ট্রাম্প শুল্কের প্রভাব তেমন কিছুই লক্ষ্য করা যাচ্ছে না

Prabhat Patnaik
ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ এই কারণে নয় যে তিনি মন্দলোক বা বোকা মানুষ আর তাই সংকট থেকে একটি ‘জ্ঞানদীপ্ত’ উপায়কে তিনি এড়িয়ে চলেন; এমনটা চলছে আসলে এই কারণে যে তিনি যা করছেন তা উদার বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা কল্পিত সোনালী পরিস্থিতির বিপরীতে, পুঁজিবাদের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেহেতু পুঁজিবাদ একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা নয়, এটি যে সংকটের মুখোমুখি তার জন্য কোনও ‘যুক্তিসঙ্গত’ সমাধানের জন্য উপযুক্ত নয়; তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল এই সংকটে নিজের স্বার্থ দেখছে।

মিডিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে একটি রুটিন পদ্ধতিতে, এর নির্দিষ্ট প্রসঙ্গটি বিবেচনা না করেই। এই প্রসঙ্গটি হলো, মার্কিন সরকার উচ্চতর শুল্ক থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ব্যয় করতে অনিচ্ছুক- এটি নিচে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ট্রাম্প শুল্কের প্রভাবে যেসব দেশ মার্কিন বাজার হারাতে পারে, তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ করেও এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে না। এই সম্প্রসারণ ঘটানো সম্ভব শুধুমাত্র সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে, হয় রাজস্ব ঘাটতি দ্বারা অথবা ধনীদের উপর কর আরোপের মাধ্যমে অর্থায়ন দ্বারা। কিন্তু এই দুটিই বিশ্বায়িত অর্থ পুঁজির কাছে অভিশাপ, যা নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থায় জাতি-রাষ্ট্রকে মানতেই হয়। সুতরাং মার্কিন সংরক্ষণবাদ বিশ্বের সামগ্রিক চাহিদা সংকুচিত করবে এবং এর ফলে নয়া-উদারবাদী পুঁজিবাদের সংকট আরও তীব্র হবে। এই সত্যটি, অর্থাৎ ট্রাম্প শুল্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ালেও বিশ্ব পুঁজিবাদী সংকটকে বাড়িয়ে তোলে এবং ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ মিলে মোট উৎপাদনের স্তর কমিয়ে দেয়, এই বিষয়টি খুব কমই আলোচিত হয়েছে। আসুন দেখি কিভাবে এই বিশ্ব সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস পায়। 

শুল্ক আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য স্থানীয় বাজারে টাকার মজুরির তুলনায় বাড়িয়ে দেয়, যা অন্তত আংশিকভাবে এই আমদানিগুলোকে দেশে উৎপাদিত পণ্য দ্বারা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব করে। অবশ্যই শুল্ক সব আমদানি বন্ধ করে না, তবে কিছু আমদানি নিশ্চিতভাবেই বন্ধ হয়। যে আমদানিগুলো চলতে থাকে, সরকার সেগুলো থেকে শুল্ক রাজস্ব আদায় করে, যা ভোক্তারা - যারা প্রধানত শ্রমজীবী মানুষ - শুল্কজনিত উচ্চমূল্যের মাধ্যমে পরিশোধ করে। অন্য কথায়, শুল্ক যতটা না আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সক্ষম হয় এবং কিছু শুল্ক রাজস্ব আদায় করে, তা মূলত ক্রয়ক্ষমতা শ্রমজীবী মানুষ থেকে সরকারের কাছে পুনর্বণ্টন করে। 

যেহেতু শ্রমজীবী মানুষ তাদের প্রায় সমস্ত ক্রয়ক্ষমতা পণ্য ও সেবায় ব্যয় করে, তাই তাদের কাছ থেকে সরকারের কোষাগারে এই পুনর্বণ্টন শুল্ক আরোপকারী দেশের সামগ্রিক চাহিদার স্তর কমাবে না, যদি তার সরকারও এই শুল্ক রাজস্ব পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ব্যয় করে; কিন্তু যদি তা না করে, তাহলে শুল্ক আরোপকারী দেশের সামগ্রিক চাহিদার স্তর কমে যাবে। এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক এটাই ঘটবে, কারণ ট্রাম্প শুল্ক থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব পণ্য ও সেবায় ব্যয় করা হবে না। 

