|
বাংলার বিকল্প পরিবেশ ভাবনা ও উন্নয়নের অভিমুখSourav Chakrabarty |
বর্তমানে পরিবেশ বনাম উন্নয়ন দ্বন্দ্ব সামনের সারিতে চলে এসেছে। এই দ্বন্দ্ব বৈরিতামূলক দ্বন্দ্বে উপনীত হলে এ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নেই। উন্নয়ন বলতে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি তা হলো তীব্র প্রকৃতি শোষণ - প্রাকৃতিক সম্পদের বল্গাহীন লুটতরাজ, সীমাহীন ভোগসর্বস্বতা। |
আর কদিন বাদেই পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচন, চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রচার চলছে, নির্বাচনী প্রচারে পরিবেশের বিষয়গুলি উঠে আসছে - এটা আসছে মূলত বামপন্থীদের নির্বাচনী প্রচারে, তারাই একমাত্র তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে পরিবেশকে অন্তর্ভূক্ত করেছে এবং তারা সরকারে এলে এ বিষয়ে কি কি করা হবে সু্স্পষ্ট করে বলেছে। এটা অত্যন্ত আশার কথা কারণ পরিবেশ সমস্যা সামাজিক - অর্থনৈতিক সমস্যা কিন্তু এর সমাধান রাজনৈতিক।
বর্তমানে পরিবেশ বনাম উন্নয়ন দ্বন্দ্ব সামনের সারিতে চলে এসেছে। এই দ্বন্দ্ব বৈরিতামূলক দ্বন্দ্বে উপনীত হলে এ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নেই। উন্নয়ন বলতে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি তা হলো তীব্র প্রকৃতি শোষণ - প্রাকৃতিক সম্পদের বল্গাহীন লুটতরাজ, সীমাহীন ভোগসর্বস্বতা।
পরিবেশ বা ' এনভায়রনমেন্ট ' বলতে জীবেকুলের চারপাশের সমস্ত প্রাকৃতিক, সামাজিক, জৈব ও অজৈব উপাদানের সমষ্টিকে বোঝায়, যা জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে আর ' ইকোলজি ' হলো জীব ও তাদের পরিবেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, নির্ভরতা এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।
পুঁজিবাদী উন্নয়ন জীব এবং তার পরিবেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, নির্ভরতা এবং ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়াকে ভেঙে দেয় - যাকে কার্ল মার্কস ' সোস্যাল মেটাবলিক রিফ্ট ' বা প্রকৃতির এবং সমাজের মধ্যে বিপাক ক্রিয়ার ভাঙন বলে অভিহিত করেছিলেন। এর ফলেই আজ পরিবেশ সংকট, এ কারণেই বিজ্ঞানীরা বলছেন ষষ্ঠ প্রজাতি বিলোপের কথা। বিশ্ব-উষ্ণায়ন হচ্ছে,জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে - খরা, বন্যা, দাবানল, সঞ্চিত বরফ গলছে, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি ঘটছে, প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, মানুষ পরিবেশ উদ্ধাস্তু হচ্ছে।
বামপন্থীরা মানুষকে পরিবেশের অংশ হিসেবে দেখে, তারা বলে পরিবেশ ধ্বংসের মূল কারণ পুঁজিবাদ, কর্পোরেট লুঠ ও বৈষম্য; তাই সমাধান হলো সামাজিক ন্যায়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও গণআন্দোলন।
দক্ষিণপন্থীরা পরিবেশ রক্ষাকে সমর্থন করলেও পরিবেশকে বাজারের মূল্যে দেখে , প্রাকৃতিক সম্পদকে সামাজিক সম্পদ হিসেবে না দেখে মুনাফার উপকরণ হিসেবে দেখে।
অতি দক্ষিণপন্থীরা পরিবেশ সংকটকে জনসংখ্যা, অভিবাসন ও জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত করে।
নয়া ফ্যাসীবাদী বা ইকো-ফ্যাসিস্টরা পরিবেশের নামে বর্ণবাদ, সীমান্ত বন্ধ, “অতিরিক্ত মানুষ” কমানো ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিকে সমর্থন করে।
উন্নয়ন তাই আজ সমাজবৈরী এক শব্দ। আসলে উন্নয়ন বলে কিছু হয়না,কথাটা হবে দীর্ঘস্থায়ী বা টেকসই উন্নয়ন বা ' সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট। ' ১৯৮৭ সালে ইউনাইটেড নেশনস নিযুক্ত ব্রান্ডল্যান্ড কমিশন পরিবেশ - উন্নয়ন নিয়ে বলতে গিয়ে ' আওয়ার কমন ফিউচার ' প্রতিবেদনে ' দীর্ঘস্থায়ী ' বা 'টেকসই ' বা ' সাসটেনেবল ' উন্নয়নের সংজ্ঞা এইভাবে দেয় —
“Development that meets the needs of the present without compromising the ability of future generations to meet their own needs.”
অর্থাৎ,সেই উন্নয়ন যা বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। তাই উন্নয়ন বলে কথাটা কার্যত পরিত্যাজ্য - এতে পরিবেশ এবং ইকোলজির চরম সর্বনাশ।
এই মুহূর্তে উড়িষ্যার রায়াগাড়া জেলার সিজিমালি পাহাড়ে বেদান্ত লিমিটেডের বক্সাইট খনি প্রকল্প বিরোধী আদিবাসীদের বড়ো আন্দোলন চলছে। তারা মনে করছেন, এই খনি প্রকল্প কার্যকর হলে তাদের জল জমি জঙ্গল চাষবাস এবং সংস্কৃতির সর্বনাশ হবে।
এপ্রিলের শুরুতে পুলিশ গ্রামে ঢুকে গ্রেপ্তারি অভিযান চালায়, গভীর রাতে বিদ্যুৎ কেটে দিয়ে পুলিশ বাড়িতে ঢোকে। শুরু হয় সংঘর্ষ। ৭০ জন আহত হন। একদিকে পুলিশের টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ অন্যদিকে গ্রামবাসীদের কুঠার,লাঠি,পাথর নিয়ে প্রতিরোধ। গ্রামবাসীদের কথায় তাদের গ্রামসভার মতামত না নিয়েই প্রশাসন এবং বেদান্ত লিমিটেড কেম্পানি মিলে খনিতে যাবার ৩ কিমি রাস্তা নির্মাণ শুরু করেছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে যে,বেদান্ত লিমিটেড কেম্পানির খনি প্রকল্পের জন্য কোম্পানি এবং প্রশাসন একসাথে মিলে গ্রামবাসীদের ওপর আক্রমন করছে কেন? সেখানকার আদিবাসীদের অধিকার খর্ব করতে, তাদের উচ্ছেদ করতে প্রশাসন কেন বেদান্তের পাশে দাঁড়াচ্ছে? আদিবাসীদের শত বাধা উপেক্ষা করে সরকার বক্সাইট খনি বেদান্ত লিমিটেড কেম্পানির হাতে তুলে দিচ্ছেই বা কেন? আসলে এটাই দস্তুর এখন। বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাকে জল জমি জঙ্গল খনি উপঢৌকন দেওয়া হচ্ছে- উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে আদিবাসীরা, ধর্ষিত হচ্ছে তাদের অধিকার।
জল-জমি-জঙ্গলের কর্পোরেট লুট
বর্তমানে আমরা দেখছি ভারতে কোথাও কর্পোরেট নিজেই জবরদস্তি লুট করছে আবার কর্পোরেটের হাতে জল-জমি-জঙ্গল তুলে দেওয়া হচ্ছে, পাহাড় তুলে দেওয়া হচ্ছে — মানুষ উচ্ছেদ হচ্ছে তথাকথিত উন্নয়নের নামে। এটি কেবল সামাজিক-রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং ডেটা, আইনগত নীতি, এবং বাস্তব প্রকল্প বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ভারতে গত ১৫–২০ বছরে এই প্রবণতা ব্যবস্থাবদ্ধভাবে ঘটছে। এই ঘটনা ঘটছে নয়া উদারনীতির অর্থনীতির দর্শন এবং তার গর্ভে জন্ম নেওয়া আরো প্রতিক্রিয়াশীল নয়া ফ্যাসীবাদী দর্শন অনুসারে।
নয়া উদারনীতি হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা কমিয়ে বাজারকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া একটি রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক মতবাদ, যেখানে— প্রকৃতি- পরিবেশ, কৃষি, জল, নদী,পাহাড়—সবকিছুকেই “বাজারযোগ্য সম্পদ” বানানো হয়। কর্পোরেট মুনাফাই প্রধান নীতি হয়ে দাঁড়ায়। “নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাজার” (deregulation) - পরিবেশ–নিয়ন্ত্রণও দুর্বল করা হয়, আইনগুলিকে খর্ব করা হয়।
বর্তমান ভারতে নয়া ফ্যাসিবাদের রূপ স্পষ্ট হচ্ছে। আধুনিক সময়ে উদ্ভূত কর্তৃত্ববাদী উগ্র জাতীয়তাবাদ, যেখানে—সংখ্যালঘু, অভিবাসী, আদিবাসীর ওপর আক্রমণ যেমন শারীরিক আক্রমন করে তেমনই তাদের জল জমি জঙ্গলের অধিকার হরণ করে - উচ্ছেদ করে। উন্নয়নের নামে কর্পোরেটের হাতে জল জমি জঙ্গল খনি তুলে দেওয়া হয় এবং উচ্ছেদকে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের নামে বৈধতা দেওয়া হয়। পরিবেশ–আন্দোলনকে “রাষ্ট্রবিরোধী” আখ্যা দেওয়া, জলবায়ু দাবি ও বিজ্ঞানকে “পশ্চিমী ষড়যন্ত্র” বলে দুর্বল করা হয়।
১) জঙ্গল, কর্পোরেটের হাতে আইনগত পরিবর্তন দিয়ে বৈধতাঃ
ক) Compensatory Afforestation Act, 2016 - এই আইনে “বন কাটলে অন্য কোথাও গাছ লাগালেই চলবে” বলা হলো। এর ফলে: কোম্পানির খনি, বাঁধ, শিল্প এলাকায় জঙ্গল কাটা সহজ হলো। Natural forest → “non-forest land”-এ plantation করে বনের “ক্ষতিপূরণ” দেখানো হচ্ছে।
খ) Forest Conservation Amendment Act, 2023 - এই সংশোধন হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক: সেনাবাহিনী, রেল, সড়ক, খনি, প্রকল্প—১০ কিমি অভ্যন্তরে হলে environmental clearance ছাড়াই বন কাটা যাবে। “Historical forest” সংজ্ঞা বাদ দেওয়া হলো। ৩ টির বেশি বড় প্রকল্পে পরিবেশ মূল্যায়ন প্রয়োজন হবে না। জঙ্গল কাটতে আইনি বাধা প্রায় নেই।
২) জল—নদী—জমি কর্পোরেটকরণঃ নদী ও জলের উপর নিয়ন্ত্রণ-নর্মদা, মহানদী, দামোদরসহ বহু নদীর জলাধিকার কর্পোরেটদের ব্যবস্থাপনায়। একাধিক রাজ্যে Bulk Water Supply PPP Model চালু, জলকে “economic asset” হিসেবে দেখানো হচ্ছে, অধিকার নয়। শিল্প–খনির জল অগ্রাধিকার পাচ্ছে, গ্রামীণ পানীয় জল পিছিয়ে পড়ছে।
৩) জমি অধিগ্রহণ আইন দুর্বল করা
2013-এর Land Acquisition Act → অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল কিন্তু বহু রাজ্য ২০১৫–২০২৩ এর মধ্যে নিজেদের আইন করে social impact assessment বাতিল করেছে। ফলে consent ছাড়াই জমি অধিগ্রহণ,জমির দাম কম দেখানো,আদিবাসী ও গ্রামীণ মানুষদের জমি সরকার–কর্পোরেট মিলে নিয়ে নিচ্ছে।
৪) পাহাড় বিক্রি — খনিজ কর্পোরেটের কাছে হস্তান্তরঃ প্রধান খনিজ অঞ্চল:ছত্তিসগড় (কোরবা, সুরগুজা), ঝাড়খণ্ড (পশ্চিম সিংভূম, রাঁচি, দুমকা),ওডিশা (কেওনঝড়, কেন্দুজহার, সুন্দরগড়), পশ্চিমবঙ্গ-পুরুলিয়া,আন্দামান–নিকোবর (Great Nicobar), এই সব জায়গায়—পাহাড় উৎখনন, ওপেন-কাস্ট কয়লা–লোহা–বক্সাইট খনি,বন উজাড় → খনিজ উত্তোলন জন্য কর্পোরেট লিজ। এ সব এলাকায় পাহাড়ে বসবাসকারী Adivasi—সরাসরি উচ্ছেদ।
৫) প্রকল্পগুলিতে বৃহৎ কর্পোরেটদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
দেউচা–পাঁচামি কয়লা ব্লক (WB) → এশিয়ার সবচেয়ে বড়, ৩–৪টি কর্পোরেট যুক্ত, আড়ালে সুবৃহৎ কর্পোরেট সংস্থা থাকতে পারে।
আদানি কোল ব্লক (ছত্তিসগড়, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা), পসকো–লোহা প্রকল্প (ওডিশা; পরে নাম পরিবর্তন), বিদ্যুতের captive coal blocks। Great Nicobar mega-port project → বিশাল কর্পোরেট লিজ। Vedanta, JSW ইত্যাদি শিল্প প্রকল্প। বড় হাইড্রো প্রজেক্ট (দিবাং, রোপার, পার্বতী) সবগুলোতেই বন→পাহাড়→জমি→জল—কর্পোরেট লিজিং। ব্যাপকভাবে জঙ্গল উজাড়।
৬) মানুষ উচ্ছেদ — উন্নয়নের নামে বাস্তবে আদিবাসী উচ্ছেদঃ ভারতে একমাত্র কমিউনিটি যারা শতাব্দী ধরে জঙ্গল পাহাড় রক্ষা করেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি উচ্ছেদ হচ্ছে। ১৯৫০–২০২৪: মোট ৬ কোটির বেশি মানুষ উন্নয়ন প্রকল্পে উচ্ছেদ হয়েছে তার ৪০% এর বেশি আদিবাসী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুনর্বাসন অসম্পূর্ণ, নতুন জায়গায় কৃষিযোগ্য জমি নেই,জীবিকা নষ্ট, খাদ্য–জলের নিরাপত্তা নেই।
“পরিবেশ অনুমোদন” এখন pro-corporate: EIA 2020 draft →জনশুনানি কমানো, Self-certification system, Backdate clearance. ফলে মানুষ আপত্তি তুললেও প্রকল্প থামে না।
৭) এটি একটি কাঠামোগত প্রবণতা: State–Corporate Nexus. ভারতে এখন উন্নয়ন মডেল হলো: জল, জমি, জঙ্গল,পাহাড় কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া এবং আগ্রাসী উচ্ছেদ। রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন, বাজেট, কর কাঠামো → সবই কর্পোরেটের স্বার্থে। বিজ্ঞানীরা এটিকে বলেন: Development-induced displacement, Green grabbing, Resource extraction model, Neo-extractivism. ক্যাপিটালের ১ম খন্ডে মার্কস ইংল্যান্ডের Enclosure Movement এবং আদিম সঞ্চয় (Primitive Accumulaion) নিয়ে যা যা বলেছেন আমরা আজ তাই প্রত্যক্ষ করছি।
অনেক গবেষকই বলেন যে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গে আজকের commons দখল, জমি ভরাট, জলাভূমি বেসরকারিকরণ, খনি, শিল্পাঞ্চল, রিয়েল এস্টেট, expressway, logistics park—এসব অনেকটা নতুন ধরনের enclosure-এর মতো।
ঐতিহাসিকভাবে enclosure বলতে বোঝাত English enclosure movement—যেখানে গ্রামের common land, grazing ground, forest, waterbody ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে যায়। এর ফলে সাধারণ কৃষক, পশুপালক ও গরিব মানুষ তাদের জীবিকার জায়গা হারায়।
ভারতে অনেক পণ্ডিত যেমন David Harvey “accumulation by dispossession” ধারণা ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র ও বাজার মিলে সাধারণ মানুষের জমি, জল, বন, নদী, commons কে কর্পোরেট বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়। ভারতের SEZ, mining zone, port project, dam, industrial corridor, smart city, township—এসব ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা দেখা যায়।
পশ্চিমবঙ্গে এর উদাহরণ হিসেবে অনেকেই ধাপা, East Kolkata Wetlands, উপকূল অঞ্চল, খনি এলাকা, ইটভাটা অঞ্চল, নদীর চর, গ্রামসভার জমি—এসবের কথা বলেন। বিশেষ করে East Kolkata Wetlands-এ জলাভূমি, মাছের ভেড়ি, খাল, চাষের জমি ও গ্রামীণ commons ধীরে ধীরে গুদাম, আবাসন, রাস্তা, কারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে চলে যাচ্ছে।
অনেকে বলেন, আগে enclosure হতো বেড়া দিয়ে; এখন হয় master plan, land bank, industrial park, township, tourism project, mining lease, riverfront development, expressway, SEZ বা environmental clearance-এর মাধ্যমে। ফলে commons সরাসরি ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হলেও, সাধারণ মানুষের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে যায়।
Elinor Ostrom-এর মতে, commons বাঁচাতে স্থানীয় মানুষের হাতে ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার। কিন্তু যখন দূরের আমলাতন্ত্র, কর্পোরেট বা রিয়েল এস্টেট স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন commons দ্রুত হারিয়ে যায়।
David Harvey “accumulation by dispossession” বলতে বোঝান এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে সাধারণ মানুষের জমি, জল, বন, খনি, commons, সরকারি সম্পদ, এমনকি শ্রম ও জ্ঞানও ধীরে ধীরে কর্পোরেট, ধনী গোষ্ঠী বা ব্যক্তিগত মালিকানার হাতে চলে যায়।
এই ধারণাটি এসেছে Karl Marx-এর “primitive accumulation” ধারণা থেকে। Marx বলেছিলেন, পুঁজিবাদের শুরুতে কৃষকদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, commons ঘিরে দেওয়া হয়েছিল, মানুষকে জমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে মজুরিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। Harvey বলেন, এই প্রক্রিয়া শুধু অতীতে হয়নি; এখনও চলছে, শুধু নতুন রূপে।
এর মধ্যে থাকতে পারে—কৃষিজমি বা গ্রামসভার জমি অধিগ্রহণ,বনভূমি খনি বা শিল্পের জন্য তুলে দেওয়া
জলাভূমি ভরাট করে আবাসন বা গুদাম তৈরি
নদী, সৈকত বা পাহাড় পর্যটন বা বাণিজ্যিক ব্যবহারে দেওয়া,সরকারি স্কুল, হাসপাতাল, রেল, বিদ্যুৎ, পানীয় জল ইত্যাদি বেসরকারিকরণ।আদিবাসী বা গরিব মানুষের জীবিকার জায়গা কেড়ে নেওয়া,ঋণ, আর্থিক সংকট বা জমির দামের চাপে মানুষকে সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে ভারতে অনেকেই SEZ, mining project, port, expressway, dam, smart city, township, riverfront development, logistics park ইত্যাদিকে accumulation by dispossession-এর উদাহরণ বলেন।
Garrett Hardin বলেছিলেন, commons যদি একেবারে উন্মুক্ত থাকে এবং কোনও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে মানুষ নিজের লাভের জন্য বেশি ব্যবহার করবে, ফলে শেষ পর্যন্ত সেই সম্পদ নষ্ট হয়ে যাবে। তাঁর বিখ্যাত “tragedy of the commons” ধারণা অনুযায়ী, “সবার” সম্পদ শেষ পর্যন্ত “কারও নয়” হয়ে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের জলাভূমিউন্মত্ত লালসার কোপে জলাভূমি
জলাভূমি নির্বিচারে ভরাট হচ্ছে জলাভূমি। উচ্ছন্নে যাক পরিবেশ!হোক শুধু নির্মাণ! তথ্য বলছে ২০১০ এ কলকাতায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ৭২০০ টি, ২০২১ এ তা কমে দাঁড়াল ৩৭০০ টি - অর্থাৎ অর্ধেক! জলাভূমি নানা উদ্ভিদ প্রাণীর বাস্তুতন্ত্রের আধার। জলাভূমি প্লাবন এবং জল জমা ঠেকিয়ে দেয়। জলাভূমি কার্বন শোষণ করে। সর্বপরি জলাভূমি ভূগর্ভস্থ জল ভান্ডার কে পুষ্ট করে। নির্বিচারে গাছ কাটা জলাভূমি ভরাট করাতেই কি বোঝা যায় না, কেন দিল্লির পরেই বিশ্বের দূষিত শহরটির নাম হ'ল কলকাতা!
'উন্নয়ন' বিভীষিকায় কলকাতা
এই যে আগ্রাসী নির্মাণ চলছে তাতে কলকাতার মাটির তলার জলের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। তোলা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল। ভূগর্ভস্থ জলভান্ডার নেমে যাচ্ছে ৩০-৪০ ফুট, কোথাওবা ৬০ ফুট। শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে কলকাতা! ২০২০ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ' স্প্রিংগার নেচার জার্নাল অফ এনভায়রনমেন্টাল আর্থ সায়েন্স'এর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয় মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল তোলার জন্য কলকাতার
ভূগর্ভে এক অবতল খাত তৈরি হয়েছে যা কলকাতা শহরের পৃষ্ঠতলের ৩০ শতাংশ বেশি - যার জন্য ভূগর্ভস্থ জলের ৭৫ শতাংশ জল অংশত বা সম্পূর্ণ নোনতা হয়ে যাচ্ছে। এক ফুট করে জলস্তর নামছে প্রতিবছর। জলস্তর নেমে যাবার জন্য আর্সেনিক সমস্যা বাড়ছে আর
ভয়ানকভাবে বাড়ছে কলকাতার অবনমনের আশঙ্কা! শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কলকাতার উপর যে হিমালয় প্রমাণ নির্মাণের গুরুভার চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাতে কি কলকাতা ভবিষ্যতের যোশীমঠ হবে?
'উন্নয়ন'এ বিপন্ন ' বিশ্বের বিস্ময়'
সারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ এক অদ্বিতীয় জলাভূমির নাম 'পূর্ব কলকাতা জলাভূমি।'এই জলাভূমি প্রাকৃতিকভাবে কলকাতার আশিভাগ দূষিত জলকে বর্জ্য গর্ভেই জন্ম নেওয়া এবং শতগুণ বেড়ে ওঠা ব্যাকটেরিয়া এবং 'এ্যালগি' বা শৈবাল, সূর্যের আলোর সাহায্যে পরিশোধিত করে মাছের খাদ্য তৈরি করে। এই প্রাকৃতিক জৈব - রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় যে মাছ চাষ, সবজি চাষের ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে তা বিশ্বের বিস্ময়!
২০০২ সালে এই জলাভূমিকে রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কলকাতার আশিভাগ বর্জ্যজল যার পরিমাণ এক হাজার মিলিয়ন লিটার প্রতি দিন, এই জলাভূমিতে নালার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ ক'রে প্রায় দুশোটি ভেড়িতে ভাগ হয়ে গিয়ে এমন এক বিস্ময়কর কর্মকাণ্ড ঘটায় যার জন্য কলকাতাতে ' সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ' নির্মাণ করেনি ব্রিটিশ শাসকরা। সেই ব্যবস্থা আজও চলছে। ফলে বর্জ্য পরিশোধন বাবদ ৪১৯ কোটি টাকা প্রতি বছরই বেঁচে যায় কে এম ডি এর ( ' স্প্রিংগার নেচার' এ প্রকাশিত গবেষণার তথ্য)। এর সাথে বছরে আঠেরো হাজার টন মাছ এবং দেড়শো টন সবজি উৎপাদন করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। আরো আছে! যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক- লেখক সুদিন পাল দেখিয়েছেন, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বর্জ্য থেকে ৬৯ শতাংশ কার্বন সঞ্চয় করে। ভাবা যায়! এই হ'ল জলাভূমির উৎপাদনশীলতা! এই উৎপাদনশীলতা প্রাকৃতিক। উদারনীতির মুনাফাকারী উন্নয়নের উৎপাদনশীলতা নয়।
১৯৯৭ সালে ২৬৪টি ভেরি কার্যকর ছিল। আজ সেখানে মাত্র ২০০ টি বেঁচে আছে। কিছুদিনের মধ্যে ধাপা- মনপুর মৌজা, বড়োবন ভেরি এবং রবি ঘোষের ভেরি বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। ৩৭ টি মৌজার ২০ টি মৌজা ভয়াবহ জবরদখলের আতঙ্কে রয়েছে। জবরদখল এবং বর্জ্য জলের পরিমাণ কমে যাওয়া- এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পূর্ব কলকাতা জলাভূমিকে। ১৯৯২ সালে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয় যে, এই জলাভূমির চরিত্র বদল করা যাবে না অথচ বর্তমান সরকার সেই বিধিনিষেধ তুলে দেবার জন্য অপকৌশল অবলম্বন করছে।
'সেন্টার ফর সায়েন্স এ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ' ( সি ই সি) র বিশ্লেষণ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে জলাভূমি ও নদীভিত্তিক পরিবেশ দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। রাজ্যে প্রায় ৪.৬ লক্ষের বেশি জলাভূমি রয়েছে, যা রাজ্যের মোট আয়তনের প্রায় ১২.৯%। কিন্তু নগরায়ন, রাস্তা, গুদাম, আবাসন ও শিল্প প্রকল্পের চাপে এগুলির বড় অংশ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
ডাউন টু আর্থের -এর ২০২৬ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুধু মুর্শিদাবাদ জেলার ১৪টি বড় জলাভূমির ক্ষেত্রেই ১৯৯০ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। মোট এলাকা ৫,৫২৪.৭ হেক্টর থেকে কমে ১,৭০০.২ হেক্টরে নেমেছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ২.১% হারে জলাভূমি হারাচ্ছে, যা ভারতের জাতীয় গড়ের দেড় গুণ এবং বিশ্ব গড়ের প্রায় তিন গুণ।
ডাউন টু আর্থ আরও বলছে, মুর্শিদাবাদের বহু জলাভূমি এখন কচুরিপানা, পলি জমা ও দখলের কারণে প্রায় মৃত অবস্থায় পৌঁছেছে। অনেক বিল বাওর শুকিয়ে কৃষিজমি বা বসতি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
'দ্য ওয়্যার 'এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী পূর্ব কলকাতা জলাভূমি গত ৩০ বছরে প্রায় ৩৬% হারিয়ে গেছে। ১৯৯১ সালে এর আয়তন ছিল প্রায় ৬৫ বর্গকিলোমিটার, যা ২০২১ সালে নেমে এসেছে প্রায় ৪২ বর্গকিলোমিটারে।
২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ১৯৯১ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে ৬৩.৪% পর্যন্ত সঙ্কুচিত হয়েছে। এই হার আরও ভয়াবহ, কারণ জলাভূমির জায়গা মূলত , রাস্তা, গুদাম, আবাসন ও কৃষিজমিতে বদলে গেছে।
South Asian Forum for Environment এবং International Water Management Institute-এর পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, আদিগঙ্গা এবং শহরের বন্যা প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে যৌথ গবেষণার মূল বক্তব্য ছিল—
২০০৫-২০১৫ সালের মধ্যে পূর্ব কলকাতার প্রায় ৫৩% জলাভূমি নষ্ট হয়েছে।আদিগঙ্গার প্রায় ৮৬% অংশে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
জলাভূমি ভরাট, সিল্ট জমা ও দ্রুত নগরায়নের ফলে কলকাতার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার প্রায় ৬৫% কমে গেছে।
পরিস্থিতি না বদলালে টানা ৪৮ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিতেই কলকাতার বড় অংশ ডুবে যেতে পারে।কলকাতার বহু ওয়ার্ড উচ্চ বন্যা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার ২০২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ব কলকাতা জলাভূমি নিয়ে ৫০০-র বেশি 'এফ আই আর' হয়েছে - অবৈধ ভরাট, গুদাম ও নির্মাণের বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষায় অন্তত ৬২০টি অবৈধ শিল্প ইউনিট, প্লাস্টিক কারখানা, গ্যারাজ, গুদাম এবং ছাউনি পাওয়া গেছে।
একই রিপোর্টে বলা হয়েছে যে আমাজন, ফ্লিপকার্ট, ব্লিঙ্কিট,সুইগি, ইনস্টামার্ট -এর মতো বড় ই- বানিজ্য গুদামও পুরনো পুরণো ভেরি ভরাট করে তৈরি হয়েছে। বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প Urbana-র পিছনের প্রায় ১.৫ বর্গকিলোমিটার জলাভূমি এখন কার্যত মাটি - আর্জনার স্তুপের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলে যে ৫০৫টি অবৈধ নির্মাণ চিহ্নিত হয়েছে তাতে আদালত পর্যন্ত বলেছে যে এগুলি সরাতে আধা সামরিক বাহিনী লাগতে পারে।
আরও যে জলাভূমিগুলি সংকটে
সাঁতরাগাছি ঝিল — পরিযায়ী পাখির জন্য বিখ্যাত এই জলাভূমি জলজ আগাছা, দূষণ, আশেপাশের নগরায়ণ এবং মানবিক চাপের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে।
চুপির চর — গঙ্গার চরভূমি ও জলাভূমি অঞ্চল, যেখানে পাখির আবাসস্থল ধ্বংস, পর্যটনের চাপ এবং নদীর চরিত্র বদলের কারণে সমস্যা বাড়ছে।
রসিক বিল — উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, যেখানে পলি জমা, জলস্তর কমে যাওয়া এবং কৃষি ও বসতির চাপ রয়েছে।
পূর্বস্থলী অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ— চুপির চর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত এই জলাভূমি পাখির আবাসস্থল হলেও নদীর গতিপথ বদল, পলি জমা এবং দূষণের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে।
মুর্শিদাবাদের আহিরণ বিল — মাছ, পাখি ও স্থানীয় জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও জলাভূমি ভরাট, চাষের জমি বৃদ্ধি এবং দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চলাতিয়া এবং বিষ্ণুপুর বিল দুটিও ভরাটের সংকটে।
পাটলাখোয়া বিল— উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিলে পলি জমা, দখল এবং কৃষি সম্প্রসারণের চাপ রয়েছে।
'উন্নয়ন' মদমত্ততায় অরণ্য নিধন
ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট ২০২১' অনুযায়ী পশ্চিমবাংলায় ২১৯-২০২১ পর্যন্ত ৭০ বর্গ কিমি অরণ্য কমেছে।পশ্চিমবঙ্গে বনভূমি গত কয়েক বছরে ওঠানামা করলেও দীর্ঘমেয়াদে কমেছে। Forest Survey of India-এর India State of Forest Report অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে বনভূমির পরিমাণ ছিল ১৬,৯০২ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা নেমে হয়েছে ১৬,৮৩২.৩৩ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ২০১৯ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে প্রায় ৬৯.৭ বর্গকিলোমিটার বনভূমি কমেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মোট ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ৮৮,৭৫২ বর্গকিলোমিটার। সেই হিসাবে ২০২৩ সালে রাজ্যের মোট আয়তনের প্রায় ১৮.৯৬% বনভূমির আওতায় ছিল। এর মধ্যে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি বন, ডুয়ার্স, জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের শুকনো বনভূমি অন্তর্ভুক্ত।
বিগত দশ বছরে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের ৫০ বর্গকিলোমিটার ম্যানগ্রোভ অরণ্য কমেছে। বাঘ বেরিয়ে আসে লোকালয়ে? নাকি মানুষই যায় বাঘেদের আলয়ে? কোন কারনে ' ম্যান - এ্যানিম্যাল কনফ্লিক্ট ' ঘটে? কলকাতা ২০১১-২০২১ সাল পর্যন্ত ৩০ শতাংশ বৃক্ষের আচ্ছাদন হারিয়েছে। এসব তথ্য নির্বিচারে অরণ্য ও বৃক্ষ ছেদনের আয়না।
বিশ্বের সবাই যখন কি করে বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেওয়া যায়, বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানো যায় তাই নিয়ে চুল ছিঁড়ছে আর এখানে কার্বন শোষণের হাতিয়ার অরণ্য নিধন হচ্ছে উন্নয়নের নামে!
