|
ভারতের ক্রীড়ানীতি: একটি ধারাবাহিক ইতিহাস (ষষ্ঠ পর্ব)Sumit Gangopadhyay |
দূরদর্শনের রঙিন সম্প্রচার, সরাসরি ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা এবং বিজ্ঞাপননির্ভর আয় ক্রিকেটকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। ফুটবল বা হকির মতো খেলাগুলি এই মিডিয়া কাঠামোর সঙ্গে সমানভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি। ফলে দর্শকসংখ্যা, স্পনসরশিপ ও প্রশাসনিক গুরুত্বের বিচারে ক্রিকেট একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। |
১৯৮০ থেকে ১৯৯৬—এই দেড় দশকেরও কিছু বেশি সময়কে ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে একটি গভীর রূপান্তরের পর্ব হিসেবে দেখা যায়। এটি ছিল রাষ্ট্রনির্ভর ক্রীড়া ব্যবস্থার শেষ পর্যায়, ধীরে ধীরে বাজার ও গণমাধ্যমের প্রবেশ, এবং একই সঙ্গে বহু ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার অবক্ষয় ও কিছু নির্বাচিত খেলায় আংশিক উত্থানের যুগ। এই সময়কালকে বোঝার জন্য কেবল পদকসংখ্যা বা ম্যাচজয়ের হিসাব যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রের নীতি, মধ্যবিত্ত সমাজের বিস্তার, টেলিভিশনের আগমন এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতের অবস্থানকে একত্রে বিচার করা প্রয়োজন। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ভারতীয় ক্রীড়া কাঠামো মূলত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে ক্রীড়াকে জাতীয় মর্যাদা ও শারীরিক সক্ষমতা গঠনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবে তা ছিল সীমিত অর্থায়ন, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্বল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আবদ্ধ। এই দশকের প্রথম ভাগে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। যার শাসনামলে রাষ্ট্রের সর্বব্যাপী ভূমিকা ক্রীড়াক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়। ক্রীড়া সংস্থাগুলি কার্যত সরকারি অনুদান ও প্রশাসনিক অনুমতির উপর নির্ভরশীল ছিল; বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল সীমিত ও অনিয়মিত। ক্রীড়াবিদদের প্রশিক্ষণ, খাদ্য, চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট ছিল, যার প্রভাব অলিম্পিক ও বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় বারবার ধরা পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমস একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধুমাত্র ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল ভারতের রাষ্ট্রীয় আত্মপ্রদর্শনের এক প্রকল্প। নতুন স্টেডিয়াম, অবকাঠামো, সম্প্রচার ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ভারত নিজেকে এশীয় ক্রীড়া মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। গেমসের সাফল্য আংশিকভাবে সেই লক্ষ্য পূরণ করলেও, এর উত্তরাধিকার ছিল দ্বিমুখী। একদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ক্রীড়া প্রশাসনের অভিজ্ঞতা বাড়ে, অন্যদিকে গেমস-পরবর্তী সময়ে সেই অবকাঠামো ও পরিকল্পনার ধারাবাহিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া উন্নয়নের বদলে একটি এককালীন প্রদর্শনী হিসেবেই বেশি থেকে যায়। ১৯৮০-এর দশকে সরকারি নীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘এলিট ক্রীড়া’ বনাম ‘গণক্রীড়া’র দ্বন্দ্ব। রাষ্ট্র মূলত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সম্মান অর্জনের দিকে নজর দিলেও, তৃণমূল স্তরে ক্রীড়া বিস্তারের জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, তা অনুপস্থিত ছিল। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলা ধীরে ধীরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে কোণঠাসা হতে থাকে। এর ফল হিসেবে প্রতিভা চিহ্নিতকরণ ও ধারাবাহিক উন্নয়নের শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা বিশেষভাবে ফুটবল ও হকির মতো দলগত খেলায় স্পষ্ট হয়, যেখানে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক কৌশলগত অভিযোজন অপরিহার্য। এই সময়ে ক্রিকেট ধীরে ধীরে অন্য সব খেলাকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করে। ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয় ছিল এই প্রক্রিয়ার এক ঐতিহাসিক মোড়। যদিও এখানে আলাদা করে ম্যাচ বা খেলোয়াড়ের বিশ্লেষণ করা হচ্ছে না, তবু এটুকু বলা যায় যে এই সাফল্য ক্রিকেটকে জাতীয় কল্পনায় এক বিশেষ স্থানে বসিয়ে দেয়। বিসিসিআইয়ের প্রশাসনিক কাঠামো, তুলনামূলকভাবে বেশি স্বায়ত্তশাসন এবং কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকদের আগ্রহ ক্রিকেটকে দ্রুত পেশাদার ও বাণিজ্যিক পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ঘরোয়া লিগ, বিজ্ঞাপন ও খেলোয়াড়দের আয়—সবকিছুতেই এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়, যা অন্য খেলাগুলির নাগালের বাইরে থেকে যায়। এই ক্রিকেটীয় উত্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল টেলিভিশনের বিস্তার। দূরদর্শনের রঙিন সম্প্রচার, সরাসরি ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা এবং বিজ্ঞাপননির্ভর আয় ক্রিকেটকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। ফুটবল বা হকির মতো খেলাগুলি এই মিডিয়া কাঠামোর সঙ্গে সমানভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি। ফলে দর্শকসংখ্যা, স্পনসরশিপ ও প্রশাসনিক গুরুত্বের বিচারে ক্রিকেট একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। এই বাজার দখল কেবল জনপ্রিয়তার প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল সম্পদের পুনর্বণ্টন, যেখানে রাষ্ট্র ও বাজার উভয়েই ক্রিকেটকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে। ফুটবলের ক্ষেত্রে ১৯৮০ থেকে ১৯৯৬ ছিল স্পষ্ট পতনের সময়। স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে ফুটবল, বিশেষ করে পূর্ব ভারতের শহরগুলিতে, একটি শক্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু এই সময়ে জাতীয় স্তরে পেশাদার লিগের অভাব, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থতা ফুটবলকে পিছিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণের সুযোগ কমে যায়, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়িত হয় না, এবং তরুণ প্রতিভারা ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে ফুটবল ধীরে ধীরে এক প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়, যেখানে আবেগ ও ঐতিহ্য থাকলেও কাঠামোগত শক্তি অনুপস্থিত। হকির গল্প ছিল আরও বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর ভারতের সবচেয়ে সফল অলিম্পিক খেলাটি ১৯৮০-এর দশকে এসে তার গৌরব হারাতে শুরু করে। অ্যাস্ট্রোটার্ফের যুগে অভিযোজনের অভাব, প্রশাসনিক কোন্দল এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতির ঘাটতি ভারতীয় হকিকে পিছিয়ে দেয়। কিছু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সাফল্য সত্ত্বেও, তা ছিল বিচ্ছিন্ন ও অস্থায়ী। এই সময়ে হকি আর জাতীয় গর্বের অবিসংবাদিত প্রতীক রইল না; বরং তা হয়ে উঠল ‘হারানো গৌরব’-এর স্মারক। অলিম্পিক ক্ষেত্রে ১৯৮০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ভারতের অবস্থান মূলত সীমিত সাফল্য ও বারবার ব্যর্থতার মিশ্রণ। পদকসংখ্যা কম ছিল, এবং যে কয়েকটি সাফল্য এসেছে, সেগুলি প্রায়ই ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, কোনও সুসংহত জাতীয় ক্রীড়ানীতির ফল হিসেবে নয়। ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে ভারত হকিতে সোনা পায়। এরপর থেকে ৯২ পর্যন্ত অলিম্পিকে ভারতের কোন সাফল্য আসেনি পদক হীন ভাবে ভারতকে ফিরতে হয়েছিল। ৯৬ সালের লিয়েন্ডার পেজের ব্রোঞ্জ পাওয়া অলিম্পিকে ভারতের নতুন করে এক যাত্রা সূচনা ঘটায়। ![]() ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বেসরকারি উদ্যোগ ধীরে ধীরে ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রবেশ করতে শুরু করে, যদিও তা ছিল অসম ও নির্বাচনী। ক্রিকেটে কর্পোরেট স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপন দ্রুত বাড়লেও, ফুটবল, হকি বা অ্যাথলেটিক্সে সেই প্রবাহ পৌঁছায়নি। রাষ্ট্রও এই সময়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল—একদিকে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপে বেসরকারি অংশগ্রহণ মেনে নেওয়া। এই দ্বৈততা ক্রীড়ানীতিকে অস্পষ্ট ও খণ্ডিত করে তোলে। ১৯৮৪-এর পর রাজীব গান্ধীর শাসনামলে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ভাষা রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রবেশ করলেও, ক্রীড়াক্ষেত্রে তার প্রভাব সীমিত ছিল। কিছু প্রশাসনিক সংস্কার ও যুব কার্যক্রমের কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া উন্নয়নের কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের আগে পর্যন্ত ক্রীড়া মূলত রাষ্ট্রনির্ভর ও খণ্ডিত বাজারের মধ্যে আটকে ছিল। ক্রিকেট বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য স্থাপন করে, ফুটবল ও হকি ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কাঠামোগত দুর্বলতায় পিছিয়ে পড়ে, অলিম্পিক সাফল্য সীমিত থাকে, এবং রাষ্ট্র ও বাজারের টানাপোড়েনে একটি সুসংহত জাতীয় ক্রীড়ানীতি গড়ে ওঠে না। এই সময়কালকে তাই কেবল ব্যর্থতার ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং পরবর্তী দশকের রূপান্তরের ভূমি প্রস্তুতকারী এক অন্তর্বর্তী পর্ব হিসেবে দেখা উচিত। শুধু ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করলেই বেসরকারীকরণের এবং ক্রিকেটের দাপটের ধারাটা ধরা পড়বে। ১৯৫৯ সালে ভারতে টিভি সম্প্রচার শুরু হয়। ক্রমে বড় শহরের উচ্চবিত্ত মহলে টিভি প্রবেশ করে ষাটের দশকে। ১৯৬৬ সালে ভারতে প্রথম টিভিতে ক্রিকেট দেখানো শুরু হয়। তবে ১৯৭০ এর আগে টিভি খুবই কম মধ্যবিত্ত পরবারের অংশ হয়। ঘটনাচক্রে ভারতের একটা বড় অংশের মানুষ যুগপৎ টিভি ও ক্রিকেটের প্রতি আকৃষ্ট হন ১৯৮৩ সালে ভারতের বিশ্বজয়ের পরে। তখন ভারত ছিল নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির দেশ। ভয়ঙ্কর আমলাতান্ত্রিক ও গতানুতিগকভাবে কাজ হতো। একদিকে ধীরে চলো নীতি ও অন্যদিকে লাইসেন্স রাজ। ভারতীয় পুঁজিপতিরা নিশ্চিত বাজারের জন্য রাজনৈতীক নেতা, দল ও সরকারের সঙ্গে আঁতাত তৈরী করতো। তাঁর সঙ্গে ছিল সোভিয়েত মডেল ঘেঁষা প্ল্যানিং কমিশন। ফলে আক্ষরিক অর্থে টিভি ভারতে জনপ্রিয় হতে সময় নিয়েছে অনেক বেশি। আগামীকাল সপ্তম পর্ব থাকবেঃ ঝাপসা সাদা–কালো পর্দা, এক ক্যামেরার ক্রিকেট, মাঝখানে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ—এই বাস্তবতা থেকেই নব্বইয়ের শুরুতে ভারত ঢুকে পড়ে কেবল, বেসরকারি চ্যানেল আর সম্প্রচারস্বত্বের যুদ্ধে। সোভিয়েত পতন থেকে ভারতের মুক্তবাজার—বিশ্ব রাজনীতির টালমাটাল সময়ে টেলিভিশন আর ক্রিকেট মিলিয়ে তৈরি হয় এক নতুন সাংস্কৃতিক অর্থনীতি। হিরো কাপের সম্প্রচার লড়াই, সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়, আর শচীন তেন্ডুলকরের ব্যাট—সব মিলিয়ে ক্রিকেট হয়ে ওঠে নয়া উদারবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম। এই অংশটি সেই সন্ধিক্ষণের গল্প, যেখানে টিভি ভারতকে বদলায়, আর ক্রিকেট হয়ে ওঠে বাজারের রাজা। ![]() প্রকাশের তারিখ: ০১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|