শ্যামাপ্রসাদ ও দেশভাগ - রাজনৈতিক পটভূমিকা নির্মোহ দৃষ্টিতে আলোচনা বিশেষ জরুরি

শ্যামাপ্রসাদ ও দেশভাগ

Gautam-Roy

গৌতম রায়


                  অটলবিহারি বাজপেয়ী তিন দফাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রায় সাড়ে ছয় বছর।একক গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় না থাকলেও সেই সময়ে আর এস এসের কাছে কলকাতা বন্দরে সুভাষচন্দ্র বসুর নাম মুছে দিতে কলকাতা বন্দরের নাম বদলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নি।নরেন্দ্র মোদি তাঁর দল বিজেপির একক গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার প্রথম পাঁচ বছরে কলকাতা বন্দরের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করেন নি।হঠাৎ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর দেশে কি এমন ঘটলো যে কোবিদ ১৯ জনিত লক ডাউনের ভিতরেই মন্ত্রীসভার ভার্চুয়াল অধিবেশনে কলকাতা বন্দরের নাম বদল করে সেটিকে শ্যামাপ্রসাদের নামে করবার  সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গুরুতর বিষয় ঘটাতে হল? এই বিষয়াবলীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টি আমাদের বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার।

সত্যজিৎ রায়ের ' গুপি গাইন বাঘা বাইন ' ফিল্মে র অন্তিম পর্বে সুন্ডির রাজার অসাধারণ একটি ডায়লগ আছে,' রাজকন্যা কি কম পড়িয়াছে?' - এই অসামান্য সংলাপের রেশ ধরেই বলতে হয়, কেবল দেশের পূর্বাঞ্চলেই নয়, গোটা ভারতেই কি আর এস এস- তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি আর তাদের হাজারো রকমের শাখা সংগঠনগুলির কাছে কি ' আইকন'কম পড়িয়াছে? পশ্চিমবঙ্গে আগামী ২০২১ সালের বিধানসভার ভোটকে কেন্দ্র করে ' আইকনে' র খোঁজেই কি শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে এই নোতুন করে টানাপোড়েন? তাই কি যে বন্দরের নাম বদলের কথা অটলবিহারীর প্রায় সাড়ে ছয় বছরের শাসনকালে মনে পড়ে না।নরেন্দ্র মোদির শাসন কালের প্রথম দফার পাঁচ বছরে মনে পড়ে না।দ্বিতীয় দফার প্রথম বছরেও মনে পড়ে না।পশ্চিমবঙ্গের ভোট দরজায় কড়া নাড়ার সময়েই মনে পড়ে বন্দরের নামে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের নাম মুছে শ্যামাপ্রসাদের নামে করার?

আন্দামানের সেলুলাল জেল থেকে ব্রিটিশের হয়ে বশংবদগিরি করবার জন্যে মুচলেকা দেওয়া যে 'বীর 'সাভারকরকে নিয়ে আর এস এস- বিজেপির হিরোইজমের শেষ ছিল না, গান্ধীজী হত্যার ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকা সেই সাভারকর, যাকে কেবল আইনের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্যে গান্ধীহত্যার দায়ে নাথুরাম গডসের সঙ্গে ফাঁসি যেতে হয় নি, সেই সাভারকরকে দিয়ে কি আগামী নির্বাচনগুলিতে হিন্দু - মুসলমানের বিভাজনকে তীব্র থেকে আরো উগ্র করে ভোট বৈতরণী পার হওয়া যাবে না? তাই উচ্চবর্ণ  , উচ্চবিত্ত এবং অবশ্য ই তিনি না থাকলে আপামর হিন্দুকে আজ মুসলমানদের অধীন হয়ে পাকিস্থানে থাকতে হতো, এই মিথ্যা প্রচার করে , কোটি কোটি নিম্নবিত্তের ,নিম্ন বর্ণের , দলিত, তপশিলি জাতি- উপজাতি, ওবিসিকে  ছিন্নমূল করে, তাঁদের পেটের ভাত কেড়ে নিয়ে , কেবল মাত্র মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণ, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের জন্যে যে বাংলাভাগ ঘটানোর ক্ষেত্রে আর এস এস - হিন্দু মহাসভা, হেডগেওয়ার, গোলওয়ালকর, সাভারকর, জিন্নার বিশ্বস্ত দালাল শ্যামাপ্রসাদকে নায়কোচিত সামাজিক পুনর্বাসন চায় আর এস এস - বিজেপি?
             

অবিভক্ত ভারতের শেষ নির্বাচনে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরকে প্রত্যাখ্যান করেছিল গোটা ভারতবাসী।প্রত্যাখ্যান করেছিল শ্যামাপ্রসাদকেও।দেশকে ভাগ করার আবেগকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জির মতো কিছু হিন্দু মহাসভার প্রার্থী জিতলেও , পরবর্তী কালে বাংলায় বামপন্থীদের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলন ধারাবাহিক ভাবে চলে , তার জেরে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দেশৃর পূর্বাঞ্চলেও নয়, গোটা দেশে তো দূরের কথা-- শ্যামাপ্রসাদ আর এস এস - হিন্দু মহাসভার উচ্চবর্ণের , উচ্চবিত্তের ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির ধারকবাহক হিন্দুদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষায় বাংলাভাগ তথা দেশভাগের এক নিন্দিত এবং বিস্মৃত চরিত্র।


          

সেই বিস্মৃত চরিত্র কে নিয়ে কেন আজ কেন্দ্রীয় সরকারের বকলমে আর এস এস- বিজেপির নোতুন করে এতো মাতামাতি? কারন, যে হিন্দুদের নাম করে গোটা হিন্দু সম্প্রদায়কে আজ আর এস এসের সদর দপ্তর নাগপুরের রেশমবাগের ' হিন্দু' হিশেবে দেখাতে চায় সঙ্ঘ, আপামর সেই হিন্দু সম্প্রদায়, তাঁদের ভিতর বিশ্বাসী মানুষ আছেন, ধর্মপ্রাণ মানুষ আছেন, নাস্তিক ও আছেন, তাঁরা কেউ ই ' হিন্দু ' শব্দের আর এস এস কৃত বিকৃত ব্যাখ্যার শরিক হতে চান না।বহুত্ববাদী, সমন্বয়ী চিন্তাচেতনার ভারত, যে পরধর্ম, পরমত সহিষ্ণু ভাবধারার পরম্পরা বহন করছে, ধর্মপ্রাণ হিন্দু সেভাবেই থাকতে চান।যেমন চান মুসলমানেরাও।কেউ ই আর এস এস বা জামাত ই ইসলাম বা ওয়াইয়েসির মিম এর শরিক হয়ে সাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার আবর্তে ঢুবে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারতে চায় না।তাই কি মোদি, কি মোহন ভাগবত , আবার অপরদিকে ওয়াইসি পারছেন না আপামর দেশবাসীকে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বানে ভাসিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থপূরণ করতে।
                    

এই স্বার্থান্ধতার কাজ টি ' বীর' সাভারকর কে দিয়ে হচ্ছে না।কারন, ব্রিটিশের ক্রীড়নক হতে চেয়ে সাভারকরের যে ভূমিকা, সেটি দেশবাসীর কাছে আজ ভীষণ রকম পরিস্কার।এই কাজ গোলওয়লকর বা দীনদয়াল উপাধ্যায়কে দিয়েও হচ্ছে না।তাই দরকার নোতুন আইকন।সেই কারনেই এককালে দীনদয়ালকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিতে যে শ্যামাপ্রসাদ কে আস্তে আস্তে চেপে দিতে চেয়েছিল আর এস এস এবং তাদের সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনসঙ্ঘ, আজ মধ্যবিত্তের মন জয় করতে , উদ্বাস্তু , ছিন্নমূল মানুষদের সামনে দেশভাগ ঘিরে মিথ্যে তথ্য তুলে ধরে তাঁদের মন জয় করতে নায়কের ভূমিকায় শ্যামাপ্রসাদ নোতুন ভাবে তুলে ধরছে আর এস এস - বিজেপি।উদ্দেশ্য, আসাম বিধানসভার আসন্ন নির্বাচন।তারপরেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোট।তার কিছু পরেই ভোট উত্তরপ্রদেশে।সেটা মিটতে না মিটতেই এসে যাবে লোকসভার ভোট।সুতরাং , শ্যামাপ্রসাদের মতো ব্যক্তিত্বকে ইতিহাসের আস্তাকুড় থেকে তুলে এনে দেশভাগে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির ঘৃণ্য ভূমিকা কে চেপে দিয়ে , সেই ভূমিকাকে ইতিবাচক ভাবে না দেখালে তো ভোট রাজনীতিতে বিজেপির অস্তিত্ব সঙ্কট হয়ে পড়বে!
            

ভারতের জাতীয় আন্দোলন চলাকালীন সেই প্রবাহের সঙ্গে হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা  কোনো অবস্থাতেই নিজেদের যুক্ত করে নি।বিশ শতকের শুরু থেকেই কেবলমাত্র তাদের ধ্যান ধারণাতে যাঁরা ' হিন্দু' বলে বিবেচিত হবেন, অর্থাৎ; ভারতের বহুত্ববাদী চেতনায় যাঁরা আস্থা রাখেন না, এমন মানুষদের ই ' হিন্দু'বলে সাব্যস্ত করে , কেবলমাত্র তাঁদের স্বার্থে দেশভাগ চাইছিল আর এস এসের সমস্ত পূর্বসূরিরা। এই কাজে আর এস এস প্রতিষ্ঠার আগেই তাদের মতাদর্শের যারা পূর্বসূরি ছিলেন, তারা অবিভক্ত পাঞ্জাবে দেশভাগের পক্ষে জোরদার প্রচার চালায়।কেমব্রিজের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলি ১৯৩৩ সালে জিন্নাকে পাকিস্থান ভাবনার কথা বলেছিলেন।সেদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের দরুণ সেই কথা জিন্না ছাত্রসুলভ ছেলেমানুষি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
                  

বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব, দেশভাগের প্রস্তাব সেইদিন জিন্না উড়িয়ে দিলেও আর এস এসের পূর্বসূরিরা হিন্দু স্বার্থে, মূলত উচ্চবর্ণ আর বণিক হিন্দুদের স্বার্থে তার অনেক আগেই দেশভাগ চেয়েছিলেন।অখন্ড ভারতের কোন কোন অংশ নিয়ে হিন্দুদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্র হওয়া দরকার তার মাণচিত্র পর্যন্ত লাহোর থেকে প্রচাশিত ' ট্রিবিউন ' পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল।পাঞ্জাবের হিন্দু ব্যবহায়ী , যাদের ' লালা' বলে সম্বোধিত করা হতো,আর এস এস প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই তারা দেশভাগের পক্ষে কথা বলেছেন।হিন্দু স্বার্থরক্ষার তাগিদে নানা ভাবে দাঙ্গা লাগাতেও তাদের ভূমিকা কম ছিল না।বস্তুত ১৯২৫ সালে আর এস এস প্রতিষ্ঠার পটভূমি নির্মাণ এবং হিন্দুস্বার্থ রক্ষার নাম করে বিত্তবান, উচ্চবর্ণের , মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির শাসন ভারতে কায়েমের লক্ষ্যে এরা কাজ করতে শুরু করেন।এদের চাষ করা জমিতেই সাম্প্রদায়িকতার বীজ পোঁতে হেডগেওয়ার, বি এস মুঞ্জে, গোলওয়ালকর, সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জীরা।
              

দেশভাগ কে ত্বরান্বিত করে , দলিত, তপশিলি জাতি- উপজাতিভুক্ত হিন্দুদের সমস্ত রকম অধিকারকে ভূলুন্ঠিত করে মনুবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের হাতে ভারতের শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করাই জন্মমুহূর্ত থেকে আর এস এসের লক্ষ্য।সেই লক্ষ্যকে ফলপ্রসু করতেই জন্মলগ্নের পর থেকে হাজারো শাখা , সহযোগী সংগঠন তৈরি করে আর এস এস।তাদের প্রতিষ্ঠার আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হিন্দু মহাসভা।সাম্প্রদায়িকতাকে প্রধানতম আদর্শগত ভিত্তি হিশেবে মেনে চলা এই সংগঠনটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আর একটি বড় লক্ষণ ছিল , উগ্র মুসলিম বিরুদ্ধতা।তাই এদের সঙ্গে আদর্শগত অবস্থানে প্রথম থেকেই খুব নৈকট্য অনুভব করতো আর এস এস।সেই কারণেই সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের ভিতরেই হিন্দু মহাসভা আর এস এসের রাজনৈতিক সংগঠন হিশেবে নিজেদের পরিচয় রাখতে থাকে।
                         

দেশভাগের ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক হিন্দুদের স্বার্থ আরো সুরক্ষিত করবার তাগিদেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উচ্চবর্ণের হিন্দু অভিজাতদের সংগঠিত করতে শুরু করে আর এস এস।উত্তরভারতে এই হিন্দু অভিজাতদের দেশভাগের স্বার্থে সংগঠিত করবার ক্ষেত্রে  আর এস এস খুব গুরুত্ব দিয়েছিল তদানীন্তন যুক্তপ্রদেশ , অর্থাৎ, আজকের উত্তরপ্রদেশ এবং অবিভক্ত পাঞ্জাবকে।আর বাংলাভাগের স্বার্থে জোর দিয়েছিল স্যার আশুতোষের পুত্র হিশেবে , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের সবথেকে কম বয়সী উপাচার্য হিশেবে শ্যামাপ্রসাদের ক্যারিশমাকে ব্যবহার করতে। কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে আইনসভায় লড়ে , জিতে , কংগ্রেস আইনসভা ত্যাগের পর , পদত্যাগ করে , নির্দল প্রাথী হিশেবে কার্যত বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় শ্যামাপ্রসাদ জেতার পর, আর এস এস  এই মানুষটির ব্যক্তি স্বার্থবাহী ধারাটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগটিকে আর কোনো অবস্থাতেই হাত ছাড়া করতে চায় নি। সমকালীন রাজনীতিত র এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই আমাদের  শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সক্রিয়তার সূচনা পর্ব কে বিচার করতে হবে। হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি আর এস এস এবং

তাদের সেই সময়কালের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম সাম্প্রদায়িক সংগঠন মুসলিম লিগ ও জামাত ই ইসলামের কার্যত যৌথ উদ্যোগে বাংলাভাগের পরিকল্পনার শুরু হিশেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।
                      

পাঞ্জাবকে বিভক্ত করতে আর এস এস নিজে যতোখানি প্রকাশ্য সক্রিয়তা দেখিয়েছিল, বাংলার ক্ষেত্রে তেমনটা সরাসরি দেখায় নি।বাংলার ক্ষেত্রে আর এস এসের সেই নিস্ক্রীয়তার আড়ালে সক্রিয়তাকে পরিপূর্ণতা দিতে আর এস এস তাদের সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার ছত্রছায়ার ভিতরে শ্যামাপ্রসাদকে তুলে ধরেছিল।বাংলাকে বিভক্ত করার ক্ষেত্রে মুসলিম লীগের বিভাজন প্রক্রিয়ার অনুঘটক হিশেবে সঙ্ঘ এখানে অনেক বেশি সক্রিয় করেছিল তাদের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভা কে।আর হিন্দু মহাসভা সেই সক্রিয়তা দেখাবার ক্ষেত্রে জোরদার ভাবে তুলে ধরেছিল শ্যামাপ্রসাদকে।
                  