ট্রাম্প প্রশাসন, ধনীদেরকে বিশাল কর ছাড় দিয়েছে এবং শুল্ক রাজস্ব, এই কর ছাড়ের ফলে সৃষ্ট রাজস্ব ঘাটতি কমাতে ব্যবহার করা হবে। অন্য কথায়, শুল্ক রাজস্ব আদৌ ব্যয় করা হবে না, বরং রাজস্ব ঘাটতি কমানো হবে, যার অর্থ সরকার দ্বারা আদায়কৃত শুল্ক রাজস্বের প্রতিটি ডলার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সামগ্রিক চাহিদার স্তর কমিয়ে দেবে। যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য অংশে সরকারি ব্যয় এই মার্কিন চাহিদা হ্রাস পুষিয়ে বাড়ানো হবে না, এর অর্থ হলো বিশ্বকে একটি সম্পূর্ণ হিসাবে নিলে সামগ্রিক চাহিদার স্তর কমে যাবে, যা বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাবস্থাকে আরও তীব্র করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে, সামগ্রিক চাহিদা কমলেও, আমদানির খরচে দেশজ উৎপাদন বাড়তে পারে। অন্য কথায়, শুল্কের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মন্দা কমতে পারে, কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বকে একটি সম্পূর্ণ হিসাবে, অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাকি বিশ্ব মিলে, কার্যক্রমের স্তর কমে যাবে। 

এটি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা ‘বেকারত্ব রপ্তানি’-র চেয়েও বেশি, অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা অনুসৃত ‘প্রতিবেশীকে ভিক্ষুক বানাও’ নীতির চেয়েও বেশি। এটি এমন একটি ঘটনা যেখানে যদি শুল্কের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দেশজ উৎপাদন ১০০ বৃদ্ধি পায়, তবে বাকি বিশ্বের উৎপাদন ১০০ নয় বরং ১০০ এর চেয়ে বেশি, যেমন ১২০ বা ১৫০ দ্বারা সংকুচিত হয়, যাতে বিশ্বব্যাপী উৎপাদনের স্তর সংকুচিত হয়। সংক্ষেপে, এটি বিশ্বব্যাপী কার্যক্রমের স্তর প্রকৃতপক্ষে কমিয়ে দেওয়ার ঘটনা, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রমের স্তর বাড়ে। 

অন্যান্য দেশ যদি মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে জবাবদিহি করে তবে এই সিদ্ধান্ত এক বিন্দুও পরিবর্তিত হয় না। বাস্তবে, এই অন্যান্য দেশগুলোও যদি তাদের শুল্ক রাজস্ব, যা তাদের দেশীয় শ্রমিকদের খরচে আদায় করা হয়, তাদের রাজস্ব ঘাটতি কমাতে বা তাদের ধনীদের কর ছাড় দিতে ব্যবহার করে, যারা তাদের দেওয়া অর্থের একটি ছোট অংশই ভোগ করে, তবে সামগ্রিক প্রভাব বিশ্ব সামগ্রিক চাহিদার আরও বেশি সংকোচন। অন্য কথায়, মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে অন্যান্য দেশের জবাবদিহি, চাহিদা এবং সেই অনুযায়ী উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের নিজস্ব অর্থনীতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেও, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও খারাপ করে তোলে; নয়া-উদারবাদী পুঁজিবাদের সংকট আরও তীব্র হয়। 

শুল্ক নিয়ে রুটিন আলোচনা এই শেষ পয়েন্টটি সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করে। এটি শুল্ককে কেবল অন্য দেশ থেকে নিজের দেশে চাহিদা এবং সেই অনুযায়ী উৎপাদন সরানোর একটি মাধ্যম হিসাবে দেখে। কিন্তু যদি শুল্ক এমন পরিস্থিতিতে আরোপ করা হয় যেখানে শুল্ক রাজস্ব, যা শ্রমজীবী মানুষের খরচে আদায় করা হয়, সরকার আদৌ ব্যয় করে না বরং শুধুমাত্র সরকারি সঞ্চয় বাড়ায়, তবে শুল্কের একটি অতিরিক্ত প্রভাব আছে যা বিশ্বব্যাপী চাহিদা ও উৎপাদনের স্তর সংকুচিত করে, অর্থাৎ নয়া-উদারবাদী পুঁজিবাদের সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। 

এই সংকটের প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতা হিসাবে, উদার বুর্জোয়া মতামত অনুযায়ী এটি আশা করা হয়েছিল যে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর দ্বারা একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে সংকট কাটিয়ে উঠতে নেতৃত্ব দেবে। এটাই উদার বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরা আশা করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৩০ এর মহামন্দার সময়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর দ্বারা এমন সমন্বিত পদক্ষেপ জে এম কেইনস পরামর্শ দিয়েছিলেন। আজ যা ঘটছে তা হলো, যখন পুঁজিবাদী বিশ্বের জন্য পরিস্থিতিগুলো আরও খারাপ হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল নিজেকে সংকট থেকে বের করে আনতে চাইছে। ঘুরিয়ে বললে, ট্রাম্প, পুঁজিবাদী বিশ্বকে সংকট কাটাতে কিছু পথ প্রস্তাব করে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে ‘আমেরিকাকে আবার মহান বানানোর’ (MAGA) চেষ্টা করছেন না, বরঞ্চ বাকি পুঁজিবাদী বিশ্বকে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে, আরও বেশি দুর্দশা গ্রহণ করতে বাধ্য করছেন, যাতে কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। 

ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ এই কারণে নয় যে তিনি মন্দলোক বা বোকা মানুষ আর তাই সংকট থেকে একটি ‘জ্ঞানদীপ্ত’ উপায়কে তিনি এড়িয়ে চলেন; এমনটা চলছে আসলে এই কারণে যে তিনি যা করছেন তা উদার বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা কল্পিত সোনালী পরিস্থিতির বিপরীতে, পুঁজিবাদের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেহেতু পুঁজিবাদ একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা নয়, এটি যে সংকটের মুখোমুখি তার জন্য কোনও ‘যুক্তিসঙ্গত’ সমাধানের জন্য উপযুক্ত নয়; তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল এই সংকটে নিজের স্বার্থ দেখছে। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংকট থেকে নিজেকে বের করে আনার প্রচেষ্টা, যখন বাকি বিশ্বকে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথকে, আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত করছে, এটা তাদের বিভিন্ন বাণিজ্য আলোচনায় যে দাবিগুলো করছে তা থেকে স্পষ্ট। এই পদ্ধতি, শুরুতে অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে খুব উচ্চ শুল্কের হুমকি দেয়, কিন্তু আলোচনার দেশটি যদি শূন্য শুল্কে বিভিন্ন মার্কিন পণ্য গ্রহণ করতে রাজী হয় তবে হুমকির চেয়ে কম শুল্কে সম্মত হতে ইচ্ছুক হয়। প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকটি দেশের সাথে বাণিজ্য আলোচনায় এই লাইনে চুক্তি করেছে। 

যাইহোক, এটি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের জন্য এর অর্থ হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের প্রধান রপ্তানি, যেমন টেক্সটাইল, রত্ন ও গহনা, এবং ওষুধের উপর মার্কিন ঘোষিত শুল্কে কিছু ছাড় পেতে মার্কিন দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও বাদাম ইত্যাদি বিনা শর্তে গ্রহণ করা। এটি লক্ষাধিক ভারতীয় কৃষককে দুর্দশায় ফেলবে, যারা আমদানিকৃত পণ্যের প্রতিযোগিতা সহ্য করতে পারবে না, কারণ মার্কিন কৃষকরা বেশি ‘দক্ষ’ বলে নয় বরং মার্কিন সরকার দ্বারা ব্যাপকভাবে ভর্তুকি দেওয়া হয়, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা অযৌক্তিকভাবে এবং পক্ষপাতিত্ব করে নিষিদ্ধ ভর্তুকির তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। 

নয়া-উদারবাদ দেশকে এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে যেখানে তার সামনে উপায় হলো হয় কৃষকদের স্বার্থ বলি দেওয়া অথবা ওষুধ, রত্ন ও গহনা, পোশাক ইত্যাদি উৎপাদনে নিযুক্তদের স্বার্থ বলি দেওয়া। তবে উত্তরণের উপায় ‘Heads I win, tails you lose’ এই ধরনের কোনও উপায় বের করা নয়, বরং সেই ব্যবস্থাটিকেই অতিক্রম করা যা দেশকে এই ধরনের পছন্দ করার মত পরিস্থিতি তৈরী করে, অর্থাৎ নয়া-উদারবাদকেই অতিক্রম করা।

 

মূল প্রবন্ধটি ইংরেজিতে পিপলস ডেমোক্রেসী পত্রিকার ১১-১৭ আগস্ট ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত

বাংলা ভাষান্তরঃ অঞ্জন মুখোপাধ্যায়


প্রকাশের তারিখ: ১৭-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org