Germany invades Polland 2

বিশ্ব শান্তি এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস হিসাবে ১ সেপ্টেম্বরের তাৎপর্য - বিমান বসু

কেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস ?

Germany invades Polland 1
Image Source: Social Media

১লা সেপ্টেম্বর সারা পৃথিবীতেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস হিসাবে পালন করা হয়। একথা সকলেই জানেন ঐদিন ফ্যাসিস্ত জার্মানি আক্রমন করেছিল পোল্যান্ডে এবং শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সেদিনের সেই যুদ্ধের ফলাফলে আজকের পৃথিবীটি অন্যরকম চেহারা পেত যদি না যোসেফ স্তালিনের নেতৃত্বে কূটনীতি এবং সমরকৌশলের যথাযোগ্য ব্যাবহার করে সোভিয়েত লাল ফৌজের দ্বারা অক্ষশক্তির পরাজয় না ঘটত। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আচমকাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহরের উপরে পারমানবিক বোমা ফেলে - এতেও লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, লক্ষ মানুষ হয়ে পড়ে বিকলাঙ্গ। সেই পারমানবিক অস্ত্রের তেজস্ক্রিয়তার ফলে আক্রান্ত হয়ে মহিলারা বিকলাঙ্গ সন্তান প্রসব করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই ভয়াবহতা আজও মানুষের চেতনায় রয়েছে।

Germany invades Polland 2
Image Source: Social Media

এই যুদ্ধ শুরু ছিল মানবতার সকল সদগুণের ধ্বংসসাধন করে দুনিয়াজূড়ে ফ্যসিবাদী ক্ষমতা কায়েম করার রাজনৈতিক লক্ষ্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল এতই ভয়াবহ ছিল যে যুদ্ধাবসানের পরেই শুরু হয় সারা পৃথিবী জূড়ে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন। একশো পঞ্চাশটিরও বেশি দেশে যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮২ সালে (১০ই ফেব্রিয়ারি - ১৫ই ফেব্রুয়ারি) কিউবার রাজধানী হাভানায় WTUF (World Trade Union Federation)'র এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়, সেখানে ৮৫০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনের মঞ্চ থেকে সমবেত সিদ্ধান্তের ঘোষণা করে বলা হয় এখন থেকে ১লা সেপ্টেম্বর দিনটিকে যুদ্ধবিরোধী শান্তি দিবস হিসাবে পালন করা হবে।

Germany invades Polland 3
Image Source: Social Media

সারা পৃথিবীতে ১৯৮৫ সাল থেকে এই দিনটিকে যুদ্ধবিরোধী শান্তি দিবস হিসাবে পালন করা শুরু হয়। আমাদের দেশে কলকাতায় বহু যুদ্ধবিরোধী কর্মসূচি অতীতে সংগঠিত হয়ে এসেছে (১৯৮৫ সালের অনেক আগে থেকেই), বলা যায় ভারতের বুকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের একটি বড় কেন্দ্র হল এই শহর। ইন্দোচিনে মুক্তির লড়াইয়ের সমর্থনে কলকাতায় একের পরে এক ছাত্রদের মিছিল, শ্রমিকদের মিছিল - সমাবেশ আবার আরেকদিকে সমগ্র জনগণের অনেকগুলি বিশাল মিছিল হয়েছে। কমরেড যোসেফ স্তালিন ১৯৫৩ সালে মারা গেলে যখন এদেশে সেই মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছায় কলকাতায় অনেকগুলি জায়গায় কিছুক্ষনের জন্য কল-কারখানা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, রাস্তায় চলা ট্রাম কোম্পানির চাকা স্তব্ধ হয়ে গেছিল দু মিনিটের জন্য। এই হল কলকাতার ইতিহাস। অনেকেই এই ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত নন, আবার অনেকে জেনেশুনেও তাদের লেখা কিংবা কথাবার্তায় এর উল্লেখ করেন না - জানিনা কেন! ভিয়েতনামে মার্কিন সেনাবাহিনী বোমা ফেললে ছাত্র-যুবরা বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছেন - হুংকার দিয়ে উঠেছে গোটা শহর কলকাতা।