এই ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি সঙ্ঘের বিভিন্ন শাখা সংগঠন এ কাজে মুসলিম লীগের স্বার্থপূরণে আড়াল থেকে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল।উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছেই নিজেদের সম্প্রদায়ের উচ্চবর্ণের, উচ্চবিত্তের শ্রেণীস্বার্থ সুরক্ষিত করার প্রশ্নটিই ছিল সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তাই দেশভাগ হলে গরিব, নিম্ন আয়ের, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের দশা কি হবে- সেই ভাবনা যেমন আর এস এস- হিন্দু মহাসভা বা শ্যামাপ্রসাদ কারোর ই ছিল না, তেমন ভাবেই খেটে খাওয়া গরিব মুসলমান, কৃষক সম্প্রদায়, সামান্য হলেও পূর্ববঙ্গে সেই সময়ে শিল্পের যেটুকু বিকাশ ঘটছিল, তার সঙ্গে যুক্ত মানুষ, যাঁদের অনেকেই মুসলমান ছিলেন, তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি দেশভাগ হলে কি হবে- সেদিকে মুসলিম সাম্প্রদায়িকদের কোনো নজর ছিল না।পূরূববঙ্গের অর্থনীতিতে বিভাগপূর্ব সময়ে একটা বড় রকমের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করত অভিজাত , উচ্চবর্ণের হিন্দুরা।দেশভাগের সম্ভাবনাতেই এই উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বিত্ত স্থানান্তর করতে থাকে ভারতে।ফলে হিন্দু এবং মুসলমান, উভয় সম্প্রদায়ের ই নিম্নবর্গীয় মানুষ, তপশিলি জাতি - উপজাতি থেকে শুরু করে আতরাফ মুসলমান, একটা ভয়াবহ সঙ্কটের ভিতরে পড়ে।তাঁদের সেই সঙ্কট কালে হিন্দু- মুসলমান কোনো সম্প্রদায়ের ই অভিজাত, উচ্চফর্ণের মানোষ কখনোই দাঁড়ায় নি।দুই বঙ্গেই এই অংশের মানুষদের কাছে নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী একমাত্র দাঁড়িয়েছিল বামপন্থীরা।
                            

১৯২৯ সালে শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল জাতীয় কংগ্রেসের হাত ধরে।কলকাতা বিশ্ববিদ্রালয়ের উপাচার্য হিশেবে বহু সাম্প্রদায়িক ভূমিকা নেওয়া স্বত্ত্বেও আইনসভাতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস তাঁকে প্রার্থী করেছিল।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিশেবে নিজের উত্তরসূরি আজিজুল হক সম্পর্কে শ্যামাপ্রসাদের মূল্যায়ণ ছিল;" এটা দেখে সত্যি ই অবাক হয়ে যেতে হয় যে, তিনি ( আজিজুল হক) বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে মুসলিম স্বার্থরক্ষার কাজ ছাড়া অন্য সব বিষয়েই নিস্পৃহ।" (Leaves from a Disry by Shya Prashad Mukherjee. Oxford University Press.New Delhi.1st Edition.1993 গ্রন্থের ১৯৩৯   সালের ২৩ শে জানুয়ারির দিনলিপি)।
                      

কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে আইনসভাতে প্রথম প্রবেশ করেও '৩০ সালে কংগ্রেস যখন আইনসভা বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়, ক্ষমতার অলিন্দ্য থেকে তখন কিন্তু সরে আসতে রাজি হন নি শ্যামাপ্রসাদ।পদত্যাগ করে এক ই আসনে নির্দল প্রার্থী হয়ে ( কংগ্রেস সেই নির্বাচনেও অংশ নেয় নি।ফলে তাঁর জেতাটা খুব সহজ হয়েছিল) জেতেন। তাঁর এই একবার কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়া , জেতা এবং কংগ্রেস আইনসভা বয়কটের পর ভিন্ন কৌশলে সংসদীয় রাজনীতিতে থেকে যাওয়া-- এটা জন্মলগ্নের পরেই বিশেষ ভাবে নজরে পড়েছিল আর এস এসের।ব্যক্তিস্বার্থের কাছে কোনো আদর্শবোধকে যে পাত্তা দিতে শ্যামাপ্রসাদ রাজি নন, সেটা বুঝেই তাঁকে ধীরে ধীরে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার শীর্ষে নিয়ে আসতে শুরু করে সঙ্ঘ।
                         

ফজলুল হকের অখন্ড বাংলার প্রিমিয়ার হিশেবে বেঙ্গল টেনান্সী অ্যাক্টের সংশোধন ('৩৭) , বিকল্প কৃষিপণ্যের বাজার তৈরির ভাবনা('৩৯) -- এইসব কিছুকেই আইন করে হিন্দুদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার জন্যে মুসলমানেদের ষড়যন্ত্র- হিন্দু মহাসভার অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক এই অসত্য প্রচার গোটা বাংলায় ছড়িয়ে হিন্দু- মুসলমানের বিরোধকে সংঘাতের পথে নিয়ে যেতে শুরু করেন শ্যামাপ্রসাদ।এই প্রচারকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গে ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়ায়।ফজলুল হকের বিরুদ্ধতা করতে গিয়ে মুসলীম লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে গোটা পূর্ববঙ্গে প্রচার চালায় হিন্দু মহাসভা।নেতৃত্ব দেন মূলত শ্যামাপ্রসাদ এবং নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।দীনেশ রায়ের ' সোনাপদ্মা ' উপন্যাসে '৩৬ থেকে '৩৯ এর মধ্যবর্তী সময়ে পাবনা জেলাতে , বিশেষ করে সেখানকার সিরাজগঞ্জ সাবডিভিশনে হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে যে দাঙ্গা হয়, যে দাঙ্গাকে সংগঠিত করতে শ্যামাপ্রসাদ এবং নির্মলচন্দ্রের নিপূণ ভূমিকা রয়েছে, তার মর্মস্পর্শী বিবরণ আছে।হিন্দু মহাসভার তৈরি করা ফাঁদে সহজে ধরা দিয়ে মুসলিম লীগ ও সেই দাঙ্গায় ভয়াবহ ভূমিকা পালন করেছিল।


                       

হিন্দু মহাসভা ফজলুল হকের মন্ত্রীসভাতে থেকেও ভয়ঙ্কর ভাবে প্রচার চালায়; সাম্প্রদায়িক কারণে হিন্দুদের চাকরি থেকে বঞ্চনা করা হচ্ছে।'৩৮ সালে পুলিশে চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দু আর মুসলমানের ভিতরে একটা সমতা আনার চেষ্টা হয়েছিল।পুলিশে মুসলমানেদের স্বল্প উপস্থিতির বিষয়টিকে সংশোধন করে , পুলিশের চাকরিতে যাতে ধর্মীয় পক্ষপাতিত্ব না আনা হয়, সেদিকে নজর দিয়েছিলেন ফজলুল হক। এই বিষয়টিকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতিতে হিন্দু মহাসভাকে সক্রিয় করতে নিজে বেশি সক্রিয় হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।এই কাজে বর্ধমানের রাজা সহ বেশ কিছু রাজারাজরাদের সংগঠিত করেন তিনি।তাঁদের নিয়ে বাংলার তৎকালীন অস্থায়ী গভর্নর জন রীডের কাছে এমন কিছু অভিযোগ শ্যামাপ্রসাদ করেন যা মুসলিম লীগকে হিন্দুদের উপর নেতিবাচক রাজনীতি করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্ররোচিত করে।

বস্তুত এই বিষয়টি নিয়ে হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসালের যে কর্মতৎপরতা, বড়লাট লর্ড লিনলিথগো থেকে ভারত সচিব লিওপোল্ড এমারির কাছে পর্যন্ত তাঁদের মুসলমানেদের বিরুদ্ধে অভিযোগটিকে একে লুফে নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা।হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের এই প্ররোচনাতেই ব্রিটিশ সরকার তৈরি করে , ' কমিউনাল রেশিও অফিসার' নামক পদ।এই অফিসারটির ব্রিটিশের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতির প্রয়োগ, দেশভাগের - বাংলাভাগের গোটা পটভূমিকাকে অনেকখানি শক্তিশালী করে।এই কমিউনাল রেশিও অফিসার পদটির মাধ্যমে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষায় হিন্দু মহাসভার সব নেতাই অখন্ড বাংলাতে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন।কিন্তু ওই সরকারী পদকর্তার সাহায্য নিয়ে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের দুমুঠো পেটের ভাত জোগারে এতোটুকু আগ্রহ কখনো হিন্দু মহাসভা দেখায় নি।
              

ফজলুল হক মন্ত্রীসভার অর্থমন্ত্রী হিশেবে যাবতীয় প্রশাসনিক সুযোগ সুবিধাকে পূর্ববঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভিতর তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ তৈরি করে, সেই বিদ্বেষকে মুসলিম সাম্প্রদায়িকদের হিন্দু বিদ্বেষে রূপান্তরিত করার কাজে হিন্দু মহাসভার সবথেকে নির্ভরযোগ্য লোক ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। যে মন্ত্রীসভার সদস্য তিনি নিজে সেই মন্ত্রীসভাকে ব্যক্তিগত ভাবে সব সময়ে যে শ্যামাপ্রসাদ সাম্প্রদায়িক মন্ত্রীসভা হিশেবেই দেখেছিলেন, তা তাঁর দিনলিপির '৪৪ সালের বিবরণ থেকে পরিস্কার।
                     

হক মন্ত্রীসভার মাধ্যমিক বিল আর কলকাতা পৌরসভা বিল কে ঘিরে গোটা বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়কে মুসলমানেদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিয়ে দেশভাগের সমস্ত সম্ভাবনাকে উসকে দেয় হিন্দু মহাসভা।এই সময়কালেই বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের ভিতর মুসলমানদের সম্পর্কে তীব্র বিষ ঢালতে কলকাতায় আসে('৩৯ সালে) হিন্দু মহাসভার আর এক নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর।এই সেই সাভারকর, যে আন্দামানে তাঁর সহযোগী ত্রৈলোক্য মহারাজকে পর্যন্ত চরম অমর্যাদার ভিতরে ফেলে ব্রিটিশ কে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি কিনেছিল।
                   

ত্রৈলক্য মহারাজের সঙ্গে আন্দামানের সেলুলার জেলে সাভারকরের সহবন্দি থাকার ঘটনাক্রম কে ব্যবহার করে হেডগেওয়ার মহারাজের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিলেন নিজের ছাত্রজীবনের সূচনাপর্বে কলকাতাতে ।সেলুলার জেলে গোটা ভারত থেকে যে সব রাজনৈতিক বন্দীরা গিয়েছিলেন, তাঁরা বিপ্লবের পথে, সশস্ত্র প্রতিরোধের পথে ব্রিটিশকে এইদেশ থেকে তাড়াবার সংকল্পে দৃঢ় ছিলেন।এঁদের বেশিরভাগ ই পরবর্তীকালে বামপন্থী ভাবধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।আন্দামানের সেলুলার জেলে বিপ্লবী বন্দিদের যে তালিকা আছে তাঁদের ভিতর বেশির ভাগ ই বাঙালি।ব্রিটিশেরা যাঁদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, তাঁদের বেশিরভাগ ই বাংলার মানুষ।সেইসব মানুষেরা বা তাঁদের পরিবার পরিজন কিন্তু কখনো দেশভাগের সমর্থনে হিন্দু মহাসভার ক্ষতিকর রাজনীতির ধারপাশ দিয়ে হাঁটেন নি।
                

এই পর্যায়ে সাভারকরের কলকাতা আজমণকে কেন্দ্র করে , হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে কংগ্রেসের দল ভাঙানোর একটা ভয়ঙ্কর একটা খেলা চলে। কংগ্রেসের নলিনীরঞ্জন সরকার এবং স্যার বিজয়প্রসাদ সিং রায় যাতে কলকাতা পুরসভা বিলের বিরোধিতা করেন, সে জন্যে শ্যামাপ্রসাদ আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছিলেন।যদিও সফল হন নি।এই সময়ে হিন্দু মহাসভার কাছের একটি পত্রিকা ' অ্যাডভিন্স' হিন্দু স্বার্থের কথা বলে প্রচ্ছন্ন ভাবে দেশভাগের কথা বলতে গিয়ে নলিনীরঞ্জনের সমালোচনাতে মুখর হয়ে উঠেছিল। সেই সময়কালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে বামপন্থী ধারার একটা বিশেষ গুরুত্ব ছিল।সুভাষচন্দ্রের মত ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল উপস্থিতির পাশাপাশি কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত বহু ব্যক্তিত্ব ও কংগ্রেসের ভিতরের এই বামপন্থী ধারা কে পুষ্ট করেছিলেন।আজকের মত কংগ্রেস কিন্তু তখন একটা রাজনৈতিক দল নয়।একটা বৃহৎ মঞ্চ, যেখান থেকে বহু ভিন্ন ভাবধারার মানুষ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সম্প্রতি রক্ষা এবং ব্রিটিশ বিরোধিতার প্রশ্নে যাঁদের কোনো দ্বিমত নেই, তাঁরা একযোগে লড়াই করতেন।এই সন্মিলিত লড়াইতে হিন্দু মহাসভাকে প্রতিহত ঈরবার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভিতরে এবং বাইরে সেই সময়ে বামপন্থীদের একটা বিশেষ উল্লেখযোখ্য ভূমিকা ছিল।
                    

একটা কথা মনে রাখা দরকার , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ থেকে অবসরের পর তাঁর আমলের সেনেট সদস্যদের দ্বারা সান্মানিক ডক্টরেট শ্যামাপ্রসাদ কে হিন্দুত্ববাদীরা মহান শিক্ষাবিদ হিশেবে দেখাতে চাইলেও ,ফজলুল হক ভাংলার প্রিমিয়ার হিশেবে তৎকালীন ম্যাট্রিক শিক্ষাব্যবস্থাতে আরো স্বচ্ছতা আনবার লক্ষ্য গোটা ম্যাট্রিক পরীক্ষা ব্যবস্থাটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্তিয়ার থেকে সরিয়ে পৃথক বোর্ড করেন।এই প্রক্রিয়ার তুমুল বিরোধী ছিল হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা পূর্ববঙ্গে হিন্দু মহাসভা প্রচার চালায় যে, মুসলমানেদের অনৈতিক ভাবে ম্যাট্রিক পাশ করাতেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকার খর্ব করে পৃথক বোর্ড করছেন ফজলুল হক। পাল্টা প্রচার চালায় মুসলিম সাম্প্রদায়িকেরাও।ফলে বাংলাভাগের প্রেক্ষাপট আরো অনেক প্রসারিত হয়।
                  

শ্যামাপ্রসাদের প্রবল ব্রিটিশ ভক্তির উদাহরণ আমরা দেখি , বাংলার গভর্নর লর্ড ব্রাবোর্নের মৃত্যুর পর আইনসভা তে দেওয়া এক ভক্তি বিগলিত বক্তৃতাতে।' ৩৯ সালে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে শরৎচন্দ্র বসু এবং সুভাষচন্দ্র বসুকে উসকে দেওয়ার বহু চেষ্টা শ্যামাপ্রসাদ করেছিলেন। সেই চেষ্টাতে এঁদের ফজলুল হকের বিরুদ্ধে নামানো না যাওয়ার বিষয়টিকে এই দুই নেতার রাজনৈতিক চরিত্রহননের কাজে ব্যবহার করতে ছাড়ে নি হিন্দু মহাসভা।শরৎ বসু এবং সুভাষ বসু - এমন কোনো কাজ করতে চান না যাতে মুসলমানেরা খেপে যায়- এই প্রচারটা পূর্ববঙ্গে বেশ জোরদার ভাবেই করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।
                    