অরণ্য নিধন, বৃক্ষচ্ছেদন এখন উন্নয়নের মূল উপাদন।
অরণ্য নিধন ক'রে কার্বন শোষণের জায়গায় কার্বন বাড়িয়ে দিচ্ছে উন্নয়ন! সাধে কী কোভিড ১৯, ইবোলা, মাংকি পক্সের মত জুনোটিক ডিজিজ ( প্রাণীদেহ থেকে মানুষের শরীরে ছলকে আসা) এর প্রাদুর্ভাব হয়! ডেঙ্গুর মতো জুনোটিক এবং ভেক্টর ডিজিজের বাড়বাড়ন্ত হয়! এ কারণেই তো আইপিবিইএস (ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্লাটফর্ম ফর বায়ো ডাইভারসিটি এবং ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস)
কোভিডের সময় বলেছিল - এতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে?
পশ্চিমবঙ্গে বনভূমি গত কয়েক বছরে ওঠানামা করলেও দীর্ঘমেয়াদে কমেছে। Forest Survey of India-এর India State of Forest Report অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে বনভূমির পরিমাণ ছিল ১৬,৯০২ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা নেমে হয়েছে ১৬,৮৩২.৩৩ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ২০১৯ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে প্রায় ৬৯.৭ বর্গকিলোমিটার বনভূমি কমেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মোট ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ৮৮,৭৫২ বর্গকিলোমিটার। সেই হিসাবে ২০২৩ সালে রাজ্যের মোট আয়তনের প্রায় ১৮.৯৬% বনভূমির আওতায় ছিল। এর মধ্যে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি বন, ডুয়ার্স, জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের শুকনো বনভূমি অন্তর্ভুক্ত।
ব্রিটিশ রাজ ভারতের অরণ্য সম্পদকে বানিজ্যিক মুনাফার জন্য ব্যবহারের যে বন নীতি এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, উচ্ছেদ করেছিল বনকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা আদিবাসীদের, খর্ব করেছিল তাদের অধিকার ভারত সরকারও কার্যত একই ধারা বজায় রেখেছে। বন অধিকার আইন ২০০৬, আদিবাসী ও অন্যান্য অরণ্যবাসীদের যে অধকার দিয়েছিল তা খর্ব করে দেশের বর্তমান সরকার। এতে কর্পোরেট দুনিয়ার বন, বনজ সম্পদ,আকরিক সম্পদ লুন্ঠন করার কাজ সহজ হলো। সহজ হলো উন্নয়নের নামে আদিবাসী অরণ্যবাসীদের উচ্ছেদ করার কাজ।
১৯৮৮ সালের বন নীতিতে ' জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট ' এর কথা আসে। গ্রাম প্রান্তের বনকে গ্রামের মানুষের তৈরী ' ফরেস্ট প্রোটেকশন কমিটি ' র মাধ্যমে তাদের অংশীদার করে বন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল কিন্তু এখানেও ১৯৮০ র দশকে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার ' আড়াবারি ফরেস্ট রেঞ্জ' এর শালবনে গড়ে ওঠা ' জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট ' এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয় দেশের নানা প্রান্তে। এ বিষয়ে সেসময়কার বামফ্রন্ট সরকারের অবদান অপরিসীম, সেই সরকারের বনসৃজন প্রকল্প রাজ্যের বনসৃজনে যে ভূমিকা নেয় তা অতুলনীয়।
তাপ প্রবাহ ও বায়ু দূষণ
পশ্চিমবঙ্গে এখন শুধু “গরম” বাড়ছে না, হিট ওয়েব বা তাপপ্রবাহের চরিত্রও বদলাচ্ছে। আগে মূলত পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি যেমন পুরুলিয়া বাঁকুড়া পশ্চিম বর্দ্ধমান বীরভূমে গাপ প্রবাহ বেশি হত, কিন্তু এখন কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গেও দীর্ঘস্থায়ী ও আর্দ্র তাপ প্রবাহ বাড়ছে।
কলকাতার ক্ষেত্রে সমস্যা হল এখানে তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতা খুব বেশি থাকে। ফলে ৩৭°C–৩৮°C তাপমাত্রাও শরীরে ৪৫°C-এর মতো অনুভূত হতে পারে। IMD ও গবেষণাগুলি দেখাচ্ছে যে এখন শুধু দিনের নয় রাতের তাপমাত্রাও বাড়ছে—অর্থাৎ রাতেও শরীর ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে কলকাতা বছরে গড়ে প্রায় ৩টি তাপ প্রবাহের এর মুখোমুখি হয়, এবং প্রতিটি গড়ে ৪.২ দিন স্থায়ী হয়। এর সঙ্গে উচ্চ আদ্রতা যোগ হলে ' হিট স্ট্রেস ' ' ডিহাইড্রেশন ' ' হিট সিনকোপ ' এর মতো ঘটনা ঘটে। কিডনির সমস্যা,হৃদরোগে আক্রান্ত হবার সমস্যা বাড়ে। বৃদ্ধ ও শ্রমজীবী, বস্তিবাসী প্রান্তিক মানুষের জীবন জীবিকা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
বিশেষ করে কলকাতা, হাওড়া, দুর্গাপুর, আসানসোলের মতো শহরে ' হিট আইল্যান্ড এফেক্ট ' বা শহুরে তাপদ্বীপের কারণে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামের তুলনায় ২°C থেকে ৫°C পর্যন্ত বেশি হতে পারে। কংক্রিট, ডামর, বহুতল, গাড়ি, এসি, কমে যাওয়া গাছপালা ও জলাভূমি ভরাট—সব মিলিয়ে শহর রাতে তাপ ধরে রাখে। এর ফলে উষ্ণ রাত বাড়ছে, যা শরীরের উপর আরও বেশি চাপ ফেলে।
এর প্রধান কারণই হলো সবুজের আস্তরণ কমা এবং কংক্রিটের আস্তরণ নেড়ে যাওয়া। ২০১১ সালের তুলনায় ২০২১ সালে কলকাতার সবুজের আস্তরণ প্রায় ৩০% কমেছে। ২০১১ সালে শহরে প্রায় ২.৫ বর্গকিমি গাছপালার আবরণ ছিল, যা ২০২১ সালে নেমে হয় ১.৮ বর্গকিমি। অর্থাৎ ০.৭ বর্গকিমি সবুজ হারিয়েছে শহর। এখন Kolkata-র মোট এলাকার ১%-এরও কম অংশে গাছপালার আবরণ আছে।
একই সময়ে কংক্রিট ও কংক্রিটের আবরণ ক্রমাগত বেড়েছে। স্যাটেলাইট সমীক্ষা বলছে ২০০৫ সালে কংক্রিটের আবরণ ছিল ৫২%, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭০.৫%, বর্তমানে তা ৮০%।
কলকাতা এখন স্পষ্টভাবে একটি ' আরবান হিট আইল্যান্ড ' বা “তাপ দ্বীপ” শহরে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ বা কম নির্মিত এলাকার তুলনায় কয়েক ডিগ্রি বেশি হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হল কংক্রিট, ডামর, বহুতল, গাড়ি, এসি, শিল্প ও কমে যাওয়া গাছপালা।
গবেষণায় দেখা গেছে গত ৩০ বছরে Kolkata Metropolitan Area-তে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪.৭২°C বেড়েছে। একই সময়ে নির্মাণ এলাকা প্রায় ৩৩.৭৫% বেড়েছে এবং সবুজের আস্তরণ প্রায় ২৫.৫২% কমেছে। সবচেয়ে বেশি ' হিট আইল্যান্ড এফেক্ট ' দেখা যাচ্ছে মধ্য কলকাতা , উত্তর কলকাতা, হাওড়া , দক্ষিণ কলকাতা ও ই এম বাইপাস ও নিউ টাউন অঞ্চলে।
আরও একটি গবেষণায় দেখা গেছে ১৯৯৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কলকাতার গ্রীষ্মকালীন ভূপৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা প্রায় ৮.৪৩°C বেড়েছে এবং শীতকালীন ভূপৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা প্রায় ৪.৩২°C বেড়েছে। গাছপালা ও কৃষিজমি কংক্রিটে বদলে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
কলকাতার সমস্যা আরও বেশি কারণ এখানে তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতাও খুব বেশি। ' সেন্টার ফর সায়েন্স এ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ' এর গবেষণা অনুযায়ী ভারতের বড় শহরগুলির মধ্যে কলকাতায় গ্রীষ্মকালে আদ্রতা সবচেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে কলকাতার গ্রীষ্মের গড় আদ্রতা ছিল ৭৪.৪%, আর ২০২০ সালে তা ৮১.৩% পর্যন্ত উঠেছিল। ফলে শরীর ঘাম ঝরিয়েও ঠান্ডা হতে পারে না।
কলকাতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণগুলি হল:
জলাভূমি ও খাল ভরাট,বৃক্ষচ্ছেদনে সবুজের আস্তরণ কমে গিয়ে কংক্রিটের আস্তরণ বেড়ে যাওয়া, এসি,যান- বাহন, শিল্প, কালো পিচের রাস্তা, কংক্রিটের বহুতল
এসি, গাড়ি,ডিজেল জেনারেটর থেকে waste heat
সরু রাস্তা ও উঁচু বিল্ডিংয়ের জন্য বায়ু চলাচল কমে যাওয়া - অপরিকল্পিত আগ্রাসী নগরায়ন,
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ভরাট, আদিগঙ্গার জল প্রবাহ কমে যাওয়া পুকুর ও খোলা জমি কমে যাওয়া।
হাওড়া, আসানসোল,দুর্গাপুর, শিলিগুড়িতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শিল্পাঞ্চল, রাস্তা, ফ্লাইওভার, আবাসন প্রকল্প, কমে যাওয়া সবুজের কারণে গরম আরও বাড়ছে। বিশেষ করে আসানসোল, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে কয়লাভিত্তিক শিল্প, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও খনি অঞ্চলের কারণে ' হিট আইল্যান্ড এফেক্ট 'আরও বেশি হতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, কলকাতাতে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান যেমন সবুজের আবরণ, ছাদ বাগান, সাদা রঙের প্রলেপ ছাদ, ভেদ্য ভূমিতল ও জলাশয় রক্ষা করলে স্থানীয় তাপমাত্রা ৪°C থেকে ৮°C পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচার রিসার্চ ২০১১ তে 'ন্যাশনাল ইনোভেশন ইন ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট এগ্রিকালচার ' ( এন আই সি আর এ) গঠন করে, ২০১৯ এ তারা মূল্যায়ন করে বলে যে, ভারতের ৫৭৩ টি কৃষি প্রধান জেলার মধ্যে ১০৯ টি জেলা 'ভেরি হাই ক্লাইমেট রিস্ক', ২৩১ টি জেলা ' হাই ক্লাইমেট রিস্ক ', ৫৯ টি জেলা ' লো ক্লাইমেট রিস্ক ', ২০৪ টি জেলা 'মিডিয়াম ক্লাইমেট রিস্ক ' জেলা বলে অভিহিত। পশ্চিমবাংলায় ' ভেরি হাই ক্লাইমেট রিস্ক ' ক্যাটাগরিতে মালদহ,উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এই তিনটি জেলা রয়েছে, 'হাই ক্লাইমেট রিস্ক' ক্যাটাগরিতে বীরভূম, কোচবিহার, দার্জিলিং, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, হাওড়া, জলপাইগুড়ি, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, পুরুলিয়া, এই ১১টি জেলা রয়েছে। 'হাই ক্লাইমেট রিস্ক' এবং 'ভেরি হাই ক্লাইমেট রিস্ক' জেলা মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে দেশের ৩১০ টির মধ্যে ১৪টি জেলা নিয়ে ৭ নম্বর স্থানে রয়েছে।
কৃষি বীমার ক্ষেত্রে এক অদ্ভূত অসামঞ্জস্য রয়েছে। কৃষক প্রতি মোট বীমাকৃত অর্থ ' ভেরি হাই ক্লাইমেট রিস্ক ' জেলার ক্ষেত্রে কম অর্থাৎ ফসল ক্ষতির সময় যে ক্ষতিপূরণ 'ভেরি হাই ক্লাইমেট রিস্ক ' জেলার কৃষক পাবেন তা 'মিডিয়াম', 'লো' বা ' ভেরি লো ক্লাইমেট রিস্ক ' জেলার থেকে কম - ২০ শতাংশ কম। সংখ্যায় কম বলে বীমার নিয়ম অনুসারে প্রিমিয়াম বেশি দিতে হয় ফলে সরকারের দেয় ভাগও কম হয়, ফলে প্রাপকের প্রাপ্য কম হয়ে যায়, যদিও তারা সবথেকে ক্ষতিগ্রস্থ। সরকারের এ বিষয়ে আবশ্যিকভাবে নজর দেওয়া উচিৎ।
হিট ওয়েভ ইনসিওরেন্স
অসুরক্ষিত শ্রমিকদের তাপপ্রবাহের প্রভাবে জীবিকা ও স্বাস্থ্য রক্ষার প্রশ্নে তাপ প্রবাহ বিমার চাহিদা বাড়ছে। একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছুলে বা কয়েক দিন ধরে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বিরাজমান থাকলে শ্রমিকদের বীমাজাত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়, এই বিমার মাধ্যমে প্রদান করা অর্থের পরিমাণ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির উপর ভিত্তি করে হয়।
সেল্ফ এমপ্লয়েড উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন (SEWA) ভারতের কতকগুলো রাজ্যে 'হিট ওয়েভ ইনসিওরেন্স' কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাদের দাবি মতো দেশে ৩ টি রাজ্যের ২২ টি জেলার ৭টি শিল্পক্ষেত্রে ৪৬,০০০ মহিলা শ্রমিক বীমার সুবিধা গ্রহণ করেছে।
কেরালা সরকারের কাজের ঘন্টা সম্পর্কিত ইতিবাচক পদক্ষেপ:
