আনিস খানের মতো প্রতিবাদীকে কেন খুন হতে হলো?

আনিস খান ,ভারতের মূল নিবাসীদের ধর্মের দোহাই দিয়ে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, তার প্রতিবাদে এক আত্মনিবেদিত তরতাজা যুবক ।সেই যুবককে কি রাষ্ট্রশক্তি বেঁচে থাকতে দিতে পারে ?সেই যুবক যে রাষ্ট্রশক্তির দোহাই দিয়ে সহনাগরিক মুসলমানদের সঙ্গে রাষ্ট্র কতখানি বিমাতাসুলভ আচরণ করছে, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ব্রত নিয়ে ছিল, এমন ব্রতধারী মানুষকে কি রাষ্ট্র বেঁচে থাকতে দিতে পারে? আনিস খান হচ্ছেন সেই যুবক, যিনি মুসলমান সমাজের উন্নয়নের নাম করে ,তাঁদের  ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতার  দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রশক্তি জান কবুল করে দিচ্ছে ,রাষ্ট্রের এই অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিত্ব। মুসলমান সমাজকে যে কেবলমাত্র ধর্মীয় বিধি বিধানে আবদ্ধ না রেখে, আধুনিকতার সাম্প্রতিকতম পর্যায়ের সঙ্গে পরিচিত না করলে তার সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয় ,এই সহজ সত্যটা সমাজকে জানানো যুবক হলেন আনিস খান। তাই এমন সহজ সত্য কথাটা নাগরিক সমাজের সামনে যে ছেলে তুলে ধরছে ,সেই ছেলেকে কি রাষ্ট্র বেঁচে থাকতে দিতে পারে?                  

সচেতনতার জন্য লড়াই করে যে সেইতো রাষ্ট্রের রোষানলের শিকার হয়। অনিস খান মুসলমান সমাজকে সচেতন করার জন্য লড়াই করছিল ।মুসলমান সমাজের জন্য ভারতের সংবিধান যে অধিকার সাব্যস্ত করেছে, সেই অধিকার সচেতন করে তোলার জন্য মুসলমান সমাজের মধ্যে আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আধুনিক প্রজন্মের মানুষ যে সামাজিক আন্দোলন শুরু করেছে, সেই সামাজিক আন্দোলনের শরিক ছিল আনিস। ভিক্ষা নয়। ডোল নয় ।কৌতুকে করুণায় ছুঁড়ে দেওয়া দুটো চারটে পয়সা নয় ।মুসলমান সমাজের  সত্যিকারের মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য দরকার ,আধুনিক শিক্ষা। দরকার প্রযুক্তির নিত্যনতুন কৌশল আয়ত্ত করা। প্রথাগত শিক্ষার সাথে সাথে দরকার ,নানা ধরনের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা ।দরকার নিজের আত্ম পরিচয় সম্পর্কে সার্বিকভাবে অবহিত হওয়া ।তাহলেই সমস্ত রকমের হীনমন্যতা কাটিয়ে ,স্বাধীকারের লড়াইয়ের প্রশ্নে মুসলমান সমাজ সবার সাথে এক ভাবে ,পায়ে পা মিলিয়ে, অধিকারের জন্য লড়াইয়ের ময়দানে শামিল হতে পারে।                 

মুসলমান সমাজকে সচেতনতা তৈরি করবার জন্য তাঁদের ভেতর থেকেই ঝাঁকে ঝাঁকে উজ্জ্বল, প্রতিশ্রুতিবান যুব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি উঠে আসছেন। আনিস খান ছিলেন তাঁদেরই একজন। শাসক শিবিরের  প্রচারের ঢক্কানিনাদে আস্থা ছিলো না  আনিসের।মুসলমানদের টাকা দিয়েই মুসলমানদের দুটো চারটে পয়সা দান খয়রাত করে ,মুসলমান সমাজের যে প্রকৃত কল্যান করতে পারা যায় না ,আধুনিক শিক্ষা  সেই বোধটাই দিয়েছে আনিসের মতো মানুষদের ।আর সেই বোধটা হতদরিদ্র মুসলমান সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো আনিস।                 

মঞ্চ সফল  অভিনয়ের জন্য হিজাব পড়ে, ভুল ভঙ্গিমায় মোনাজাতের পোস্ট দিয়ে ,ফটো সেশন করলেই যে মুসলমান সমাজের উন্নতি হয় না, এই সহজ-সরল সত্যটা মুসলমান সমাজের সামনে তুলে ধরার জন্য জান কবুল লড়াই জারি রেখেছিল আনিস। আরবি-ফারসি মিশ্রিত দুটো ,চারটে, পাঁচটা ধর্মীয় ভঙ্গিমা  অবলম্বন করলেই যে মুসলমান সমাজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে না  , এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক শিক্ষা র , প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি, সর্বস্তরেই পক্ষপাতিত্বহীন বিনিয়োগ ব্যবস্থা ,দরকার আধুনিক স্বাস্থ্যবিধি ,ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজালের বাইরে বেরিয়ে এসে ,জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শরীর বৃত্তীয় প্রত্যেকটি কাজের জন্য দরকার আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাহায্য গ্রহণ ।এই সহজ-সরল সত্য গুলি যে আনিস খান তুলে ধরেছিল গ্রাম-গ্রামান্তরে হত দরিদ্র মানুষদের মধ্যে।                 

সেই মানুষদের মধ্যে যেমন জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন, তেমনি জন্মসূত্রে মুসলমান ও ছিলেন ।আনিসের  এই কথাগুলো যে কেবলমাত্র মুসলমান সমাজকে প্রভাবিত করেছিল তা নয় ।হিন্দু সমাজের ভেতরে যাঁরা প্রথাগত শিক্ষার তেমন সুযোগ পাননি ,আধুনিক জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে যাঁরা নিজের জীবনকে এখনো জুড়ে উঠতে পারেননি অর্থনৈতিক কারণে, সেই মানুষেরাও প্রভাবিত হচ্ছিল আনিসের কথার দ্বারা। ফলে  কেবল যে শাসকের আরশ কেঁপে উঠছিল আনিসের দ্বারা তা নয়। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ,ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তির যৌথ উদ্যোগে গ্রাম-গ্রামান্তরে যে পুরোহিত তন্ত্র এবং মৌলভী তন্ত্র, তাকে আঘাত করছিলেন আনিস।                 

এই প্রতিক্রিয়াশীলতার সঙ্গে  সমানভাবে পাল্লা দিয়ে চলছিল আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ধ্যান-ধারণা।একটা পরিবর্তন ধারা হিসেবে সেই প্রতিক্রিয়াশীলতার কাঠামোকেও নাড়িয়ে দিচ্ছিল আনিস, আনিসের  মত ছেলেরা ।যে দিল্লি গণহত্যা নিয়ে এ রাজ্যের শাসকদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাইনি ,কেন্দ্রীয় শাসকদের বিরুদ্ধে এ রাজ্যের শাসকেরা দিল্লি গনহত্যার বর্বরতা ঘিরে একটি প্রতিবাদ ,একটি প্রতিরোধের সংকল্প সংসদের ভেতরে হোক, সংসদের বাইরে হোক ,মানুষের দরবারে হোক, প্রতিধ্বনিত করেনি ,সেই বর্বরোচিত দিল্লি গণহত্যা ঘিরে এই আনিস কিন্তু তাঁর নিজের সাধ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ, প্রতিরোধে সর্বাত্মকভাবে শামিল ছিল ।         

আনিসের প্রতিবাদী চরিত্র ,সেই চরিত্রের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ আঙ্গিক।' মুসলমান বিপন্ন'  এই জিগির তুলে ,মুসলমান সম্প্রদায় কে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার সস্তার রাজনীতির পথে কিন্তু আনিস  একটি দিনের জন্য মাঠে নামে  নি।তাই এমন ছেলে যেমন শাসকের অপছন্দের হবে ,তেমনি অপছন্দের গোটা প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের। গোটা ধর্মান্ধ শিবিরের। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ঘটিয়ে ,নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়, সেই অংশের মানুষদের কাছে জালেমদের কেল্লা পোড়ানো স্ফুলিঙ্গ হিসেবেই ক্রমশ উঠে আসছিল আনিস খান।                 

