|
আর-এক আরম্ভের জন্যRajat Bandyapadhay |
শিল্প বিপ্লবের ফলে মানুষের মনে হয়েছিল, হয়তো মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা, সামাজিক সম্পর্ক-সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে বিজ্ঞানের বিকাশের ফলে। প্রকৃতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, একা হয়ে যাবে। এই ভাবনাই উপন্যাসটির জন্ম দিয়েছে। |
খোলা মঞ্চে কে যেন গুটিয়ে শুয়ে আছে, পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায়। ধীরে ধীরে ফুটে উঠল আলোছায়ার খেলা। শুনতে পাওয়া গেল হৃদস্পন্দনের মতো শব্দ-লাবডাব। দেখা গেল লাল আলোর কাটাকুটি। ভেসে উঠল গুণ চিহ্ন। মনে হলো, একটা ক্ষেত্র যেন ক্রমশ প্রস্তুত করা হচ্ছে, বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। দুটো জোরালো ফুটলাইট। পর্দায় ফুটে উঠছে মেরুদণ্ডের ছবি। এ্যাক্রোর মধ্য দিয়ে জন্ম নিচ্ছে মানব সদৃশ একটা অবয়ব। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল তার বীভৎস মুখ, দানবের মতো। আমরা দেখলাম পুতুল-দড়ি অন্যের হাতে। জন্মলগ্ন থেকেই। পরিবর্তক-এর প্রযোজনায় শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য পরিচালিত নাটক ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ শুরু হল এভাবেই। আজ থেকে দুশো বছরেরও বেশি আগে মেরি শেলির উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন অর দ্য মর্ডান প্রমিথিউস’ মনে রেখেই এই নাটক। অবশ্যই ভিন্ন প্রেক্ষিতে, ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। উপন্যাসের নায়ক জার্মান গবেষক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন একজন তরুণ বিজ্ঞানী- যিনি মৃত্যুকে অতিক্রম করে জীবনের রহস্যভেদ করতে চেয়েছিলেন। মৃত মানুষের দেহাংশ দিয়ে তৈরি শরীরে প্রাণ সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন মানুষ। কিন্তু দেখা গেল, সৃষ্টি হয়েছে এক বীভৎস দানব। দেখতে কুৎসিত। তাকে দেখে সবাই ভয় পায়। এমনকি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নিজেও। তিনিও তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করেন, কারণ তিনি তো দানব তৈরি করতে চাননি, মানব সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করতে চান। দানবটি ক্রুদ্ধ হয় সে দায়ী করে তার স্রষ্টা। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন মারা যান, তাঁর সৃষ্ট দানবকে আর দেখা যায় না। আসলে শিল্প বিপ্লবের ফলে মানুষের মনে হয়েছিল, হয়তো মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা, সামাজিক সম্পর্ক-সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে বিজ্ঞানের বিকাশের ফলে। প্রকৃতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, একা হয়ে যাবে। এই ভাবনাই উপন্যাসটির জন্ম দিয়েছে। আজ যখন এই উপন্যাসকে স্মরণে রেখে প্রযোজিত হচ্ছে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নাটক- তখন অন্য-এক সময়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি উন্নততর পর্যায়ে। অভাবনীর তার অগ্রগমন। দুটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এসেও এখনও মানবসভ্যতা বিপন্ন। যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যালেস্তাইন। আক্রান্ত মানুষের অধিকার। মানুষে মানুষে বিভেদের ছায়াপাত। কৃত্রিম বা যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগে এক নতুন সংকটের মুখোমুখি আমরা। সৃষ্টির জগতেও তার হানাদারি নিত্যনতুন দ্বন্দ্বের মধ্যে আমাদের নিক্ষেপ করছে। বৃহৎ পুঁজির বিশ্বব্যবস্থায় সমাজ-রাজনীতি-পরিবার সর্বত্র মানুষ থাকছে, কিন্তু মানসিক সংযুক্তি থাকছে না। মানুষের মধ্যে সম্পর্কের টান ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে। মানুষকে দিশাহীন, অনির্দিষ্ট, একক করে তোলার অবিরাম প্রচেষ্টা চলছে। এইরকম এক বিধ্বস্ত সময়ে এই নাটকের প্রযোজনা। সৃষ্ট দানব একা। সে কাঁদে। সে বলে, আমি কে? এই প্রশ্ন তো চিরকালীন। তার প্রশ্ন, সবাই কেন সমান সুযোগ পাবে না? এই ধরনের প্রক্ষিপ্ত সংলাপ দিয়ে সময়কে ধরার চেষ্টা হয়েছে। অন্যরা তাকে এড়িয়ে চলে। শুধু যিনি চোখে দেখেন না সেই বৃদ্ধ ছাড়া। তাঁর পুত্র-পুত্রবধূ খাবার দিয়ে যায়, পর্দায় ফুটে ওঠে খেতের ছবি। গান শোনা যায়-হাম ভূখসে মরণেওয়ালে...। এক ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়। দানব বৃদ্ধের কাছে আসে। অভিজ্ঞ বৃদ্ধ যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছেন। অনির্দিষ্ট তাঁর ঠিকানা। যুদ্ধ তো তাঁর দৃষ্টিহ কেড়ে নিয়েছে। তিনি দানবকে দেখতে পান না, তাই তার সঙ্গে স্বাভাবিক তাঁর ব্যবহার। তিনি তাকে পড়ান-আর দানব হাঁটে প্রান্তদেশে। সে কি প্রান্তিক? তার প্রশ্ন, যুদ্ধে গিয়েছিলে? কোথা থেকে এলে? ঈশ্বরে বিশ্বাস কর? বৃদ্ধ যুক্তির কথা বলেন। দানবের প্রশ্ন, কেন খিদে পায়? কেন খাবার নেই। বৃদ্ধের উত্তরসুরিরা তাকে দেখে পালিয়ে যায়, অথচ তারাই ফসল ফলাবে। তার ইঙ্গিত পর্দায় ফুটে ওঠে। বৃদ্ধ ভালোবাসার কথা বলেন, দানব খিদের কথা বলে- বৃদ্ধ পড়ার কথা বলেন, দানব যুদ্ধের কথা বলে, প্রশ্ন তোলে। বৃদ্ধ তো চোখে দেখেন না, তাহলে কি করে বোঝেন অন্ধকার নামছে? পেঁচারা অন্ধকার নামিয়ে আনে? তাৎপর্যপূর্ণ এই প্রশ্ন। আমরা নিজেদের মুখোমুখি হই। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বোন মারা যায়। সেটা দুর্ঘটনা, দানব তাকে মারেনি। কিন্তু সকলে তাকেই দায়ী করে। তার চেহারার জন্য? তার অবস্থানের জন্য? মৃত উইলির হাতে ধরা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ডায়ারির পাতা খুঁজে পাওয়া যায়। দানব তা যদি পড়ে! ভয় পায় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। দানবের জন্য সে নারী সৃষ্টি করতে চায় যাতে দানব ভালোবাসা পায়, ভালো থাকে। কিন্তু তাকে সে নিজেই ধ্বংস করে। দানব ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে- স্রষ্টা তার ভালো চায় না, সে প্রতিশোধ নেয়, স্রষ্টার প্রেয়সীকে হত্যা করে। দানব ভাবে, সে-ও তো ভালোবাসার যোগ্য। পাখিরা ওড়ে, বাসা বাঁধে। দানবের মনে হয়, তাকে যারা বানিয়েছে তারা তা জানে। ভিতরের ভালোবাসা বাইরের ভালোবাসাকে যেন স্পর্শ করে। কিন্তু পুতুল-দড়ি তো অন্যের হাতে। সবশেষে আমরা দেখি, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত দানব স্রষ্টাকে কাঁধে নিয়ে পাহাড় পেরিয়ে যেন চলে যাচ্ছে 'অন্য কোথা, অন্য কোনখানে'। যেন এমন এক পৃথিবীতে যেতে হবে যেখানে সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে বৈপরীত্য থাকবে না। স্রষ্টা থাকবে স্বাধীন, সৃষ্টিও মুক্ত। সবাই ভালোবাসুক, স্বাধীন থাকুক, শান্তিতে থাকুক। এদি পিয়াফ-এর কণ্ঠে সংগীতের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে প্রেক্ষাগৃহে যার বার্তা-অতীতের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হও, স্বাধীন হও আর-এক আরম্ভের জন্য। মঞ্চে তখন উচ্ছল শিশুদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি নতুন সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। দানবের ভূমিকায় জয়রাজ ভট্টাচার্য সম্ভবত তাঁর এযাবৎ করা শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের নিদর্শন রাখলেন। অনবদ্য তাঁর শরীরী অভিনয়। আর বৃদ্ধ, যিনি মঞ্চ ও দর্শকের মধ্যে সেতু হয়ে ওঠেন তাঁর অভিনয়ও অনন্য। এককথায়, দলগত অভিনয় চমৎকার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে আবিষ্ট করে রাখে এই প্রযোজনা। তবে, কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে হয়। দানবের জন্মমুহূর্তে প্রজেকশন কি অত্যন্ত জরুরি ছিল? অভিনেতার দেহের ভাষাই তো যথেষ্ট বলে মনে হয়েছে। আর শুরুতে দুটো জোরালো হলুদ ফুটলাইট মঞ্চের নিচের দু-কোণের ফুটলাইটের বিপরীত এফেক্ট? যদি অভিনয়ের সময়ে থাকে, সামনে-বসা দর্শকের সমস্যা হয়। লেস-এর পশ্চাদপট ও ঘড়ির মোটিফ নিঃসন্দেহে অর্থবহ, কিন্তু বিরতির পরে যে নৃত্যের কোরিওগ্রাফ তার কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? আর ‘উত্তর দিক’-এর কথা যা সংলাপে এসেছে তার তাৎপর্য বোঝা গেল না, অস্পষ্টতা রয়েই গেল। এইসব প্রশ্ন তুলেও বলতে হয় যে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নিঃসন্দেহে এই সময়ের এক উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা। পরিচালককে অভিনন্দন। প্রকাশের তারিখ: ১৩-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|