'৩৯ সালে কংগ্রেসের ত্রিপোরী অধিবেশন, কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগ- এইসব ঘটনাপ্রবাহের জেরে জাতীয় রাজনীতির জাগরণ- এই সময়কালটাতেই বাংলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে সক্রিয় করতে সবথেকে বেশি তৎপর হন শ্যামাপ্রসাদ। সে বছরের ই মার্চ মাসে বাংলাতে ' হিন্দু সত্তা' ঘিরে বাংলাতে সাভারকরের সংগঠন তৈরির যে উদ্যোগ, তাকে সক্রিয় সাহায্য করেন শ্যামাপ্রসাদ।আর এস এসের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারের সঙ্গে ও এই সময়েই বাংলাতে সক্রিয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি র প্রয়োগ ঘিরে শ্যামাপ্রসাদের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।
                         

এই সময়কালেই ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে উৎসাহী এক প্রবল মুসলিম বিদ্বেষী ব্যক্তি, একদা পূর্ববঙ্গে ' বিনোদ সাধু' নামে পরিচিত, পরবর্তীতে স্বামী প্রণবানন্দ নামে পরিচিত,' হিন্দু মিলন মন্দির' নামক একটি ঘোরতর সাম্প্রদায়িক কেন্দ্র স্থাপন করেন পূর্ববঙ্গের ই বিভিন্ন মুসলমান প্রধান অঞ্চলে।'৩৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার দেশবন্ধু পার্কে প্রণবানন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় ' হিন্দু সন্মেলন' ।
                       

বস্তুত বাংলাভাগকে কার্যকরী করতে সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের একত্রিত করার লক্ষ্যে এটা ছিল প্রচন্ড কার্যকরী একটি সাম্প্রদায়িক উদ্যোগ।উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালিদের ভিতর সংগঠিত ভাবে মুসলিম বিদ্বেষ সংক্রমিত করে দেশভাগের পটভূমিকা কে আরো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অত্যন্ত সংগঠিত ভাবে এই সন্মেলনে স্যার নীলরতন সরকার, ইউ এন ব্রহ্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি স্যার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায়, দার্শনিক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্যারিষ্টার বিজয়চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যিক দীনেশচন্দ্র সেন, সাংবাদিক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, জমিদার প্রমথনাথ রায়, ' প্রবাসী' র সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, গায়ক মৃণালকান্তি ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী, সনৎকুমার রায়চৌধুরী প্রমুখকে জড়ো করা হয়েছিল।এঁদের জড়ো করতে প্রাক্তন উপাচার্য আর মন্ত্রী হিশেবে শ্যামাপ্রসাদের ইমেজ প্রচন্ড ভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।শরৎ বসু আর সুভাষ বসুকে এই সন্মেলনে আনার বহু চেষ্টা করেও শ্যামাপ্রসাদ যথারীতি সফল হন নি।আর সফল হন নি স্যার বিজয়প্রসাদ সিং রায়, নলিনীরঞ্জন সরকারের মতো মানুষদের ও হাজির করতে।
           

সাভারকর '৩৯ আগস্ট মাসে আবার কলকাতায় এসে অতিথি হন হিন্দু মহাসভার নেতা নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের।তাঁর বাড়িতেই শ্যামাপ্রসাদ এবং সাভারকরের একান্ত বৈঠক হয়।এই সময়কালেই নির্মলচন্দ্র এবং আশুতোষ লাহিড়ির প্রত্যক্ষ ভূমিকার ফলে শ্যামাপ্রসাদ প্রকাশ্য ভাবে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন।তার আগে পর্যন্ত আর এস এসের রাজনীতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বাংলাভাগের ভিতর দিয়ে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার আজগুবি তত্ত্বের অবতারণা করলেও খাতায় কলমে সংগঠনটির সঙ্গে কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্ক স্থাপন করেন নি।যোগ দিয়েই , হিন্দুর উপর মুসলমানের অত্যাচার বাড়ছে দেখেও শরৎ বসু, সূভাষ বসুর কোনো তাপ উত্তাপ নেই- এটাই ছিল শ্যামাপ্রসাদের প্রচারের ধরণ।
                     

বাংলায় মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্পর্কে কুৎসা রটিয়ে সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করতে আর এস এস এখানে তাদের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার ভিতরেই দুটি সমান্তরাল ধারা রেখেছিল।এই দুটি ধারার একটির নেতৃত্বে ছিলেন বিজয়চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।দুটি ধারাকে একত্রিত করতে শ্যামাপ্রসাদ , নির্মল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরা সক্রিয় হন।
                 

অখিল ভারত হিন্দু মহাসভাকে এই সময়ে নানা ভাবে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন কংগ্রেস কে আর্থিক সাহায্যকারী ঘনশ্যামদাস বিড়লার বুড়ো দাদা যুগলকিশোর বিড়লা।তা ছাড়াও বংশীধর জালান, বদ্রীদাস গোয়েঙ্কা, রাধাকৃষ্ণ কানোরিয়া।খৈতান অ্যান্ড কোং , যারা কংগ্রেসকেও অর্থ সাহায্য করত, তারা হিন্দু মহাসভাকেও অর্থ সাহায্য করল।
               

বাংলাভাগের উদ্দেশ্য নিয়ে হিন্দু মহাসভাকে বাংলার বুকে প্রসারিত করার প্রথম পর্যায়ে শ্যামাপ্রসাদ প্রবল বাঁধা পেয়েছিলেন কমিউনিস্টদের কাছ থেকে এবং সুভাষচন্দ্রের কাছ থেকে।হিন্দু মহাসভা যে সাম্প্রদায়িক এবং প্রতিক্রিয়াশীল - সে বিষয়ে প্রথম থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির কোনো সংশয় ছিল না।কমিউনিস্ট রা তখন সর্বশক্তি দিয়ে দুই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়েছে।সুভাষচন্দ্রের বাংলায় হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই , সেই লড়াইতে তাঁর সবথেকে বড়ো সহায়ক শক্তি ছিলেন বামপন্থীরা।কংগ্রেসের ভিতরের যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তদের কাছ থেকে হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে সুভাষচন্দ্র বহু বাঁধা পেয়েছিলেন।বামপন্থীদের প্রত্যক্ষ সহায়তার ফলেই কংগ্রেসের ভিতরকার দক্ষিণপন্থী , সাম্প্রদায়িকদের সুভাষচন্দ্র প্রতিহত করতে পেরেছিলেন হিন্দু মহাসভার জঘন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে।

                

এই পর্যায়ে গোটা বাংলা ঘুরে হিন্দু স্বার্থের নামে মুসলিম বিদ্বেষ কে প্রবল আকারে ছড়াতে থাকেন শ্যামাপ্রসাদ।মুসলিমদের সব ধরণের অত্যাচারের একমাত্র সমাধান দেশভাগ- বাংলাভাগ, এটাই তখন শ্যামাপ্রসাদ আর হিন্দু মহাসভার একমাত্র বক্তব্য হয়ে উঠেছিল।' ৪০ এর শেষ দিকে লাহোরে হিন্দু মহাসভার পক্ষে একটি সভা তে বক্তৃতা করেন শ্যামাপ্রসাদ।পাঞ্জাব ভাগের লক্ষ্যে সেখানকার মুসলিম সাম্প্রদায়িক নেতাদের তাতিয়ে দিতে আর এস এসের মূল ব্যবস্থাপনাতেই শ্যামাপ্রসাদের ওই সভাটি হয়েছিল।সঙ্ঘকে ভারতের দুর্যোগপূর্ণ আকাশে এক আলোর রেখা হিশেবে বর্ণনা করে সেদিন বাংলাতে হিন্দুদের উপর মুসলমানদের অত্যাচারের বেশ কিছু কল্পিত কাহিনী শ্যামাপ্রসাদ বলেন।তাঁর ওই সভার পরেই মুসলিম লীগ লাহোরে দেশভাগের উদ্দেশে আরো অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।
                     

দেশভাগের প্রেক্ষাপটকে ত্বরান্বিত করতে জনগণনা ঘিরে একটা বিতর্কের পরিবেশ হিন্দু সাম্প্রদায়িকরা তৈরি করে '৩১ সালের আদমসুমারির সময় থেকেই।'৩১ এর জনগণনা তে মুসলিম লীগ ইচ্ছাকৃত তথ্যবিকৃতি ঘটিয়ে মুসলমান জনসংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে।উদ্দেশ্য; মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিশেবে দেখানো- এটাই ছিল হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের প্রচার।শ্যামাপ্রসাদ ও পরবর্তীকালে এই প্রচারটিকে একটা চরম মাত্রা দিতে এটাই বলেছিলেন যে? কংগ্রেস , মুসলিম লীগের অপচেষ্টাকে রুখতে কোনো ভাবেই উদ্যোগী হয় নি।
                       

চারের দশকের শুরু থেকেই হিন্দু মহাসভা এই লোকগণনার বিষয়টি ঘিরে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাকে একটা লাগামহীন জায়গাতে নিয়ে আসে।মুসলিম লীগ লোকগণনাতে তথ্য বিকৃতি করুক বা না করুক, তাঁদের ঘিরে হিন্দু মহাসভার অপপ্রচার মুসলিম মানসের ভিতর বিচ্ছিন্নতার ভাবনাকে অনেক বেশি উসকে দেয়।অপরপক্ষে পূর্ববঙ্গের দরুণ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে মুসলমানেরা, ফলে চাকরি- ব্যবসা ইত্যাদির ক্ষেত্রে হিন্দুরা মুসলমানেদের অধীনস্ত হয়ে যাবে-- এই প্রচারগুলিকে লাগামহীন করবার ক্ষেত্রে '৪১ এর জনগণনার আগে হিন্দু মহাসভা একটা ভয়ঙ্কর অবস্থান নিতে শুরু করে।
                     

'৪০ সালের ডিসেম্বরে হিন্দু মহাসভার কলকাতার দেশবন্ধু পার্কের সন্মেলনে র ভিতর দিয়ে একটা বড়ো অংশের উচ্চ শিক্ষিত , সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত, আর্থিকভাবে শক্তিশালী বাঙালি হিন্দুকে শ্যামাপ্রসাদের প্রাক্তন উপাচার্য জনিত ব্যক্তি ক্যারিসমাকে ব্যবহার করে টেনে আনা হয়েছিল।সেই অংশটিই ' ৪১ এর জনগণনা ঘিরে হিন্দু সাম্প্রদায়িক দের অসত্য ধারণাকে একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
                   

জনগণনাতে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই ' জাত' বিষয়টি উল্লিখিত।হিন্দু সাম্প্রদায়িকরা মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু অভিজাতদের প্রতিনিধিত্ব করেছে।নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের তারা কখনো মানুষ বলেই  মনে করে নি।কিন্তু হিন্দু জনগোষ্ঠীর আধিপত্য বজায় রাখতে বাংলাভাগের উদ্দেশে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের ' জাত' জনিত বিষয়টিকে কার্যত চেপে দিয়ে , হিন্দু সমাজে জাতপাতের ভয়ঙ্কর বিভাজনকে আড়াল করে, নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক হিন্দুতে পরিণত করবার ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র এই সময়ে হিন্দু মহাসভা করে।তারা জনগণনাতে ' জাত' এর বিষয়টি উল্লেখ না করে সবাইকে ' হিন্দু' বলে পরিগণিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।( শ্যামাপ্রসাদের দিনলিপিতে '৪৫ সালের ৬ ই ডিসেম্বর এর বিস্তারিত উল্লেখ আছে) এভাবে মুসলমানদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার কৌশলকে তারা বাংলাভাগের একটি জোরদার হাতিয়ার হিশেবে কাজে লাগায়।
                 

ফজলুল হককে পদচ্যুত করতে অভিজাত , মধ্যবিত্ত হিন্দুদের একটি ব্লগ তৈরিতে ও এই সময়ে হিন্দু মহাসভা বিশেষ ভাবে সচেষ্ট হয়েছিল।এই উদ্দেশ্যে মূলত শ্যামাপ্রসাদের উদ্যোগে একটি ' হিন্দু' সন্মেলন হয়, যেখানে ভাইসরয়ের একাসিকিউটিভ কাউন্সিলের সভ্য নৃপেন্দ্রনাথ সরকার সভাপতিত্ব করেছিলেন।হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে ভাইসরয় সহ বিশিষ্ট্য ব্রিটিশ আমলাদের সংযোগ রাখার ক্ষেত্রে এই নৃপেন্দ্রনাথ সরকারের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
                        

দুর্ভিক্ষের ছায়া ক্রমশঃ দীর্ঘ হচ্ছে দেখে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি ফজলুল হক মন্ত্রীসভাকে ক্ষমতাচ্যুত করে হিন্দু- মুসলমানের সংঘাত কে আরো বল্গাহীন করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।এই লক্ষ্যে '৪১ সালের আগস্ট মাসে ফজলুল হক মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়।যেদিন আইনসভাতে ডেপুটি স্পিকার আশরফ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে হিন্দু মহাসভার ষড়যন্ত্র ভেস্তে দেন।
                           

ফজলুল হকের দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে( তখন অবিভক্ত বাংলার নির্বাচিত সরকার প্রধানকে ' প্রধানমন্ত্রী' বা ' প্রিমিয়ার' বলা হতো) অর্থমন্ত্রী হিশেবে শ্যামাপ্রসাদ ব্রিটিশের হাতে কর্ণাটকের কুর্গে বন্দি শরৎ বসুকে ঘিরে ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো এবং স্বরাষ্ট্র সংক্রান্ত সদস্য স্যার রেজিন্যান্ড ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে আলোচনা করেন।এই আলোচনার পর ই দেখা যায়, শরৎচন্দ্র বসুর কারাজীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
                       

বাংলাভাগকে ত্বরান্বিত করতে হিন্দু মহাসভা তাদের কর্মকান্ডকে বাংলার বাইরেও ছড়িয়ে দেয়।বাংলা সন্নিহিত বিহারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরি করে মুসলমান সমাজকে উত্তেজিত করার ষড়যন্ত্র হিশেবে '৩৯ সালে হক মন্ত্রীসভার সদস্য হিশেবে শ্যামাপ্রসাদ শপথ নেওয়ার অল্প কয়েকদিনের ভিতরেই বিহারের ভাগলপুরে হিন্দু মহাসভা তাদের ২৩ তম অধিবেশন করার সিদ্ধাত নেয়।সংঘাতের উদ্দেশ্য নিয়েই পবিত্র ঈদের খুব কাছাকাছি সময়ে হিন্দু মহাসভা এই সন্মেলনের আয়োজন করেছিল।মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি যাতে নোতুন ভাবে উৎসাহ পায় , সেই উদ্দেশে নেপালরাজের সঙ্গেও একটা সম্পর্ক তৈরি করেছিল হিন্দু মহাসভা।ব্রিটিশ সরকার এই সন্মেলনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও বাংলার মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদের এই সন্মেলন ঘিরে ভাগলপুর যাওয়াকে কোনো অবস্থাতেই আটকায় নি।
                  

রাজারাজড়া দের সঙ্গে হিন্দু মহাসভার একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল।ব্রিটিশ সরকার ভাগলপুরে হিন্দু মহাসভার সন্মেলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বলে আর এস এস- হিন্দু মহাসভা ঘনিষ্ঠ দারভাঙ্গার মহারাজা স্যার কামেশ্বর সিং প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাঁর শহরে এই সন্মেলন করতে।গোটা উত্তেজনাকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে '৩৯সালের ১৪ ই ডিসেম্বর , ' অল ইন্ডিয়া ভাগলপুর ডে' হিন্দু মহাসভা পালন করেছিল।আর এস এস নেতা বি এস মুঞ্জে এবং খাপার্দে গোলমাল আরো বৃদ্ধির উদ্দেশে ভাগলপুরে যাওয়ার পথ হিশেবে কলকাতাকে ব্যবহার করলেন।
                      

অনেক প্রগতিশীল মানুষ ও বলেন;  শ্যামাপ্রসাদ কখনো ব্রিটিশ জেলে থাকেন নি।না।তথ্যটি ঠিক নয়।শ্যামাপ্রসাদ ব্রিটিশ জেলে থেকেছেন।ব্রিটিশ ভারতের একমাত্র মন্ত্রী হলেন শ্যামাপ্রসাদ, যিনি মন্ত্রীত্বে আসীন থাকাকালীন ভাগলপুরের উপকন্ঠ কাহালগাঁতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন! তবে তাঁর এই গ্রেপ্তারবরণ ব্রিটিশ কে এই দেশকে তাড়াবার উদ্দেশে নয়! তাঁর এই গ্রেপ্তার হওয়া ছিল, বাংলাভাগকে ত্বরান্বিত করতে পবিত্র ঈদকে কেন্দ্র করে ভাগলপুরে হিন্দু- মুসলমানের ভিতর দাঙ্গা ছড়াবার উদ্দেশে।দাঙ্গায় উৎসাহ দিতে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভাগলপুরে যেতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে শ্যামাপ্রসাদ চার- পাঁচদিন ব্রিটিশের হাতে বন্দি ছিলেন।মুসলিম সাম্প্রদায়িকদের খুশি করতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শ্যামাপ্রসাদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।তাদের শ্যামাপ্রসাদকে গ্রেপ্তার উদ্দেশ্য ছিল, ওই গ্রেপ্তারের ভাতর দিয়ে হিন্দু - মুসলমান, উভয় সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক শিবির, মৌলবাদী শিবির , পরস্পরের প্রতি যেন আরো বল্গাহীন আক্রোশে ফেটে পড়ে, সেটা সুনিশ্চিত করা।কারন, যে ব্রিটিশ গান্ধীজী থেকে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সীমান্ত গান্ধী, সুচেতা কৃপালনী, সরোজিনী নাইডু, মুজফফর আহমদ, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু দের গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে দিনের পর দিন কারান্তরালে চরম নির্যাতনের ভিতর রাখে, সেই ব্রিটিশ মাত্র চার - পাঁচ দিনের ভিতরে মুক্তি দিয়েছিল শ্যামাপ্রসাদকে।হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লীগ , দুই ধর্মের সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদী শক্তির দেশভাগের তাগিদে আরো হিংস্র হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ব্রিটিশের বোড়ের চাল যে শ্যামাপ্রসাদের মতো উচ্চ ক্ষমতাকাঙ্খী মানুষেরা ছিলেন, মাত্র চার - পাঁচ দিন শ্যামাপ্রসাদকে আটক করার ভিতর দিয়ে তা পরিস্কার।
                   

শ্যামাপ্রসাদ সহ আর এস এস , হিন্দু মহাসভার নেতাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টিকে বাংলাসহ গোটা দেশেই হিন্দু- মুসলমানকে বিভাজিত করার উদ্দেশে ব্যবহার করে গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা।ব্রিটিশ শ্যামাপ্রসাদকে গ্রেপ্তার করেছিল হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের আরো বেশি পরিমাণে মুসলমান সাম্প্রদায়িকদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই।সেই উদ্দেশ্য ব্রিটিশের সফল ও হয়েছিল।কারন, শ্যামাপ্রসাদকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করা সত্ত্বেও আর এস এস - হিন্দু মহাসভা সহ গোটা হিন্দুত্ববাদী শক্তির রাগটা ব্রিটিশের বদলে গিয়ে পড়েছিল মুসলমানেদের উপরে।শ্যামাপ্রসাদ মাত্র তিন চারদিন কারান্তরালে রেখে হিন্দু- মুসলমানের সংঘাতকে লাগামহীন করবার জন্যে ব্রিটিশের যে রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল, তা সেদিন মারাত্মকভাবে সফল হয়েছিল।
                         

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে ' হোম আর্মি' নামে ধর্মের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর ধাঁচে একটি বাহিনী গঠনের জন্যে গভর্নর এবং ভাইসরয়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে '৪২ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর বড়লাটের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের একান্ত বৈঠক হয়। তার অল্প কয়েকদিন আগে পাঞ্জাবের মুসলমান জমিদারদের দল ইউনিয়নিস্ট পার্টির নেতা স্যার সিকন্দর হায়াৎ খানের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ  গোপন বৈঠক করেন। এই বৈঠক গুলি একদিকে ছিল মুসলিম লীগের আভ্যন্তরীণ সঙ্কটকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু- মুসলমানের ভিতরে পারস্পরিক অবিশ্বাসকে তীব্র করে তোলা এবং ব্রিটিশ কে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে হিন্দু স্বার্থের নামে সাম্প্রদায়িক অভিসন্ধি সিদ্ধ করবার তাগিদ।ভুলে গেলে চলবে না, মুসলিম লীগের মতোই হিন্দু মহাসভাও ' ৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সর্বাত্মক বিরোধিতা করেছিল।মেদিনীপুরে সতীশ সামন্ত, অজয় মুখার্জী, সুশীল ধারা, কুমুদিনী ডাকুয়াদের নেতৃত্বে যে ' স্বাধীন তাম্রলিপ্ত সরকার' তৈরি হয়েছিল, হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ তার সর্বাত্মক বিরোধিতা করেছিলেন।
                          

'৪২ সালের ১৬ ই অক্টোবর।দিন টি ছিল শারদ উৎসবের মহাষ্টমী।সেদিন মেদিনীপুর জেলার কাঁথিতে এক ভয়াবহ সুনামিতে তিরিশ হাজারের ও বেশি মানুষ মারা যান।এই ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িক পর্যায়ের প্রচারে নিয়ে যায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা।তারা প্রচার করে মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মহম্মদ খান এবং এস ডি ও ওয়াজির আলি সুনামির সমস্ত খবর জানা স্বত্ত্বেও সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক কারনে সেই খবর জানিয়ে মানুষকে সতর্ক করেন নি।
                       

এই প্রচারকে হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ এমন একটা জায়গাতে নিয়ে গিয়েছিলেন যে , গোটা বাংলার হিন্দু মানসের একটা বড়ো অংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণার একদম শেষ সীমায় চলে এসেছিলেন।ঘৃণার রাজনীতি কে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে, হিন্দু জনমানসকে বাংলাভাগের দাবিতে আরো বেশি করে উসকে দেওয়াই ছিল হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদের উদ্দেশ্য।অপরপক্ষে মুসলমান সমাজকে ও এই মিথ্যে রটনার ভিতর দিয়ে হিন্দুদের সম্পর্কে আরো বেশি উত্তেজিত, প্ররোচিত করবার কাজটি সহজেই করে ফেলে হিন্দু মহাসভা।প্রসঙ্গত বলতে হয়, কাঁথিতে সুনামি যখন আছড়ে পড়ে সেই সময়কালটা কিন্তু একদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহকতা অপর দিকে দুর্ভিক্ষের প্রবল হাতছানি।শ্যামাপ্রসাদ কিন্তু বাংলার মন্ত্রী।সুনামির সময়ে তিনি নিজে ছুটি কাটাচ্ছিলেন দার্জিলিংয়ে!
                       

তেতাল্লিশের মন্বন্তর সংগঠিত করতে শ্যামাপ্রসাদ সহ গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের ভূমিকা ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা কালোবাজারির ক্ষেত্রে এইচ দত্ত সহ বেশ কিছু কোম্পানিকে ব্যবহার করে আর মুসলমান সম্প্রদায়িকেরা ব্যবহার করে ইস্পাহানির মতো কোম্পানি গুলোকে।' বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল রিলিফ কমিটি' সভাপতি হন শ্যামাপ্রসাদ।তিনি ই স্যার বদ্রীদাস গোয়েঙ্কার সভাপতিত্বে বেঙ্গল রিলিফ কমিটির সভাপতি ছিলেন।চরমতম আর্থিক দুর্নীতি এবং সাম্প্রদায়িকতা ছঢ়াবার ক্ষেত্রে এই দুটি সংগঠনকে ঘিরেই বিস্তর অভিযোগ আছে।আর এই দুটি সংগঠনের মাধ্যমে হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা বিভাজনের রাজনীতিকে প্রসারিত করে বাংলাভাগের পর্যায়কে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন।
                     

' বেঙ্গল রিলিফ কমিটি' এবং ' হিন্দু মহাসভা রিলিফ কমিটি' এক ই সঙ্গে ত্রাণ দুর্নীতি, মজুতদারদের সুবিধা করে দেওয়া এবং ত্রাণ কাজে হিন্দু - মুসলমান বিভাজন তৈরির ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিল। এই কাজে মাড়োয়ারি রিলিফ সোসাইটির পক্ষে মন্টুরাম জয়পুরিয়া, আর্যসমাজ রিলিফ সোসাইটি এবং তাদের প্রতিনিধি দীপচাঁদজী পোদ্দার, স্টক এক্সচেঞ্জ রিলিফ কমিটি এবং তাঁদের নেতা গোবিন্দলাল বাঙ্গুর, গুজরাট সেবা সমিতি এবং তার নেতা প্রাণজীবন জাঠা, পাঞ্জাব রিলিফ কমিটি এবং তাদের নেতা লালা করমচাঁদ থাপার, হাওড়া রিলিফ সোসাইটি আর তাদের প্রধান ব্যক্তিত্ব চিরঞ্জিলাল বাজোরিয়া, জি এল মেহতার নেতৃত্বাধীন অল বেঙ্গল ফ্ল্যাড অ্যান্ড ফেমিন রিলিফ সোসাইটি, ব্যবসায়ী সমিতি বিড়লা ব্রাদার্স, সুরজলাল নাগরমল প্রমুখের ভূমিকা, এঁদের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের সম্পর্ক ঘিরে বহু চাপান উতোর আছে।এইসব ব্যক্তি এবং সংগঠন দুর্ভিক্ষ ঘিরে তাঁদের ভূমিকার ভিথর দিয়ে বাংলার সামাজিক প্রেক্ষাপটে হিন্দু - মুসলমানকে বিভাজিত করবার ক্ষেত্রে বিশেষ রকমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।এঁদের সেসব ভূমিকা দেশ তথা বাংলাভাগের বিষয়ে বিশেষ রকম ভূমিকা পালন করেছিল।হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদের ছত্রছায়াতে থাকা এইসব ত্রাণ কমিটি গুলো সেই সময়ে গোটা দেশ থেকে পঞ্চাশ কোটির ও বেশি( আজকের হিশেবে তিনশো কোটি টাকার ও বেশি) টাকা সংগ্রহ করেছিল।


                       

ধর্মনিরপেক্ষ নীতি, মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় সোচ্চার, প্রকৃত সম্প্রীতি ভাবনার ধারক বাহক গান্ধীজী চিরদিন সাম্প্রদায়িক হিন্দু শিবিরের আক্রমণের কেন্দ্রস্থল।গান্ধীজী ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন।নিজের ধার্মিক সত্তাকে তিনি কখনো লুকোবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেন নি।গান্ধীজীর এই ধার্মিক সত্তার মতোই তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা।একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ যে কখনো পরধর্ম বিদ্বেষী হতে পারেন না,  গান্ধীজীর জীবন একটি বড়ো উদাহরণ।ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থেই গান্ধীজী মুসলমান সমাজের আর্থ- সামাজিক- সাংস্কৃতিক- ধর্মীয় বিষয়গুলি সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে সবথেকে যত্নবান ছিলেন। গান্ধীজীর এই অবস্থান হিন্দু - মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের ই সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদী শিবিরের কাছে ছিল ভীষণ অপছন্দের বিষয়।এই কারনেই আর এস এস- হিন্দু মহাসভার ছিল ভয়ঙ্কর বিদ্বেষ গান্ধীজীর প্রতি।তাদের সেই বিদ্বেষের জেরেই শেষ কালে আর এস এস- হিন্দু মহাসভার কর্মী নাথুরাম গডসের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল গান্ধীজীকে।
                     

'৪৪ সালের আগস্ট মাসে পুনাতে লোকমান্য  বাল গঙ্গাধর তিলকের জন্মদিনে এক বক্তৃতায় গান্ধীজীকে সরাসরি হিন্দু স্বার্থবিরোধী মানুষ বলে অভিযুক্ত করেন শ্যামাপ্রসাদ।এই সময়কালেই ইংরেজিতে ' দি ন্যাশানলিস্ট' এবং বাংলায়,' হিন্দুস্থান 'নামক দুটি পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি।সেই দুটি পত্রিকার মাধ্যমে চরম মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে হিন্দু মুসলমানের বিভাজনটিকে একটা ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।সেই বিভাজন জনিত প্রতিক্রিয়া বাংলাভাগের সার্বিক ক্ষেত্র রচনা করে।কাঁথির সুনামির অল্প পরেই শ্যামাপ্রসাদ প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন; ' আমরা প্রভু পরিবর্তন চাই না।' ব্রিটিশ চলে যাক-- এটাযে শ্যামাপ্রসাদ বা হিন্দু মহাসভা কখনোই চায় নি, শ্যামাপ্রসাদের এই উক্তি ই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।দেশভাগের প্ররোচনা ছড়াতে কেবল বাংলার বিভিন্ন প্রান্তেই নয়, আজকের পাকিস্থানের লায়ালপুর থেকে শিলং, মাদুরাই থেকে লুকিয়ানা ভয়ঙ্কর প্ররোচনামূলক বক্তৃতা করতেন শ্যামাপ্রসাদ ।সেইসব বক্তৃতার সঙ্কলণ ' অ্যাওয়েক হিন্দুস্থান' এই সময়েই প্রকাশিত হয়েছিল।
                            

আর এস এস বা তাদের সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ প্রত্যেকেই ' হিন্দু' স্বার্থের কথা বলতেন।কিন্তু সেই ' হিন্দু' স্বার্থ ছিল একান্তভাবেই হিন্দু মহাসভার প্রথম সারির নেতাদের ব্যক্তি স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।শ্যামাপ্রসাদ ও নিজের একান্ত ব্যক্তিস্বার্থের নিগড়েই ' হিন্দু' স্বার্থ কেদেখতেন।এঁদের এই বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায় নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রী বরদাপ্রসন্ন পাইনের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদ সহ গোটা হিন্দুত্ববাদী লোকেদের প্রবল অসূয়াকে কেন্দ্র করে।বরদাবাবুকে পদচ্যুত করতে উদ্যোগী হলে ও শ্যামাপ্রসাদের আসল লক্ষ্য ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু।বরদাপ্রসন্ন পাইন যেহেতু শরৎ বসুর রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব মানতেন , তাই শ্যামাপ্রসাদের টার্গেট হয়েছিলেন বরদাপ্রসন্ন।
                      

'৪৫ সালেই নির্বাচন ঘিরে হিন্দু মহাসভার যে সাম্প্রদায়িক প্রচার, তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বাংলাভাগকে অনিবার্য করে তোলা।শরৎ বসু পরবর্তী নির্বাচনে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে সমঝোতায় আসার জন্যে কার্যত হাতেপায়ে ধরে নিরাশ হন শ্যামাপ্রসাদ। এই হতাশার বেশ কিছু বহিঃপ্রকাশ আছে শ্যামাপ্রসাদের দিনলিপিতে।মজার কথা হল; শ্যামাপ্রসাদের দিনলিপির ইংরেজি আর বাংলাতেও বেশ গরমিল আছে।এক ই ব্যক্তির এক ই দিনের ইংরেজি তে লেখা ঘটনাক্রম আর বাংলাতে লেখা ঘটনাক্রমের ভিতরে যে ফারাক থাকতে পারে, তা শ্যামাপ্রসাদের ইংরেজি এবং বাংলাতে লেখা ডাইরি না পড়লে জানা যায় না!
                