এমন ছেলেকে কি রাষ্ট্রযন্ত্র বেঁচে থাকতে দেয়? এমন ছেলে যদি বাঁচে ,তবে তো সে রক্তবীজের মত গোটা সমাজে হিন্দু মুসলমান ,ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ,মানুষের মধ্যে এই মন্ত্র সংক্রমিত করবে যে ,ধর্মান্ধ পাশবিক শক্তির কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও ।আর ধর্মান্ধ পাশবিক শক্তির কালো হাতের দিকে যদি নাগরিক সমাজের রোষানল একবার বর্ষিত হয় ,তাহলে কি দিল্লির সাউথ ব্লক ,কি পশ্চিমবঙ্গের নবান্ন, সমস্ত শাসকদের আরশ ভেঙেচুরে, চুরমার,খন্ড বিখন্ড হয়ে যাবে।                 

তাই তো রাষ্ট্রশক্তি ভীরু কাপুরুষের মতো ,মাঝরাত্রে হানা দেয় এমন একটি ছেলের বাড়িতে ,যে ছেলেটি কিন্তু এন আর সির  নাম করে ,ভারতের নাগরিকদের ,তারা ধর্মে হিন্দু আর মুসলমান হন , যাই হোন না কেন, তাঁরা যদি নাগপুরি হিন্দুত্বের সমর্থক না হন ,অচিরেই খুলে ফেলবেন ভারতের নাগরিকত্ব ঘুচিয়ে দেবে নাগরিকত্বের পরিচয়, এমন ই কালাকানুন এনআরসির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ।সেই আন্দোলনে ঘুম কেড়ে নিয়েছে শাসকের। সংশোধিত কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যের পর ,গোটা দেশে যখন ধীরে ধীরে এন আর সি ,সি এ এ-  বিরোধী আন্দোলন, সমস্ত স্তরের প্রতিক্রিয়াশীলদের  কুটকৌশল কে অস্বীকার করে ,অগ্রাহ্য করে, অতিক্রম করে নতুনভাবে  আবার  দানা বাঁধার চেষ্টা করছে, তখন যে রাষ্ট্রযন্ত্র কৌশল করে ওঁদের হত্যা করবে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই ।           

আর এই হত্যাকাণ্ডে পুলিশ গিয়েছিল কি না, এই কূটতর্ক তুলবেন একদল শাসকজীবী মানুষ ।তাঁরা  এই প্রশ্ন তুলবেন না যে ,আনিসের বাড়ির সামনে যে দুজন উর্দি পরা পুলিশ ছিল ,যে দুজন উর্দি পরা পুলিশের কাছে ,আনিসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সিভিক ভলেন্টিয়ারেরা বলেন,'কাজ হয়ে গেছে',  সেই দু'জন উর্দি পরা পুলিশ যে অস্ত্র নিয়ে ওখানে গিয়েছিল,  সেই অস্ত্র কিন্তু পুলিশেরই অস্ত্র । একজন কর্তব্যরত পুলিশ যখন আর্মস অ্যামুনেশন সাথে নিয়ে তাঁর কাজে যোগদান করে, তখন সেঈ ব্যক্তি ,কোন আর্মস, অ্যামুনেশন সাথে নিল ,সেগুলো কিন্তু পুলিশের খাতায় লিপিবদ্ধ থাকে। কর্তব্যরত পুলিশের অস্ত্র কখনো বাইরের মানুষের হাতে যেতে পারে না ।আর যদি তা গিয়েই থাকে, তাহলে কার হাত দিয়ে গেল,অর্থাৎ; এই ষড়যন্ত্রের জাল যে কতটা দূর বিস্তৃত তা ধরা তদন্তকারী দলের পক্ষে কিন্তু আদৌ অসম্ভব কোন ব্যাপার নয়।               

যে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে খুন করার ,রাজ্যের শাসক সেই পুলিশকেই খুনের তদন্তভার অর্পণ করেছে। এই বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট এর কি  পরিণতি হয়,  গত প্রায় এগারো  বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষটা খুব ভালোভাবে দেখেছেন। সারদা ,রোজভ্যালি চিটফান্ড কান্ডে  একাধিক  সিট তৈরি হয়েছে ।কিন্তু আসল লোক ধরা পড়েছে , না নকল ধরা পড়েছে তা নিয়েই মানুষ সংশয়ী।তাই রাজ্য পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন এনআরসির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত আনিস খানের  নরকীয় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করবে সিট,  কি সিদ্ধান্ত তারা দেবে,  তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই নিরপেক্ষ নাগরিকদের সেটা বুঝে নিতে কোনো অসুবিধা হয় না।

Gautam-Roy

গৌতম রায়

*মতামত লেখকের নিজস্ব


শেয়ার করুন

উত্তর দিন