Zainul Abedin

গ্রামীণ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ ও বাংলার নিসর্গ ছিল তাঁর অতি প্রিয় বিষয়

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কথা

Gautam-Roy

গৌতম রায়

জয়নুল আবেদিন ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্ময়কর এক শিল্প-প্রতিভা। জয়নুল  ছিলেন একাধারে একজন অসাধারণ মেধাবী শিল্পী, অনুপ্রেরণাদানকারী শিল্পগুরু ও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পকলা চর্চার কৌশলী সংগঠক। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে একটি অধ্যধারার  শিল্পচর্চার জনক।বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের পুনরুদ্ধারকারী হিশেবে জয়নুলের একটি পৃথক শিল্প সত্তা ছিল।
মানবিক গুণাবলির জন্যও  জয়নুল  বিশিষ্টতার দাবি রাখেন। অত্যন্ত  শক্তিশালী ও সংবেদনশীল শিল্পী জয়নুল আবেদিন শিল্পকলাকে কোনোদিন ই সাধারণ জীবনের বাইরের কোনো বিষয় হিশেবে   গণ্য করেননি। তাঁর কাছে শিল্প ছিল জীবনেরই এক প্রকাশ ।শিল্পের উদ্দেশ্য হিশেবে তিনি দেখেছিলেন  মানবসমাজকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলা।
জয়নুলের  শিল্প সব সময়ই সাধারণ মানুষের কথা বলেছে। তিনি নিজেও উঠে এসেছিলেন  সাধারণ মানুষের ভিতর   থেকেই। সাধারণ মানুষের  জীবন, তাঁদের অন্তহীন সংগ্রাম, তাঁদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা— সব কিছুই জয়নুল অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে নিজের  কাজের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ ও বাংলার নিসর্গ ছিল তাঁর অতি প্রিয় বিষয়।

জয়নুল আবেদিনের জন্ম অবিভক্ত  ময়মনসিংহ জেলার এক সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারে ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ব্রহ্মপুত্র নদের প্লাবন অববাহিকার অত্যন্ত শান্ত সুনিবিড় ও রোমান্টিক পরিবেশে জয়নুল  বেড়ে উঠেছিলেন। তাঁর শৈল্পিক মানসিকতা নির্মাণে প্রকৃতির প্রভাব ছিল অসামান্য ও সুদূরপ্রসারী।

ময়মনসিংহে তাঁর জীবনের শুরুতেই তিনি শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে বহুদূরের সেই শহর কলকাতায় গিয়ে শিল্পকলা শেখার দীর্ঘ ও কঠিন ছাত্রজীবন শুরু না করা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন।

শৈশবে তাঁর ওপর প্রকৃতির প্রভাব এবং কলকাতায় আর্ট স্কুলে ইউরোপীয় বাস্তববাদী ধারার শিল্পাঙ্কন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ তরুণ জয়নুল আবেদিনকে গ্রামীণ নিসর্গশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি তখন সাঁওতাল পরগনা ও ময়মনসিংহের নৈসর্গিক দৃশ্যের ওপর বেশকিছু স্মরণীয় স্কেচ ও জলরঙ চিত্র আঁকেন। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা তাঁর একগুচ্ছ জলরঙ ছবির জন্য তিনি ১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত চিত্রপ্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ বছরই তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলের শিক্ষক নিযুক্ত হন।

এর পর কিছুকাল জয়নুল আবেদিন প্রাকৃতিক পরিবেশেরই এক রোমান্টিক রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তখন ছিলেন এক অরাজনৈতিক ব্যক্তি, একজন বিশ্বস্ত নিসর্গশিল্পী। কিন্তু ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনকে একেবারে বদলে দেয়। গ্রামবাংলার রোমান্টিক নিসর্গশিল্পীকে রূপান্তরিত করে ফেলে এক দুর্দান্ত বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বে। অতঃপর সারাটি জীবনই বিক্ষুব্ধ থেকে গেছেন তিনি।

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় কলকাতা মহানগরে ঘটেছে মানবতার চরম অবমাননা। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্যান্বেষণে তীব্র প্রতিযোগিতা চলেছে মানুষ আর কুকুরের মধ্যে। ঊনত্রিশ বছর বয়স্ক জয়নুল এ রকম অমানবিক দৃশ্যে প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হন, আতঙ্কে শিউরে ওঠেন, আবেগাপ্লুুত হয়ে পড়েন। কিন্তু সে আবেগ তিনি কাজে লাগান সেসব দৃশ্যের শিল্পরূপ দিতে। অন্যভাবে বলা যায়, সেই আবেগই তাকে তাড়িত করে, বাধ্য করে অমানবিক পরিস্থিতির এক মানবিক নির্মাণে।

