাই জোট বাঁধো তৈরি হও’। প্রকাশের তারিখ: ০৮-মার্চ-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|