|
সাম্রাজ্যবাদ, তেলের দাম এবং বিশ্ব অর্থনীতিPrabhat Patnaik |
ইরান মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে শুধু ইরানের নয়, বেশ কয়েকটি দেশের তেল যায় — যার মোট পরিমাণ রাশিয়ার মোট উৎপাদনের প্রায় দ্বিগুণ। |
এই সপ্তাহান্তে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অবশেষে প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, এমনকি ১১০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। ইরানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরুর আগে দাম ছিল প্রায় ৬৯ ডলার প্রতি ব্যারেল। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সত্যিকারের তেলের সংকট নয়, বরং এই সংকট হতে পারে — এই আশঙ্কা থেকেই বাজারে এই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি আগের ঘটনাগুলো থেকে আলাদা। ১৯৭৩ সালে ওপেক নিজেরা তেলের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল, সেখানে কোনো সরবরাহ সংকট ছিল না। ২০০৮ সালে চিনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং নাইজেরিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে দাম বেড়েছিল, যা স্বভাবতই বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার উপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দাম বেড়েছিল, কিন্তু রাশিয়া বিকল্প পথে রপ্তানি অব্যাহত রাখে এবং মার্কিন শক্তি ইউরোপের বাজারে রাশিয়ার জায়গা নেয় — ফলে সেই বৃদ্ধিও বেশিদিন টেকেনি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আলাদা। ইরান মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে শুধু ইরানের নয়, বেশ কয়েকটি দেশের তেল যায় — যার মোট পরিমাণ রাশিয়ার মোট উৎপাদনের প্রায় দ্বিগুণ। এই যুদ্ধের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না, তাই দাম বৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। উপরন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মূল্যবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, বলছেন যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণের জন্য এটা ‘সামান্য মূল্য’। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে বেশী থাকলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। শুধু জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়বে তাই নয়, তেল যেসব পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেগুলোর দামও বাড়বে। যেমন সার তৈরিতে তেল লাগে, সারের দাম বাড়লে খাদ্যশস্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে, ফলে খাদ্যের দামও বাড়বে — যদি উৎপাদকের মুনাফা অপরিবর্তিত রাখতে হয়। তার উপর সব পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়বে, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতিকে আরও ঠেলে দেবে উপরে। দ্বিতীয়ত, মন্দা আসবে। যারা তেলের বাড়তি দাম থেকে লাভবান হচ্ছেন, তারা সেই বাড়তি আয় ব্যাংকে জমা রাখবেন — যা সরাসরি পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা তৈরি করে না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির শিকার মানুষ তাদের মোট ক্রয়ক্ষমতা কমাতে বাধ্য হবেন। ফলে বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক চাহিদা কমবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেবে। এটি লক্ষণীয় যে তেলের দাম বৃদ্ধি যদি উৎপাদকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে হয় (সরবরাহ সংকটের কারণে নয়), তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সরকার রাজস্ব ও আর্থিক নীতিতে সম্প্রসারণমূলক পদক্ষেপ নিয়ে চাহিদা ধরে রাখতে পারে। কিন্তু যখন সরবরাহই কমে যায়, তখন সেই পথ বন্ধ। তখন মন্দা শুধু অনিবার্য নয়, সরবরাহ সংকট কাটানোর একটি উপায় হিসেবেও মন্দাকে দেখা হয়। কাজেই এই পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দা — দুটোই একসাথে আসবে। দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য আরও বড় বিসিত তেলের দাম বৃদ্ধিতে সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর — অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোর — জন্য সমস্যা আরও গভীর। তেলের দাম বাড়লে তেল আমদানিকারক সব দেশেরই লেনদেন ঘাটতি বাড়বে। উত্তরের ধনী দেশগুলো সাধারণত এই ঘাটতি ঋণ নিয়ে সামলাতে পারে, কারণ বিদেশি ব্যাংক বা আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে তাদের ঋণযোগ্যতা স্বীকৃত। কিন্তু দক্ষিণের দেশগুলো সেই বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক সময় পায় না। ফলে তাদের মুদ্রার মান পড়ে যাবে, তারা বিদেশি ঋণ নিতে বাধ্য হবে অত্যন্ত কঠিন শর্তে — কঠোর "কৃচ্ছ্রসাধন" নীতি মেনে, বা খনিজ সম্পদ বন্ধক রেখে। মুদ্রার মান পড়লে সব আমদানিপণ্যের দাম বাড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি হবে আরও তীব্র। আবার বিদেশি ঋণদাতাদের চাপানো কৃচ্ছ্রনীতির কারণে দেশীয় চাহিদা আরও কমবে, মন্দা হবে আরও গভীর। এইভাবে এই দেশগুলোর সাধারণ মানুষের কষ্ট হবে সবচেয়ে বেশি। তাই এই দেশগুলোর জন্য মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন জরুরি প্রয়োজন — নৈতিক কারণে যেমন, নিজেদের স্বার্থেও তেমনই। ভারতের জন্য বিশেষ বিপদ ভারত এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যে তেল যায়, তার প্রায় ৮৪ শতাংশ যায় চিন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার দেশগুলোতে। প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের বাজারে দাম বাড়বে এবং বিনিময় হারও প্রভাবিত হবে — তার উপর এই দেশগুলোতে সময়মতো তেলের শারীরিক সরবরাহও বিঘ্নিত হবে। ট্রাম্প ভারতকে ‘অনুমতি’ দিয়েছেন রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে, যাতে উঁচু তেলের দামের প্রভাব কিছুটা এড়ানো যায়। কিন্তু এই ‘অনুমতি’ মাত্র এক মাসের জন্য। স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও যে দেশকে নিজের পছন্দের দেশ থেকে তেল কিনতে অন্য একটি দেশের ‘অনুমতি’ নিতে হচ্ছে — এটা আমাদের ঔপনিবেশিক-বিরোধী সংগ্রামের প্রতি চরম অবমাননা। আর এই ‘অনুমতি’-কে চুপচাপ মেনে নেওয়া — ট্রাম্পকে যোগ্য জবাব না দিয়ে — এটা আরও বড় লজ্জার। এক মাস পরে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারত নীরব থাকলে সেটা হবে ভারতের নিজের জন্যই আত্মঘাতী। ইরানের কৌশল এবং বৃহত্তর প্রসঙ্গ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব তেলের বাজারে ঝাঁকুনি দেওয়ার মাধ্যমে ইরান আসলে দক্ষিণের দেশগুলোকে একটি বার্তা দিতে চাইছে: ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আসলে তোমাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ। তোমরা নিরপেক্ষ থাকতে পারো না। ইরানের সামরিক নেতারা মনে করছেন তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে — যা হবে বিশ্বের মানুষের জন্য, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের মানুষের জন্য, একেবারে মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি — যদি না তারা দ্রুত এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রুখতে এগিয়ে আসে। এখন নীরব থাকলে আরও ভয়ঙ্কর বিপদ আসতে পারে। যুদ্ধের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও মন্দা দেখা দিলে ট্রাম্প ভেতরে জনরোষের মুখে পড়বেন। যুদ্ধ এমনিতেই সেদেশে জনপ্রিয় নয়। সেই পরিস্থিতিতে যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করতে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র’ ব্যবহারের পথে যেতে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। সুপরিচিত মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেমস গ্যালব্রেইথ উল্লেখ করেছেন যে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ পরামর্শের কারণে সেই বিপর্যয় থেকে বিরত হয়েছিল। যদি বিশ্ব এখনই দৃঢ়ভাবে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায়, এই যুদ্ধের স্পষ্ট বিরোধিতা না করে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি মার্কিন অবজ্ঞার নিন্দা না জানায়, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সেই ভয়াবহ সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হতে পারে। প্রকাশিতঃ পিপলস্ ডেমোক্র্যাসী ০৯-১৫ মার্চ ২০২৬ প্রকাশের তারিখ: ১৫-মার্চ-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|