শিল্পাচার্য জয়নুল তখন আর্ট স্কুলের একজন শিক্ষক। আয় অতি সামান্য।সময়কাল টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল।মন্বন্তরের  কাল।দুর্ভিক্ষের বাজারে উন্নতমানের শিল্পসামগ্রী তখন যেমন ছিল দুর্লভ, তেমনি দুর্মূল্য। সে কারণে তিনি বেছে নিলেন শুধু কালো কালি আর তুলি। শুখনো তুলিতে কালো চীনা কালির টানে স্কেচ করতে লাগলেন  অতি সাধারণ সস্তা দরের কাগজের ওপর। ব্যবহার করতে লাগলেন কার্টিজ পেপার।

এসব কাগজ ছিল খানিকটা পীত বর্ণের। এই সময়ে জয়নুল   প্যাকেজিং কাগজ পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। সাধারণ,খুব ই কমদামের  এই সব অঙ্কনসামগ্রী ব্যবহার করে তিনি যে শিল্প সৃষ্টি করলেন, তাই পরিণত হলো অমূল্য সম্পদে। এমন এক অসাধারণ শক্তিশালী অঙ্কনশৈলীর ভেতর দিয়ে জয়নুল   দুর্ভিক্ষের জ্বলন্ত বাস্তব দৃশ্যাবলি চিত্রায়িত করলেন।এ ধরনের চিত্রকলার  কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের চিত্র-ঐতিহ্যে আগে ছিল না। দুর্ভিক্ষের এসব চিত্র শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে অমরত্ব দিয়েছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ত্যাগ করলেও দেশকে খন্ডিত করে দেশত্যাগ করে।  জয়নুল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের  রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর সম্মানজনক চাকরিটি ছেড়ে ঢাকায় এসে নর্মাল স্কুলের সাধারণ অঙ্কণ শিক্ষকের কাজ নেন। তখন থেকেই তিনি বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময়ের  সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকায় একটি শিল্পকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার তাঁর উদ্যোগটি ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক উদ্যোগ।
শিল্পী হিসেবে জয়নুলের  খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা, সেই সময়ের  শিল্পী ,সাহিত্যিক,সংস্কৃতিকর্মী এবং  বন্ধুদের সহযোগিতা আর কিছু  বাঙালি সরকারি কর্মকর্তার সাহায্য -- সবকিছু মিলিয়েই অসম্ভব কে সম্ভব করে তুলেছিলেন জয়নুল।
১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে প্রথম  আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা। তখন এটি নামকরন করা হয়েছিল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস।
প্রতিষ্ঠানটি  গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব শিল্পাচার্য গ্রহণ করেছিলেন সংস্থার  প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিশেবে।(একদম সূচনা পর্বে  কয়েক মাসের জন্য শিল্পী আনোয়ারুল হক সেখানকাল  ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন)।

জয়নুল মাত্র দুটি ঘর নিয়ে শুরু করে  সেই প্রতিষ্ঠানকেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যেই এক অভূতপূর্ব  আধুনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরে সেটি ই তৎকালীন  পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় এবং স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। আরো পরে মহাবিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তরিত হয় এবং এর বর্তমান পরিচয়, চারুকলা অনুষদ। শাহবাগে এই প্রতিষ্ঠানের  সুপরিসর নান্দনিক ক্যাম্পাস।
ভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত আগে  ১৯৫১-৫২তে জয়নুল আবেদিন সরকারি বৃত্তি নিয়ে এক বছরের জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন চারুকলা প্রতিষ্ঠানে হাতে ঈলমে অভিজ্ঞতা অর্জন  করেন। সেইসময়ে জয়নুল ইংলন্ডে  নিজের একটি  শিল্পকর্মের প্রদর্শনীও করেন। তাঁর কাজ ইংল্যান্ডের বিদগ্ধজনের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে। এই সময়ে  তিনি ইউরোপের বহু দেশে যান।      
জয়নুলের এই সময়ের এই পাশ্চাত্য সফরটি  ভ্রমণটি শুধু যে তাঁকে পাশ্চাত্য জগতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাই নয়, এই সফরের ফলে তাঁর দৃষ্টি আরো প্রসারিত হয়। জয়নুল আবেদিনের পাঁচের দশকের শুরুতে এই পাশ্চাত্য সফরের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের চারুকলা চর্চা সূচনাপর্ব  থেকেই এক প্রাণবন্ত আধুনিকতার ধারায় উপনীত হতে পেরেছিল। জয়নুল আবেদিনের এই ইউরোপ সফর  তাঁকে বাংলার সমৃদ্ধ লোকশিল্পের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কেও বিশেষভাবে সচেতন করে তুলেছিল।
সেই সচেতনতার প্রতিফলন তাঁর  নিজের কাজের ভিতরেও  এই সময় থেকে দারুণভাবে প্রতিফলিত হতে শুরু করে।১৯৫১ সালে র সৃষ্টি বা তার ঠিক পরবর্তী সময়কালে তাঁর আঁকা  ছবিতে একটি অসাধারণ আঙ্গিকের পরিচয় পাওয়া যায়। এ আঙ্গিকের প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা যায়, জয়নুল গ্রামবাংলার অতি সাধারণ প্রাত্যহিক অথচ অত্যন্ত প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন দৃশ্যাবলি অনবদ্য চিত্রায়ণ করেছেন। বেশিরবাগ কাজ  জলরঙে  বা গোয়াশে করেছিলেন তিনি এই সময়ে।
তাঁর এই সময়ের  ব্যবহার করা জলরঙের বৈশিষ্ট্য হিশেবে সবথেকে উল্লেখযোগ্য হলো হালকা এবং অনুজ্জ্বল তুলির টান।
নিজের আঁকা ছবিতে কম্পোজিশন বা স্পেস ব্যবহারের অত্যন্ত প্রাচ্যধর্মী আঙ্গিক কে অনবদ্য ভাবে এইসময় থেকে ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন জয়নাল।এর পাশাপাশি বিষয় উপস্থাপনা এবং ড্রইংয়ের  পাশ্চাত্য-বাস্তবধর্মী ঘরাণাও এইসময়ে জয়নুলের সৃষ্টিতে জীবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করে।