Germany invades Polland 4
Image Source: Social Media

ভিয়েতনামে মুক্তি সংগ্রামিদের সেই ঐতিহাসিক লড়াই কাগজে, বইতে পড়ার সুযোগ হয়েছে আমাদের - আমার সুযোগ হয়েছে সেখানে গিয়ে সেই লড়াইয়ের স্মৃতিচিহ্নগুলীকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। দেড় কিলোমিটার জুড়ে মাটির ভিতরে টানেল কাটা - তার ভিতর অপারেশন থিয়েটার সহ হাসপাতাল এবং চিকিৎসক, নার্সদের থাকার জায়গা, সেনাবাহিনী এবং অন্যান্যদের জন্য ব্যাবস্থা এমনকি ছোটদের জন্য স্কুলের পরিকাঠামোও দেখে এসেছি। দেশকে মুক্ত করতে কতটা দৃঢ় পণ নিয়ে আধিপিত্যকারী রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে নামলে এমন করা যায় তা আমি উপলব্ধি করেছি, আমাদের সবার উচিত এই ঐতিহাসিক সংগ্রামকে স্মরণে রাখা। এই সময়ে কলকাতায় ছাত্রদের মিছিল সবচেয়ে বেশি হয়েছে, সেইসব মিছিলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন শ্রমিকেরা, সাধারণ জনতাও। এমনও হয়েছে একই সপ্তাহে দুটি কিংবা তিনটি মিছিলও করতে হয়েছে।

আমার এখনও মনে আছে হ্যানয়ে বোমা ফেলার পরের দিনই আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম, দামাং'এ বোমা ফেলা হলেও একইভাবে রাস্তায় নামা হয়। ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনী B2 বিমানে করে এত বড় বড় বোমা ফেলেছে যে তার আঘাতে মাটিতে প্রায় এক একটি পুকুরের সমান আকারের গর্ত হয়ে গেছে - ভিয়েতনাম সেই চিহ্নগুলি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসাবে আজও রেখে দিয়েছে।

সারা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের মতো এখানেও ধ্বনিত হয়েছে "সাম্রাজ্যবাদ - ভিয়েতনাম থেকে হাত ওঠাও" স্লোগান। "তোমার নাম আমার নাম, ভিয়েতনাম - ভিয়েতনাম" স্লোগানটিতো এক কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত। এই সবই হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসাবে। ইরাকের উপরে যখন আক্রমন নামিয়ে আনা হয় সেদিনও কলকাতার বুকে বহু মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। কিউবায় অর্থনৈতিক অবরোধই হোক কিংবা ইজরায়েলকে শিখণ্ডীর মতো ব্যাবহার করে প্যালেস্তাইনের উপরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আক্রমনের ঘটনাই হোক না কেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়েছে এই কলকাতায়।

শান্তির পক্ষে কথা বলার, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার প্রয়োজন আজকের পৃথিবীতেও রয়েছে কারন আধুনিক পৃথিবীতেও আধিপত্য বিস্তারের নয়া কলাকৌশল প্রযোজ্য হয়ে চলেছে। Imperialism is the highest stage of capitalism - এই কথা ভুললে চলে না। যেহেতু পুঁজিবাদ এখনও নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে তাই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইও আজও প্রাসঙ্গিক।

পৃথিবীর বুকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে নাকি হবে না তার উত্তর আগামী সময় দেবে। যেভাবে দেশে দেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেত চেয়ে মার্কিন শক্তি সক্রিয়তা দেখাচ্ছে এবং আমাদের দেশকে সেই কাজের ছোট শরিক করতে চাইছে - ব্যাবহার করতে চাইছে এশিয়া মহাদেশে চীনের বিরুদ্ধে Strategic Partner হিসাবে তাতে আজকের দিনটিকে যুদ্ধবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শান্তি দিবস হিসাবে পালন করা আমাদের এক অবশ্য পালনীয় রাজনৈতিক কর্তব্য। এছাড়া অন্য কোন পথ নেই।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন