|
আরাবল্লি : হরির লুটে পাহাড় পাথরParthapratim Biswas |
তখন মান্যতা পাবে জলাভুমি বুজিয়ে নির্মাণের নতুন বিপদ। ফলে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন পরিবেশ ধ্বংসের বিপজ্জনক পরিকল্পনা বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে শুধু আরাবল্লির মানুষদের নয় বরং গোটা দেশের মানুষকেই। |
এদেশে উদারীকরণের পর নগরায়নের গতি বৃদ্ধির সাথে সাথেই বেড়েছে খাদানের সংখ্যা হৈ হৈ করে, ধ্বংস হয়েছে পাহাড়ের পর পাহাড়। পশ্চিমঘাট পর্বত থেকে শুরু করে হিমালয় হয়ে আরাবলি পর্বত কোনটাই এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম হচ্ছে নির্মাণক্ষেত্রে কর্পোরেট দাপটের কাছে আত্মসমর্পণ করে পাহাড়ের এক নতুন ফর্মুলা উদ্ভাবনের সিদ্ধান্তে। সাম্প্রতিক অতীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে তৈরি হওয়া এক উচ্চপর্যায়ের সরকারি কমিটির সুপারিশে প্রস্তাবিত হয়েছে যে আরাবল্লী পর্বতমালার অন্তর্গত পাহাড় বা টিলা যেগুলি উচ্চতায় ১০০ মিটারের বেশি সেগুলি পাহাড় হিসেবে মান্যতা পাবে এবং মূল পাহাড়ের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হবে। ফলে ৬৯০ কিলোমিটার বিস্তীর্ণ আরাবল্লী পর্বত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন পাহাড় কিংবা টিলাগুলিকে রক্ষার ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার সরকারি আইন প্রযোজ্য হবে। কিন্তু আরাবল্লী অঞ্চলের সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী ১০০ মিটারের বেশি উচ্চতার পাহাড় পাহাড়ের পরিমাণ মাত্র ৯ %। ফলে উচ্চতার ভিত্তিতে পাহাড়ের এমন ফর্মুলা চালু হলে আরাবল্লী অঞ্চলের ৯১ % পাহাড় ছেঁটে ফেলার ক্ষেত্রে কিংবা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে আইনি বাধা থাকবে না। ফলে খাদান থেকে শুরু করে খনি তৈরির ক্ষেত্রে আর কোনো পরিবেশ সংক্রান্ত বিধি নিষেধ থাকবে না। ফলে এই আইন কার্যকরী হলে গুজরাতের হিম্মতনগর থেকে শুরু করে রাজস্থান, হরিয়ানা হয়ে দিল্লির গুরুগ্রাম অবধি চার রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা ঊনচল্লিশটা জেলার পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্র নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠে যাবে। ফলে এদেশে অবস্থিত পৃথিবীর প্রাচীনতম পর্বতমালা আরাবলির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত পরিবেশপ্রেমী থেকে শুরু করে মানবাধিকার রক্ষার সোচ্চার মানুষজনেরা। নগরায়নে বিপন্ন পাহাড় নগরায়নের অংশ হিসেবে নির্মাণক্ষেত্র দেশের অর্থনীতিতে এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কার্যত এই ক্ষেত্রটি এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। নির্মাণক্ষেত্রে খুব জরুরী সিমেন্ট থেকে ইস্পাত, মার্বেল থেকে গ্রানাইট পাথর, কুচি পাথর থেকে বালি সবকিছুই। আর এই সমস্ত কাঁচামাল আসে সরাসরি প্রাকৃতিক সম্পদ থেকেই।ফলে যত বেশি নির্মাণ ক্ষেত্রে দাপট বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে তত বেশি বাড়ছে প্রকৃতির ধ্বংস লীলাও। হাল আমলে জল, জঙ্গল , পাহাড় দখল হয়ে যাচ্ছে লুঠের সম্পদ হিসেবে। আর সেই চার অক্ষরের শব্দ ‘উন্নয়নের’ মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে আত্মঘাতী লক্ষ্য স্থির করছে দেশের সরকার। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা পরিবেশ রক্ষার লড়াইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আরাবল্লী সংরক্ষণের নামে গোটা আরাবল্লী পাহাড়কে পরিণত করেছে হরির লুটের সম্পদে। কার্যত দেশের নির্মাণ ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারকারী শিল্পপতিদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতেই আরাবলি পর্বতমালার টিলা- পাহাড় গুলিকে বাজারের বিক্রির পণ্য বানিয়ে ছাড়ছে দেশের সরকার। নির্মাণ ক্ষেত্রের অন্যতম দামি জরুরি সামগ্রী সিমেন্টের কাঁচামালের অন্যতম যোগানদার হয়ে উঠতে পারে আরাবল্লী অঞ্চল। পাশাপাশি বালি, পাথরকুচি থেকে শুরু করে মার্বেল পাথরের মত লাভজনক ইমারতি পদার্থের ঢালাও জোগান দেশ-বিদেশের বাজারে নিশ্চিত করতেই এখন দেশের পাহাড় বিক্রি শুরু হচ্ছে। টেলিকম পরিষেবার ক্ষেত্রে যেমন আকাশ বাতাসের লিজ পেয়ে গেছে আদানি থেকে শুরু করে এয়ারটেল , ভোদাফোনের মতো বড় কর্পোরেট শিল্প গোষ্ঠীগুলি । কার্যত এবার আদানি- আম্বানি- আদিত্য বিড়লাদের মত বড় বড় শিল্পপতিদের হাতে পাহাড়ে সম্পদ তুলে দিতে উদ্যত হয়েছে দেশের সরকার। পাহাড় পরিবেশের প্রহরী মনে রাখতে হবে যে আরাবল্লী পাহাড় লুটের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে, নির্মাণক্ষেত্রের কর্পোরেট গোষ্ঠীদের সন্তুষ্ট করতে সেই পাহাড়কেই উত্তর ভারতের ফুসফুস বলা হয়। ওই পাহাড়ের মাঝ থেকে তৈরি হওয়া চম্বল, কসাবতি, বান স, গাম্ভীরির মতো প্রচুর নদী নালা, ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জল সম্পদকে নিয়ন্ত্রণ করে । কেবল নদী দিয়ে বয়ে চলা জল নয় উপরন্তু আরাবল্লী পাহাড়ের শিলাস্তরের উপস্থিতির জন্য বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূগর্ভে জল সঞ্চয় সুরক্ষিত থাকে সেই রুক্ষ অঞ্চলে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরাবল্লীর নিধন যজ্ঞ চলতে থাকলে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জল সংকটের কবলে পড়তে পারে। বিপন্ন হতে পারে সেই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। ফলে নিশ্চিহ্ন হতে পারে পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলের বহু প্রাচীন জনপদ।এমনকি দেশের পশ্চিমে থর মরুভূমি ছড়িয়ে পড়তে পারে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশে যদি না আরাবল্লী পর্বত প্রহরীর মতো মরুঝড়ের ধুলো বালি আটকে রাখতে না পারে। বিচিত্র ফর্মুলায় বিপন্ন পাহাড় পাশাপাশি আরাবলি ধ্বংস হলে কিংবা সেই অঞ্চলের পাহাড়ের গড় উচ্চতা কমে গেলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবেই ইতিমধ্যে গোটা পৃথিবীজুড়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে মানুষ সোচ্চার হচ্ছে প্রতিবাদ হচ্ছে উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে এদেশের সরকারি নীতিতে মান্যতা পাচ্ছে পাহাড় ধ্বংসের নতুন সংজ্ঞা। কেবলমাত্র উচ্চতা নিরিখে পাহাড়ের গুরুত্বকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সরকারি কমিটি কিংবা দেশের আদালত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে পাহাড় সন্নিহিত অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের উপর পাহাড়ের ভূমিকাকে লঘু করে দেখা হয়েছে। ভাবখানা এমন যেন , উঁচু পাহাড় কেটে কিংবা ফাটিয়ে ধ্বংস করার তুলনায় নিচু পাহাড় কিংবা টিলা ধ্বংস করা নিরাপদ। কিন্তু এমন নিচু পাহাড়ের সংখ্যা আরাবলি অঞ্চলের সিংহভাগ হলে সেই পাহাড় ধ্বংস করে খাদান বানালে সেই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য যে ভয়াবহভাবে বিঘ্নিত হবে সে সম্পর্কে তলিয়ে দেখতে চায়নি আন্তঃরাজ্য সরকারি কমিটি । কার্যত বহকাল বাদে সাম্প্রতিক সময়ে এই চারটি রাজ্যের একই সাথে ডাবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে গেরুয়া শাসকের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে। কার্যত উন্নয়নের কর্পোরেট নির্ভর মডেলে আশু লাভের প্রেক্ষিতে উপেক্ষিত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশের ক্ষতির ঝুঁকি। উল্টে দেখো পালটে গেছে এতদিন আরাবল্লীর অন্যতম প্রধান সুরক্ষা ছিল অরন্য সংরক্ষন আইন। পাহাড়ের সাথে জড়িয়ে থাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জঙ্গল। ফলে সেই জঙ্গল রক্ষা করার কারণেই পাহাড় রক্ষা পেত ঘুরপথে, সেই আইনের বলে। কিন্তু সম্প্রতি উচ্চতার মাপকাঠিতে পাহাড় কিংবা টিলাকে সংরক্ষিত রাখার সরকারি নীতি প্রণয়ন করার মধ্যে ফলে আরাবল্লী অঞ্চলের সিংহভাগ পাহাড় ও জঙ্গল ছেঁটে কিংবা কেটে ফেলার পদ্ধতিকে মান্যতা দেওয়া হল। এর ফলে বাড়ল পরিবেশের বিপদের গভীরতা। পাহাড় থেকে জলাভূমির মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে যান্ত্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে সেগুলির বহুমাত্রিক প্রভাব বিবেচনায় রেখেই সরকারি নীতি গ্রহণ করা উচিত। কেবল উচ্চতার নিরিখে যান্ত্রিকভাবে পাহাড়ের কার্যকারিতা বিচারের ফর্মুলায় যে বিপদ লুকিয়ে ঠিক তেমনটাই হবে জলাভূমির কার্যকারিতা বিচারের ক্ষেত্রে জলাশয়ে জলের গভীরতার মাপকাঠি। ফলে সরকারের যে যুক্তিতে কম উচ্চতার পাহাড় সংরক্ষণের প্রয়োজন ফুরিয়েছে সেই একই যুক্তিতে কোলকাতার মতো শহরে কিংবা রাজ্যের শহরতলির বিস্তীর্ণ অংশে অগভীর ( ১-২ মিটার ) জলাভূমিগুলিও যে কোনদিন সংরক্ষণের আওতার বাইরে চলে যেতে পারে। ফলে তখন মান্যতা পাবে জলাভুমি বুজিয়ে নির্মাণের নতুন বিপদ। ফলে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন পরিবেশ ধ্বংসের বিপজ্জনক পরিকল্পনা বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে শুধু আরাবল্লির মানুষদের নয় বরং গোটা দেশের মানুষকেই।প্রকাশের তারিখ: ২৭-ডিসেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|