এই ভাবে ই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের  এক অপরূপ সমন্বয়ের সৌধ হলো তাঁর শিল্পকর্মে।এই প্রসঙ্গে জয়নুলের  ‘ঝড়’ শীর্ষক ছবির কথা বলা যায়। ' ঝড়ে' বাংলাদেশের কালবৈশাখীর আকস্মিকতা ও উদ্দামতা ধরা পড়েছে অতি চমত্কারভাবে। বিন্যাসের সংক্ষিপ্ততায় ছবিটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। একইভাবে আঁকা তাঁর আরো দুটি সুন্দর জলরঙ ছবি ‘মই দেয়া’ ও ‘বিদ্রোহী গরু’।
পাশ্চাত্য সফর সেরে দেশে ফিরে ’৫২-৫৩তে জয়নুল গড়ে তোলেন এক অসাধারণ আঙ্গিক।  এই আঙ্গিক পরিচিতি লাভ করে  ‘আধুনিক বাঙালি’ আঙ্গিক হিশেবে। জয়নুলের এই আঙ্গিকের  কাজে বাংলার লোকশিল্পের নানা মোটিফ এবং রঙবিন্যাসের প্রভাবও বিশেষভাবে  লক্ষণীয়। জয়নুলের এই  সময় কালের  কাজগুলোকে রোমান্টিক মেজাজের একটা অনবদ্য পরিচয় মেলে।এই আঙ্গিকে তাঁর আঁকা  ছবি গুলি,প্রায় সবই অবয়বভিত্তিক। যদিও জয়নুলের   নিজস্ব নোতুন আঙ্গিকেই সেগুলি  উপস্থাপিত হয়েছিল।
 অসাধারণ আধা বিমূর্ত জ্যামিতিক ফর্মে নির্মিত তেরি করেছিলেন মানব-মানবীর শরীর। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ  প্রথাগত পারসপেক্টিভের শর্ত তিনি সেইসব ছবি তে মানেন নি। জলরঙ, গোয়াশ ও তেলরঙ, নানা মাধ্যমে আঁকা সেইসব ছবির সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য,সেগুলির  উজ্জ্বল প্রাথমিক রঙের ব্যবহার। ছবিগুলো আকারে আয়তনে খুব বড়ো না। মাঝারিই বলা চলে।
এই পর্যায়ে তাঁর আঁকা বেশিরভাগ   ছবি ই নারীর   জীবনযাপন কেন্দ্রিক।  মা ও শিশুও আছে।গ্রামীণ খেটে খাওয়া জীবন সংগ্রাম ও ধরা পড়েছে তাঁর  এই সময়কার কাজে। একটি গোটা সিরিজ এভাবেই তিনি  গড়ে তুলেছিলেন। এই সব ছবি র ভিতরে  কিছু উল্লেখযোগ্য  কাজ হলো ‘পাইন্যার মা’, ‘পল্লী রমণী’, ‘আয়না নিয়ে বধূ’, ‘একাকী বনে’, ‘মা ও শিশু’, ‘তিন পল্লী রমণী’, ‘গুণ টানা’, ‘মুখ চতুষ্টয়’ ইত্যাদি।
জয়নুল আবেদিন অবশ্য তাঁর এই পর্যায়ের  শিল্প আঙ্গিকটি কে খুব বেশি দিন ধরে রাখেননি। পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগেই তিনি আবার  ফিরে যান তাঁর প্রথম পর্যায়ের বাস্তবধর্মী আঙ্গিকের ভিতরে।এই আঙ্গিকের সবথেকে বড়ো  বৈশিষ্ট্য ছিল গতিময় ও শক্তিশালী রেখা।
 জয়নুল  কোনো কোনো সময়ে বিমূর্ত প্রকাশবাদী আঙ্গিকে কিছু ছবি এঁকেছিলেন। যদিও  তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিল বাংলার খেটে খাওয়া মানুষদের  জীবন সংগ্রামের বারমাস্যাতেই। ১৯৫৯ সালে তাঁর আঁকা বিশাল তেলরঙের একটি কাজ, শিরোনাম ‘সংগ্রাম’— এই ধারারই জ্বলন্ত প্রতীক। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে গরুর গাড়ির এক চালককে ।যিনি প্রাণপণ শক্তিতে কাদার মধ্যে আটকে যাওয়া তাঁর গাড়িটিকে ঠেলে তুলতে চেষ্টা করে চলেছেন। চালকের এই সংগ্রাম হলো , এক নিঃসঙ্গ ,নির্জন ,একক মানুষের সংগ্রাম। এই  সংগ্রামের যেন কোনো অন্ত নেই।

১৯৬৯ সালে সেই সময়ের  পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার গণআন্দোলন , আইয়ুব খান বিরোধী গণ অভ্যুত্থান।আইয়ুবেল  স্বৈরশাসনের শুরু '৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে।রাজনীতির পাশাপাশি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের  বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবিই ছিল সেই গণআন্দোলনের মূল কথা। তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের  চিত্রশিল্পীরাও জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন । ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আর্ট কলেজে ‘নবান্ন’ শীর্ষক এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন মূলত শিল্পাচার্যের উদ্যোগে।
আপাদমস্তক এক বাঙালি জাতীয়তাবাদের জ্বলন্ত প্রতীক ছিলেন জয়নুল।বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা গোটা বিশ্বের শিল্পসমাজের কাছে অনুপ্রেরণা।
'৭০ সালের ‘নবান্ন’ প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি স্ক্রল চিত্র নিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন।সেই ছবিটির  স্ক্রলের কাগজের প্রস্থ ছিল চার ফুট। কালো চীনা কালি, জলরঙ আর মোম ব্যবহার করেছিলেন জয়নুল সেই স্ক্রলটি আঁকতে। এই চিত্রমালায় তিনি তুলে ধরেছিলেন  বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস।
‘সোনার বাংলা’ এবং 'সুখ ও শান্তির দিনে' র চিত্র দিয়ে শুরু ছিল সেই প্রদর্শনী। ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার ক্রম-নিঃস্বতার পরিণতি, ভয়াবহ দারিদ্র্যার ভিতরে ডুবে যাওয়া, দুর্ভিক্ষ এবং অবধারিতভাবে দুঃখী-দরিদ্র মানুষের গ্রামত্যাগী হয়ে শহরমুখী যাত্রা-- এইসবের ধারাবাহিকতা ছিল সেই চিত্রবলীর মর্মকথা।সেগুলি ছিল যেন এক মহা আলেখ্য।
ভয়াবহ কারুণ্যে মাখা স্পর্শকাতর দৃশ্যাবলি, অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী উপস্থাপনা, অত্যন্ত সহজ সরল আঙ্গিক অথচ কি অসাধারণ জয়নুলের  আবেদন।
শিল্পাচার্য  ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে যাঁরা সংগ্রাম করেন, তাঁদের সবার সঙ্গেই একাত্মতা এই পর্যায়ে তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। '৭০ সাল, তখন তাঁর বয়স প্রায় ৫৬, সেই সময়ে তিনি আরব লীগের আমন্ত্রণে ছুটে গেলেন মধ্যপ্রাচ্যের সমরক্ষেত্রে। আল-ফাতাহ গেরিলাদের সঙ্গে চলে গেলেন যুদ্ধফ্রন্টে।
সেখানে জয়নুল মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকলেন।শিল্পাচার্যের সেইসব ছবির প্রদর্শনী হয়েছে একাধিক আরব দেশে। মুক্তিযোদ্ধারা সেই প্রদর্শনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্যালেস্টাইন থেকে দেশে ফিরতে না ফিরতে জয়নুলের নিজের দেশেই এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হেনেছিল উপকূলীয় এলাকায়। তিন লক্ষের ও বেশি  মানুষ ,'৭০ সালের ১২ই  নভেম্বরের ঝড়ে ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়।এই ঘটনায় প্রচণ্ড মানসিক আঘাত জয়নুল আবেদিন। আগাতের জর্জরিত হয়েও তিনি বসে থাকলেন না।তৈরি করলেন একটি রিলিফের দল।সেই দল নিয়ে   ছুটে গেলেন দুর্যোগ আক্রান্ত এলাকায়।
দুঃখী মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।পরবর্তীতে  তিনি সেই ঝড় এবং ত্রাণ শিবিরের কিছু  মর্মস্পর্শী দৃশ্য   তুলে ধরেছিলেন তাঁর তুলিতে, কালিতে। দুর্যোগ এলাকা থেকে ফিরে এসে নবান্ন আঙ্গিকেই  আবার আঁকলেন একটি দীর্ঘ স্ক্রলচিত্র। ‘মনপুরা ৭০’ শীর্ষক এ স্ক্রলটি ছিল ৩০ ফুট দীর্ঘ। কালো কালি এবং মোম-দিয়ে আঁকা হয়েছিল সেই স্ক্রলের ছবি।
সেখানে  দেখানো হয়েছিল  স্তূপীকৃত লাশের দৃশ্য।‘আমরা শুধু মৃত্যুতেই একতাবদ্ধ হই’—এই ছবি টির সামনে দাঁড়িয়ে জয়নুল দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলতেন। ‘মনপুরা ৭০’ একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ চিত্রকর্ম।

'৭০ এর  ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সেরে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নিজের  দেশে বন্দিজীবন কাটাতে বাধ্য হলেন জয়নুল।মুক্তিযুদ্ধ জয়নুলের মনে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি তৈরি করলো।বিজয় অর্জনের পর পরই তিনি পূর্ণোদ্যমে লেগে যান শিল্পচর্চা সংগঠনের কাজে। এবারে লোকশিল্প তাঁর সবথেকে বেশি প্রাধান্য পেলো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জয়নুল আবেদিনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সংবিধানের অঙ্গসজ্জার। জয়নুল  প্রবল উদ্দীপনার  সঙ্গে কাজটি সমাধা করেন। তাঁকে এই কাজে  সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন কয়েকজন তরুণ শিল্পী।
তবে  পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করে। তাঁর কর্মচাঞ্চল্যে কিছুটা ভাটা পড়তে শুরু করে।জয়নুলের  মন খারাপ হতে শুরু করে। জয়নুল  যেন বুঝতে পারেন যে, তাঁর নিজের সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।  এই পর্যায়ে তিনি ছোটেন  তাঁর আজীবন লালিত স্বপ্ন ‘লোকশিল্প জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার কাজে।
জয়নুলের  ইচ্ছে ছিল এই  জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে দেশের মূল্যবান লোকশিল্প।আগামী  প্রজন্ম সেখান  থেকেই নোতুন প্রেরণা পাবে। জয়নুল এই পর্যায়ে নিজের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য ময়মনসিংহে একটি চিত্রশালা প্রতিষ্ঠার কথাও ভেবেছিলেন।এই সব কাজের জন্য বাংলাদেশ  সরকার তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল  প্রসারিত করেছিল। প্রয়োজনীয় কিছু অর্থের ও  মঞ্জুরি  দিয়েছিল সে দেশের সরকার।
একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানেরই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার শুরুটা তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে আগেই দেখে যেতে পেরেছেন।

প্রায় ছয় মাস ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে তাঁর জীবনদীপ নিভে যায়।  মাত্র ৬২ বছর বয়সেই তাঁর জীবনাবসান হলো। অবশ্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আঁকার কাজে নিছেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে তারিখে তাঁর মৃত্যুর মাত্র কদিন আগে ঢাকার পিজি হাসপাতালে শুয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ঢঙে শেষ ছবিটি এঁকেছিলেন।দুটো মুখ, বলিষ্ঠ মোটা রেখায়, কালো কালি আর মোম ব্যবহার করেছিলেন সেই ছবিতে।

'৭৩ সালে শিল্পাচার্যকে  দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করেছিল। পাকিস্তানের পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৬৫) এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৭৩) তিনি ছিলেন অতিথি অধ্যাপক।  বঙ্গবন্ধু তাঁর শাহাদাত বরণের অব্যবহিত আগে , '৭৫ সালের ১৭ ই মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে  জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত করেছিলেন।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন