Titumir

তিতুমীর : ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম বাঙালি শহিদ

মীর নিশার আলি, যিনি তিতুমীর নামে সকলের কাছে পরিচিত, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সফল কৃষক গণ প্রতিরোধ গড়বার ক্ষেত্রে যাঁকে আদিপুরুষ বলে মর্যাদা দেওয়া হয়, তাঁর জন্ম আজকের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার চাঁদপুর গ্রামে।সেটি বসিরহাট মহকুমার একটি গ্রাম।১৭৮২সালে তিতুর জন্ম। সেকালের রীতিতে তাঁর জন্ম তারিখের কোনো সুনির্দিষ্ট নথি নেই। চাঁদপুর গাঁয়েই সে যুগের প্রথায় স্থানীয় মাদ্রাসাতে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। মাদ্রায় পড়াশুনার পাশাপাশি শৈশব থেকেই তিতুর শরীরচর্চার প্রতি ছিল তীব্র আকর্ষণ।নিজের গাঁয়েই একটি আখড়া তে শরীরচর্চা শুরু করেন তিতু।কুস্তিবীর হিশেবে অষ্টাদশ শতকের শেষাব্দে কেবল নিজের গ্রাম চাঁদপুরেই নয়, গোটা বসিরহাট অঞ্চলে অত্যন্ত সুনাম অর্জন করেন তিতু।কুস্তি প্রদর্শনের নানা কৌশল দেখাতে উনিশ শতকের সূচনায়,১৮০০ সালে তিনি কলকাতায় আসেন।সেই সময়ে কলকাতাতে দিল্লির মুঘল পরিবারের সদস্য মির্জা গোলাম আম্বিয়া নামক এক সম্ভ্রান্ত মানুষের সঙ্গে তিতুর সংযোগ গড়ে ওঠে।এই মির্জা গোলাম , কলকাতার শিয়ালদহ অঞ্চলের মির্জাপুর ( এখন যেটি সূর্য সেন স্ট্রীট, শ্রদ্ধানন্দ পার্ক) এলাকার জমিদার ছিলেন।তিতুর প্রথম জীবনে ব্রিটিশ বিরোধী চেতনার বিকাশে মির্জা গোলাম আম্বিয়ার বিশেষ প্রভাব ছিল।পরবর্তীতে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী যুবকরা নানা প্রশিক্ষণে শরীর চর্চার উপর যে গুরুত্ব আরোপ করতেন, ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধে , শরীর চর্চার সেই প্রাথমিক ধারণাটি প্রথম সঞ্চারিত করেছিলেন তিতুমীর।
              

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি , তাদের ভেদনীতিনির্ভর শাসন পদ্ধতিতে তিতুর প্রতিবাদী চরিত্রটি অনুভব করবার প্রায় সাথে সাথেই তাঁকে দাঙ্গাকারী, হামলাবাজ, হিন্দু বিদ্বেষী হিশেবে দেখাতে শুরু করে নিজেদের শ্রেণীস্বার্থে।মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে অপরাধপ্রবণ হিশেবে দেখানোর যে প্রবণতা পরবর্তী কালে আমরা হিন্দু সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদী শক্তির ভেতরে দেখেছি, তাদের প্রভাবিত শাসকদের ভিতরে দেখেছি, বাংলায় এই প্রবণতা ব্রিটিশ প্রথম দেখায় ১৮১৫ সালে এক হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে দাঙ্গাহাঙ্গামাতে তিতু জড়িত , এই অসত্য অভিযোগের ভিতর দিয়ে।পরবর্তীতে এভাবে হিন্দু - মুসলমানের সংঘাতকে তীব্র করবার কৌশল ব্রিটিশ ধারাবাহিক ভাবে চলিয়েছে।এখন সেটি অনুসরণ করে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদীরা। কৃষকের স্বার্থে, প্রজার স্বার্থে জমিদারের বিরুদ্ধে তিতুর যে প্রতিবাদ, জাত- ধর্মের বিচার না করে , গরিবগুর্বো মানুষদের নিয়ে যে প্রতিরোধের প্রচেষ্টা, ব্রিটিশ সেই লড়াইকে উপস্থাপিত করে, হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে মুসলমান তিতুর অত্যাচার, দাঙ্গা - হাঙ্গামার ষড়যন্ত্র হিশেবে।সেই অভিযোগেই ১৮১৫ তে তিতু ব্রিটিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার লিখছেন; মুক্তির পর কলকাতায় মির্জা গোলাম আম্বিয়ার কাছে তিতু চলে আসেন।তিতু সম্পর্কে লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে ব্রিটিশের যে সমস্ত কাগজপত্র আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৮১৫ তে গ্রপ্তার হওয়ার পর প্রায় সাত থেকেআট বছর কার্যত বিনাবিচারে তিতুকে জেল খাটতে হয়েছিল।হান্টার নিজে লিখেছেন, ১৮২২-২৩ সাল নাগাদ ,বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর , তিতু কলকাতাতে মির্জা গোলাম আম্বিয়ার কাছে চলে এসেছিলেন।সাত থেকে আট বছর নিছক সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে এবং তিতুকে হিন্দু বিদ্বেষী হিশেবে প্রতিপন্ন করে , ব্রিটিশের বিরুদ্ধে , হিন্দু- মুসলমানের সন্মিলিত প্রতিবাদ, প্রতিরোধকে ভেস্তে দিতেই যে তিতুর বিরুদ্ধে ব্রিটিশের এই নোংরা ষড়যন্ত্র, তা হান্টারের কথা থেকেও পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে।
         

