|
ব্যর্থ বিপ্লবের সেলুলয়েড মহাকাব্যShantanu Chakrabarty |
সেই অভিঘাত অস্বীকার করতে পারেন না নাৎসি প্রচার বিভাগের সর্বময় কর্তা গোয়েবেলসও। তিনি বলেছিলেন যে কোনও নিরপেক্ষ মানুষ এ ছবি দেখলে “বলশেভিক” হয়ে যেতে বাধ্য। নাৎসিবাদের প্রচারে আমাদেরও তাই এরকমই ছবি বানাতে হবে। আর এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আইজেনস্টাইন বলেছিলেন নাৎসিবাদের মানবতা বিরোধী তত্ত্বে এই বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার চেতনা অর্জন করাই সম্ভব নয়। |
খাবার বলতে দেন তো ওই তো দুটো শক্ত-পোড়া রুটি আর একবাটি মাংসের স্যুপ। আর সেই মাংসের গায়েও থিক থিক করছে পোকা। আমরা না খেয়ে থাকব তবু ওই পচা মাংসের স্যুপ ছোঁব না। ওপরওয়ালাদের মুখের ওপর সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিন-এর নাবিক সৈনিকরা। নৌ-বাহিনীর পদস্থ কর্তারা বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন। তবে বিদ্রোহীদের এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করলেও তাঁরা বিদ্রোহ দমাতে পারেন নি। নাবিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন অফিসার নিহত হন। বিদ্রোহীরা পোটেমকিন দখল করে। জাহাজের মাস্তলে বিপ্লবের রক্তপতাকা উড়িয়ে দেন। শহীদ কমরেড এর মরদেহ নিয়ে বিদ্রোহী রণতরী এসে থেমেছিল ওডেসা বন্দরে। শুরু হয়েছিল বিদ্রোহের দ্বিতীয় পর্ব। কিন্তু ১৯০৫ সালের ২৭ জুন, রুশ রণতরী পোটেমকিন-এ যে বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল সেখানে ভাঁড়ার ঘরের পোকা ধরা পচা মাংস স্রেফ একটা স্ফুলিঙ্গর কাজ করেছিল। জার শাসিত রাশিয়ার নৌবহর সহ গোটা সামারিক ব্যবস্থার প্রতিটা কোনেই ক্ষোভ-প্রতিবাদের বারুদ জমেছিল অনেক দিন ধরেই। রাশিয়ার প্রশাসন আমলাতন্ত্রের মতই সামরিক বিভাগেও ছিল সমান্তবাদের দাপট। ওপরতলার অফিসাররা প্রায় সবাই আসছেন ধনী অভিজাত পরিবার থেকে। পারিবারিক প্রভাব প্রতিপত্তির দেমাকে তাঁদের মাটিতে পা-ই পড়ত না। কাজের জায়গাটাকেও তাঁরা তাঁদের বাবার জমিদারি বা খাস তাল্লুক বলে মনে করতেন। সাধারণ সৈনিকদের মানুষ বলেই ভাবতেন না। মনে করতেন তাঁদের জমিদারির বেগার-খাটা ক্রীতদাস। এই নাবিক-সৈনিকরাও বেশিরভাগই ছিলেন শ্রমিক, কৃষক, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা প্রান্তিক খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তান। দেশপ্রেমের চেয়েও অনেকবেশি পেটের দায়েই তাঁরা সেনা বাহিনীতে এসেছিলেন। ফলে বাহিনীর ওপর ও নিচের তলার দুপক্ষের মধ্যে একটা তীব্র শ্রেণী-ঘৃণা ও সংঘাতের আবহ ছিলই। যে কোনো দিন, যে কোনো তুচ্ছ কারণে সেটা ফেটে পড়তই। ১৯০৪-০৫ সালের রুশ-জাপান যুদ্ধ আর সেই যুদ্ধে সব ফ্রন্টেই ছোট দ্বীপ-রাষ্ট্র জাপানের কাছে, ইউরোপ-এশিয়া জোরা বিশাল জার সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক পরাজয় পরিস্থিতিটাকে এগিয়ে এনেছিল। এই যুদ্ধ জার শাসনের সামরিক শক্তির মীথ ভেঙে খানখান করেদিয়েছিল। প্রশান্ত মহাসাগর, বাল্টিকসাগর সব জায়গায় জারের অমিত বিক্রম অপ্রতিরোধ্য নৌবহর হেরে ভূত হচ্ছিল। নৌ-বাহিনীর মনোবল প্রতিদিন ভেঙে পড়ছিল। এই অবস্থায় হতাশ, হতোদ্যম নৌ-সেনাদের মনোবল ফেরানোর বদলে, অফিসারের ইউনিফর্ম পরা রইসজাদাদের দুর্ব্যবহার আর অত্যাচার দিন-কে-দিন বেড়েই চলেছিল। একেই যুদ্ধের জন্য খাদ্য-রসদের টানাটানি তার ওপরে কদিন ধরেই একটা উড়ো খবর পোটেমকিন-এর নাবিক মহলে ভেসে বেড়াচ্ছিল। কৃষ্ণ সাগরে নজরদারির দায়িত্ব ছেড়ে তাঁদেরকে নাকি এবার সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানি নৌবাহিনীর মোকাবিলা করতে পাঠানো হবে। এইসব গুজব, উত্তেজনার মধ্যেই পচা মাংস খেতে বাধ্য করার আমলাতান্ত্রিক বাড়াবাড়ি বিস্ফোরন ঘটিয়ে ফেলল। ২৭ জুনের এই বিদ্রোহ শেষ অবধি সফল হয় নি আমরা সবাই জানি। নানা কারনে ওডেসা বন্দর থেকে মুখ ঘুরিয়ে রণতরী পোটেমকিনকে চলে যেতে হয়েছিল অনেকদূরে, পূর্ব ইউরোপে, রোমানিয়ার উপকূলে। সেখানকার কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্রোহী নাবিকরা আত্মসমর্পন করতেও বাধ্য হন। এদিকে একই সময়েই জাপান যুদ্ধের জেরে বেকায়দায় পড়া জার অভিজাততন্ত্রের স্নায়ুকেন্দ্রে চূড়ান্ত আঘাত হানতে চাইছিলেন বলশেভিক বিপ্লবীরাও। শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি নৌ ও সামরিক বাহিনীকে সঙ্গে নিয়েই তাঁরা অভ্যুত্থান ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু মাংস কান্ডে পোটেমকিনে অচমকা বিদ্রোহ শুরু হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়। তবে পোটেমকিন যে দ্রোহের ফুলকি জ্বালিয়েছিল, ১৯০৫-এর বছরভর রাশিয়ার বিভিন্ন সেনা ছাউনিতে বিক্ষিপ্তভাবে অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটতেই থাকে। কোনোটাই সফল হয় নি কিন্তু ২৭ জুনের ব্যর্থ নৌ-বিদ্রোহ সহ এই প্রত্যেকটা ঘটনাই প্রত্যেকবার জারতন্ত্রকে খানিকটা হলেও দুর্বল করেছে। জারের সর্বশক্তিমান মহিমাকে একটু একটু করে খর্ব করেছে। আর এই প্রত্যেকটা বিদ্রোহই ১৯১৭-র মহান নভেম্বর বিপ্লবের সাফল্যকে আরো একটু নিশ্চিত করেছে। একটু একটু করেই তার মঞ্চ নির্মান করেছে। ২৭ জুন পূর্ণতা পেয়েছে ৭ নভেম্বরে। আর সেজন্যেই ১৯২৫ সালে, ১৯০৫-এর অসমাপ্তি বিপ্লবের ২০তম বছরে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লবী সরকার জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে রনতরী পোটেমকিনের রণহুঙ্কারকে উদযাপন করতে চেয়েছিল। সরকারীভাবে প্রথমে ঠিক হয়েছিলো শুধু যুদ্ধ জাহাজের শ্রমিকদের রুখে দাঁড়ানোর অখ্যান নয় রুশ জাপান যুদ্ধ থেকে শুরু করে বলশেভিক বিপ্লবীদের সীত-প্রাসাদ দখল অবধি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব নিয়ে তৈরী হবে এক সেলুলয়েড “ম্যাগনাম ওপাস”। সে ছবির চিত্রনাট্য লেখার দায়িত্ব দেওয়া হল বলশেভিক নেত্রী লেখক, চলচ্চিত্রকার নিনা আগাদ ঝানোভাকে। আর ছবির পরিচালক স্থাপ্ত্যবিদ্যার এক প্রাক্তন ছাত্র, লাল ফৌজের এক প্রাক্তন সেনানী তথা থিয়েটার কর্মী-১৯০৫ এর নৌ-বিদ্রোহের সময় যারা বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর। এই ২৭ বছরের তরুন সের্গেই আইজেনস্টাইনের থিয়েটার থেকে সিনেমায় আসার অন্যতম প্রেরণা ছিল বলশেভিক বিপ্লব, কমরেড লেনিন ও হলিউডের এক চরম দক্ষিণপন্থী চলচ্চিত্র নির্মাতা গ্রিফিতের ছবি “ইনটলারেন্স”। এই ছবিটার কোন স্ক্রিপ্ট চোরাপথে মস্কোয় এসেছিল এবং লেনিন সহ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব ছবিটি দেখেন। লেনিনের মেধাবী চেতনা এই নতুন শিল্প মাধ্যমের শক্তি ও ক্ষমতা বুঝে নিতে কোন ভুল করে নি। তিনি চেয়েছিলেন সোভিয়েত চলচ্চিত্র শিল্পী কলাকুশলীরাও বিপ্লবের মতাদর্শ ও নতুন সমাজ-দেশ গঠনের কাজে এই শিল্পমাধ্যমকেও ব্যবহার করুক। আইজেনস্টাইনও ‘ইনটলারেন্স’ দেখেন। সে ছবিতে শট ডিভিশন, সম্পাদনা ও মন্তাজ-এর ব্যবহার নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেন। আর সিনিমার দৃশ্য বা ইমেজ কে বিপ্লবী চেতনায় কিভাবে রূপান্তরিত করা যায় সেটাও উপলব্ধি করেন। “ব্যাটলশিপ পোটেমকিন” ছিল তাঁর কাছে বিপ্লবী চেতনাকে সিনেমার নিজস্ব শিল্পভাষায় মহাকাব্যিক বিস্তার দেওয়ার পরীক্ষাগার। নিনা আগাদ ঝানোভার চিত্রনাট্য মোটামুটি ৮টি পর্বের বিপ্লবের পুরো ইতিহাসটাকে ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু আইজেনস্টাইনদের হাতে সময় ছিল খুব কম। কারন বিপ্লবের বার্ষিক উদযাপনের জন্য ছবিটা ১৯২৫-এর ডিসেম্বরে রিলিজ করতেই হত। আইজেনস্টাইন তাই নিনার ৪২ পাতার চিত্রনাট্যের কয়েকটি মাত্র পাতা বেছে নেন। পুরো ছবির ফোকাসটাই কেন্দ্রীভূত হয় রণতরী পোটেমকিনের কোয়াটার ডেক-এ সংঘটিত বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে। আইজেনস্টাইন তাঁর বিভিন্ন লেখায় নিনার কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছে। বলেছেন, একটা না দেখা বিপ্লবের উত্তাপ নিনার চিত্রনাট্যের মাধ্যমেই তাঁর ভাবনার অনুভবে সংবাহিত হয়। তবে চিত্রনাট্যে বা শুটিং স্ক্রিপ্ট-এ ছিল না, এমন কিছু কিছু জিনিসও পোটেমকিন-এর চিত্রায়নে ঢুকে পড়েছিল