|
একটি পরিকল্পিত সাংবিধানিক বিপর্যয়Samik Lahiri |
পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা অনুযায়ী ‘বিচারাধীন’ বা ‘Under Adjudication’। যে সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে ভোটের ফল এবং সরকার গঠন নির্ভর করে, তার চাইতে অনেক বেশী সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকার বাইরে পাঠানোর উদ্যোগ যে অত্যন্ত পরিকল্পিত হীন ষড়যন্ত্র, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। |
এসআইআর – বিহারের অভিজ্ঞতা সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে ভোট হয়েছে। সেখানে মোট ৭ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি ৯৮ লক্ষ ৫৯ হাজার ৫১০ ভোটদাতা ভোট দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের নির্বাচনের তথ্যানুযায়ী, এনডিএ এবং মহাগোঠবন্ধনের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ৪৫ লক্ষ ৮৭ হাজার ০৭০। এই ফলাফল আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সব ভোটের মধ্যে অন্যতম বড় ব্যবধান। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপি-র মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য ছিল - ৫৮,৮৪,৭১০। এটাও ভারতবর্ষে বিধানসভা নির্বাচনগুলির ফলাফল অনুযায়ী অন্যতম বড় ব্যবধান। এবার পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা অনুযায়ী ‘বিচারাধীন’ বা ‘Under Adjudication’। যে সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে ভোটের ফল এবং সরকার গঠন নির্ভর করে, তার চাইতে অনেক বেশী সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকার বাইরে পাঠানোর উদ্যোগ যে অত্যন্ত পরিকল্পিত হীন ষড়যন্ত্র, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। আশ্চর্যের বিষয়, একটি মর্যাদাপূর্ণ স্বাধীন স্বতন্ত্র সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যাদের দেশে গণতন্ত্র রক্ষার প্রধান এবং একমাত্র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাই আরএসএস-বিজেপি’র এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অন্যতম যন্ত্রী। এটাই হলো ভারতবর্ষে গণতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বিপদ। আর একটি চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে যার সঙ্গে এবারের এসআইআর প্রক্রিয়ার সম্পর্ক গভীর। বিহারে ২০২০ সালের নির্বাচনে, এনডিএ এবং মহাগোঠবন্ধনের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ১২ হাজার ৭০৪, যা গত বছরে বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লক্ষ ৮৭ হাজার ০৭০ অর্থাৎ প্রায় ৩৬১ গুণ বৃদ্ধি। মোট ভোটারের সংখ্যা এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে দাঁড়িয়েছিল ৭ কোটি ৪৫ লক্ষ ২৬ হাজার ৮৫৮। এঁর মধ্যে নতুন ভোটার ছিলেন ২১ লক্ষ ৫৩ হাজার। অর্থাৎ বাদ পড়েছিল ৬৫ লক্ষ মানুষের নাম। তাহলে এসআইআর এর নামে ইচ্ছেমতো বিরোধী ভোটারদের নাম বাদ দিয়েই কী এবার বিজেপি-জেডিইউ জোটের এই চমকপ্রদ সাফল্য এসেছে – এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যেই জিতুক – সরকার বিজেপি’র আগে আর এস এস-বিজেপি-এর স্লোগান ছিল – যো ভি জিতে, সরকার বানায়েঙ্গে ভাজপা। অর্থাৎ ভোটে বিজেপি হারলেও বিধায়ক কেনাবেচা করে সরকার বানাবে তারাই। অন্তত ৬টি রাজ্যে বিজেপি এধরনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে। ১. গোয়া - ২০১৭ সালে গোয়ায় কংগ্রেস ১৭টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হলেও বিজেপি ১৩টি আসন পাওয়া সত্ত্বেও আঞ্চলিক দলগুলোর বিধায়কদের অর্থ ক্ষমতা ইত্যাদি প্রলোভনের মাধ্যমে কিনে নিয়ে সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে ২০১৯ ও ২০২২ সালে কংগ্রেসের অধিকাংশ বিধায়ককে একই কৌশলে নিজেদের দলে টেনে নিয়ে বিজেপি তাদের অবস্থান মজবুত করে। ২. মণিপুর - ২০১৭ সালে এখানেও কংগ্রেস ২৮টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল ছিল অন্যদিকে বিজেপি পেয়েছিল ২১টি। বিরোধী বিধায়কদের একই কায়দায় কিনে বিজেপি সরকার গঠন করে। পরে কংগ্রেসের একাধিক বিধায়ক বিজেপিতে যোগ দেন, তবে কিসের বিনিময়ে তা সহজেই অনুমেয়। ৩. কর্ণাটক - ২০১৮ সালের নির্বাচনে জেডি(এস) এবং কংগ্রেস জোট সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে 'অপারেশন কমলা'-র মাধ্যমে ১৭ জন বিধায়ককে পদত্যাগ করানো হয় এবং জোট সরকারের পতন ঘটে। এরপর ইয়েদুরাপ্পার নেতৃত্বে বিজেপি বিধায়ক কেনাবেচা করে সরকার গঠন করে। ৪. মধ্যপ্রদেশ - ২০২০ সালে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার নেতৃত্বে ২২ জন কংগ্রেস বিধায়ক পদত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিলে কমল নাথের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটে। এর ফলে বিজেপি পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং শিবরাজ সিং চৌহান মুখ্যমন্ত্রী হন। এখানেও মূল চাবিকাঠি বিপুল অর্থের লেনদেন। ৫. মহারাষ্ট্র - ২০২২ শিবসেনার অভ্যন্তরে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে বিদ্রোহের ফলে উদ্ধব ঠাকরের 'মহা বিকাশ আঘাড়ি' (MVA) সরকারের পতন ঘটে। শিবসেনার একটি বড় অংশ এবং পরে এনসিপি-র (অজিত পাওয়ার গোষ্ঠী) সমর্থনে বিজেপি সেখানে জোট সরকার গঠন করে। এখানেও অর্থশক্তিই ছিল সরকার দখলের মূল চাবিকাঠি। ৬. অরুণাচল প্রদেশ - ২০১৬ সালে রাজনৈতিক নাটকের মাধ্যমে তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু সহ প্রায় সব বিধায়ক প্রথমে পিপলস পার্টি অফ অরুণাচল এবং পরে বিজেপিতে যোগ দেন। কোনো নির্বাচন ছাড়াই রাতারাতি কংগ্রেস সরকার বিজেপি সরকারে রূপান্তরিত হয় অর্থের লেনদেনে। ফলে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন উঠছে - এবার মোদি-শাহ্’র ক্ষমতা দখলের যাদুকাঠি কি তাহলে এসআইআর? ‘ম্যান্ডেট ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর বিপদ মহারাষ্ট্রের ২০২৪ বিধানসভা নির্বাচনে যে জয় মহায়ুতি জোটকে উপহার দেওয়া হয়েছে, তাকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ৬০ লক্ষ ভোটারের সংকটের এক অদ্ভুত ও ভীতিপ্রদ সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। মহারাষ্ট্রে ভোটগ্রহণের হার শেষ বেলায় হঠাৎ ৭.৬% বৃদ্ধি পাওয়া অর্থাৎ প্রায় ৭৬ লক্ষ ভোট এবং পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লক্ষ ভোটারকে ‘অনিশ্চিত’ রাখা — দুটোই আসলে জনমতকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করার একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ডেটা ম্যানিপুলেশন ও টার্গেটেড ডিলিটশন - অভিযোগ উঠেছে, মহারাষ্ট্রে ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে বিরোধী ভোটারদের চিহ্নিত করে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও যখন দেখা যায় যে ৩০-৪০ বছরের সরকারি কর্মচারী বা বৈধ অভিভাবকদের নাম তালিকায় থাকলে সন্তানদের নাম ‘Under Adjudication’ তালিকায় অথবা এঁর উলটো ঘটনাও আছে - তখন একে যান্ত্রিক ত্রুটি বলা চলে না। এটি একটি নির্দিষ্ট ‘ভোটিং প্যাটার্ন’ নষ্ট করার সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা। গণিতের কারচুপি - বিহারে যে ব্যবধান ২০২০ সালে ছিল মাত্র ১২,৭০৪, যখন তা ২০২৫ সালে এসে ৪৫ লক্ষ অতিক্রম করে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই গাণিতিক সমীকরণটি আর স্বাভাবিক নেই। মহারাষ্ট্রের মতো এরাজ্যেও যদি ৬০ লক্ষ ভোটারকে (যা গতবারের জয়ের ব্যবধান ৫৮.৮৪ লক্ষের চাইতেও বেশী) প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়, তবে ভোটের আগেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা - মহারাষ্ট্রে যেমন ইভিএম ব্যাটারি এবং ‘ফর্ম ১৭-সি’ নিয়ে গোপনীয়তার অভিযোগ উঠেছে, পশ্চিমবঙ্গেও একইভাবে নাম কাটার ‘অর্ডার শিট’ গোপন রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের এই ‘লুকোচুরি খেলা’ প্রমাণ করে যে, তারা নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের বদলে কেন্দ্রের শাসকদলের স্বার্থরক্ষায় বেশি তৎপর। ‘ডেটা দিয়ে গণতন্ত্র হাইজ্যাক’-এর মাধ্যমেই পশ্চিমবঙ্গ সেই একই মডেলে এক গভীরতর সাংবিধানিক সংকটের পথে হাঁটছে। ভোটার তালিকায় এই ৬০ লক্ষ মানুষের নাম ‘বিচারাধীন’ রেখে কোনো নির্বাচন করা মানে হলো কয়েক কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করা। এটি কেবল আরএসএস-বিজেপি জোটের সুবিধা করে দেওয়া নয়, বরং ভারতবর্ষের নির্বাচনী ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার নামান্তর। সংবিধান ও ইসিআই ভারতের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন, স্বয়ংশাসিত এবং নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো — ভয়ের উর্দ্ধে উঠে একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই সাংবিধানিক স্তম্ভটি আজ নজিরবিহীনভাবে টালমাটাল। যখন রাজ্যের প্রায় ৬০ লক্ষ নাগরিকের নাম ভোটার তালিকায় ‘Under Adjudication’ বা ‘বিচারাধীন’ তকমা দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে এটি কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং ভোটাধিকার হরণের এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা। একটি বিশাল অংশকে ‘বিচারাধীন’ রেখে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করা হলে, তখন তাকে ‘জনমতের প্রতিফলন’হয় না, সেটা নিছকই ‘ডিজিটাল কারচুপি’। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এর আগে কখনও দেখা যায়নি যে, নির্বাচনের ঠিক আগে প্রায় ৮৫ লক্ষ মানুষের (৬০ লক্ষ বিচারাধীন ও ২৫ লক্ষ বাদ পড়া) ভোটদানের অধিকার প্রশাসনিক অন্ধকার ঘরে বন্দি। ‘বিচারাধীন’- একটি অবৈধ ধূসর এলাকা ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের ভোটার তালিকা নিবন্ধন নিয়মাবলী অনুযায়ী, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ‘বিচারাধীন ভোটার’বলে কোনো তৃতীয় শ্রেণির অস্তিত্ব নেই। আইনের ১৬, ১৭, এবং ১৮ ধারায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা আছে — একজন নাগরিক হয় ‘যোগ্য ভোটার’, নতুবা তিনি ‘অযোগ্য’। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ১৫ থেকে ২০ এবং ভোটার তালিকা নিবন্ধন নিয়মাবলী, ১৯৬০-এর কোনো অংশেই ‘Under Adjudication’ বা ‘বিচারাধীন’ বলে কোনো শ্রেণির ভোটারের উল্লেখ নেই। আইনত, একজন ব্যক্তি হয় যোগ্য নতুবা অযোগ্য। ‘বিচারাধীন’ বলে কোনও ‘ধূসর এলাকা’ তৈরি করা সরাসরি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৬ (সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার)-এর পরিপন্থী। হাজার হাজার ভোটারের নাম কোনো ‘Order Sheet’ বা সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা ছাড়াই ‘বিচারাধীন’ করে রাখা হয়েছে। এটি 'Audi Alteram Partem' অর্থাৎ ‘অপর পক্ষের কথা শোনা’ –আইনের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী, কারণ সংশ্লিষ্ট নাগরিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কার্যত না দিয়েই তার ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ৬০ লক্ষ মানুষকে এই ‘ধূসর এলাকায়’বন্দি রাখা কেবল অনৈতিক নয়, বরং সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের পরিপন্থী। ভারতের নির্বাচন কমিশন বনাম মদন লাল (১৯৯১) মামলায় শীর্ষ আদালত স্পষ্ট বলেছিল যে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া কোনোভাবেই একজন যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার হরণের হাতিয়ার হতে পারে না। কেন আজ পর্যন্ত নাম কাটার সুনির্দিষ্ট ‘অর্ডার শিট’অনলাইন বা অফলাইনে জনসমক্ষে আনা হলো না? কেন ভোটারদের থেকে তথ্য গোপন করা হচ্ছে? এই গোপনীয়তা প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা এবং বিশেষ কিছু সম্প্রদায়ের অর্থাৎ প্রান্তিক, সংখ্যালঘু, মতুয়া ইত্যাদি অংশের ভোটারদের লক্ষ্য করেই এই ‘বিচারাধীন’ রাখার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪, যা সাম্যের অধিকারকে নিশ্চিত করে - তার চরম লঙ্ঘন। ললিতেশ্বর প্রসাদ বনাম হনুমান প্রসাদ (১৯৬৬) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট বলেছিল যে, ভোটার তালিকায় নাম থাকা একটি সংবিধিবদ্ধ অধিকার (‘Statutory Right’)। উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়া প্রশাসনিক খেয়ালখুশিতে কারও নাম বাদ দেওয়া বা ঝুলিয়ে রাখা জালিয়াতির শামিল। ডিজিটাল এক্সক্লুশন - অনলাইন সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে দরিদ্র মানুষকে জেলা সদরে অফলাইনে ফর্ম জমা দিতে বাধ্য করাকে সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময়ে ‘প্রশাসনিক অত্যাচার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০ এর সেকশন ৩১ অনুযায়ী যদি কোনো আধিকারিক জেনেবুঝে ভোটার তালিকায় ভুল তথ্য দেন বা জালিয়াতি করেন, তবে তাঁর ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এই ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে মাত্র ২/৪ জন আধিকারিকের বিরুদ্ধে দায়সারা এফআইআর করা ছাড়া নির্বাচন কমিশন আর কোনও ভূমিকা পালন করেছে? কেন করেনি – রহস্য এখানেই। প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র - জেলা নির্বাচন দপ্তর (DEO) থেকে ডিলিটেড ভোটারদের নতুন করে ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করতে বলা হচ্ছে। আসলে এটি একটি ‘আইনি ফাঁদ’। যতক্ষণ না পূর্বের আবেদনের নিষ্পত্তি (Disposal) হচ্ছে, ততক্ষণ দ্বিতীয়বার আবেদনের আইনি বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। এছাড়া, অনলাইনের যুগে প্রান্তিক মানুষকে ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে জেলা সদরে গিয়ে অফলাইনে ফর্ম জমা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি আসলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে স্তিমিত করার একটি ‘বুলশিট টেকনিক’বা ‘ছেলে-ভোলানো’কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। কেন বিডিও এবং এসডিও স্তরে এই কাজ করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ডিইও-দের যে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৫ দিনের মধ্যে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) কাছে আপিল করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের আছে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে ‘রিজেকশন লেটার’ গোপন রাখা হচ্ছে। যদি ভোটার জানতেই না পারেন কেন তার নাম কাটা গেল বা কেন তা ‘বিচারাধীন’, তবে তিনি আইনি লড়াই লড়বেন কীভাবে? প্রশাসনের এই অসহযোগিতাই প্রমাণ করে যে, কেন্দ্রের শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনেই এই গোটা প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে। আধিকারিকদের নিরপেক্ষতা ভোটার তালিকা যাচাই প্রক্রিয়ায় চরম জালিয়াতি ধরা পড়েছে। যে সব পরিবারের সদস্যরা শত শত বছর ধরে ভারতে বসবাস করছেন, এমনকি সরকারি কর্মচারী, ভোটার তালিকাভুক্ত পিতা-মাতার সন্তানদের নামও ‘বিচারাধীন’ রাখা হয়েছে। বিএলও থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এক বড় অংশ নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক দাসের মতো আচরণ করছেন। সংবিধানের রক্ষক হিসেবে পরিচিত নির্বাচন কমিশন আজ নিজেই অভিযুক্তের কাঠগড়ায়। প্রহসন নির্বাচন যখন বিজেপি-আরএসএস পথ প্রশস্ত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে। ৬০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে পশ্চিমবঙ্গে যে নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে, তা আসলে একটি ‘নির্বাচনী প্রহসন’। মেরুদণ্ডহীন প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অকর্মণ্যতার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকাও এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য সমান ভাবে দায়ী। অভিযোগ উঠছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রাজ্য প্রশাসনের একটি বিশাল অংশকে ‘দলদাস’বা নিজের দলের রাজনৈতিক কর্মীতে রূপান্তরিত করেছেন। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোটার তালিকা সংশোধনী প্রক্রিয়ায় আজ সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ‘অশুভ আঁতাত’। বিএলও থেকে শুরু করে জেলা স্তরের আধিকারিকদের অধিকাংশ যখন সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা ভুলে তৃণমূলের ব্লক অফিসের নির্দেশিকা মেনে ভোটারদের ভাগ্য নির্ধারণ করেন, তখন তা শুধুমাত্র প্রশাসনিক কর্তব্যে অবহেলাই নয়, তা সাংবিধানকেই অস্বীকার করা। একদিকে কেন্দ্রের বিজেপি-আরএসএস জোটের সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে রাজ্যের শাসকদলের নিজস্ব ভোটার ব্যাংক অটুট রেখে বিরোধীদের ছেঁটে ফেলার এই দ্বি-পাক্ষিক ষড়যন্ত্রে বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের ওপর মুখ্যমন্ত্রীর এই সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ আসলে ভোটার তালিকা সংশোধনী প্রক্রিয়াকে একটি প্রহসনে পরিণত করেছে। নিরপেক্ষ এসআইআর করতে না দেওয়া এবং সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা প্রমাণ করে যে, শাসকদল অবাধ নির্বাচনের ময়দানকে ভয় পাচ্ছে এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেই তারা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইছে। মানুষের দাবি অবিলম্বে ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের জট খুলতে হবে এবং স্বচ্ছ অর্ডার শিট প্রকাশ করতে হবে। একজনকেও বিচারাধীন রেখে নির্বাচনের নির্ঘন্ট ঘোষণা করা যাবে না। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির দায়ভার সম্পূর্ণভাবে কমিশন এবং রাজ্য প্রশাসনকেই নিতে হবে। বাংলার মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় রাজপথ থেকে আদালত—সর্বত্র লড়াই চালিয়ে যাবে। সৌজন্যেঃ দেশ হিতৈষী প্রকাশের তারিখ: ০৯-মার্চ-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|