তবে বহু চেষ্টা করেও ভোটকে কিছুতেই' হিন্দু  ভোটে' রূপান্তরিত করতে পারলেন না শ্যামাপ্রসাদ।পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ সেভাবে হিন্দু মহাসভাকে তাঁদের একমাত্র প্রতিনিধি হিশেবে মেনে নিলেন না।স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদ পর্যন্ত হেরে গেলেন।তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী অপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হুগলির নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১০২১৬  ভোট পেয়ে জিতলেন।অপরপক্ষে কলকাতার ভূমিপুত্র শ্যামাপ্রসাদ পেলেন মাত্র ৩৪৬ টি ভোট।
                  

শ্যামাপ্রসাদ নিজে হারলেন বটে, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি জিতল।মুসলিম লীগের মতোই হিন্দু মহাসভা চাইছিল দেশভাগ , তথা বাংলাভাগ।তাই মুসলমান সমাজকে ভাঙনের নেশায় মাতিয়ে দিতে মুসলিম লীগকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্যদানকারীর ভূমিকাতে অবতীর্ণ হয়েছিল হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদেরা।দাঙ্গার পরিবেশের ভিতর দিয়ে মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভা পরস্পর পরস্পরের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে তখন দেশভাগকেই ধরে নিয়েছিল একমাত্র সমাধান।তাই ভয়াবহ মুসলিম বিদ্বেষের ভিতর দিয়ে মুসলমান সমাজের ধর্মনিরপেক্ষ অংশের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষকে পর্যন্ত হিন্দু মহাসভা, শ্রামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জীরা বাধ্য করেছিল সাম্প্রদায়িকতার আবর্তে আত্মবিসর্জন দিতে। তাই হিন্দু মহাসভার এই অনুঘটকের ভূমিকা পালনের ফলেই অবিভক্ত বাংলার মোট মুসলিম ভোট যখন ছিল ২৪,৩৪,৭৭৫ টি, সেখানে মুসলিম লীগ একাই পেয়েছিল;২০, ৩৬, ৭৭৫ টি ভোট।অর্থাৎ, মুসলিম লীগের দাবি মতো, মুসলমানেদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল হল, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস নয়-- এই দাবিটি সেই সময়ের প্রেক্ষিতে সর্বাত্মক স্বীকৃতি পায় হিন্দু মহাসভার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক অবস্থান, প্রচার, দাঙ্গা বাঁধানোর মতো ঘটনাবলীর ভিতর দিয়ে। শ্যামাপ্রসাদ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরকে বিভ্রান্ত করতে শরৎ বসুর প্রতি ভোটের আগে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে একদিকে কংগ্রেসের প্রতি মুসলমান সমাজের একটা বড় অংশ, যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন, তাঁদের বিভ্রান্ত করে দিয়েছিলেন।অপলপক্ষে , নিজের সম্পর্কে একটা মিথ্যে ধারণা তৈরি করে কংগ্রেসের ভোটে থাবা বসাতে চেয়েছিলেন।'৪৫ এর নির্বাচনে এই চেষ্টা করে শরৎ বসুর চরিত্র হনন করতে যেমন শ্যামাপ্রসাদ সফল হন নি, তেমন ই তাঁর সাফল্য আসে নি '৪০ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচন ঘিরেও।সেই সময়ে তিনি সুভাষচন্দ্র বসুকে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
                        

এইভাবে হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বের প্রতি, তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার প্রতি যে গভীর আস্থা আছে, তাকে সন্দিহান করে তোলবার নোংরা ষড়যন্ত্র করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।বলাবাহুল্য শ্যামাপ্রসাদের কাছ থেকে পাওয়া হিন্দু মহাসভার সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রস্তাব সুভাষ কেফল প্রত্যাখ্যান ই করেন নি, সেই প্রস্তাবের জবাবে ব্যক্তি শ্যামাপ্রসাদ এবং তাঁর দল হিন্দু মহাসভার সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত কে সুভাষ আরো তীব্র করে তুলেছিলেন। সুভাষকে এই কাজে সর্বাত্মক ভাবে সাহায্য করেছিলেন বামপন্থীরা।
                

হিন্দু মহাসভা যে হিন্দু স্বার্থের কথা বলত, সেখানে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের কোনো জায়গা ছিল না।তাই নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের নেতা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল কে কেবল রাজনৈতিক না, সামাজিক ভাবে হেনস্থার কম চেষ্টা শ্যামাপ্রসাদেরা করেন নি।উচ্চবর্গীয় হিন্দুদের জন্যে বাংলাভাগ করে সেই ক্ষমতার সর ননী খেতে যখন শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জী রা ব্যস্ত থেকেছেন, তখন খন্ডিত ভারত, যেটা তখন পৃথক রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্থান, সেখানে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের জন্যে লড়াই করেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল।পশ্চিম পাকিস্থানে জিন্না , লিয়াকত আলি রা যখন যোগেন্দ্রনাথ কে নানা ভাবে হেনস্থা করতে থাকে, তখন হিন্দু দরদী বলে নিজেদের পরিচয় দেওয়া আর এস এস, হিন্দু মহাসভা, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, এম এস গোলওয়ালকর, ' বীর' সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জী রা কেউ কোনো প্রতিবাদ করেন নি।বরংচ প্রাণের দায়ে যোগেন্দ্রনাথ পন্ডিত নেহরুর সহায়তায় ভারতে এসে যে পদত্যাগপত্র পাকিস্থানের কাছে পাঠিয়েছিলেন, তাকে ' কাপুরুষতা' বলে হিন্দুত্ববাদীরা বর্ণনা করে।এই হিন্দুত্ববাদীদের প্রতিনিধি অটলবিহারী বাজপেয়ী দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরের ই অবলুপ্তি ঘটান।ফলে ছিন্নমূল নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের আজ অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের সরকারি সুযোগ পাওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই।এই হল আর এস এস- হিন্দু মহাসভা, তাদের বিবর্তিত রূপ ভারতীয় জনসঙ্ঘ এবং সেটির বর্তমান বিবর্তন ভারতীয় জনতা পার্টির ' হিন্দু ' প্রেমের স্বরূপ।
                            

কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি যাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, কংগ্রেস হিন্দু স্বার্থবিরোধী বলে যাতে সবার কাছে প্রতিপন্ন হয় সেজন্যে শ্যামাপ্রসাদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।আর এস এস বুঝেছিল, কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে যতো মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য করে তোলা যায় , ততোই হিন্দু- মুসলমান , উভয় সাম্প্রদায়িক শিবিরের লাভ।কংগ্রেস হিন্দু স্বার্থ বিরোধী- এই অপপ্রচারটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে একদিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের অনেক বেশি মুসলিম বিদ্বেষী করে তোলা যায় আর অপরপক্ষে মুসলমানেদের ও ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে অনেক বেশি মুসলিম জাতীয়তার প্রতি আকৃষ্ট করে দেশভাগে সংকল্পিত করা যায়-- এটা বুঝতে পেরেই আর এস এস, হিন্দু মহাসভা কংগ্রেস দলের ভিতরেও বেশ কিছু নিজেদের দলের এজেন্টকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
                         

'৪৫ এর নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের ভিতর হিন্দু মহাসভার হয়ে কাজ করতে পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু লোক সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।হিন্দু স্বার্থে দেশভাগ এদের কাছে ছিল একমাত্র সমাধান।সেই সমাধানকে হাসিল করতে হিন্দু মহাসভার স্বার্থপূরণের উদ্দেশ্য নিয়েই পূর্ববঙ্গের ক্ষিতীশ নিয়োগী( ওই নির্বাচনে ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং ফরিদপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন) , গোপনে যোগাযোগ রাখতে শুরু করলেন শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে।নারায়ণগঞ্জের আনন্দমোহন পোদ্দারকে তো শ্যামাপ্রসাদ নিজেই তাঁর দিনলিপিতে ' তিনি হিন্দু মহাসভার লোক' বলে অভিহিত করেছিলেন।আনন্দমোহনের নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সভাপতি হিশেবে চরম হিন্দু সাম্প্রদায়িক ভূমিকা, চারের দশকে বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকা এবং সন্নিহিত এলাকাতে দাঙ্গা সংগঠনে ন্যক্কারজনক ভূমিকা -- এইসবের পিছনে ছিল শ্যামাপ্রসাদ এবং হিন্দু মহাসভার গোপন হাত।উদ্দেশ্য একটাই ; হিন্দুকে মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়া , আর মুসলমানকে হিন্দুর বিরুদ্ধে লড়ানো, যাতে সহজে বাংলাভাগ হাসিল হয়।
                       

পাঞ্জাবের গোকুলচাঁদ নারাঙ, সেখানকার হিন্দুসভার ( হিন্দু মহাসভার ই শাখা সংগঠন) ছিলেন।শ্যামাপ্রসাদের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি।ইনি প্রত্যক্ষ ভাবে হিন্দু মহাসভা থেকে সরে গিয়ে কংগ্রেসে যোগ দিলেন,তবে হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করলেন না।হিন্দু মহাসভাও তাঁকে বহিস্কৃত করলো না।শ্যামাপ্রসাদ তাঁর দিনলিপিতেই অপর এক হিন্দু মহাসভার নেতা মেহেরচাঁদ খান্না সম্পর্কে লিখছেন ( ০৪\০১\১৯৪৬) ; হিন্দুসভার সভাপতি কংগ্রেস দলে যোগ দিলেন এবং কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত সচিব হলেন।তবু হিন্দু মহাসভা ছাড়লেন না।
                      

এই মেহেরচাঁদ ছিলেন যুক্তপ্রদেশের( আজকের উত্তরপ্রদেশ) হিন্দুসভার সভাপতি।অযোধ্যার হিন্দুসভার সভাপতি মহেশ্বর দয়াল শেঠ,  যাঁর সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের বিশেষ সখ্যতা ছিল, নিজের দিনলিপিতে (০৯\০১\১৯৪৬) যাঁর হিন্দুসভার দৌলতে প্রতিপত্তি বৃদ্ধির কথা শ্যামাপ্রসাদ নিজেই লিখেছিলেন, তিনি ও কংগ্রেসে গেলেন হিন্দুসভা থেকে পদত্যাগ না করেই। এই মহেশ্বর কে ঘিরে হিন্দু মহাসভার ভিতরে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে সাভারকরের যথেষ্ট সংঘাত ও হয়েছিল। এই বছরেই শারদ উৎসবের কালে গোরক্ষপুরের গোরক্ষনাথ মন্দিরের মোহন্ত , তথা হিন্দু মহাসভার নেতা মোহন্ত দিগ্বিজয় নাথ বাংলাতে মুসলমান কতো অত্যাচির করছে- এই কল্পকাহিনি তে যুক্তপ্রদেশের হিন্দুদের প্ররোচিত করতে নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে গোটা যুক্তপ্রদেশ চষে ফেলেছিলেন।আসন্ন নির্বাচন তাঁদের প্রত্যক্ষ লক্ষ্য হলেও মূল লক্ষ্য ছিল দেশভাগ।দক্ষিণ ভারতের ও হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তিত্ব, যারা সঙ্ঘ পরিবারের পরিমন্ডলের ই অন্তর্ভূক্ত ছিলেন, তাদের ও কৌশল হিশেবেই এইসময়ে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়।উদাহরণ হিশেবে অন্ধ্রপ্রদেশের হিন্দু মহাসভার সভাপতি রেড্ডি, তামিলনাডুর ডাঃ নাইডু প্রমুখের নাম করা যায়। এই কাজে বাল গঙ্গাধর তিলকের পুত্র জয়ন্তকেও ব্যবহারের কম চেষ্টা হিন্দু মহাসভার নেতারা করেন নি। এই পর্যায়ে বম্বেতে সাভারকরের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীকে ব্যবহারের কাজে ই নিজের ' দক্ষতা' শ্যামাপ্রসাদ বেশ ভালো ভাবেই দেখিয়েছিলেন।
                      

' ৪৫ সালের শেষের দিকে বামপন্থী ছাত্র রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে শহিদ হন।এই বর্বরোচিত ঘটনায় কলকাতা উত্তাল হয়।উত্তাল ছাত্রদের কাছে বাংলাভাগের লক্ষ্যে শামাপ্রসাদের নগ্ন ষড়যন্ত্র তখন পরিস্কার।তাই রামেশ্বর শহিদ হওয়ার পর কিন্তু বামপন্থী, কি কংগ্রেসের ছাত্র - যুব সহ কোনো স্তরের নেতার কাছেই তখন শ্যামাপ্রসাদের এতোটুকু গ্রহণযোগ্যতা নেই।সেই সময়ে উত্তাল ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যে শ্যামাপ্রসাদ এতোটুকু ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেই কথাও পরের কয়েকদিনের খবরের কাগজে একটি শব্দেও উল্লেখ নেই।অথচ শ্যামাপ্রসাদ নিজের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিশেবে অবসরের সর, পেটোয়া লোকেদের দ্বারা পরিবৃত সিনেট , সিন্ডিকেট কর্তৃক তাঁকে সাম্মানিক ' ডি লিট' দেওয়ার মতোই , নিজের দিনলিপিতে রামেশ্বরের শহিদ হওয়ার পর অশান্ত কলকাতাকে, বিশেষ করে ছাত্র সমাজকে শান্ত করার সব কৃতিত্ব নিজেকেই দিয়েছেন।এই কৃতিত্ব দিয়েই গোটা কলকাতা একদিকে ব্রিটিশের পাশবিকতার বিরুদ্ধে যখন জ্বলছে আর অপর দিকে হিন্দু মহাসভা- শ্যামাপ্রসাদ এবং মুসলিম লীগের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল, হিন্দু - মুসলমানের সংঘাতকে অস্বীকার করে যখন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যৌথ , সঙ্ঘবদ্ধ লড়াই তে প্রস্তুত, তখন নির্বাচনী প্রচারের অছিলা দিয়ে ইছাপুর, শ্যামনগর, জগদ্দল, ভাটপাড়া, নৈহাটি, হালিসহর , কাঁচড়াপাড়া তে শ্যামাপ্রসাদ প্রবল সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে নিজের হাজির হয়ে গিয়েছিলেন।শ্রমিক অধ্যুষিত, মিশ্র জনগোষ্ঠীর জগদ্দল ,ভাটপাড়াতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিষ সংক্রমণে সাফল্য দেখে নিজেই নিজের দিনলিপিতে আনন্দপ্রকাশ করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।
                          

ভাটপাড়ার পন্ডিত সমাজের প্রতিনিধি শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ( যিনি ' ৫২ র লোকসভা ভোটে সঙ্ঘের শাখা ' রামরাজ্য পরিষদ ' থেকে বারাকপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছিলেন)  , তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় জানকীবল্লভ ভট্টাচার্যেরা শ্যামাপ্রসাদের সেই সভাগুলি সংগঠিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।পাশের শহর নৈহাটিতে সাম্প্রদায়িকতার বিষ সেভাবে সংক্রমিত না করতে পারার ক্ষোভ শ্যামাপ্রসাদ তাঁর দিনলিপিতে গোপন করেন নি!নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্যামাপ্রসাদের এইসব কর্মকান্ড হিন্দু মহাসভাকে আদৌ কোনো নির্বাচনী সাফল্য এনে দিতে না পারলেও, তাদের দেশভাগের উদ্দেশ্য কে সিদ্ধ করতে মুসলিম লীগকে নির্বাচনী সাফল্য এনে দিয়েছিল।সেই সাফল্য ই বাংলাভাগ তথা দেশভাগকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।
                     

'৪৬ সালের ১৬ ই আগস্ট ব্রিটিশের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ডাকটিক হিন্দু মহাসভা ' হিন্দু' দের বিরুদ্ধে  লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম হিশেবে মানুষের কাছে তুলে ধরে এক প্রলয়ঙ্ককারী ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার অবতারণা করে।এই দাঙ্গা অল্প সময়ের ভিতরেই নোয়াখালীতে ছড়ায়।মুসলিম লীগ থেকে বহিস্কৃত গোলাম সারোয়ারের নেতৃত্বে যে নারকীয় তান্ডব চলে , তার দায় মুসলিম লীগ তথা সমগ্র মুসলমান সমাজের উপরে চাপিয়ে দেয় আর এস এস, হিন্দু মহাসভা, শ্যামাপ্রসাদ, সাভারকর, এন সি চ্যাটার্জীরা।এই দাঙ্গার জেরে জ্বলতে শুরু করে বিহার।বাংলাভাগ, দেশভাগ, তখন হয়ে দাঁড়ায় কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
                         

ব্রিটিশ ভারতে পুলিশ প্রশাসনের উঁচু পদে কোনো ভারতীয়ের নিয়োগকেই মেনে নিতে পারত না হিন্দু মহাসভা, আর এস এস, শ্যামাপ্রসাদেরা।ভারতীয়েরা প্রশাসনের সর্বোচ্চ আমলার আসনে বসলে হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের পক্ষে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোটা বেশ মুশকিলের ব্যাপার হয়ে যেত।কারণ, ভূমিপুত্র ভারতীয়রা যেমন হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের অপকর্মের যাবতীয় সুলুক সন্ধান জানতেন, তেমনিই জানতেন মুসলমান সাম্প্রদায়িকদের ষড়যন্ত্রের যাবতীয় প্যাঁচ পায়জার।তাই ভারতীয় প্রতিনিধি প্রশাসনের উঁচু পদে বসলে হিন্দু- মুসলমান, উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষেই বাংলাভাগ তথা দেশভাগের লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িকতার প্রসার ও প্রয়োগ ঘটানো সম্ভবপর হতো না।
                            

তাই যখন বাংলার প্রিমিয়ার সোহরাওয়ার্দি কলকাতার পুলিশ কমিশনার হিশেবে মহম্মদ শামসুদ্দোহাকে নিয়োগ করেন, তখন ই সেই নিয়োগকে সাম্প্রদায়িক নিয়োগ করে শীবাকীর্তন গাইতে শুরু করে দেয় হিন্দু মহাসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ।তাই হিন্দু মহাসভার কর্মীদের এই সময়ে বাংলার বিভিন্ন অংশ থেকে কলকাতার হিন্দুদের আত্মরক্ষার জন্যে অস্ত্র সংগ্রহে নিয়োজিত করা হয়।পরবর্তীকালে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সে সময়ে ছিলেন হিন্দু মহাসভার একজন তরুণ কর্মী।কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় হিন্দুদের আত্মরক্ষার নাম করে , কলকাতার মুসলমানেদের উপর আক্রমণের লক্ষ্যে অস্ত্র সংগ্রহের কর্মসূচিতে সুকুমার বাবু ও অংশ নিয়েছিলেন।তিনি হুগলীর মানকুন্ডু থেকে প্রভূত অস্ত্র সংগারহ করে কলকাতার বিভিন্ন পাড়াতে পৌঁছে দিয়েছিলেন বলে বিজেপি শীর্ষনেতাদের আলোচনাতেই জানা যায়।রাম চট্টোপাধ্যায় সেই সময়ে সরাসরি হিন্দু মহাসভা করতেন না।তবে হিন্দু সুরক্ষার নাম করে মুসলমানদের উপর সবধরণের অত্যাচারে তিনি ও তার শাগরেদরা তখন সিদ্ধহস্ত।এই কাজে ভাটপাড়ার এক সমাজ বিরোধী ওয়াগানব্রেকার অক্ষয় ভট্টাচার্য ছিল রাম চট্টোপাধ্যায়ের অন্যতম বড়ো শাগরেদ।সেই সময়ের হিন্দু মহাসভার তরুণকর্মী সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে মানকুন্ডুতে ওইসব অস্ত্রের যোগানদার চন্দননগরের রাম চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কি না-- এই সংশয় থেকেই যায়।
                  

শ্যামাপ্রসাদ, হিন্দু মহাসভা, আর এস এসের দেশভাগের লক্ষ্যে, বাংলাভাগের উদ্দেশে যে দীর্ঘদিনের কর্মকান্ড তা একটা চরম পরিণতির দিকে যেতে শুরু করে '৪৬ এর দাঙ্গাতে উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তির দ্বারা সামাজিক বিভাজন টাকে ভয়ঙ্কর রকমের নগ্ন করে তুলবার পর।সেই বছরের ই শেষের দিকে ' বেঙ্গল পার্টিশন লীগ' তৈরি হয়েছিল।শ্যামাপ্রসাদ নিজে প্রথম দিকে সেই সংগঠনটির সঙ্গে কৌশলগত কারণে একটু দূরত্ব রাখছিলেন।কারণ, নিজেকে প্রথমে প্রকাশ্যে দেশভাগের সমর্থক হিশেবে না দেখিয়ে আরো কিছু দরকষাকষির তিনি পক্ষপাতী ছিলেন।তবে '৪৬ এর দাঙ্গার পর তিনি দেশভাগ ঘিরে কৌশলজনিত আড়াল আবডাল আর রাখলেন না।দেশভাগের উগ্র সমর্থক হয়ে প্রত্যক্ষ ভাবে বেঙ্গল পার্টিশন লীগের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ফেললেন।শ্যামাপ্রসাদ সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার দরুণ সেটি বিশেষ রকমভাবে সক্রিয় হয়ে উঠলো।এই সংগঠনটির অতি সক্রিয়তার কার্যকরী প্রভাব পড়লো মুসলমান সমাজের সাম্প্রদায়িক অংশের ভিতরেও বেশ জোরদার ভাবে।
                        

'৪৬  এর দাঙ্গার আগে থেকেই শ্যামাপ্রসাদ এটা রটিয়ে দিয়েছিলেন যে, হিন্দুদের অনন্তকাল মুসলমানেদের অধীন করে রাখার ষড়যন্ত্র হচ্ছে।তাঁর রটনাতে এটাও ছিল যে, মুসলমানেরা হিন্দুদের জাতিগত বিলুপ্তি চাইছে। এ নিয়ে একটি বিকৃত প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশে হিন্দু মহাসভা ' ৪৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে একটি অনুসন্ধান কমিটি তৈরি করে।সে বছর ৯ ই মার্চ ভয়ঙ্কর প্ররোচনামূলক, হিংস্র একটি প্রতিবেদন সেই কমিটি দাখিল করে। কেন্দ্রীয় আইনসভা তে দেশভাগ চেয়ে প্রস্তাব আনার  সমর্থনে  দিল্লিতে একটি জনসভায়বক্তব্য  পেশ করলেন এন সি চ্যাটার্জি, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রাক্তন সেনানায়ক এ সি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।'৪৭ এর ১৫ ই মার্চ বাংলাভাগের দাবিতে কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভার দুদিন ব্যাপী সন্মেলন হল।রমেশচন্দ্র মজুমদার( কিছুদিন আগেই ঢাকার দাঙ্গাতে উস্কানি দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য , প্রখ্যাত হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার ঐতিহাসিক তথা আর এস এসের সক্রিয় সদস্য ডঃ মজুমদারের ঢাকার বাড়িতে গিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক আলোচনা করে এসেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।ডঃ মজুমদারের দুই সহপাঠী প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুরেন্দ্রনাথ সেন এবং কোচবিহার ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক উপেন্দ্রনাথ রায় যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন দেশভাগের বিপক্ষে।ডঃ মজুমদারের হিন্দু সাম্প্রদায়িক অবস্থানের , বিশেষ করে শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে তাঁর  পক্ষপাতিত্বের এই দুই ঐতিহাসিক এনেছিলেন।   ), লর্ড সিনহা, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ভবতোষ ঘটক, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, ঈশ্বরদাস জালান প্রমুখ বিশিষ্ট্য মানুষ, যাঁদের বেশিরভাগ ই সরাসরি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না, তাঁরাও হিন্দু মহাসভার দেশভাগের দাবিতে সন্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।দেশভাগের দাবিকে সমর্থন করে জোরালো বক্তব্য ও রেখেছিলেন।
                       

বাঙালি মুসলমানদের ভিতরেও বিভাজন আনতে হিন্দু মহাসভা কম সচেষ্ট থাকে নি সেই সময়ে।সোহরাওয়ার্দি পাঞ্জাবি মুসলমান দিয়ে কলকাতা পুলিশ ভরিয়ে দিয়েছে এবং সেই পাঞ্জাবি পুলিশ হিন্দু নারী ধর্ষণ করছে-- এটাই ছিল আর এস এস- হিন্দু মহাসভা- শ্যামাপ্রসাদ- এন সি চ্যাটার্জির সন্মিলিত প্রচার। হিন্দু সাম্প্রদায়িক অবস্থান এবং উচ্চবর্ণের, উচ্চবিত্তের অভিজাত হিন্দুদের স্বার্থরক্ষায় বাংলাভাগ-- হিন্দু মহাসভা, শ্যামাপ্রসাদের এই কর্মকান্ডে বিশেষ সহায়ক ছিল অমৃতবাজার পত্রিকা এবং যুগান্তর।অমৃতবাজার পত্রিকা এইসময়ে দেশভাগের পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে একটি তথাকথিত সমীক্ষা চালায়।সেই সমীক্ষাতে তারা দাবি করে যে, শতকরা ৯৮.৬ শতাংশ হিন্দু দেশভাগকে সমর্থন করছে।কিসের ভিত্তিতে সেই সমীক্ষা ছিল, সে তথ্য অবশ্য কোনোদিন ই জানা যায় নি!
            

শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে স্যার যদুনাথ সরকারের কিছু ব্যক্তিগত সংঘাত ছিল।কিন্তু হিন্দু মহাসভার সামাজিক প্রযুক্তি দেশভাগকে কেন্দ্র করে সেদিন এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিল যে, যাবতীয় ব্যক্তি সংঘাত কে দূরে সরিয়ে স্যার যদুনাথের মতো বিশ্ববিশ্রুত ঐতিহাসিকের ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালিকে দেশভাগের পক্ষে চূড়ান্ত ভাবে প্ররোচিত করতে তাঁকে সভাপতি করে '৪৭ সালের মে মাসে কলকাতায় দেশভাগের পক্ষে জনসভা ডাকে হিন্দু মহাসভা।সিলেট ঘিরে গণভোটে দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহাকে ঘিরেও জঘন্য অপপ্থচার করতে শ্যামাপ্রসাদ বা হিন্দু মহাসভা ছাড়ে নি।কারন, রণদাপ্রসাদের কাছে দেশ ছিল সবার আগে।দেশের মাটির গুরুত্ব ছিল সবার আগে।তিনি নিজে উচ্চ বিত্তশালী হিন্দু হয়েও , সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের স্বার্থের জোয়ারে গা ভাসাতে পারেন নি।তাই শ্যামাপ্রসাদদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু থেকে গেছেন।শ্যামাপ্রসাদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষায় তাঁর হাতের পুতুল হতে পারেন নি।তাই তাঁকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদীদের নিন্দাবাদ আজ ও শেষ হয় নি।জন্মসূত্রে কোনো হিন্দু যদি সাম্প্রদায়িক না হন, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের স্বার্থবাহী অবস্থান না নেন, তাহলে তাঁকে যে শ্যামাপ্রসাদের মতো ' হিন্দু' বোধকে সাম্প্রদায়িক, স্বার্থান্বেষী দৃষ্টিতেই একমাত্র দেখতে অভ্যস্থ লোকেদের কাছে আক্রমণের লক্ষাযবস্তু হতে হয় রণদাপ্রসাদ সাহা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
                       

দেশভাগে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখা আর এস এস, হিন্দু মহাসভা বা তার বিবর্তিত রূপ ভারতীয় জনসঙ্ঘের উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, মুসলিম বিদ্বেষ, বহুত্ববাদী ভারতচেতনায় অবিশ্বাসের সাথে সাথেই আর একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল, চরম নারী বিদ্বেষ।পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা হল হিন্দু- মুসলিম, উভয় সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর এস এস সেই বৈশিষ্টের ই ধারক বাহক।আর এস এসের সমস্ত শাখা সংগঠন গুলি এবং তাদের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠন গুলি চরম নারী বিদ্বেষী।হেডগেওয়ার থেকে সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদ থেকে দীনদয়াল উপাধ্যায়, প্রত্যেকেই ছিলেন চরম পুরুষতান্ত্রিক, নারী বিদ্বেষী মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ।লিঙ্গ সাম্যে সাম্প্রদায়িকেরা কখনো বিশ্বাস করে না।আর এস এস- হিন্দু মহাসভা- বিজেপি , এদের কারো বিশ্বাস নেই নারী স্বাধীনতায়।রান্নাঘর আর আঁতুরঘরের বাইরে নারীর কোনো অস্তিত্ব এঁরা স্বীকার করে না।তাই সংসদে হিন্দু কোড বিল যখন আসে তখন ভয়ঙ্কর রকম ভাবে তার বিরোধিতা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।হিন্দু কোড বিল ঘিরে লোকসভাতে শ্যামাপ্রসাদ এবং আম্বেদকরের বিতর্ক থেকেই বোঝা যায় হিন্দুত্ববাদী চিন্তা চেতনা কতোখানি প্রতিক্রিয়াশীল।হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, দলিত বিদ্বেষী শ্যামাপ্রসাদ কতোখানি নারী বিদ্বেষী ছিলেন লোকসভাতে আম্বেদকরের সঙ্গে তাঁর বিতর্কের ভিতর দিয়ে তা দিনের আলোর মতো পরিস্কার।
 
