ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র ধারার এক অনালোচিত ধারার হীরক দ্যুতি

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বামী বিবেকানন্দ

গৌতম রায়

ব্রিটিশের দাসত্ব শৃঙ্খল চূর্ণ করে তাদের স্বৈরাচারের দম্ভকে মাটিতে মিশিয়ে দিক ভারতবর্ষের মানুষ- এটাই স্বামী বিবেকানন্দের ঐকান্তিক কামনা ছিল।স্পষ্টত ই তিনি বলেছিলেন; ব্রিটিশের দাসত্বের শৃঙ্খল মোচনে যে আগুন জ্বলবে, সেই আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে ভারতের কোনায় কোনায়।বিবেকানন্দের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল; সেই আগুনের স্ফুলিঙ্গ ই ব্রিটিশ সাম্রজ্যবাদকে ধ্বংসের সামনে এনে উপস্থিত করবে।সেই যুদ্ধে যে প্রথম রক্ত তিনি নিজে দেবেন,তা অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গেই স্বামীজী উচ্চারণ করেছিলেন  ( swami vivekananda in America: New Discoveries by Marie Louise Burje.Advaita Ashram.calcutta.1966.page-26) ।

সশস্ত্র লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে যাঁরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত উপড়ে ফেলার কথা ভাবতেন, তাঁদের চিন্তা- চেতনার জগতে একটা বড়ো অংশ জুড়ে ছিলেন স্বামীজী।সশস্ত্র বিপ্লবীদের জীবন ও কর্মে বিবেকানন্দের এই ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা অনেকের জানা থাকলেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মূল উৎপাটনে আখুন জ্বালাতে নিজে নেতৃত্বদানের কথা ও যে বিবেকানন্দ খুব স্পষ্ট ভাবেই ভেবেছিলেন- এই ঐতিহাসিক তথ্যটি সম্পর্কে সারস্বত সমাজে তেমন চর্চা নেই ই বলা যেতে পারে।আমেরিকা যাবার আগে পরিব্রাজক জীবনে এবং আমেরিকা সহ পাশ্চাত্য দেশগুলি থেকে ফেরার পরেও ব্রিটিশ বিতারণে আগুন জ্বালাবার কাজে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার ভাবনা যে বিবেকানন্দের অত্যন্ত পরিস্কার ভাবেই ছিল - তা বুঝতে পারা যায় সিষ্টার ক্রাস্টিন ও মিস ম্যাকলাউডের দেওয়া বিভিন্ন সূত্র ধরেই।                     

স্বামীজীর এই কর্মকান্ড সম্পর্কে সিস্টার ক্রিস্টিনের কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন;" স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের বেশ কিছু অংশ ভারতবর্ষের মানুষদের কাছে এখনো অজানাই থেকে গেছে।বিবেকানন্দের জীবনের প্রারম্ভিক পর্বে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনায় সরাসরি বৈপ্লবিক ধ্যানধারণা ছিল এটা এখন বেশিরভাগ মানুষ ই ঠিক মতো জানেন না।দেশকে তিনি বিদেশি শাসনের কবল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন।চেষ্টা করলেও ,তাঁর সে চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সাফল্য পায় নি।কেন পারেন নি, সেই ব্যর্থতার কারন তিনি নিজে খুঁজে বের করবার চেষ্টা করেছিলেন।সেই না পারার উপলব্ধি থেকে তিনি আলাদা পথে এই সমস্যার সমাধানের ও চেষ্টা করেছিলেন।সেই আলাদা পথের ভিতর দিয়েই বিবেকানন্দ তাঁর ভাবনাগুলোকে পরিচালিত করেছিলেন।.........

এ বিষয়ে সিস্টার ক্রিস্টিন একবার স্বামীজীর কাছে জানতে চান।ক্রিস্টিনের প্রশ্নের জবাবে তখন স্বামীজী বলেছিলেন; " আমার মাথায় একটা ভাবনা তখন খুব জোরদার ভাবে ঘুরছিল।ভাবনাটা হলো এই যে, দেশীয় রাজাদের একজোট করে তাদেরশকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদের জন্যে ব্যবহার করা।এই উদ্দেশ্য নিয়েই আমি হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত একদম পায়ে হেঁটে ঘুরেছি।এই কারনেই বন্দুক প্রস্তুতকারক স্যার হিরাম ম্যাকসিমের সঙ্গে আমার একটা বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।কিন্তু দেশের কাছ থেকে আমি কোনো সাড়া পাই নি।দেশটা মৃত।" প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে সশস্ত্র ধারার অনুশীলনে আরো কতো ব্যাপক পরিকল্পনা বিবেকানন্দ করেছিলেন, সেই বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন সিস্টার ক্রিস্টিনের সঙ্গে।মন্ত্রগুপ্তির কারনে স্বামীজীর সেই পরিকল্পনার কথা ভূপেন্দ্রনাথ দত্তকে কিছু ই জানাতে চাননি সিস্টার ক্রিস্টিন।ইতিহাসের স্বার্থে সিস্টার ক্রিস্টিন যদি সেদিন মুখ খুলতেন তাহলে বিবেকানন্দের জীবন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র ধারার এক অনালোচিত ধারার হীরক দ্যুতি আমরা লাভ করতাম। ( Swami Vivekananda:Patriot Prophet -- Bhupendra nath dutta,Naba Bharat Publishers,Calcutta,1954.page- viii- ix)


শেয়ার করুন

উত্তর দিন