সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের উপর আমেরিকার দাদাগিরি

Prabhat Patnaik
যখন ভারত স্বনির্ভর অর্থনীতি ও জোট নিরপেক্ষ নীতি মানত, তখন আমেরিকার দাদাগিরির সামনে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু নয়া উদারবাদী অর্থনীতি (neoliberalism)-তে হল উল্টো, এতে স্বনির্ভরতা বাদ দিয়ে বিদেশি পুঁজিকে আমন্ত্রণ জানানো হয় (‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র মতো উদ্যোগে)। ফলে দেশ আরও নির্ভরশীল হয় এবং সহজে চাপে পড়ে।

ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ব্রিটিশ শাসনের উপর বিজয়ের ৭৮ বছর পর এখন আমেরিকা খোলাখুলিভাবে ভারতকে চাপ দিয়ে তাদের নির্দেশ মেনে চলতে বলছে। সাম্রাজ্যবাদ সবসময়ই দুর্বল দেশগুলিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। স্বাধীনতার পর এই প্রথম নয় যে আমেরিকা ভারতকে এমন চাপ দিচ্ছে - আগেও বহুবার দিয়েছে। তবে এবারের চাপ দেওয়ার ধরণ কিছুটা আলাদা।

প্রথমত, আগে তারা বলতো - “তুমি যদি আমাদের কথাটা মানো, তাহলে তোমারই উপকার হবে”। কিন্তু এবার তারা সরাসরি বলছে -“তুমি আমাদের স্বার্থে এই কাজ করো, না হলে আমরা তোমাকে শাস্তি দেব”।

দ্বিতীয়ত, আগে ভারত সরকার দৃঢ়ভাবে এর প্রতিবাদ করত। কিন্তু এবারে সরকার পরিষ্কার ভাবে বিরোধিতা না করে, একদিকে সমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে বিরোধিতার সুরও শোনা যাচ্ছে - যাকে লেখক বলেছেন “মিশ্র সংকেত”।

এবার এই চাপ আসছে মূলত অর্থনৈতিক শাস্তির হুমকি আকারে। ভারতের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (sanctions) বা অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা আরোপ করতে পারে, যদি ভারত আমেরিকার চাহিদা না মেনে চলে। আগে, ‘কোল্ড-ওয়ার’ চলাকালীন সময় বা অন্য সময়ে, এ ধরনের চাপ তুলনামূলক ভাবে একটু প্রচ্ছন্নভাবে দিত- এখন তা একেবারে প্রকাশ্যে দেওয়া হচ্ছে।

ভারতের বর্তমান সরকার একদিকে বিদেশে বলছে- “আমরা স্বাধীন নীতি মেনে চলি”, কিন্তু অন্যদিকে আমেরিকার চাপ নিয়ে দেশে স্পষ্ট বিরোধিতা করছে না। এমনকি সরকার অনেক সময় নীরব থেকেও পরোক্ষভাবে আমেরিকার পক্ষে যাচ্ছে।

এ এক খুবই বিপজ্জনক প্রবণতা, কারণ যদি সরকার দৃঢ়ভাবে আত্মনির্ভরতার নীতি না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আরও দুর্বল হবে।

এবার আমেরিকার চাপের কারণ মূলত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একধরনের নতুন শিবির-রাজনীতি চলছে- যেখানে আমেরিকা চেষ্টা করছে যত বেশি সম্ভব দেশকে তাদের পাশে আনা যায়, বিশেষ করে যেসব দেশ ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো মিত্রশক্তির প্রভাবের বাইরে বা স্বাধীন নীতি অনুসরণ করে।

ভারত বর্তমানে কিছু বিষয়ে আমেরিকার সাথে একমত নয়, যেমন- রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে। আমেরিকা চাইছে ভারত সরাসরি তাদের কৌশলগত ব্লকে যোগ দিক এবং রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা সীমিত করুক। এই চাপ শুধু কূটনৈতিকভাবে নয়, বরং বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত ক্ষেত্রেও আসছে।

আমেরিকার এমন আচরণের মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতের ‘নীতি স্বাধীনতা’ বা policy autonomy কে সীমিত করা। অর্থাৎ ভারত যাতে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত না নিয়ে, বরং আমেরিকার ইচ্ছামতো চলে।

ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী একদিকে জাতীয়তাবাদের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে এতটা প্রাধান্য দিচ্ছে যে ভারতের সার্বভৌম নীতি স্থির করার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণ- কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ভারত এমনভাবে ভোট দিচ্ছে বা এমন বিবৃতি দিচ্ছে যা আগে দিত না, শুধু আমেরিকার সাথে সম্পর্ক খারাপ না হওয়ার জন্য।

আশঙ্কা হয়, ভারত ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় চলে যাবে যেখানে আমেরিকার চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ও ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃঢ় সমর্থনের কারণে ভারত স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তার জোট নিরপেক্ষ নীতির (non-alignment) পথ ও স্বনির্ভর অর্থনীতির নীতি বজায় রাখে। তখন পাবলিক সেক্টরকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি (মহানগরভিত্তিক) পুঁজির দাপট রুখতে চেষ্টা করা হয়। বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও ভারত তার নীতি থেকে পিছু হটেনি।