' ৪৬  সালের দাঙ্গা সোহরাওয়ার্দীর নিন্দনীয় কাজ, এখন পর্যন্ত তা একটা সুপ্রতিষ্ঠিত কাহিনী হিসেবে টিকে আছে হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা এই ভাবেই বিষয়টিকে টিকিয়ে রেখেছে। হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতারাও যে এই ঘটনায় গভীরভাবে জড়িত ছিল, এ সত্যটা সেভাবে সামনেই আসে না। ঐ লড়াইয়ে হিন্দুর চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান নিহত হয়। স্বভাভসুলভ ভাবে  নিরুদ্বিগ্ন প্যাটেল ঐ বীভৎস বিষয়টিকে এভাবে মূল্যায়ন করেন: 'হিন্দুরা এতে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হয়েছে।
                   

সাম্প্রদায়িক শক্তির এই বিভৎস প্রতিযোগিতায় ১৯৪৬ সালে হিন্দুদের প্রস্তুতি একেবারে বিস্ময়কর ছিল না। কারণ এ কথা মনে রাখা দরকার যে, ত্রিশ দশকের শেষে এবং চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে কোলকাতা ও মফস্বল শহরগুলোতে হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সংগঠন প্রতিষ্ঠার আধিক্য দেখা যায়- এসব গ্রুপের বিঘোষিত নীতি ছিল হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা; কিন্তু তারা ভদ্রলোক যুবকদেরকে দৈহিক যোগ্যতা অর্জন করতে ও আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে উৎসাহ দিতে অধিকতর শক্তি ব্যয় করত।
                       

সম্ভবত এসব সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে সুসংগঠিত সংগঠন ছিল ভারত সেবাশ্রম সংঘ। এই সংগঠন টি  ছিল হিন্দু মহাসভার গোপন  স্বেচ্ছাসেবক শাখা। প্রকাশ্যে সমাজ সেবামূলক সংগঠন হলেও ,সূচনাপর্ব  থেকে এই সংগঠনটি  সামরিক কৌশল গ্রহণ করে একদম আর এস এসের আদলে।
                 

হিন্দুদের আত্মরক্ষার কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণের আহ্বান জানায় ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ।১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সংঘের এক সভায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সভাপতিত্ব করেছিলেন। এই সভায় ২,৬০০ লোক যোগদান করে বলে জানা যায়। সভায়- বক্তারা সম্প্রদায়গত রোয়েদাদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, এর উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দুদের প্রতিহত করা। তাঁরা বলেন যে, সাবেক দণ্ডিত অপরাধী পুলিন দাস ও সতীন সেনের সাহায্য নিয়ে তাদের আখড়া তৈরি করে দৈহিক গঠনের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত যাতে হিন্দুরা আক্রান্ত হলে যেন এক হাজার লাঠি উত্তোলিত হয়... বাঙলায় লেখা পোস্টার ছাপানো হয়- এর মধ্যে একটা পোস্টারের শিরোনাম ছিল 'এখনই অহিংসার চেতনা ত্যাগ করো, প্রয়োজন হল পৌরুষ'।
                      

দু'মাস পর অনুষ্ঠিত সংঘের অন্য এক সভার প্যান্ডেলে প্রদর্শিত প্লাকার্ডে বাঙলায় লেখা ছিল: 'হিন্দুরা জাগ্রত হও এবং অসুরদের হত্যার শপথ গ্রহণ করো।'৩০ এর পরের বছর শিবের ধর্মীয় মূর্তিকে ব্যবহার করে একই মূলভাবকে প্রকাশ করা হয়:
৭ তারিখে (এপ্রিল, ১৯৪০) সেবাশ্রম সংঘের উদ্যোগে মহেশ্বরী ভবনে একটা হিন্দু সম্বেলন অনুষ্ঠিত হয়। মি. বি. সি. চ্যাটার্জী ঐ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। হিন্দুদের সামরিক মানস গড়ে তোলার জন্য সেখানে বক্তৃতা করা হয়। ত্রিশূলসহ শিবের একটা বড় চিত্র প্রদশির্ত হয়... স্বামী বিজনানন্দ বলেন যে, অসুরকে ধ্বংস করার জন্য হিন্দু দেব-দেবীরা সব সময় বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন। স্বামী আদিত্যনন্দ... মন্তব্য করেন যে, তিনি হিন্দুদের সেবা করার জন্য একটা লাঠি নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন যে, হিন্দুর শত্রদের মুণ্ডচ্ছেদ করতে হবে। ত্রিশূলসহ শিবের চিত্রের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন যে, তাঁর অনুসারীদের অস্ত্র, কমপক্ষে লাঠি হাতে এগিয়ে আসতে হবে... স্বামী প্রণবানন্দ পাঁচ লাখ লোকের একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তুলতে চান... তিনি মাড়োয়ারিদের কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানান... হরনাম দাস প্রত্যেক হিন্দুকে সৈনিক হওয়ার আহ্বান জানান।
                        

পাঁচ লাখ হিন্দুর একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলার সংঘের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এতে সন্তুষ্টির সাথে উল্লেখ করা হয়ে যে, ইতিমধ্যে বারো হাজার লোককে সংগ্রহ করা হয়েছে।৩১ শুরু থেকে ভারত সেবাশ্রম সংঘ মহাসভার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। কিন্তু চল্লিশের দশকে সংঘ এবং এর মতো অন্যান্য সংগঠন ভদ্রলোকদের ব্যাপক সমর্থন পেতে থাকে।
                       

অমৃত বাজার পত্রিকা-র মৃণাল কান্তি ঘোষ, দৈনিক বসুমতী পত্রিকার সম্পাদক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ এবং মডার্ন রিভিউ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চ্যাটার্জীসহ কোলকাতার ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবী গ্রুপের সদস্যরা সংঘের মিটিং-এ উপস্থিত থাকতেন।৩২ এমনকি ১৯৪৭ সালের দিকে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত খ্যাতনামা ব্যক্তিরাও সংঘের সাথে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার কথা গোপন রাখেননি। ঘোষণা করা হয় যে, ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সাবেক সদস্য ও মন্ত্রী স্যার বিজয়প্রসাদ সিংহ রায় সংঘ আয়োজিত হিন্দু সম্মেলনের অধিবেশন উদ্বোধন করবেন। ঐ সম্মেলনে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পি. এন. ব্যানার্জী সভাপতিত্ব করবেন।
                     

কংগ্রেস পার্টির নিজস্ব একাধিক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন ছিল,৩৪ এসব সংগঠনের লোকেরা প্রায়ই সংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করত। চন্দ্রনাথ মন্দির অপবিত্র করার প্রতিবাদে ১৯৪৬ সালের মে মাসে সংঘ একটা জনসভার আয়োজন করে। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় আইন সভার কংগ্রেস সদস্য শশাংক শেখর সান্যাল।
                   

পরের বছর ('৪৭ ) স্বামী প্রণবানন্দের জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে সংঘ একটি মিছিলের আয়োজন করে- ঐ মিছিলে কংগ্রেসের একটা দল সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে: 'তারা ছিল সাদা জামা, হাপ প্যান্ট ও গান্ধী টুপি পরিহিত অবস্থায়... তারা বহন করছিল কংগ্রেস পতাকা (এবং) ... বিভিন্ন পোস্টার, এতে হিন্দুদের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং শিবাজী ও রানা প্রতাপের আদর্শ অনুসরণ করে শক্তি অর্জনের আহ্বান ছিল।'( বন্ধনীভূক্ত গুলি সব গৃহ মন্ত্রণালয়ের গোপন প্রতিবেদন।ক্রম অনুসারে তার সূত্র শেষে দেওয়া আছে)  ।
                      

তা ছাড়াও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের  মতো আরো অনেক সংগঠন তাদের সামরিক ও আক্রমণাত্মক হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচির মাধ্যমে (কমিউনিস্ট আন্দোলনের বাইরে থাকা) পুরনো সশস্ত্র  সংগঠনের অবশিষ্ট কর্মীদের আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। পুলিন দাস ও সতীন সেন ছিলেন সাবেক যুগান্তর সদস্য, অতীতে তাঁরা ' বিপ্লবী' অপরাধের জন্য গ্রেফতার হন।
                       

এখন তাঁরা সেবাশ্রম সংঘের 'মার্শাল আর্ট'-এর পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োজিত হন। যুগান্তর পার্টির মাদারীপুর স্থানীয় শাখা ১৯৪১ সালে সংঘের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণের ভার গ্রহণ করে।  মাদারীপুর যুগান্তর গ্রুপের অন্য একজন বিশিষ্ট সদস্য কল্যাণ কুমার নাগ ত্রিশের দশকে সংঘ এবং হিন্দু মহাসভার সক্রিয় সদস্য হন।৩৯ এই কল্যাণ কুমার নাগ পরে 'স্বামী সত্যানন্দ' হিসেবে পরিচিত হন এবং ইনিই ১৯২৬ সালে 'হিন্দু মিশন' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে কোলকাতার হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পায় । তার  মধ্যে মহাসভার অপর এক 'সক্রিয়' শাখা হিন্দু শক্তি সংঘ ছিল বেশ বড় ও সুগঠিত।
                      

এই সংগঠনের  পাঁচশ'র বেশি সদস্য শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল এবং এদের আর্থিক অবস্থা ছিল ভালো। অন্যান্য সংগঠনগুলো ছিল 'পাড়াভিত্তিক' সংগঠন। যেমনটি ছিল বেহালার 'যুব সম্প্রদায়'। এই সংগঠনটির অন্তর্গত
বেহালা থানার কিছু ছেলেমেয়েকে নিয়ে নির্মল কুমার চ্যাটার্জী ১৯৪৩ সালে সংগঠনের  কার্যক্রম শুরু করেন। তাদের  কার্যক্রম হল: ১. তরুণ ছেলে ও মেয়েদের জন্য ব্রতচারী ও ছোরা খেলা, ২. নাট্য শাখা, ৩. ফুটবল শাখা। এদের একটা লাইব্রেরিও ছিল । সর্বমোট সংগঠনটির  সদস্য সংখ্যা ৫০;৩০ জন হচ্ছে স্কুলের উঠতি বয়েসের ছেলেমেয়ে এবং বাকি ২০ জন যুবক। তারা দুর্গা পূজা এবং সরস্বতী পূজা পালন করত। দুর্গা পূজার সময় তারা নাটক মঞ্চস্থ করত।
                      

একইভাবে বাগবাজার তরুণ ব্যায়াম সমিতি এবং পার্ক সার্কাস এলাকার আর্য বীর দলের সদস্য সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৫ এবং ১৬ জন।৪৩ বৃহৎ কোলকাতায় এ ধরনের সক্রিয় সমিতির মধ্যে ছিল এন্টালি ব্যায়াম সংঘ, হাওড়ায় সালকিয়া তরুণ দল, ২৪ পরগণা জেলার হাজী নগরে হিন্দু সেবা সংঘ এবং শ্রীরামপুরে মিতালী সংসদ।

বড় বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রায়শই বিপুল আর্থিক সাহায্য দেওয়া হত। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ভারত সেবাশ্রম সংঘ মাড়োয়ারিদের সাহায্য পেত। ১৯৪১ সালে গোয়েন্দা শাখা একটা পত্র হস্তগত করে- বাঙলা প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার সেক্রেটারির লেখা ঐ পত্রের প্রাপক ছিল যুগল কিশোর বিড়লা। 'বর্ধমানের হিন্দুদের প্রশিক্ষণ ও দৈহিক উন্নতির জন্য' আর্থিক সাহায্যের প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে ঐ পত্রে ধন্যবাদ জানানো হয়।
                   

অন্য একটি সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) বাঙলা শাখা বিড়লাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করত। আরএসএস-এর কোলকাতাস্থ প্রধান কেন্দ্র 'হ্যারিসন রোড ও আমহার্স্ট চৌমাথার পাশে মি. বিড়লার শিল্প বিদ্যালয়ে' ছিল ।সঙ্ঘ গোটা ভারতে এক ভাবে শক্তি বিস্তার করেছিল।বাংলাতে আর একভাগে।বাংলাতে যেহেতু হিন্দু মহাসভাকে দিয়ে তাদের কাজ আনেকখানি হাসিল হয়ে যাচ্ছিল, তাই নিজেরা এখানে বেশি সক্রিয় হয় নি।
                  

চারের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে  আরএসএস কোলকাতা থেকে গ্রামবাংলার দিকে  নিজেদের  বিস্তার করতে শুরু করে। এই কাজে কমপক্ষে একজন বড় হিন্দু জমিদার সহায়তা করে। গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্টে প্রকাশ পায় যে-
রাজশাহী, পাবনা, সালাপ (salap) (পাবনা জেলা), ময়মনসিংহ, সুসঙ্গ দুর্গাপুর (ময়মনসিংহ জেলা) এবং বাঙলার অন্যান্য অংশে অনেক শাখা আছে। সুসঙ্গ রাজ পরিবারের বাবু পরিমল সিংহ ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একজন অনুগত সমর্থক। বলা হয় যে, বাঙলায় এ সংঘের সদস্য সংখ্যা প্রায় এক লাখ।
                  

চারের  দশকের সাম্প্রদায়িক আদর্শ এবং হিন্দু মহাসভা ও হিন্দুত্ববাদী কংগ্রেসের রাজনীতিতে কোলকাতার হিন্দু ভদ্রলোক যুবক শ্রেণীর ব্যাপক অংশকে সংগঠিত করতে এ ধরনের সংগঠন খুবই শক্তিশালী ছিল। এ ধরনের সংগঠনের অধিকাংশকেই নির্দোষ বলে কর্তৃপক্ষ গণ্য করে ।
                  

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সংগঠনের ব্যাপারে সরকারের সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গির বিস্ময়কর প্রতিফলন ঘটে।৪৮ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তার তালিকাভুক্ত যুবকদের 'শারীরিক প্রশিক্ষণ' দিত, তার মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৩৯ সালে আরএসএস-এর বাঙলা শাখার ভি আর পাঠকী লন্ডনে অবস্থানরত তার এক বন্ধুকে লেখেন:
আপনার পাঠানো লি এন-ফিল বেয়োনেট ইত্যাদির নকশা-তালিকা পাওয়া গিয়েছে... লন্ডনে 'পার্কার হেল' নামে একটা সুপ্রসিদ্ধ ফার্ম আছে যেখানে প্রয়োজনীয় আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি করা হয়। আপনি কি ঐ ফার্ম থেকে একটা 'এইমিং রেস্ট' (Aiming Rest) যোগাড় করতে পারেন? এ যন্ত্রটির ওপর বন্দুক রেখে নিশানা ঠিক করা হয়। নতুন যারা ভর্তি হয়েছে তারা গুলি করার অনুমতি পাওয়ায় আগে এটা ব্যবহার করতে পারে।


                   

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক কাজ থেকে অব্যাহতি পাওয়া সৈনিক ও সামরিক কর্মচারীদেরকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগহ করতে প্রলুব্ধ করা হয়। ১৯৪৬ সালের মে মাসে দেওয়া এক পুলিশ রিপোর্টে প্রকাশ পায় যে, অনুশীলন ও যুগান্তর গ্রুপ অস্ত্র সংগ্রহের সাথে জড়িত; গুজব রটে যে, হিন্দু মহাসভা তাদের এই কাজে অর্থ যোগান দেয়:
অনুশীলন দলের সদস্যরা সামরিক কর্মচারীদের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে ... ১১ই মে যুগান্তর দলের সদস্য শ্যামসুন্দর পালের কোলকাতার বাড়ি তল্লাশি করা হয় এবং সেখানে ১০৮ রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়। অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহের কাজেও যুগান্তর দল জড়িত-অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে হিন্দু মহাসভার একজন বিশিষ্ট নেতা তাদের অর্থ প্রদান করে বলে জানা যায়।
                         