তাৎক্ষনিক কোনো শৈল্পিক সিদ্ধান্তে। যেমন ছবি শুরুর এই অশান্ত সমুদ্র আর মেঘ-মন্ত্রিত আকাশ যা জাহাজের ডেক-এ আসন্ন কোন ঝড়ের পূর্বভাস হয়ে উঠেছিল। কিংবা ওডেসা বন্দরে ভোর রাতের ওই প্রান, বিষন্ন কুয়াশা যা নৌ-বিদ্রোহের প্রথম শহীদ বিদ্রোহী নাবিক নেতা ভাকুলিনচুকের নিথর শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল অঝোর শোকের মত। আইজেনস্টাইন “ব্যাটলশিপ পোটেমকিন”-এর ৮৬ মিনিটের সিনেমা শরীরকে পাঁচটি পর্বে বা তাঁর প্রিয় নাটকের পরিভাষায় পঞ্চমান্তে ভাগ করেছিলেন। “মানুষ ও পোকাগুলি”, “ডেকের ওপর নাটক”, “নিহত শহীদ বিচার চায়”, “ওডেসার সিড়িগুলি”, ও “সমস্ত শক্তির মুখোমুখি একা” এই পাঁচটি পর্ব যে ১৯০৫-এর ঘটনাপ্রবাহকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরন করেছিল এমনটা নয়। কিন্তু ১৯০৫-এর অসমাপ্ত দ্রোহকল যে আসলে নভেম্বর বিপ্লবেরই “সুসজ্জিত মহড়া” ছিল এই বার্তাটাই সংগঠিত ও সুসম্পাদিতভাবে দর্শকদের পৌছে দেওয়া হয়েছিল। তাই ১৯০৫ থেকে ১৯১৭-র মধ্যে ঘটে যাওয়া অনেক কিছুই ছবির শরীরে প্রক্ষিপ্ত হয়েছিল যেমন করে মহাকাব্যের অনন্ত অবগাহনে অনায়াসে ডুব দেয় নানা সময়ের অনেক প্রক্ষিপ্ত চিত্রকল্প। আইজেনস্টাইনের "পোটেমকিন" তাই সংলাপহীন দৃশ্যের সমাহার আর সুচারু সম্পাদনায়, এক ব্যর্থ-অসম্পূর্ণ বিদ্রোহের শীররের ওপরেই সৃজন করেছিল এক চিরন্তন, অবিনশ্বর বিপ্লবের স্মৃতি-সত্তা। তাই ওডেসা স্টেপস-এর নৃশংস হত্যলিলার মুহূর্তে, প্রায় কোরিওগ্রাফির মত জনসমুদ্রের ঢেউ এর মাথায় মাথায় অপরাজেয় স্মারকের মতই যেন ভেসে যায় মাতৃহারা এক শিশুর নিঃসঙ্গ প্যারাম্বুলেটার। ফলে বাস্তবের পোটেমকিন রণতরী বিদ্রোহী নাবিকদের যাই পরিণতি হোক, ছবির শেষ পর্বে, বিদ্রোহ দমন করতে আসা জারের স্কোয়াড্রন-কে পোটেমকিন-এর জন্য মুক্ত সমুদ্রে যাওয়ার পথ করেই দিতে হয়। বিপ্লবের কারুবাসনা চিরজীবি হয়ে থাকা সেলুলয়েডে। সেই অভিঘাত অস্বীকার করতে পারেন না নাৎসি প্রচার বিভাগের সর্বময় কর্তা গোয়েবেলসও। তিনি বলেছিলেন যে কোনও নিরপেক্ষ মানুষ এ ছবি দেখলে “বলশেভিক” হয়ে যেতে বাধ্য। নাৎসিবাদের প্রচারে আমাদেরও তাই এরকমই ছবি বানাতে হবে। আর এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আইজেনস্টাইন বলেছিলেন নাৎসিবাদের মানবতা বিরোধী তত্ত্বে এই বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার চেতনা অর্জন করাই সম্ভব নয়। “ব্যাটলশিপ পোটেমকিন” তাই নির্মানের শতবর্ষ পেরিয়েও এখনও সারা পৃথিবীর মানুষকে উদ্দীপিত করে। আর অজস্র নাৎসিবাদী সেলুলয়েড আবর্জনা আর্কাইভের ধুলোয় ঢাকা পড়ে থাকে। প্রকাশের তারিখ: ২৭-জুন-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|