কেরালা সরকার ২০২৫ এর ১১ ই ফেব্রুয়ারি নোটিফিকেশন জারি ক'রে ঘরের বাইরের শ্রমিকদের কাজের ঘন্টা এবং বিশ্রামের সময় বেঁধে দিয়েছে। কাজের সময় কাল কমিয়ে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যে ৭ টার মধ্যে ৮ ঘন্টা কাজের সময় বেঁধে দিয়েছে। দুপুর ১২ টা থেকে ৩টে পর্যন্ত বিশ্রামের সময় রাখা হয়েছে। দেখভালের জন্য নির্দিষ্ট টিম গঠন করা হয়েছে যারা পরিদর্শন করবে বিশেষত ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং রাস্তা নির্মাণ ক্ষেত্রে। ৩০০০ ফিটের উপরে এই নির্দেশিকায় ছাড় আছে। 'কেরালা স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি ' গিগ শ্রমিকদের তাপ প্রবাহের ক্ষেত্রে কোম্পানির মালিকদের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ পাঠিয়েছে।
১১ টি রাজ্যকে মানবাধিকার কমিশনের চিঠি
পয়লা মে ২০২৫ এ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ক'রে দেশের এগারোটা রাজ্যকে এই গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহ থেকে অসুরক্ষিত (ভালনারেবল) মানুষজনকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছে। ১১ টি রাজ্যের মুখ্য সচিবকে চিঠি দিয়ে ছাউনির ব্যবস্থা, ত্রাণ, কাজের ঘন্টার সংশোধন, তাপপ্রবাহ জনিত অসুস্থতার চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে বলা হয়েছে। রাজ্যগুলি হল পাঞ্জাব হরিয়ানা উত্তরপ্রদেশ বিহার ঝাড়খণ্ড পশ্চিমবঙ্গ উড়িষ্যা অন্ধ্রপ্রদেশ তেলেঙ্গানা মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থান।
তাপ প্রবাহ নোটিফায়েড বিপর্যয় নয়
ভারত সরকার সমস্ত রাজ্যকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় 'হিট অ্যাকশন প্ল্যান 'তৈরি করা নির্দেশিকা জারি করেছেন, তাপ প্রবাহের তীব্র ক্ষতির কথা সংসদে বলছেন, তাপ প্রবাহ প্রশমনে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন কিন্তু প্রবাহকে 'ডিজাস্টার' বা বিপর্যয় বলে নোটিফিকেশন জারি করছেন না - ফলতঃ তাপপ্রবাহ জনিত বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে 'ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৫ ' এর আওতাধীন আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়না।' আইএমডি' বলছে ২০২৪ সালে ৫৩৬ টি তাপ প্রবাহ দিন ছিল - ১৪ বছরের মধ্যে যা সর্বাধিক। সম্প্রতি বিপর্যয় ব'লে যে তালিকা প্রকাশ করেছে 'ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফান্ড' এবং 'স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফান্ড ' তাতে নানান বিপর্যয়ের নাম আছে কিন্তু তাপ প্রবাহের নাম নেই। নাম আছে সাইক্লোন খরা ভূমিকম্প আগুন বন্যা সুনামি তুষারপাত ভূমিধ্বস তুষারধ্বস মেঘভাঙ্গা বৃষ্টি , পতঙ্গের আক্রমণ, শৈত্যপ্রবাহ, হিমানী প্রবাহ।
বায়ু দূষণ
বায়ু দূষণের ক্ষেত্রেও কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলি উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে। PM2.5—অর্থাৎ খুব সূক্ষ্ম ধূলিকণা—সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এগুলি সরাসরি ফুসফুস ও রক্তে ঢুকে যেতে পারে। কলকাতার গড় PM2.5 মাত্রা ২০২৫ সালে প্রায় ৫১ µg/m³ ছিল, যা WHO-এর নিরাপদ সীমা ৫ µg/m³-এর ১০ গুণেরও বেশি।
২০২২ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে Kolkata-র গড় PM2.5 কিছুটা কমে ৫০ µg/m³ থেকে ৪৫ µg/m³ হয়েছে, কিন্তু তা এখনও ভারতের জাতীয় মানদণ্ড ৪০ µg/m³-এর উপরে। যাদবপুর, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়,হাওড়া,ফোর্ট উইলিয়াম,বিধাননগরের মতো monitoring station-এ অনেক সময় দূষণের মাত্রা বেশি পাওয়া যায়।
শীতকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ডিসেম্বর ২০২৪এ কলকাতার PM2.5 ছিল ৭৩ µg/m³ এবং জানুয়ারী ২০২৫ এ এ ৭৭ µg/m³ কারণ শীতকালে হাওয়া কম থাকে, কুয়াশা ও temperature inversion এর কারণে ধোঁয়া ও ধূলিকণা নিচে আটকে যায়।
কলকাতা এবং আশেপাশের বায়ু দূষণের প্রধান উৎসগুলি হল:পুরনো ডিজেল বাস, ট্রাক ও গাড়ি,
কয়লাভিত্তিক শিল্প ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র
নির্মাণকাজ ও রাস্তার ধুলো,খাবারের হেটেল গুলির কয়লা জ্বালানি, বর্জ্য পোড়ানো,ডিজেল জেনারেটর ইত্যাদি।
হাওড়া, দুর্গাপুর,আসানসোলের শিল্পাঞ্চলের দূষণও মাত্রা ছাড়ায়।
একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে কলকাতা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বড় শহরগুলির মধ্যে একটি ছিল, এবং ২০১৯ সালে শহরের গড় PM2.5 ছিল ৫৯.৮ µg/m³। ২০২৫ এ কলকাতা বিশ্বের ১০ টি দূষিততম শহরের একটি ছিল।
ভূগর্ভস্থ জলের অবনমন
দক্ষিণবঙ্গের বহু জেলায় ভূগর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ২০১৭-২০২১ সালের গড়ের তুলনায় দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জলের স্তর ২.৫৩ মিটার (২৭.৮%) নেমেছে, কলকাতায় ২.১২ মিটার (১৮.৬%)।
বাঁকুড়া পুরুলিয়া বীরভূম হুগকি পূর্ব মেদিনীপুর , পূর্ব বরৃদ্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনার বহু এলাকায় বর্ষার আগে ও পরে ভূগর্ভস্থ জলের স্তরে ২ মিটারের বেশি ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ হল কৃষি ও সেচের জন্য অতিরিক্ত জল তোলা হচ্ছে, কিন্তু পুনরায় recharge যথেষ্ট হচ্ছে না।
বোরো ধান, গভীর নলকূপ, অনিয়ন্ত্রিত সেচ এবং জলনির্ভর চাষের ফলে কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলস্তর নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেচের খরচ বাড়ছে, চাষের জমি অনুৎপাদনশীল হচ্ছে এবং বহু জায়গায় ফলন কমে যাচ্ছে।
বিশুদ্ধ পানীয় জল
NFHS-5 (2019-21) এবং সাম্প্রতিক WASH গবেষণা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯৩.৩% পরিবার উন্নত পানীয় জলের উৎস ব্যবহার করে। এর মধ্যে পাইপের জল, handpump, tubewell, protected well, borewell ইত্যাদি ধরা হয়েছে।
তবে ' উন্নত উৎস ' মানেই সবসময় “বিশুদ্ধ” বা সংক্রমনমুক্ত জল নয়। আর্সেনিক, লোহা, জীবানু সংক্রমন, নিকাশি জল মিশ্রন ও পাইপ ফুটো হওয়র কারণে বাস্তবে নিরাপদ বা বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া পরিবারের হার অনেক কম। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৩৩.৭% পরিবারের ক্ষেত্রে পানীয় জলের উৎস, অভিগম্যতা এবং গুণমান—তিনটি মানদণ্ডই একসঙ্গে পূরণ হয়। অর্থাৎ কাগজে প্রায় ৯৩% পরিবার উন্নত উৎস পায় কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিশুদ্ধ পানীয় জল পায় সম্ভবত এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি পরিবার।
বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও শহরতলিতে সরকারি পানীয় জলের উপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ হল দূষণ—বিশেষত আর্সেনিক, লোহা, নোংরা পাইপলাইন, নিকাশি জল মিশ্রন এবং অনেক জায়গায় জল ঘোলা বা দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া, লবনাক্ত হওয়া।
পশ্চিমবঙ্গের ৮টি জেলার ৭৯টি ব্লকে অতিরিক্ত আর্সেনিকের সমস্যা ধরা পড়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা,নদীয়া,মুর্শিদাবাদ,মালদহ,বর্দ্ধমান,হুগলি,হাওড়ার বহু মানুষ বহু বছর ধরে টিউবওয়েলের জলকে “ঝুঁকিপূর্ণ” বলে মনে করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২.৬ কোটি মানুষ আর্সেনিকযুক্ত জলের ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। অনেক জায়গায় মানুষ জানেন যে সরকারি টিউবওয়েল বা পাইপের জল “নিরাপদ” বলা হলেও বাস্তবে তার রং, গন্ধ বা স্বাদ নিয়ে সন্দেহ থাকে।
ফলে অনেক পরিবার এখন বোতলের জল, filter, RO machine, private tanker বা deep borewell-এর উপর নির্ভর করে। যাদের সামর্থ্য নেই, তারা অনেক সময় “কম খারাপ” বলে মনে হওয়া জল বেছে নেয়। অনেক জায়গায় মানুষ সরকারি জলের থেকে private filter water বা jar water-কে বেশি বিশ্বাস করেন, যদিও সেগুলিও সবসময় নিরাপদ নয়।
নদী দূষণ ও সংকট
CPCB ও West Bengal Pollution Control Board-এর হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে অন্তত ১১টি নদী “polluted river stretch” তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যাধরী, মহানন্দা,চূর্ণী,দামোদর,দ্বারকেশ্বর,দ্বারকা,গঙ্গা,জলঙ্গী,মাথাভাঙা, ময়ুরাক্ষী এবং তিস্তা নদী। পুরনো CPCB তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের ১৭টি দূষিত নদীর কথা বলা হয়েছিল। সেখানে উপরোক্ত নদীগুলির পাশাপাশি বরাকর,কালজানি, করোলা,রূপনারায়ন,শিলাবতী,কাঁসাই নদী ছিল - বলা হচ্ছে এখন এগুলি দূষণমুক্ত হয়েছে।
নদীর বালি মাটির অবৈধ উত্তোলন
পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ বালি - মাটি - পাথর তোলা সবচেয়ে বেশি হয় পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি নদীতে। এর ফলে নদীর গভীরতা বদলে যায়, সেতু দুর্বল হয়, নদীভাঙন বাড়ে, ভূগর্ভস্থ জলের recharge কমে যায় এবং মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নদীগুলির মধ্যে রয়েছে:
অজয় নদী— বীরভূম ও পশ্চিম বর্দ্ধমান অঞ্চলে ব্যাপক অবৈধ বালি তোলা হয়। অনেক জায়গায় নদীর তলদেশ কয়েক মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে।
দামোদর নদী — দুর্গাপুর, বর্দ্ধমান, বাঁকুড়া,হুগলি অঞ্চলে অবৈধ বালি খনন এক বড় সমস্যা। এতে সেতু, বাঁধ ও কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে।
ময়ুরাক্ষী নদী — বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এলাকায় অতিরিক্ত বালি তোলার অভিযোগ রয়েছে। এতে নদীর প্রবাহ ও চরিত্র বদলাচ্ছে।
দ্বারকেশ্বর নদী — বাঁকুড়া ও হুগলি অঞ্চলে নদীবক্ষ খনন খুব সাধারণ। বর্ষায় নদীভাঙন ও বন্যা বাড়ে।
শিলাতী নদী — পশ্চিম মেদিনীপুরে বালি ও মাটি তোলার জন্য পরিচিত।
কংসাবতী নদী — নদীর চর ও তলদেশ থেকে ব্যাপক বালি তোলা হয়।
সুবর্ণরেখা নদী — ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চলে বালি খনন হয়।
তিস্তা নদী — উত্তরবঙ্গে তিস্তার চর ও নদীবক্ষ থেকে বালি ও পাথর তোলা হয়। এর ফলে নদীর গতিপথ ও ভূমিক্ষয় বাড়ছে।
তোর্ষা নদী — কোচবিহার অঞ্চলে বালি ও পাথর তোলা হয়।
জলঢাকা নদী — উত্তরবঙ্গে পাথর খাদান ও বালি খননের প্রভাব রয়েছে।
মহানন্দা নদী — শিলিগুড়ি অঞ্চলে বালি ও পাথর তোলার ফলে নদীভাঙন বাড়ছে।
বিশেষ করে বীরভূম, বাঁকুড়া,পশ্চিম বর্দ্ধমান,পশ্চিম মেদিনীপুর,মুর্শিদাবাদ,জলপাইগুড়ি, কোচবিহার,শিলিগুড়ি অঞ্চলে এই সমস্যা বেশি। অনেক জায়গায় রাতের অন্ধকারে ট্রাক, ট্রাক্টর ও earthmover দিয়ে বালি তোলা হয়।
পরিবেশবিদদের মতে অবৈধ বালি তোলার ফলে:
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলায়,সেতু ও বাঁধ দুর্বল হয়,
বর্ষায় ভাঙন ও বন্যা বাড়ে, ভূগর্ভের রিচার্জ কমে,
মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়,নদী দ্রুত শুকিয়ে যায়,কৃষিজমি ও নদীর ধার ভেঙে পড়ে।
সংকটাপন্ন নদী
পশ্চিমবঙ্গের বহু নদী এখন দূষণ, পলি জমা, দখল, বালি তোলা, শিল্পবর্জ্য, কমে যাওয়া জলপ্রবাহ ও নদীভাঙনের কারণে সংকটে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় থাকা নদীগুলির মধ্যে রয়েছে:
চূর্ণী নদী — বাংলাদেশের দিক থেকে দূষিত জল ও পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় শিল্পবর্জ্যের কারণে চূর্ণীর জল অনেক জায়গায় কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়। মাছ মারা যায় ও সেচের সমস্যা হয়।
মাথাভাঙা নদী — পলি জমা, কমে যাওয়া প্রবাহ ও শাখানদীগুলির বুজে যাওয়ার কারণে নদীটি অনেক জায়গায় সরু হয়ে গেছে।
মরালি নদী — অতিরিক্ত পলি জমা ও দখলের কারণে বহু অংশে প্রায় মৃত নদীতে পরিণত হয়েছে।
পাগলাচন্ডী নদী — বর্ষায় বন্যা ও শুকনো মৌসুমে জলশূন্যতার মধ্যে দুলতে থাকা নদী। দখল ও পলি জমাও বড় সমস্যা।
জলঙ্গী নদী — উপরের প্রবাহ কমে যাওয়া, পলি জমা ও নদীভাঙনের কারণে সংকটে রয়েছে।
ভাগীরথী নদী — পলি জমা, দখল, দূষণ ও নদীভাঙনের কারণে বহু জায়গায় প্রবাহ কমেছে। মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় নদীভাঙন ভয়াবহ।
হুগলি নদী — শিল্পবর্জ্য, পয়ঃপ্রণালী, প্লাস্টিক ও বন্দর কার্যকলাপের কারণে দূষণ বাড়ছে। কলকাতা ও হাওড়া অঞ্চলে জলের গুণমান খুব খারাপ ।
দামোদর নদী — কয়লাভিত্তিক শিল্প, তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, খনি ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্যে দূষিত। দুর্গােুর - আসানসোল অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি।
অজয় নদী — অবৈধ বালি তোলা, ক্ষয়, পলি জমা ও বর্ষায় হঠাৎ বন্যা বড় সমস্যা।
ময়ুরাক্ষী নদী — পলি জমা ও অতিরিক্ত জলধারণের কারণে বন্যা ও নদীখাত পরিবর্তনের সমস্যা রয়েছে।
তিস্তা নদী — বাঁধ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, অতিবৃষ্টি, ধস ও প্রবাহ পরিবর্তনের কারণে তিস্তা অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের 'গ্লেসিয়াল লেকবার্স্ট' জনিত বন্যার পরে এর ক্ষয় ও চরিত্র আরও বদলেছে।
মহানন্দা নদী — শিলিগুড়ি অঞ্চলে দূষণ, দখল ও পলি জমার কারণে সংকটে।
তোর্ষা নদী — নদীভাঙন ও চর সৃষ্টির কারণে প্রতি বছর কৃষিজমি হারিয়ে যায়।
কালজানি নদী — উত্তরবঙ্গে বর্ষায় তীব্র নদীভাঙন ও চর পরিবর্তনের জন্য পরিচিত।
এছাড়া আরও কয়েকটি নদী কার্যত মৃত বা মৃত্যুর মুখে রয়েছে— অঞ্জনা, বেহুলা, কুন্তি, সর্স্বতী,ভৈরব, কঙ্কনা, চৈতী নদী । এদের অনেক জায়গায় নদীখাতের ওপর বসতি, রাস্তা, বাজার, চাষের জমি বা পুকুর তৈরি হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নদীগুলির প্রধান সংকট হল:নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া,অতিরিক্ত পলি জমা,অবৈধ বালি তোলা,নদীখাত দখল,শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃপ্রণালীর দূষণ,জলাভূমি ও খাল বুজে যাওয়া, বাঁধ - ব্যারাজের প্রভাব,জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের বৃদ্ধি।এসবের ফলে একই নদীতে বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা এবং গ্রীষ্মে প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার মতো দুই বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
সংকটে ইছামতী
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সংকটাপন্ন নদী। এটি ভারত- বাংলাদেশ সীমান্তের বহু অংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ, বাদুড়িয়া, বসিরহাট, টাকি , হাসনাবাদ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত ।
ইছামতী নদীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল শুকনো মৌসুমে জলপ্রবাহ খুব কমে যাওয়া। উপরে নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল ও শাখানদীগুলি বুজে যাওয়া, পলি জমা, দখল, জলাভূমি ভরাট এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যাওয়ার ফলে নদীটি বহু জায়গায় সরু হয়ে গেছে।
বর্ষাকালে নদী ফুলে ওঠে, কিন্তু শীত ও গ্রীষ্মে অনেক জায়গায় নদীর গভীরতা ও প্রবাহ খুব কমে যায়। এর ফলে মাছ ধরা, নৌযান, সেচ এবং স্থানীয় জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও একটি বড় সমস্যা হল দূষণ। ইছামতী নদীতে পয়ঃপ্রণালীর জল, প্লাস্টিক, বাজার ও শহরের বর্জ্য, কৃষিজমির রাসায়নিক এবং স্থানীয় শিল্পের বর্জ্য এসে মেশে। বিশেষ করে উৎসবের পরে মূর্তি বিসর্জন ও প্লাস্টিক দূষণও নদীর উপর চাপ বাড়ায়।
গবেষকরা বলছেন, ইছামতী নদীর সঙ্গে যুক্ত বহু পুরনো খাল, বিল ও জলাজমি হারিয়ে যাওয়ায় নদীর প্রাকৃতিক ' রিচার্জ ' কমে গেছে। এর ফলে একই নদীতে বর্ষায় বন্যা এবং গ্রীষ্মে জলাভাব—দুই সমস্যাই বাড়ছে।
বিদ্যাধরী, যমুনার এবং মতো নদীগুলিতেও একইভাবে পলি জমা, দখল ও জলপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ।
উন্নয়নে পাহাড় বিক্রি
পুরুলিয়া ও সংলগ্ন পশ্চিমাঞ্চলে যেসব পাহাড়কে ঘিরে “বিক্রি”, লিজ বা খনি–খাদান বিরোধী আন্দোলন হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল—
তিলাবনি পাহাড়,পাহাড়িগোড়া পাহাড়,বেরো পাহাড়,চণ্ডী পাহাড়,ধোবা পাহাড়,পানজনিয়া পাহাড়,মাঠাবুরু / মাথা পাহাড়,জয়চণ্ডী পাহাড়ের আশপাশ,পাঞ্চেত পাহাড় অঞ্চলের কিছু অংশ,অযোধ্যা পাহাড়ের কিছু অংশ।
তিলাবনি পাহাড়কে ঘিরে সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয়েছে। স্থানীয় আদিবাসী মানুষজনের সাথে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ আন্দোলনে যুক্ত হয়। ২০১৯ সালে পাহাড়টি গ্রানাইট উত্তোলনের জন্য লিজ দেওয়া হয়। এরপর তিলাবনি, লেবাবোনা, মাধবপুর ও পারশিবনা গ্রামের আদিবাসী ও স্থানীয় মানুষ আন্দোলনে নামেন। তারা বলেন পাহাড়টি তাদের জল, পশুখাদ্য, কেন্দু পাতা, ঔষধি গাছ, চাষের জল, পর্যটনের উৎস এবং সাংস্কৃতিক মিলনস্থান। গ্রামের মহিলারাও কালো পতাকা নিয়ে মিছিলে অংশ নেন। গ্রামবাসীরা তিলাবনি পাহাড় বাঁচাও কমিটি তৈরী করে আন্দোলন গড়ে তোলেন, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ যুক্ত হয় - ফলস্বরূপ এখনও পর্যন্ত তিলাবনিকে রক্ষা করা গেছে।
পাহাড়িগোড়া পাহাড় নিয়েও স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটি তিলাবনি অঞ্চলের কাছাকাছি এবং একই ধরনের গ্রানাইট খাদানের চাপে রয়েছে। গ্রামবাসীরা আশঙ্কা করেন যে পাহাড় কাটলে ঝরনা শুকিয়ে যাবে, চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হাতির চলাচলের পথ নষ্ট হবে। গ্রামবাসীরা কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ সহায়তা করে - পাহাড়টিকে এখনও পর্যন্ত রক্ষা করা গেছে।
বেরো পাহাড়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষ অভিযোগ করেছেন যে বিস্ফোরণ ও পাথর তোলার ফলে ঘরবাড়িতে ফাটল ধরছে, ধুলোয় ফসল নষ্ট হচ্ছে এবং আশপাশের জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়টি পর্যটনের জন্যও পরিচিত, তাই অনেকে চান এটি খাদান নয়, পর্যটন ও সংরক্ষণের জায়গা হিসেবে থাকুক।
চণ্ডী পাহাড় ও ধোবা পাহাড়কে ঘিরেও একই ধরনের আন্দোলন হয়েছে। গ্রামবাসীরা বলেন, এই পাহাড়গুলো বর্ষার জল ধরে রাখে এবং আশপাশের কুয়ো, পুকুর ও জমিতে জল জোগায়। খাদান শুরু হলে জলস্তর কমে যায়, ধুলো দূষণ বাড়ে এবং বনজ সম্পদ কমে যায়।
পানজনিয়া পাহাড়ে এখনো গ্রানাইট খনি চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পানজনিয়া, দেশড়া ও সিন্দুরপুর গ্রামের মানুষ প্রতিবাদে নেমেছেন। তারা বলেন, বিস্ফোরণের ফলে কুয়ো শুকিয়ে যাচ্ছে, ধুলোয় ফসল ঢেকে যাচ্ছে এবং পাহাড় হারালে তাদের গবাদি পশুর চরার জায়গা থাকবে না। ২০২৫–২৬ সালে ছাত্র, গবেষক ও গ্রামবাসীরা যৌথভাবে পাহাড় বাঁচানোর নীরব আন্দোলনও করেন।
মাঠাবুরু বা মাথা পাহাড় সরাসরি বড় খনি বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র না হলেও অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে পাথর খাদান, বন কাটা ও অতিরিক্ত পর্যটনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভ রয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, পাহাড়ের বন নষ্ট হলে হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর চলাচল কমে যায় এবং গরম ও জলসংকট বাড়ে।
অযোধ্যা পাহাড় ও পাঞ্চেত পাহাড় অঞ্চলেও ছোট ছোট খাদান, রাস্তা নির্মাণ ও পর্যটন প্রকল্প নিয়ে আপত্তি উঠেছে। স্থানীয় আদিবাসী মানুষ মনে করেন, পাহাড় শুধু পাথরের স্তূপ নয়; এটি তাদের দেবতা, উৎসব, বনজ পণ্য, চাষ, গবাদি পশু ও পানীয় জলের উৎস।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
পশ্চিমবঙ্গের কঠিন বর্জ্য এবং তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও বড় পরিবেশ সংকট।
Solid waste বা কঠিন বর্জ্যের ক্ষেত্রে কলকাতা সবচেয়ে বড় উৎস। রাজ্যের ১২৫টি urban local body মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩,৭০৮ টন municipal solid waste তৈরি হয়। এর মধ্যে একা কলকাতাতেই প্রায় ৪,৫০০-৫,৩০০ টন বর্জ্য প্রতিদিন তৈরি হয়।
কলকাতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বর্জ্য পৃথজীকরণ কম হওয়া। শহরের বর্জ্যের মধ্যে প্রায় ৩০% জৈব সার যোগ্য এবং প্রায় ১৫% পূনর্নবীকরণযোগ্য হলেও বাস্তবে তার বড় অংশ আলাদা করা হয় না। ফলে প্লাস্টিক, খাবারের বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, ইলেকট্রনিক বর্জ্য সব একসঙ্গে dumpyard-এ যায়।
ResearchGate +1
Dhapa Dumping Ground বহু দশক ধরে কলকাতার বর্জ্যের প্রধান dumping site। এখানে প্রতিদিন ৫,০০০ টনের বেশি বর্জ্য আসে, শুধু কলকাতা নয়, সল্টলেক, নিউ টাউন, পানিহাটি ও হাওড়া থেকেও বর্জ্য আসে। এই dumpyard-এ legacy waste, leachate, প্লাস্টিক, মিথেন গ্যাস ও আগুনের সমস্যা রয়েছে। ২০২৫ সালে এখানে নতুন Material Recovery Facility চালু হয়েছে, যা দিনে ১০০ টন dry waste process করতে পারে, সঙ্গে plastic ও thermocol processing unit-ও তৈরি হয়েছে।
তরল বর্জ্য বা sewage-এর ক্ষেত্রেও কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে। রাজ্যের শহর এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ২,৭৫৮ মিলিয়ন লিটার বর্জ্য তৈরি হয় এবং rural এলাকায় আরও প্রায় ১,৪০০ মিলুয়ন লিটার তরল বর্জ্য তৈরি হয়।
শুধু কলকাতাতেই প্রতিদিন প্রায় ১,৪০০ মুলিয়ন টন তরল বর্জ্য তৈরি হয়। কিন্তু শহরের STP-গুলি মিলিয়ে মাত্র ১৭৯ মুলুয়ন লিটার তরল বর্জ্য শোধন করতে পারে। বাকি অংশের বড় অংশ পূর্ব কলকাতা জলাভূমি স্বাভাবিকভাবে শোধন করে, তবুও প্রতিদিন প্রায় ৩১১ মিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য হুগলি, টালি নালা ও অন্যান্য খালে গিয়ে পড়ে।
Telegraph India +1
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক নোংড়া জলের শোধনাগারগুলির। এটি কলকাতার ৬০-৮০% নোংড়া জলকে ব্যাকটেরিয়া, এ্যালগি, সূর্যের আলোতে প্রাকৃতিকভাবে শোধন করে এবং প্রায় ৫০,০০০ মানুষের জীবিকা, মাছচাষ ও কৃষিকে রক্ষা করে। কিন্তু জলাভূমি ভরাট ও দখল বাড়লে এই প্রাকৃতিক নোংড়া জলের শোধনাগারও বিপদে পড়বে।
আরও একটি বড় সমস্যা হল শিল্প বর্জ্য। কলকাতা লেদার কমপ্লেক্সের চামড়ার বর্জ্য শোধনের জন্য জন্য Common Affluent Treatment Plant ( CETP) থাকলেও বহুবার chromium-rich sludge, অপরিশোধিত বর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য রাস্তার ধারে বা খালে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে surface water ও groundwater দূষণের ঝুঁকি বাড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কিছু উন্নতি হয়েছে। গত পাঁচ বছরে Hooghly basin-এ ৩২টি STP চালু হয়েছে, যেগুলির মোট capacity ৫৫৪ million litres per day। এর ফলে হুগলি নদীর জলের গুনমাণ কিছুটা ভালো হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের বন্যা
২০২৫ এর ৫ ই অক্টোবরে উত্তরের চারটি জেলা দার্জিলিং জলপাইগুড়ি আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে বন্যা - ধসের ঘটনায় তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে।
১) বনাঞ্চল থেকে ভেসে আসা অসংখ্য গাছ এবং লগ।
২) অত্যধিক পলি-মাটির অভূতপূর্ব অধঃক্ষেপণ।
৩) অসংখ্য বন্য প্রাণীর মৃত্যু ও ভেসে আসা মৃতদেহ।
এর প্রতিটি জলবায়ু পরিবর্তন, বন ধ্বংস ও ভূমির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বাস্তব ফলাফল।
বনাঞ্চল থেকে ভেসে আসা কাট - গাছঃ
*ভারী বৃষ্টি পাহাড়ি ঢালে গাছ সহ ভূমিধসে লগ এবং জঙ্গলের ধ্বংসাবশের এর প্রবল স্রোত নামে।
এটি debris laden flash flood নামে পরিচিত যা সাধারন বন্যার তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।
*বনচ্ছেদন এবং ঢালের অস্থিতিশীলতা হিমালয়ের পাদদেশে debris laden flood নিচে 'লগ' এবং সম্পূর্ণ গাছ বহন করেছে।
* বনচ্ছেদন, অবৈধ 'লগিং ' ও রাস্তা নির্মাণে মাটির স্থায়িত্ব নষ্ট হয়।
*অতিবৃষ্টিতে এই ডাল ভেঙ্গে পড়ে ফলে গাছপালা ও মাটি একসঙ্গে নদীর স্রোতে নামে।
* গাছ ও কাঠের টুকরো নদীর প্রবাহ রোধ করে ফলে সাময়িক বাধার সৃষ্টি করে যা পড়ে ভেঙে দিয়ে আকস্মিক বন্যা ঘটায়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে শেকড় উপড়ানো গাছের প্রবাহ এক প্রাকৃতিক বাধা সৃষ্টি করে- তিস্তা অববাহিকায় বন্যার প্রভাবকে বাড়িয়ে তোলে ( ডাউন টু আর্থ, অক্টোবর ২০২৫)।
*স্থানীয় স্তরে দেখা গেল
জলপাইগুড়ি ও মালবাজারে শত শত কাঠ ভেসে আসার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এই লগগুলির অধিকাংশই ছিল তিস্তা ও মূর্তি নদীর উজানে বনাঞ্চল থেকে (কালিম্পং, নেওড়া ভ্যালি)।
*পলি ও মাটির প্রবাহ
হিমালয়ের পাদদেশে নদী গুলিতে বিশেষত তিস্তা তোর্সা জলঢাকা ভারী বৃষ্টিতে ব্যাপক পদক্ষেপ ঘটে। এই পলি-মাটি আসে পাহাড়ি নদী এবং ভূমিধসের মাধ্যমে পাহাড় থেকে।
*পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কোচবিহার জেলার মাথাভাঙা ১ নম্বর ব্লকের জমিতে জমে থাকা পলি-মাটির নমুনা সংগ্রহ ক'রে উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়। পরীক্ষার ফল যা জানা যায় তা হলো এটা নদীর পলি। এরপর অন্য জায়গার পলি-মাটিরও পরীক্ষা করা হবে ।
তিস্তা অববাহিকা হিমালয়ের নদী গুলির মধ্যে সবথেকে বেশি অধঃক্ষেপনের ভার বহন করে, যার পরিমাণ প্রতি বছরে হেক্টরপ্রতি ৯৮.৪ ঘন কিউব (ইন্ডিয়ান জিওগ্রাফার্স ইউনিয়ন জার্নাল ২০২৩)।
*ভূমিধসে মাটি পাথর ও উদ্ভিদবর্জ্য নদীতে মিশে প্রবাহের গতি কমিয়ে দেয়।
* নদীর তলদেশ উঁচু হয় - জল ধারণ ক্ষমতা কমে বন্যা তীব্র হয়। তীব্র হয় বন্যা - তীব্র হয় নদীর স্রোত।
*ঘোলাটে জলে জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে ও সালোকসংশ্লেষ বন্ধ হয়।
বাস্তব চিত্র
তিস্তা এবং মূর্তি নদীর জমা অধঃক্ষেপনে তাদের নদী সংস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে, দুই দশকের বেশি সময়ে ২০% ধারণক্ষমতা কমছে।
৩)বন্যপ্রাণীর মৃতদেহ ভেসে আসা ও জীব বৈচিত্রের ক্ষতিঃ
*অত্যধিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢাল ভেঙে পড়ার বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে। প্রধানত গরুমারা চাপড়ামারি জলদাপাড়া ও নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের অভ্যন্তরেই বেশি ক্ষতি হয়।
অতিবৃষ্টি এবং বন্যাকবলিত আশ্রয়স্থল ভেঙে পড়ার কারণে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে বন্যপ্রাণীর অভূতপূর্ব স্থানচ্যুতি ঘটে (জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ফিল্ড রিপোর্ট২০২৫)।
*বন্যায় বহু প্রাণ ভেসে এসেছে - হরিণ, বুনো শুকর, পাখী,এমনকি হাতির মৃতদেহ পর্যন্ত পাওয়া গেছে নদীর পাড়ে। এটি প্রমাণ করে যে বন্যার স্রোতে পাহাড়ি জঙ্গল ও নদীর তীরবর্তী বন্যপ্রাণ গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বাস্তুতন্ত্রগত প্রভাব
*বাস্তুতন্ত্রে খাদ্য শৃংখলে ভাঙ্গন ঘটেছে।
* নদী তীরবর্তী বনভূমিতে জৈব পদার্থের পচনে জলদূষণ
হয়েছে।
* প্রজনন ঋতুতে এমন বিপর্যয় জীব বৈচিত্রের চরম ক্ষতি। *২০২৫ সালে উত্তরবঙ্গের বন্যা মিশ্র বিপদের উদাহরণ সৃষ্টি করল - জল বিদ্যাগত,বাস্তুতন্ত্রগত এবং জলবায়ুগত - একত্রে কার্যকর হয়েছে (নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ লেটার্স ২০২৫)
৫)যা করণীয়
*পাহাড়ের ঢালে সুস্থিতকরণ এবং উদ্ভিদ সমূহকে ফিরিয়ে আনা। পাহাড়ি ঢালে বাঁশ,শালের মতো শক্ত শিকড়ের গাছ রোপন।
* ফরেস্ট বাফার ম্যাপিংঃ জিআইএস ভিত্তিক বাফার জোন নির্ধারণ, যেখানে বনচ্ছেদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
* সেডিমেন্ট মনিটরিং স্টেশনঃ তিস্তা ও তার উপনদী গুলিতে sediment gauge স্থাপন।
* আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম: ভূকম্প বৃষ্টিপাত ভূমিদাস সেন্সরযুক্ত ইন্টিগ্রেটেড ল্যান্ড স্লাইড ওয়ার্নিং সিস্টেম
স্থাপন (আইআইটি খড়গপুর ২০২৪ এর প্রস্তাব অনুযায়ী)। *ওয়াইল্ডলাইফ করিডর রিহ্যাবিলিটেশনঃ গরুমারা, চাপড়ামারি, জলদাপাড়া সংযোগের বন্যপ্রাণ করিডরের পুনর্গঠন।
*নদীগর্ভে মানুষের বসবাস, নদীগর্ভে এবং নদীর গায়ে হোমস্টে নিষিদ্ধ করা।
স্মার্ট সিটিঃ
'স্মার্ট সিটি' ধারণায় নগরায়নের সাথে প্রযুক্তিগত আধুনিকতা, যুক্তিযুক্ত পরিকাঠামো, পরিবহন ও উন্নয়ন। একদিকে উন্নয়ন অন্যদিকে পরিবেশ ও বাসযোগ্যতার দিক থেকে সচেতন।
কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকায় স্মার্ট সিটি পরিকল্পনাঃ *ইলেকট্রিক বাস, ফেরি, রাস্তা ও ট্রানজিট নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণ।
তবে স্মার্ট সিটি ধারণার সাথে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা এখনও তুলনায় সীমিত বলেই দেখা যাচ্ছে।
বায়ু দূষণের চিত্র ও স্মার্ট সিটি সংযোগঃ
*২০২৪ এ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব শহরে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দিল্লির পরেই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় প্রদূষণকারী কলকাতা (ডাউন টু আর্থ ২০২৫)
স্মার্ট সিটি উদ্যোগ সম্ভাবনাঃ
*স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা বায়ুর গুণমান 'মনিটরিং সিস্টেম' বাধ্যতামূলক করা।
*স্মার্ট পরিবহন' নীতিতে ইলেকট্রিক বাস, ফেরি ও সাইকেল লেনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ব্যক্তিগত ডিজেল, পেট্রোল যান সীমিত করা।'
*গ্রিন জোন '
মোটোর বিহীন পরিবহন বাধ্যতামূলক করা।
গণ পরিবহন ব্যাবস্থাঃ নগরায়ন যানবাহন ও নিঃসরণ:
কলকাতা ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর। ২০১১ র জনগণনা অনুযায়ী শহরের জনঘনত্ব ২৪ হাজার জন, প্রতি বর্গ কিমিতে। আর যান-বাহনের ঘনত্বেও দেশের শীর্ষে। এত জনসংখ্যা ও গাড়ির ভারে
'গ্রিন হাউজ গ্যাস' নিঃসরণ বাড়ছে। কলকাতার নিঃসরণের ৪০% এর জন্য দায়ী যান-বাহন(সিএসই২০২৩)
বর্তমান গণপরিবহন:
* কলকাতা মেট্রোঃ শুরু ১৯৮৪ সাল থেকে, যাত্রী ৭.৫ লাখ ( কে এম আর সি এল রিপোর্ট 2024)।
ট্রাম
*১৮৭৩ সাল থেকে চলছে। আজ এটাই শহরের সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণকারী যান। ট্রাম যাত্রী কিলোমিটার প্রতি ৯০% কম কার্বন নিঃসরণ করে ডিজেল বাসের তুলনায় (আইপিসিসি আরবান ট্রান্সপোর্ট মিটিগেশন রিপোর্ট ২০২৩)।
*বর্তমানে দুটি রুট চালু। ডব্লিউ বি টি সির ৩ হাজারের বেশি বাস রয়েছে যার মধ্যে ২০০ টি ইলেকট্রিক বাস।
*আই ই ই এফ এ রিপোর্ট ২০২৪, জানায় কলকাতার ই-বাস প্রকল্প ১৫ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড কমিয়েছে শুধু ২০২৩ সালেই।
*নদীপথে ৮৩ টি ফেরি রুটের পরিকল্পনা আছে, যেগুলিকে মেট্রো ও ট্রাম নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে (কেএমডিএ রিপোর্ট ২০২৪)।
*ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:মনোরেল, ' র্যাপিড ট্রানজিট' কলকাতা মনোরেল প্রকল্প ( টালিগঞ্জ থেকে বালিগঞ্জ) ' 'ফিজিবিলিটি স্টাডি 'চলছে (আরবান ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট ওয়েস্ট বেঙ্গল ২০২৩)
*মেট্রো ট্রাম মনোরেল,বাসকে একত্রিত করে Integrated Mobility System ( IMS) তৈরী করার পরিকল্পনা WBTC ও UMTA হাতে নিয়েছে।
*প্রতিটি ব্যক্তিগত গাড়ি প্রতিদিন গড়ে ৩.২ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে সেখানে মেট্রো বা ট্রামে গেলে ০.৫ কেজি হয়।
* যদি কলকাতার ২৫% ব্যক্তিগত গাড়ি মেট্রোতে যাতায়াত করেন তাহলে বছরে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন টন।
৩)কার্বন ডাই অক্সাইড কমানো সম্ভব (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আরবান মবিলিটি স্টাডি ২০২৩)
*বায়ু দূষণ কমানো
*ট্রাফিক জ্যামে জ্বালানির অপচয় পিএম ২.৫ দূষণ শহরে ৩০-৪০% বৃদ্ধি করে।
*' ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম (এনসিএপি - ২০২৩) বলছে গণ পরিবহন ব্যবস্থায় উত্তরণে কলকাতার পিএম ২.৫ এর মাত্রা ২৫% কমানো সম্ভব ।
*শক্তি দক্ষতাঃ
ইলেকট্রিক ট্রেন, ট্রাম ও ই-বাস সরাসরি নবীকরণ যোগ্য শক্তি ব্যবহার করতে পারে। কলকাতা মেট্রো ইতিমধ্যে সোলার রুফটপ পাওয়ার ( ৫ মেগাওয়াট) ব্যবহার শুরু করেছে ( রেলওয়ে এনার্জি ম্যানেজমেন্ট কম্পানি ২০২৪)।
ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেমঃ
শহরগুলির বাস মেট্রো ট্রাম এবং মোটরহীন যানকে 'ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেম' এ নিয়ে আসলে শহরের নিঃসরণ ৩০-৪০% কমতে পারে (আইপিসিসি এ আর৬,২০২৩)
কলকাতা ইন্টিগ্রেটেড মবিলিটি ভিশন ( প্রস্তাবিত)
* মেট্রো, ট্রাম, বাস,ফেরি,বৈদ্যুতিক যান ইন্টিগ্রেশনঃ
* একক টিকিট, একক সময়সূচী
ইউনাইটেড ট্রাফিক কমান্ড সেন্টার ( ইউ টি সি সি)- AI ভিত্তিক ট্রাফিক সিগনাল ও সেন্সর দ্বারা যান- বাহন নিয়ন্ত্রন।
* কমন মবিলিটি কার্ড
*ইভি চার্জিং করিডোরঃবাস, ট্রামের ডিপোতে গ্রিন চার্জিং পরিকাঠামো।
৫) পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য শহরে সম্ভাবনা
* শিলিগুড়ি পাহাড়, তরাই সংযোগকারী শিলিগুড়ি বাগডোগরা মেট্রো করিডর(প্রস্তাবিত)।
*আসানসোল দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় ইলেক্ট্রিক বাস ও রেল সংযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা আছে।
* হাওড়া- হুগলি
* নদী, মেট্রো,রেল, বাস সংযোগকারী Integrated River Transit System হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভবনা।
গণপরিবহন কেবলমাত্র একটা আন্দোলন এর ব্যাপার নয় এটা জলবায়ু সংকট কালে সর্বজনীন বাঁচা।
C) যানবাহন দূষণে প্রযুক্তি
১. রিমোট সেনসিং টেকনোলজি
কলকাতায় ২০০৯ সাল থেকেই রিমোট সেনসিং টেকনোলজি প্রয়োগ করা হয়েছে, যেখানে চলন্ত অবস্থায় যানবাহন থামিয়ে না করেই তাদের থেকে নিয়ন্ত্রিত CO, HC, NOx ও ধোঁয়া পরীক্ষা করা হয়। .
তবে সাম্প্রতিক সংবাদ অনুযায়ী, এই সিস্টেমের একটি রিমোট সেনসিং ডিভাইস ২০২৩–২৪ সালে নভেম্বর থেকে কাজ বন্ধ করেছে।
২. উন্নত ও স্বয়ংক্রিয় পলিউশন পরীক্ষণ কেন্দ্র
পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রন পর্ষদ ও পরিবহণ দপ্তর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সব যানবাহনের জন্য PUCC (Pollution Under Control Certificate) Version 2.0 লঞ্চ করা হবে।
৩. ইলেকট্রিক ওহ্লচালিত যানবাহন (EVs) এবং গণপরিবহনের বৈদ্যুতিকীকরণঃ
কলকাতায় গণপরিবহনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক বাস ও ফেরি চালু করার ওপর নজর দেওয়া হয়েছে — এই উদ্যোগ বাতাসে যানবাহন থেকে নির্গমনের পরিমাণ কমাতে সহায়ক।
রাজ্যের ইলেকট্রিক যানবাহন নীতি (EV policy) ও পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিকল্পনা রয়েছে।
৪. ধুলো নিয়ন্ত্রণ ও যানবাহন বাহিত ধুলোর বিরুদ্ধে প্রযুক্তিঃ
WBPCB একাধিক ইলেকট্রিক যানবাহন (EVs) চালু করেছে যেগুলো জেট স্প্রিংকলার সহ, যাতে বড় সড়ক ও নির্মাণ সাইটে ধুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
CNG ও ইলেকট্রিক বাসভিত্তিক যানবাহন
রাজ্যে CNG-ভিত্তিক বাস চালু ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে বলা হয় যে ৩০টি ডিজেল বাস CNG-ভিত্তিতে রূপান্তর করা হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৩,০০০ বাস রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩৫০ টি CNG বাস সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইলেকট্রিক বাস ও EV নিয়েও উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য।
এছাড়া, বাস বা গণপরিবহনের ক্ষেত্রে CNG বাসগুলোর ব্যবহার বাড়ছে।
কর্মক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ
রিমোট সেনসিং যন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়ে রয়েছে, যা যানবাহন নির্গমণ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
CNG স্টেশন ও সাপ্লাই-চেইন পর্যাপ্ত নয়; বিতরণ/ভিত্তি সম্প্রসারণ দরকার।
সুন্দরবন
সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি, পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ অরণ্যভূমিতে বাঘেদের আশ্রয়। বিপুল জৈব বৈচিত্রের ভূমি আজ গভীর সংকটে। সুন্দরবনের ভূমি এখনো স্থিতিশীল নয় - একদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের সমুদ্রের জল স্তর বাড়ছে অন্যদিকে ভূমির অবনমন ঘটছে, দুইয়ে মিলে ম্যানগ্রোভ ভূমির পরিমাণ কমছে। রিমোট সেন্সিং, জিআইএস ব্যবহার করে যাদবপুরের 'স্কুল অফ ওশানোগ্রাফি' হাজার ১৯৮৬ থেকে ২০১২ পর্যন্ত যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের পরিমাণ ১২৪. ৪১৮ বর্গ কিমি কমেছে, এতে ভবিষ্যতে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের যে কার্বন শুষে নেওয়ার ক্ষমতা এবং অন্যান্য বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম জনিত উপযোগিতা, তা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বসবাসকারী মানুষেরা ইতিমধ্যেই উদ্বাস্তু হচ্ছেন। উদ্বাস্তুদের নাম দেওয়া হয়েছে 'পরিবেশ উদ্বাস্তু।' ভবিষ্যতে সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে। ফলতঃ এদের পূনর্বাসনের প্রশ্নটা সামনে চলে আসছে।
ভারতের সুন্দরবনে যথেষ্ট পরিমাণে পলি জমছে না, মিষ্টি জলের পরিমাণ কম, ভাগীরথী তা বয়ে নিয়ে আসতে পারছেনা। আমাদের সুন্দরবনে নোনা জলের ভাগ বেশি মিষ্টি জলের পরিমাণ কম হওয়ার কারণে ' ম্যানগ্রোভ সাকসেশন' এর পরিবর্তন ঘটছে- সুন্দরী কমছে আর গরাণ বাড়ছে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৫ এর মধ্যে ভারতের সুন্দরবনের চারটি দ্বীপ লোহাচড়া, সুপারিডাঙা,কাবাসগাদি এবং তালপট্টি জলের তলায় তলিয়ে গেছে। এর সাথে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। ঘনঘন প্রাণঘাতী সাইক্লোন এর সমস্যা।
সুন্দরবনের নদী বাঁধ
সুন্দরবনের নদীতে দিনে দুবার জোয়ার ভাটা খেলে।জোয়ারের সময় মানুষ যখন ঘুমোতে যায়, জল তার মাথার উপরে থাকে, তাই মানুষ বাঁধ দিয়েছে। সাইক্লোনে, জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙ্গে নোনাজল গ্রামে ঢুকে সর্বনাশ করে কিন্তু দেখা গেছে যেখানে ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গল আছে সেখানে তাদের শ্বাসমূল ঠেসমূল বাঁধ সংলগ্ন নদীখাতকে শক্ত করে ধরে রাখে তাই বাঁধ ভাঙেনা। অপরদিকে ম্যানগ্রোভ না থাকলে সে বাঁধ অল্পেতেই ভেঙে যায়। সুন্দরবনে ৩৫০০ কিমি মাটির বাঁধ রয়েছে। ফলতঃ এই ৩৫০০ কিমি মাটির বাঁধের সবটা ভঙ্গুর নয়, কিছুটা ভঙ্গুর। তাই সুন্দরবনের সমস্ত বাঁধটাকেই কংক্রিটে পরিণত করতে হবে - এ দাবি বিজ্ঞান সম্মত নয়, অভিজ্ঞতাও তা বলে না।
আয়লার পরে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার একটা সমীক্ষা করে বলেছিল সুন্দরবনের মাটির বাঁধ এর ৭৭৮ কিমি ভঙ্গুর। সেই হিসেবে ওই অংশটুকু আয়লা বাঁধ নাম দিয়ে কংক্রিট বাঁধের জন্য ভারত সরকারের কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছিল। পাঁচ হাজার কোটি টাকা মঞ্জুরও হয়েছিল, যার মধ্যে জমি অধিগ্রহণ এবং ৮৪ কিমি বাঁধ তৈরি বাবদ এক হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ খরচ হয়েছিল। সেসময় আজ যারা সরকারে আসীন, তখন তারা বিরোধী দল, তাদের বিরোধে চার হাজার কোটি টাকা ফেরত চলে যায় - এটা চূড়ান্ত আত্মঘাতী উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে।
মীন ধরার সমস্যাঃ
নদী বাঁধের সাথে যুক্ত রয়েছে আর এক সমস্যা, তা হলো নদী বাঁধে মীন ধরার সমস্যা। বাঁধের গায়ে নদীতে বুক জলে জাল টানতে হয়। তাদের চলাফেরার ফলে সেখানে ম্যানগ্রোভ জন্মাতে পারে না, তাতে ক্ষতি হয় বাঁধের। তবে এ সমস্যা মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার সমস্যার সাথে জড়িত - এ সমস্যাকে সেভাবেই দেখতে হবে এবং সমাধানের পথ ভাবতে হবে।
মানুষ বন্যপ্রাণী সংঘাত
সুন্দরবনে প্রতিবছর অনানুষ্ঠানিক হিসাবে প্রায় ৩০ জন জেলে, কাঁকড়া-শিকারি বা মধু-সংগ্রহকারী বাঘের আক্রমণে মারা যান বলে বিভিন্ন গবেষণা ও রিপোর্টে উল্লেখ আছে। আরও অনেকে আহত হন, কিন্তু সব ঘটনা সরকারি হিসাবে ওঠে না, কারণ অনেকেই অনুমতি ছাড়া জঙ্গলে ঢোকেন। ঐতিহাসিকভাবে বছরে ২০-৫০ জন পর্যন্ত মানুষ বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।
আহতের নির্দিষ্ট সরকারি সংখ্যা নেই, কারণ অনেক মানুষ বেঁচে ফিরলেও রিপোর্ট করেন না। তবে গবেষণা ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী প্রতি বছর বহু মানুষ গুরুতর আহত হন—হাত-পা হারানো, ঘাড়ে আঘাত, মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়া, কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকেন। শুধু নিহত নয়, আহত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
সুন্দরবনে “বাঘ বিধবা” বা tiger widow একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা। যেসব নারীর স্বামী বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন, তাঁদের স্থানীয়ভাবে অনেক সময় “স্বামীখেকো” বলে অপমান করা হয়। তাঁদের অশুভ মনে করা হয়, সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে দেওয়া হয় না, অনেককে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। বহু নারী বাধ্য হয়ে আবার একই জঙ্গলে মাছ ধরা বা কাঁকড়া ধরতে যান, কারণ অন্য কোনও উপার্জনের রাস্তা নেই।
সুন্দরবনে বাঘ বিধবার সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব আছে। স্থানীয় সংগঠন ও গবেষকদের মতে ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে ৩,০০০-এর বেশি “বাঘ বিধবা” রয়েছেন। শুধুমাত্র ভারতীয় সুন্দরবনেই কয়েকশো থেকে হাজারের বেশি বিধবা আছেন বলে বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হাজার হাজার tiger widow রয়েছেন। এদের পুনর্বাসনে সরকারকে যথেষ্ট মনোযোগী হওয়া দরকার।
ম্যানগ্রোভ নিধন চোরাশিকারঃ
মেছোঘেরির জন্য এবং কাঠ বিক্রির পয়সার লোভে ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সাফ করছে মানুষ,আছে চোরাশিকার। হরিণ, বুনো শুকর থেকে বাঘ, কচ্ছপ, গৃহপালিত পশুদের
চালান করা হয়।
ইটভাটার সমস্যাঃ
নদী বাঁধের গায়ে ইট ভাটা বাঁধের ক্ষতি করে। এরা নদীর
মূল্যবান পলি সংগ্রহ করে একটা বড় জায়গা জুড়ে ফলে তারা বাঁধ কেটে জল ঢুকায় পলি সংগ্রহের জন্য- জল জমে বাঁধের গায়। তারা গাছ কাটে এই ব্যবস্থার জন্য, এই ব্যবস্থা নদীবাঁধকে ভঙ্গুর করে। তাই ইটভাটা নদীর গায়ে হাওয়া বিপদজনক, তা হতে হবে নদী থেকে দূরে।
সুন্দরবনের দূষণঃ
প্লাস্টিক দূষণ, ভুটভুটির তেল দূষণ, শব্দদূষণ - আছে
নানা যানবাহনের কাটা তেল বা নিম্নমানের জ্বালানি তেল দূষণ, ট্যুরিষ্টরা প্লাস্টিক, আবর্জনা, ডিজে ইত্যাদির শব্দ দূষণ করে থাকে।
এক্ষুনি চাই মাস্টারপ্ল্যানঃ
এই সমস্যা নিরসনের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এক নিবিড় গবেষণাধর্মী
সমীক্ষা এই মুহূর্তে জরুরি এবং তার থেকে উঠে আসা এক মাস্টার প্ল্যান অচিরেই কার্যকর করতে হবে সরকারকে না হলে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নেই।
দেউচা পাঁচামি এক বিরাট ধাপ্পাঃ
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ২০২৫ সালের ৫ ই ফেব্রুয়ারি ' গ্লোবাল বেঙ্গল বিজনেস সামিট ' মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেন- "দেউচা-পাঁচামি কয়লা খনি প্রকল্প চালু হয়ে গেল, এক লক্ষ মানুষের চাকরি হবে এবার, পশ্চিমবাংলায় আগামী একশো বছর বিদ্যুতের অভাব থাকবে না।" হৈ চৈ পড়ে গেলো চারিদিকে।
এই ঘোষণার আগে ২০২৫ এর ১৭ ই জানুয়ারি সিআইটিইউ, এআইটিইউসি,এডব্লুবিএসআরইউ, আইএফটিইউ,টিইউসিআই,টিইউসিসি,এআইসিসিটিইউ সহ দশটি শ্রমিক সংগঠন এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ মাননীয় কলকাতা উচ্চ আদালতে দুটি মামলা ফাইল করে। তার আগে তারা ১০ ই জানুয়ারী ২০২৫ এ কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের কাছে চিঠি লিখে অভিযোগ জানানো হয়।
মামলায় সরকার যা হলফনামা দিয়েছে তাতে এই কয়লা খনি প্রকল্প আদতে যে একেবারেই ধাপ্পা, সরকারের প্রথম থেকেই নজর ছিল ব্যাসল্টের দিকেই, কয়লার দিকে নয় - যা আন্দোলনরত প্রতিটি সংগঠন বারবার বলে এসেছে।
আজ দেখা যাচ্ছে সে কথাই সত্যি হয়েছে। সরকারের নজর ব্যাসল্ট এর প্রতিই ছিল কিন্তু জনমানষের দৃষ্টি ঘোরানোর কুমতলবে বড়ো বড়ো ক'রে কয়লার খনির প্রচার করা হয়েছিল। এবার কি ব্যাসল্ট দিয়েই একশো বছরের বিদ্যুৎ তৈরী হবে? আর তার জন্য এক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে?
কলকাতা উচ্চ আদালতে সরকারের দেওয়া হলফনামা থেকে যা বেরিয়ে আসছে তা হল একটার পর একটা
পরস্পর বিরোধী সরকারি কথা!
ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়লোঃ
২০১৯ এর ১৬ই সেপ্টেম্বর তারিখে ' ওয়েস্টবেঙ্গল পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড'( ডব্লুবিপিডিসিএল) দেউচা-পাঁচামির কয়লা ব্লকের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কয়লা মন্ত্রকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল - ২১০২ মিলিয়ন টন মজুত কয়লা ভান্ডার উত্তোলনের জন্য। হলফনামায় তারা বলছে যে পরে 'জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া' এবং 'সেন্ট্রাল মাইনিং প্ল্যানিং এন্ড ডিজাইন ইনস্টিটিউট' (সি এম পি ডি আই এল) এর প্রতিবেদন থেকে 'ডব্লুবিপিডিসিএল' নাকি আবিষ্কার করে আদতে কয়লার মজুত ভান্ডার ১২০০ মিলিয়ন টন। সেকি! চুক্তির সময় তারা জানতো না একথা!
তারপর তারা 'সিএমপিডিআইএল' কে নিযুক্ত করে ভূতাত্ত্বিক প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য এবং আবার তারা আবিষ্কার করে সেখানে নাকি ব্যাসল্টের বিশাল মজুত ভান্ডার রয়েছে কয়লার সীমের ওপর! এটাও 'ডব্লুপিডিসিএল ' জানতো না? অথচ জিওলজিক্যাল সার্ভের প্রতিবেদনের দৌলতে দুনিয়ার সব মানুষ জানতো একথা। ২০০৮ সালে রাজ্য সভার প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন কয়লা মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী সন্তোষ বাগ্রোডিয়া ওই এলাকায় ৫২-১৯৫ মিটারের ব্যাসল্টের চাদর বেছানো আছে বলে বলেছিলেন? এটা সরকার এতো কান্ডের পর জানলেন? সত্যি?
স্বভাবতই এবার তারা কয়লাকে পেছনে ফেলে ব্যাসল্ট খননের অনুমোদন চাইলেন রাজ্য সরকারের কাছে শুধু তাই নয়, বললেন - "এবার ব্যাসল্ট খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কিন্তু ব্যাসল্ট খননের কোনও অভিজ্ঞতা আমাদের নেই, এমন অবস্থায় আমরা কখনও পড়িনি।"
রীতিমতো হাত তুলে দিলো 'ডব্লুপিডিসিএল'! তাদের কি ছোটখাটো কাজ ছাড়া এতো বড়ো মজুত কয়লা ভান্ডারের কয়লা তোলারই পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে? তবে তারা চুক্তি করেছিল কেন? এখন এসব গল্পের মানে কি?
ছিল রুমাল হয়ে গেলো বিড়াল!
গল্প এখান থেকে এখানে কয়লা থেকে ব্যাসল্টের দিকে বাঁক নিল। এবার বলা হলো ক্যাবিনেট সিদ্ধান্তের কথা।
' ডব্লুবিপিডিসিএল' এর প্রস্তাবমতো ৪৩১.৪৭ একরে ব্যাসাল্ট খননের সিদ্ধান্ত ক্যাবিনেট নিল ১৭ ই নভেম্বর ২০২৩ তারিখে। কয়লা পেছনের সীটে চলে গেলো। এসব কিছু দুনিয়ার সবাই জানতো, জানতো না শুধু 'ডব্লুবিপিসিএল'!
এরপর 'ইউনাইটেড এক্সপ্লোরেশন ইন্ডিয়া লিমিটেড' কে ৪৩.৯৪ একরে ব্যাসাল্ট খননের জন্য ভূতাত্ত্বিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বলা হলো।
আবার ভোল বদল! ৪৩.৯৪ একর কেন? ক্যাবিনেট তো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ৪৩১.৪৭ একরের? কেন এই সিদ্ধান্ত পাল্টে গেল? কেন ছোট হলো? আস্তে আস্তে পর্দা উঠছে!
এরপর ভেলকি! বলা হলো পাইলট প্রজেক্ট হবে এখন এবং তা হবে আরও কম একরে - ৪.৮৬ হেক্টর মানে ১১.৯৯ একর - ছিল বিড়াল হয়ে গেল রুমাল!
মোট প্রকল্প ছিল ৩৪০০ একরে কয়লা উত্তোলন হবে তারপর বলা হলো ৪৩১.৪৭ একরে ব্যাসাল্ট উত্তোলন হবে, তারও পর বলা হলো ৪৩.৯৪ একর, শেষে এসে বলা হলো এখন শুধু পাইলট প্রকল্প চলবে তাও ব্যাসাল্টের এবং তার পরিমাণ ১১.৯৯ বা প্রায় ১২ একর!
এর জন্য সাত মন তেল পুড়লো? নাকি এটা পূর্ব পরিকল্পনা? একটার পর একটা গোলপোস্ট পাল্টে যাওয়া!
পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মঞ্চ থেকে বারেবারে বলা হয়েছিল,পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ বই লিখে বলেছিল যে দেউচা - পাঁচামি তে ২০০০-২৫০০ ফুট মাটির নিচে যে কয়লা মজুত আছে এবং মজুত কয়লার সীমের ওপর যে পুরু ব্যাসাল্টের চাদর বেছানো আছে তাকে লাভজনক বাণিজ্যিকভাবে কখনো উত্তোলন করা সম্ভব না।
রাজ্য সরকার জানতো না যে ২০১৬ সালে 'জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া' (জিএসআই) এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে যে দেউচা - পাঁচামিতে লোভ উদ্রেককারী কয়লার মজুত ভান্ডার আছে ঠিকই কিন্তু তা বাস্তবে নয় খাতায়-কলমে (থিওরিটিক্যাল)?
এ কারণেই ২০১৬ সালেই সতলেজ জলবিদ্যুৎ নিগম,বিহার,কর্ণাটক, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, উত্তর প্রদেশ এমনকি পশ্চিমবঙ্গও কোল ব্লক নিতে রাজি হয়নি সেটা তো জানে বিশ্বশুদ্ধ লোক। আসলে তো কয়লাই নয়, আসলে তো ব্যাসাল্ট! আর পরিবেশ - পরিবেশ অবিঘাত ছাড়পত্র পেতে গণশুনানি প্রয়োজন, তাকে এড়াতেই গোটা প্রকল্পকে ছোট ছোট করে ভাগ করা! কি দুরভিসন্ধি!
দশটি শ্রমিক সংগঠন,পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ যে আন্দোলন গড়ে তুলেছে, এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল
তারাও তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছে আন্দোলনের মঞ্চে। এই আন্দোলন গুলির মঞ্চ থেকে নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে।
ব্যাসল্ট খনির দরপত্র প্রক্রিয়ায় গুরুতর কারচুপি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম প্রথমে ট্রান্সমেরিন নামের একটি বেসরকারি সংস্থাকে খননের দায়িত্ব দিলেও ২০২৫ সালের এপ্রিলে টেন্ডারের শর্ত ভেঙে সেই সংস্থার ৬০ শতাংশ মালিকানা হিমাদ্রি স্পেশালিটি কেমিকেল নামে বৃহৎ কোম্পানির হাতে চলে যায়। মাত্র ১৫৪ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রায় 16 কোটি টাকার মুনাফার প্রকল্পের বেআইনি হাতবদল হয়।
সম্প্রতি মাননীয় সুপ্রীম কোর্ট জানিয়েছেন যে প্রকল্পের কাজ শুরু করে দিয়ে তারপর পরিবেশ ছাড়পত্র চাওয়ার কাজ আর করা যাবে না আগে সমস্ত ছাড়পত্র যোগাড় করে তবেই কাজ শুরু করা যাবে তবুও ' ডব্লুবিপিডিসিএল' হলফনামায় দেখা যাচ্ছে যে,২১০০০ উচ্ছেদ হতে বসা পরিবারের মাত্র ১০% পরিমাণ মানুষকে চাকরির কাগজ দেওয়া হয়েছে যদিও স্থানীয় সূত্রে খবর যে এই চাকরিও আসল জমিদাতারা পাচ্ছেন না, পাচ্ছে শাসকদলের পোষা গুন্ডাবাহিনী যারা ওই এলাকায় কেউ গেলেই টাঙ্গি তীর-ধনুক ইত্যাদি' নিয়ে বাধা দেবার কাজ করছে। সে কথা বাদ দিলেও প্রশ্ন হচ্ছে যদি এত বড় প্রকল্প ছাড়পত্র না পায় তাহলে ছাড়পত্র যোগাড় করার কাজ না করে এই চাকরি কাদের এবং কেন বিলি করা হচ্ছে? যে কয়লা খনি প্রকল্প কাল্পনিক তার জন্য পুনর্বাসন প্রকল্প থাকতে পারে কি? এবং সেই অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ বা চাকরি দেওয়া যায় কি? আর ছাড়পত্র ছাড়াই এভাবে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাবার চেষ্টা করা কি মাননীয় সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশের সরাসরি অবমাননা নয়?
দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ মন্ত্রক ১০ ই নভেম্বর ২০২৩ সালেই হিসেব কষছে যে শুধু প্রথম পর্যায়ে ৪৩১.৪৭ একর জমির ১৪১.১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্যাসল্ট বিক্রি করে ৫৬০০ কোটি টাকা মুনাফা করতে পারবে ' ডব্লুবিপিডিসিএল', আর তারপরেও পাইলট প্রজেক্ট! ক্যাবিনেট ৪৩১.৪৭ একর জমির অনুমতি দিয়ে দিলেও ১২ একরের পাইলট প্রজেক্ট দেখানো কি বিভ্রান্তিকর নয়? আর যদি পাইলট প্রকল্প হয় তাহলে দরপত্রে সেভাবেই উল্লেখ থাকলো না কেন আর কেনইবা ধীরে ধীরে এই প্রকল্প ৩২৬ একর অবধি বাড়ানো হবে বলে আবেদনকারীকে বিভ্রান্ত করা হলো? আসল পরিকল্পনা তাহলে কি ছিল? এই প্রজেক্ট করতে গেলে প্রাণঘাতী পেশাগত রোগ সিলিকোসিসের যে সমস্যা আছে সে ব্যাপারে 'ডিরেক্টর জেনারেল অফ মাইন সেফটি ' কে দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হল কেন?
সার্বিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশের এই ইস্যুগুলি খুব গুরুতর হয়ে সামনে উঠে আসছে। এর কিছু কিছু রাজনৈতিক প্রচারে উঠে আসছে, বামপন্থীরা ইস্তাহারের নানা জায়গায় এই ইস্যুগুলি তুলে ধরেছেন, সুরাহার প্রয়াস নেবার দায় নিয়েছেন, আগামী দিনে তারা এই দায় কাঁধে নিয়ে মানুষকে সমবেত করে করণীয় কাজ করে যাবে এটাই মানুষের দাবি।
প্রকাশের তারিখ: ২১-এপ্রিল-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|