মির্জা গোলাম আম্বিয়ার সাহচর্যেই হজ্ব করতে পবিত্র মক্কা নগরিতে যান তিতু। একদিকে আধ্যাত্মিক চেতনা অপর দিকে আন্তর্জাতিক চিন্তাচেতনা তে সম্বৃদ্ধ হওয়ার দিকে পবিত্র ইসলামের যে উদাত্ত আহ্বান, সেই বোধ , গভীরতা , তিতুর ভিতরে জাগ্রত এবং উন্মিলনের প্রশ্নে মির্জা গোলাম আম্বিয়ার বিশেষ অবদান আছে।পবিত্র মক্কা নগরিতে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভির সাহচর্য, শিক্ষা তিতুকে কার্যত এক নোতুন জীবন দেয়।হিন্দু- মুসলমানের সন্মিলিত লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসা, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ব্টিশকে তাড়ানোর উদ্যোগে, ব্রিটিশের প্রাথমিক সখ্যতা যাদের সঙ্গে, সেই দেশিয় জমিদার দের প্রতিরোধের যে সংকল্পের কারনে তিতুর ব্রিটিশ কারাগারে নির্যাতন সহ্য করা, সেই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাদেশিক বোধ কে একটা সুসংবদ্ধ চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করতে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভি , তিতুর জীবনে বিশেষ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
                  

১৮২৭ সালে পবিত্র মক্কা নগরি থেকে তিতু ফিরে আসেন, উত্তর চব্বিশ পরগণার নারকেলবাড়িয়ার হায়দরপুর গ্রামে।স্থানীয় গরিব মানুষ, জাতধর্ম বিচার না করে, কেবল শ্রেণীগত অবস্থানের কারনে যে মানুষেরা উচ্চবর্ণের , উচ্চ বিত্তের হিন্দু- মুসলমান জমিদার, যারা ব্রিটিশের সর্বাত্মক শাসনশোষণের স্থানীয় প্রতিনিধি, তাদের প্রতিহত করবার শিক্ষা এবং সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েই , সেই মতো মানসিক গঠন কে প্রস্তুত করেই , ব্রেলভি তাঁর শিষ্য তিতুকে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন।সৈয়দ আহমদের বিশুদ্ধ ইসলামের জন্যে যে সামাজিক আন্দোলন, যে আন্দোলনের সবথেকে বড়ো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল ; ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধতা এবং ভারতবাসীর ভিতর সম্প্রীতি - সেই চেতনার বিকাশে এরপর তিতু আত্মনিয়োগ করেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী চেতনায় অনুরক্ত বহু ইতিহাসবিদ , ইসলামীয় সংস্কারবাদী আন্দোলনে সাম্প্রদায়িকতার লেবাস যুক্ত করতে চান।যদিও এই ইসলামীয় সংস্কারবাদী আন্দোলনের সমান্তরাল ধারাতে যে হিন্দু সংস্কারবাদী আন্দোলন চলেছিল, সেই ধারাতে কোনো সাম্প্রদায়িক ঝোঁক দেখতে পান না। তিতু প্রথম মক্কা থেকে ফিরে প্রথম পর্যায়ে যে সংস্কারবাদী আন্দোলন শুরু করেন, সেই আন্দোলন নিছক ইসলামধর্মের পরিমন্ডলে আবদ্ধ থাকা কোনো বৈশিষ্ট্যময় ঘটনা ছিল না।সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে শাসক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যে মিতালি, সেটির বিরোধিতার ভিতর দিয়ে, দেশের মানুষের রাজনৈতিক ভাগ্য, দেশের মানুষ ই নির্ধারণ করুন, ব্রিটিশ নয়, ব্রিটিশের দালাল দেশিয় জমিদারেরা নয়- এটাই ছিল সেই আন্দোলনের সবথেকে বড়ো রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।এই লক্ষ্যেই পরিচালিত আন্দোলনের ভিতর দিয়ে ১৮৫৭ র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ও আগে, প্রথম এই বাংলার বুকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ব্রিটিশ বিরোধী কৃষক প্রতিরোধ, যা অচিরেই গণপ্রতিরোধে পরিণত হয়েছিল, তা সংগঠিত করেছিলেন, ভারতের প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী গণপ্রতিরোধের নায়ক তিতুমীর।মির্জা গোলাম আম্বিয়া , সংস্কার আন্দোলনে আত্মনিয়োগের জন্যে তিতুকে যে বৃত্তি দিয়েছিলেন, আত্মনিবেদিত ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব তিতু সেই অর্থ, তাঁর আশেপাশের হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে গরিব চাষি মানুষদের ভিতরে বিলিয়ে দিতেন।একজন আত্মনিবেদিত মুসলমান যে একজন প্রকৃত অর্থে আত্মনিবেদিত দেশপ্রেমিক , ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ হন, তিতু তাঁর গোটা সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের ভিতর দিয়ে তা দেখিয়ে গেছেন।
           

তিতু ১৮২৮ সালে তাঁর সহমতাবলম্বী মানুষদের নিয়ে যে বাহিনি তৈরি করেছিলেন, ভারতের জাতীয় আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই কেবল নয়, বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ মননলোকের উদ্ভাষণে , সেই চেতনা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।ভারতের জাতীয় আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে, স্বাধীন সম, সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টিতে , আপামর বাঙালির যে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় স্থিত থেকে লড়াই, সেই লড়াইয়ের অন্যতম প্রেরণা ছিলেন তিতু।তাঁর যে বাহিনী কে তিনি পরিচালিত করেছিলেন, সেই বাহিনীর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কোনো রকম রক্ষণশীল চিন্তা- চেতনার এতোটুকু সংযোগ তিনি কখনো রাখেন নি।আধ্যাত্মিক চেতনাকে অস্বীকার না করে ও , অপর ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নিজধর্মের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অটুট আস্থা রেখে, দেশের মানুষের রাছনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ভাবনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, বিদেশি শাসক বা তাদের দালালদের হাতে নয়, দেশের ভূমিস্তর থেকে উঠে আসা সংগ্রামী মানুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোক-- এই যে চেতনার স্ফুরণ তিতু ঘটিয়েছিলেন, তার নিরিখে তাঁর সম্পর্কে বলতে হয়, ভারতে ভূমিস্তরে গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মিলনে তিতুমীর হলেন অন্যতম আদিপুরুষ।কৃষকদের সংগঠিত করবার ভিতর দিয়ে, আর্থ- সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের ভিতরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দালাল , দেশিয় জমিদারদের ভয়াবহ পোষণ, দমন- পীড়নের স্বরূপ এবং বিপদ বোঝাবার ক্ষেত্রে , ভারতের জাতীয় আন্দোলনে , ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতার উন্মেষের ও অন্যতম আদিপুরুষ হিশেবে তিতুকে সম্বোধিত করতে হয়।অবিভক্ত চব্বিশ নরগণা, যমুনা- ইছাবতী বিধৌত ভৌগলিক সীমারেখা এবং অবিভক্ত নদিয়া জেলা( আজকের কুস্টিয়া সমন্বিত) তে ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতা, তিতু এবং তাঁর বাহিনী যেভাবে সঞ্চারিত করেছিলেন, ভারতের জাতীয় আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের ধর্মনিরপেক্ষ ধারার প্রবাহনে, তার মূল্য ঐতিহাসিক।
                       

আজ যখন হিন্দু মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক শিবির , তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ' সাম্প্রদায়িকতা' র প্রচার এবং প্রসার ও প্রয়োগের স্বার্থে পোষাক জনিত বিতর্ককে টেনে আনছে, তখন বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয়, পোষাক ব্যবহার ঘিরে ব্যবহারিক কৌশলের উপর তিতুর এবং তাঁর অনুগামীদের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি।বাঙালি মুসলমানের পোষাক বৈশিষ্ট্য কখনো কোনো বিশেষ ধর্মজনিত কৌনিক অবস্থান ছিল না।বাঙালির নৃতত্ত্ব ঘিরে অন্যতম প্রাচীন আলোচক , জেমস ওয়াইজ যে বিবরণ রেখে গিয়েছেন, সেখানেও পোষাক ঘিরে বাঙালির বৈশিষ্ট্যে ধর্মীয় চেতনার থেকে, সেই সময়ের নিরিখে র শ্রেণি চেতনার দিকটিই ছিল প্রবল।উচ্চবর্ণের, অভিজাত, বিত্তবান বাঙালির পোষাক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে হিন্দু - মুসলমান নির্বিশেষে, গরিব , সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা বাঙালির পোষাক জনিত ফারাক ছিল বিস্তর।গরিব বাঙালি পুরুষের পরিধানে তখন ও ধুতি একটা জায়গা ধরে রেখেছিল। কাছা দিয়ে ধুতি পড়তে হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে গরিব বাঙালি অভ্যস্থ ছিল।এই প্রথা রাঢ় বঙ্গের আশরাফ মুসলমানেদের ভিতরে গত বিশ শতকের শেষের দিকেও বজায় ছিল।
       

তিতু যখন তাঁর আর্থ- সামাজিক- রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন, তখন নিম্নবর্গীয় মুসলমান সমাজের ভিতরেও কাছা দিয়ে ধুতি পরাটাই ছিল সাধারণ দস্তুর।এইভাবে ধুতি পড়াতে নামাজ আদায়ে কিছু সমস্যা তৈরি হতো।বিশেষ করে, সেজদা দেওয়ার সময়ে বার বার ওঠা বসার ক্ষেত্রে কাছা দিয়ে ধুতি পড়া র কারনে নামাজীদের সমস্যা হতো।তাই তিতু তহবন্দের আকারে ধুতি পড়ার অভ্যাসটি চালু করেন।অনুরূপ আদেশ বাংলার কৃষক আন্দোলনের আর এক পথিকৃৎ হাজি শরিয়তউল্লাহ ও দিয়েছিলেন। এই শহবত ঘিরে,' কাছাখোলা, জোলার পোলা, খাঁটি মুসলমান' শব্দটি তখন খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।পবিত্র ইসলাম সুন্নাত মোতাবেক যে দাড়ি রাখার কথা বলেছে, তেমনভাবেই ছিমছাপ দাড়ি রাখার নির্দেশ ও তিতু তাঁর শিষ্যদের দিয়েছিলেন।তিনি নিজেও তেমন ভাবে ই দাড়ি রাখতেন।এই দাড়ি ঘিরে তিতু এবং তাঁর সহমর্মীদের উপর 'দাড়ি ট্যাক্স' বসানো হয়েছিল।তাঁকে হেনস্থা করতেই স্থানীয় জমিদারদের দিয়ে ব্রিটিশেরা এই কাজ করেছিল।জমিদারি আইনকে ব্রিটিশ কেবল যে হিন্দু - মুসলমানের বিরুদ্ধে সংঘাত তৈরি তেই ব্যবহার করেছিল, তেমনটা ভাবার কোনো কারন নেই।মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানকে, বিশেষ করে প্রাচীন পন্থীদের সঙ্গে আধুনিকচেতনা , মানসিকতা সম্পন্ন মানুষদের সংঘাত তৈরি করতেও এই জমিদারি আইনকে ব্রিটিশ ব্যবহার করে।তিতু এবং তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে , স্থানীয় জমিদারদের দিয়ে এই ' দাড়িকর' ঘিরে , ভারতের সামাজিক প্রেক্ষিত কে ব্যবহার করে নিজেদের শাসন তথা শোষণ বজায় রাখতে ব্রিটিশের কৌশলের বিষয়টি খুব ভালো ভাবে বোঝা যায়।তিতুর আন্দোলনের আর্থ- সামাজিক- রাজনৈতিক চরিত্র ই তাঁকে এবং তাঁর অনুগামীদের হিন্দু- মুসলমান, উভয় সমাজের ই রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে দূরত্বের দিকে ঠেলে দেয়।সৈয়দ আহমদ ব্রেভলি যে মুহাম্মদিয়া আন্দোলন শুরু করেছিলেন,যে আন্দোলনের সঙ্গে চরিত্রগত সাযুজ্য ছিল আরবের মুয়াহহিদুন আন্দোলন, যার প্রবর্তক ছিলেন মুহাম্দ ইবনে আবদুল মুহাহদিন, সেইসব আন্দোলনের সঙ্গে তিতুর আন্দোলনের সব থেকে বড় চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য ছিল, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদের বিরোধিতা।এই প্রশ্নে , তিতুর আন্দোলনের সঙ্গে ফরায়েজি আন্দোলনের যে প্রাচীন সংস্কারকে আঁকড়ে ধরবার প্রবণতা ছিল, সেই নিরিখে , তাঁদের সাথেও তিতুর চেতনার একটা বড়ো দূরত্ব ।                        

ঔপনিবেশিক ভারতে কেবল ঔপনিবেশিকতাই নয়, সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর উপর আঘাতের প্রশ্নে তিতুমীরের আন্দোলন এবং ভূমিকা ছিল পথিকৃৎতের ।তিতুর সাংগঠনিক দক্ষতা কেবল জমিদারদের ই নয়, ব্রিটিশের মনে ও গভীর ভয়ের সঞ্চার করেছিল।মার্কসীয় চেতনা সঞ্জাত শ্রেণি চিন্তা, তিতুর ভিতরে তেমন সংগঠিত ভাবে না থাকলেও , শোষকের বিরুদ্ধে , শোষিত- বঞ্চিত- নির্যাতিত- অবহেলিত মানুষকে যেভাবে তিতু এবং তাঁর অনুগামীরা সচেতন করেছিলেন, সংগঠিত করেছিলেন, তাতে মার্কসীয় প্রজ্ঞার অসচেতন ঋত্ত্বিক হিশেবে তিতুর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে।
                   

১৮৩১ সালের ২৩ শে অক্টোবর থেকে নারকেলবেড়িয়াতে বাঁশের কেল্লায় তিতু এবং তাঁর সহযোদ্ধারা যে ঐতিহাসিক লড়াই শুরু করেছিলেন , সেই লড়াইয়ের একটি পরূযায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে সেই বছরের ই ১৯ শে নভেম্বর তিতুর শহিদত্ব বরণের ভিতর দিয়ে।তিতুর আন্দোলন পিছিয়ে পড়া মানুষ, আর্থ- সামাজিক ভাবে পিছনের সারির মানুষদের ভিতর অধিকার সচেতনতার প্রশ্নে ঐতিহাসিক অবদান রেখে গেছে।সাধারণ মানুষদের ভিতরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কদর্যতা ঘিরে সচেতনতা এবং সেইসাথে ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার উর্ধে উঠে লড়াই করার প্রশ্নে তিতুমীর এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।আজ গোটা ভারতজুড়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদি শক্তির ভয়াবহ দাপট প্রতিহত করতে, তিতুর সংগ্রামের নির্মোহ চর্চা বিশেষ জরুরি।

লেখাঃ গৌতম রায়


শেয়ার করুন

উত্তর দিন