১৯৫০-এর দশকের শেষে, মার্কিন নেতা ডালাস মারা যাওয়ার পর, আমেরিকা নিজেদের মনোভাব কিছুটা বদলায়। তারা বুঝতে পারে যে ভারতকে উপেক্ষা করলে উল্টো তার উপরে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বাড়ছে। এরপর প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের ভারত সফরের পর বিশ্বব্যাংক মারফৎ কিছু ঋণ আসে, যদিও সেসবই ছিল পরিকাঠামো প্রকল্পের জন্য।

বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় দাদাগিরি

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের হস্তক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরক্ত হয়, কারণ এতে তাদের অঞ্চলটিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নষ্ট হয়। এতটাই রেগে গিয়েছিল যে, তারা তাদের যুদ্ধ-জাহাজ ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ পাঠায় বঙ্গোপসাগরে, ভারতকে ভয় দেখাতে। কিন্তু ভারত ভয় পায়নি এবং বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিল।

ট্রাম্পের বর্তমান চাপ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে চাপ দিচ্ছে, তা মূলত দুটো বিষয়ে—

  1. শুল্ক (tariff): ১ আগস্টের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় এখন থেকে ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকায় ২৫% শুল্ক বসবে।
  2. রাশিয়ার তেল কেনা: রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনা নিয়ে আমেরিকা বিরক্ত, কারণ এটা পশ্চিমা দেশগুলোর একতরফা নিষেধাজ্ঞার (sanction) বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

এছাড়া ট্রাম্প ব্রিকস (BRICS) নিয়ে চাপ দিচ্ছে, যাতে ভারত হয় সংগঠন ত্যাগ করে, নাহয় আমেরিকার স্বার্থে ভেতর থেকে কাজ করে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি ইস্যু হলো রুশ তেল কেনা। ভারত কখনও বলে কেনা বন্ধ করবে, আবার কখনও বলে চালিয়ে যাবে - এই দ্বিধা দেখায় যে সরকার হয়তো শেষে আমেরিকার চাপে নতি স্বীকার করবে।

এতে ভারতের ক্ষতি কেন?

রাশিয়া থেকে আমদানী করা তেল, অন্যান্য মার্কিন অনুমোদিত উৎসের তুলনায় সস্তা। তাই রুশ তেল বন্ধ করতে চাপ দেওয়া মানে ভারতকে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করাতে বাধ্য করা।

এগুলো জাতিসংঘের নিষেধ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি ধনী দেশের নিজের ইচ্ছায় জারি করা নিষেধাজ্ঞা—যেমন কিউবা, ইরান বা ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করেছে। এভাবে জোর করে মানাতে বাধ্য করা সরাসরি সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থসিদ্ধি।

যখন ভারত স্বনির্ভর অর্থনীতি ও জোট নিরপেক্ষ নীতি মানত, তখন আমেরিকার দাদাগিরির সামনে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু নয়া উদারবাদী অর্থনীতি (neoliberalism)-তে হল উল্টো, এতে স্বনির্ভরতা বাদ দিয়ে বিদেশি পুঁজিকে আমন্ত্রণ জানানো হয় (‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র মতো উদ্যোগে)। ফলে দেশ আরও নির্ভরশীল হয় এবং সহজে চাপে পড়ে।

শুরুতে বলা হয়েছিল, নব্যউদার অর্থনীতি নাকি চিরস্থায়ী হবে, আর এতে ধনী দেশ থেকে গরিব দেশে কারখানা সরতে থাকবে, ফলে দারিদ্র্য কমবে। কিন্তু এটা সাম্রাজ্যবাদ তৈরি করে এবং চাইলে বদলাতে পারে। এখন দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি বদলালে ভারত আটকে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের এই শুল্ক হুমকির কারণে ভারতের মুদ্রার (রূপী) মান পড়তে শুরু করেছে। শুল্ক বাড়লে রূপী আরো পড়বে, যদি না পুঁজি ও বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা হয়। কিন্তু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যারা বিদেশি পুঁজির সঙ্গে জড়িত, তারা এর বিরোধিতা করবে। সরকারও তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে—তাই আমেরিকার চাপে নতি স্বীকার করার সম্ভাবনাই বেশি।

সাম্রাজ্যবাদ থেকে স্বাধীন থাকতে হলে নব্যউদার অর্থনীতি ত্যাগ করতে হবে। ১৯৯০-এর আগে ভারত এটা জানত, কিন্তু পরে নীতি বদলেছে। এখন ট্রাম্পের দাদাগিরি দেখিয়ে দিচ্ছে নয়া- উদার অর্থনীতির পথে হাঁটলে স্বাধীনতা কমে যায়, আর বিদেশি শক্তির চাপে মাথা নত করতে হয়।


মূল প্রবন্ধটি ইংরেজিতে পিপলস ডেমোক্রেসী পত্রিকার ১০ আগস্ট ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত

বাংলায় অনুবাদঃ অঞ্জন মুখোপাধ্যায়


প্রকাশের তারিখ: ১৪-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org