যুদ্ধের পর থেকে সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সৈনিকদের মাঝে মহাসভা খুবই সক্রিয় ছিল; তারা সৈনিকদের এবং 'অব্যাহতিপ্রাপ্ত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির লোকদের মহাসভার পতাকাতলে' সংগঠিত করার চেষ্টা করে এবং 'সৈন্যবাহিনীর সাবেক কর্মচারীদের নিয়ে হিন্দু যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে'। ৫২ অন্তুত বর্ধমানে এই প্রচেষ্টা থেকে ফল পাওয়া যায়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর কাছে লিখিত 'পানাগড়ের একজন সাবেক হিন্দু সৈন্য অফিসার' আবেগতাড়িত এক পত্রে ঘোষণা করেন:
হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলায় আমাদের বিপজ্জনক শত্রু মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আমরা বর্ধমান জেলার সৈন্যবাহিনীর সাবেক হিন্দু কর্মকর্তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি... আমরা প্রস্তুত আছি, আপনার নির্দেশ আমরা অনুসরণ করব ...আমরা শপথ নিয়েছি এবং আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা পূরণে আমরা বিরত হব না। আমরা অস্ত্রসজ্জিত এবং যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে অবহিত... আমরা মনে করি যে, প্রতিশোধ গ্রহণের এই পদ্ধতিতে প্রদেশের বর্বর মুসলমানদের থামিয়ে দিতে পারব এবং এ থেকে তাদের বর্ণসংকর (halfcast) কুখ্যাত নেতা সোহরাওয়ার্দী ও নাজিমুদ্দিন প্রতিশোধ গ্রহণে হিন্দুদের সাহস সম্পর্কে অনুধাবন করতে পারবে। 
                        

মুসলমানদের এইভাবে প্রাণপণে প্রতিহত করার পটভূমিতে ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর তাই বিস্ময়ের কিছু নেই যে, কয়েক মাস পর হিন্দু স্বেচ্ছাসেবীরা কোলকাতায় তাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিল। বি, আর, মুনজে মহাসভার নির্বাচনী প্রচারণায় সর্ব প্রথম কামান দাগেন এই ঘোষণা করে:
হিন্দু মহাসভা স্বাধীনতা চায়, কিন্তু তারা বিশ্বাস করে না যে অহিংস পথে তা অর্জন করা যাবে। এ জন্য তা পাশ্চাত্যের অতি আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারায় আক্রমণকে সংঘটিত করতে চায়... গৃহযুদ্ধের হুমকির (মুসলিম লীগের) মোকাবেলায় কংগ্রেস যদি মহাসভার শ্লোগান 'অশ্বচালনা ও রাইফেল শুটিং-এ যুবকদের শিক্ষা দাও' গ্রহণ করে তাহলে তা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
              

বাঙলায় যখন গৃহযুদ্ধ সত্যি সত্যি আসন্ন হয়ে দাঁড়াল( অন্নদাশঙ্করের প্রবন্ধ,' গৃহযুদ্ধের পাঁয়তারা' নন্দনে প্রকাশিত।প্রবন্ধকার কর্তৃক অনুলিখিত।সেখানে এই পটভূমিকার আভাস পাঠক পাবেন), তখন মহাসভা স্বেচ্ছাসেবীরা প্রস্তুত ছিল বাঁশের লাঠি, ছোরা ও দেশীয় পিস্তল নিয়ে নেতাদের পরামর্শ মতো কাজ করতে, তারা বাহিনীর মতো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ব্যগ্র ছিল। মুসলমানদের মতো হিন্দুরাও ১৬ই আগস্ট যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল; উভয় পক্ষই ছিল অস্ত্রসজ্জিত, তবে দলে-বলে হিন্দুদেরই ভারি দেখা যায়।
                    

রাজনৈতিক হিন্দু দাঙ্গাকারীদের সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণে ক্রমবর্ধমান উগ্র সাম্প্রদায়িকতার প্রেক্ষাপটে কোলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুদের সংগঠিত করতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো কতটা সফল হতে পেরেছিল তা প্রকাশ পায়। এই উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ছিল চারের র দশকে ভদ্রলোক রাজনীতির বৈশিষ্ট্য।
                    

মুসলমান দাঙ্গাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল পল্লি এলাকা থেকে শহরে আসা ভাসমান শ্রেণীর লোক। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপর যে, বহু সংখ্যক ভদ্রলোক হিন্দুকে দাঙ্গার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। দাঙ্গায় জড়িত হিন্দু জনতার গঠন সম্পর্কে আলোচনাকালে ঐতিহাসিক  সুরঞ্জন দাশ লক্ষ করেছেন;
বাঙালি হিন্দু ছাত্র ও অন্যান্য পেশাজীবী বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক বিশেষ ভাবে  সক্রিয় ছিল। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী সওদাগর, শিল্পী, দোকানদার... দাঙ্গার অভিযোগে গ্রেফতার হয়। মধ্য কোলকাতায় মুসলমানদের একটি সভা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য অন্যদের সাথে ভদ্রলোকেরাও অংশগ্রহণ করে- ঐ সভায় মুখ্যমন্ত্রী নিজে ভাষণ দেন। বিখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ড. জামাল মোহাম্মদকে হত্যাকারী জনতার মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল 'শিক্ষিত যুবক'... এটা বিস্ময়কর ছিল না যে, তাদের মধ্যে অনেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে।
                     

খুব জোরের সাথে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, হত্যাযজ্ঞের পর অব্যাহতভাবে অসন্তোষের মধ্যে মুসলমান জনতার মাঝে বোমা নিক্ষেপের জন্য হিন্দুদের মধ্যে থেকে গ্রেফতারকৃত একজন হিন্দু ছিল বর্ধমানের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মহেন্দ্রনাথ সরকার। তিনি স্বীকার করেন: 'এখন আমি একজন কংগ্রেস নেতা। আগে আমি ছিলাম হিন্দু মহাসভার সদস্য। বাঙলা বিভাগের পক্ষে আমি এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছি।'৫৬ হিন্দুদের পক্ষে যোগ দেয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সৈনিক ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা।৫৭ ছাত্র, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এবং দোকানদার ও পাড়ার ভাড়াটে গুণ্ডা মার্কা ছেলেদের অভাবিত ঐক্যের ফলে হিন্দু জনতার রক্ষক্ষয়ী বিজয় হয় কোলকাতার রাস্তায়, ১৯৪৬ সালে।
                      

এটাই বাঙলা বিভাগ এবং একটা পৃথক হিন্দু আবাসভূমি গঠনের জন্য হিন্দু আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই যে, হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের এই জঘন্য কাজকে কখনও স্বীকার করা হয়নি। সাম্প্রদায়িক হিন্দু সংবাদপত্র এই আক্রমণের জন্য দোষারোপ করে সোহরাওয়ার্দী সরকার ও মুসলিম লীগকে।
               

এই হত্যাযজ্ঞকে গণ্য করা হয় ভবিষ্যতে 'মুসলমান শাসনে'র অধীন বাঙালি হিন্দুদের ভাগ্যের ভয়াবহ অশুভ লক্ষণ হিসেবে। পরবর্তী মাসগুলোতে হিন্দু সংবাদপত্রে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের আবরণে কোলকাতা হত্যাকে একটা শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে গণ্য হয় এবং তা পশ্চিমে বাঙলায় একটা পৃথক হিন্দু রাজ্য গঠনের দাবির সপক্ষে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
           

খবরের কাগজের উদ্দেশে লেখা একটি চিঠি থেকে বোঝা যায় পরিস্থিতির ভয়াবহকতা--   নোয়াখালী ও টিপেরার স্থানীয় মুসলমানেরা কোলকাতা ও বিহারের মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যার গুজবে বিলম্বিত অথচ ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া দেখায়, এবং প্রতিশোধ হিসেবে শত শত হিন্দুকে হত্যা করে। হিন্দুরা নিজেদের নির্লজ্জভাবে যুদ্ধাবস্থায় দাঁড় করাতে এরকম একটি ঘটনাই চাইছিল, তারা এই অজুহাতটি পেয়ে যায়: সোহরাওয়ার্দীকে (তার নাম উচ্চারণে আমার ঘৃণা হয়) জানিয়ে দাও যে, হিন্দুরা এখনও মরে যায়নি, এবং সে বা তার দুশ্চরিত্র সাঙ্গোপাঙ্গোরা হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে শাসন করতে পারবে না... সোহরাওয়ার্দীকে তার দুষ্কর্মের জন্য খুব শীঘ্রই চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে। সে-ই হিন্দুদের বিদ্রোহী করে তুলেছে। এখন থেকে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হল বিদ্রোহ এবং প্রতিশোধ গ্রহণ। এসো, আমরা মুসলিম লীগের বর্বরদের সাথে যুদ্ধ করি। বাঙলা ভাগ না হওয়া পর্যন্ত এবং হিন্দুদের স্বাদেশভূমি থেকে লীগ কর্মীদের বের করে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ থেকে বিরত হব না।" (১৯\০৪\১৯৪৭, অমৃতবাজার পত্রিকাতে প্রকাশের জন্যে এই চিঠিটা পাঠানো হয়েছিল।পুলিশ সেটি আটক করে।মৃন্ময়ী দত্ত ছিলেন চিঠিটির লেখক)।

এই ধরনের অনুভূতি অনেক হিন্দুর মনে ক্রমবর্ধমান দৃঢ় সংকল্প গ্রহণে উৎসাহিত করে যে, যে কোনো মূল্যে, যা কিছুই হোক না কেন, বাঙলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে। সেই ভাগের রাজনৈতিক পটভূমিকা নির্মোহ দৃষ্টিতে আলোচনা বিশেষ জরুরি।
              

আগ্রহী পাঠক দেখুন--

1. প্যাটেলের কাছ থেকে আর. কে. সিধওয়া, ২৭শে আগস্ট ১৯৪৬। দুর্গা দাস (সম্পাদিত), সর্দার প্যাটেলস করেসপন্ডেন্স, খণ্ড ৩, পৃ. ১৪৮।

2. মেমো, তারিখ ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৩৯। জিবি এসবি' 'পিএইচ' সিরিজ ফাইল নং ৫১০/৩৯।

3. মেমো, তারিখ ১১ই নভেম্বর ১৯৩৯, প্রাগুক্ত।

4. মেমো, তারিখ ৯ই এপ্রিল ১৯৪০, প্রাগুক্ত।

5. মেমো, তারিখ ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, প্রাগুক্ত।

6. অমৃত বাজার পত্রিকা, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭।

7. ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের সাথে সংশ্লিষ্ট ১৩টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম পুলিশ তালিকাভুক্ত করে। দেখুন, মেমো নং ডিআইআর ১০১, জিবি এসবি 'পিএম' সিরিজ, ফাইল নং ৮৮২/৪৬-২

8. মেমো, তারিখ ২৫শে জুন ১৯৪৬, জিবি এসবি 'পিএইচ' সিরিজ, ফাইল নং৫১০/৩৯।

9. মেমো, তারিখ ১৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭, প্রাগুক্ত।

10. মেমো, তারিখ ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৩০, জিবি এসবি 'পিএইচ' জিরিজ, ফাইল নং ৫১০/৩৯।

11. ঢাকা ডিভিশনের কমিশনারের রিপোর্ট, এলওএফসিআর, প্রথম পক্ষ, মার্চ ১৯৪১, জিবি এইচসিপিবি ১৩/১৪।

12. হিন্দু মিশন সম্পর্কে রিপোর্ট, জিবি এসবি 'পিইএইচ' সিরিজ, ফাইল নং ৫০২/৪২।

13. আটককৃত পত্র, আশুতোষ লাহিড়ী কর্তৃক এস. কে. দেবের কাছে লেখা, ২৩শে আগস্ট ১৯৪৪, জিবি এসবি 'পিএইচ' সিরিজ ফাইল নং ৫৫০/৪৪বি।

14. স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সম্পর্কে নোট, ৩০শে নভেম্বর ১৯৪৫। জিবি এসবি 'পিএম' সিরিজ, ফাইল নং ৮২৯/৪৫।

15. মেমো, তারিখ ১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৬, প্রাগুক্ত, ফাইল নং ৮২২/৪৬-২

16. স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সম্পর্কে নোট দেখুন, ৩০শে নভেম্বর ১৯৪৫। জিবি এসবি 'পিএম' সিরিজ, ফাইল নং ৮২৯/৪৫।

17. এআইসিসি পেপার্স, ফাইল নং সিএল ১৪(বি)/১৯৪৬, সিএল-১৪(সি)/১৯৪৬ এবং সিএল-১৪(ডি(/১৯৪৬।

18. আটককৃত পত্র, যুগল কিশোর বিড়লার কাছে বর্ধমান জেলা হিন্দু মহাসভার সেক্রেটারির লেখা, তারিখ ৯ই ডিসেম্বর ১৯৪১। জিবি এসবি 'পিএইচ' সিরিজ, ৫৪৩/৪১। আনন্দিলাল পোদ্দার ছিলেন বিশেষভাবে সেবাশ্রম সংঘের সাথে ঘনিষ্ঠ এবং ১৯৪৪ সালে ঐ সংঘ কর্তৃক আয়োজিত এক জন্মাষ্টমী সভায় তিনি বক্তৃতা করেন। প্রাগুক্ত, ফাইল নং ৫১০/৪৪।

19. মেমো, তারিখ ২২শে আগস্ট ১৯৩৯। জিবি এসবি 'পিএইচ' সিরিজ, ফাইল নং ৫১০/৩৯।

20. সিআইডি রিপোর্ট, তারিখ ১৯শে এপ্রিল ১৯৪৩। জিবি এসবি 'পিএইচ' সিরিজ, ফাইল নং ৫১১/৪২। এটা হয়ত একটা সাধারণ অনুমিত হিসাব হতে পারে। তবে এটা ঠিক যে, সংঘ গঠিত হওয়ার সময় এর সদস্য সংখ্যা ছিল একশ এবং তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

21. এটা কৌতুকপ্রদ যে, সরকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যায়াম সমিতিগুলোকে 'সম্ভাবনাপূর্ণ বিপজ্জনক বলে গণ্য করে- এসব সমিতি সংশ্লিষ্ট ছিল ফরোয়ার্ড ব্লকের সাথে। আরএসএস শান্তি-শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে হুমকিস্বরূপ নয় বলে সরকার মনে করে (সারণি ৮), অতচ গোয়েন্দা শাখা অবহিত ছিল যে, আরএসএস অস্ত্র সংগ্রহ করছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অদ্ভুত অবস্থার এটা একটা দৃষ্টান্ত। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, স্যার নাজিমুদ্দিন ও সোহরাওয়ার্দীর মতো লোককে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকর বক্তব্য দেওয়ার জন্য কখনও গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি, অথচ শরৎ বসুর মতো লোককে ব্রিটিশ জেলে কয়েক বছর থাকতে হয়েছে।

22. ভি. আর. পাটকি থেকে আর. ভি. কেলকার কাছে লিখিত, আটককৃত পত্র, তারিখবিহীন, জিবি এসবি 'পিএইচ' সিরিজ, ফাইল নং ৫১০/৩৯।

23. শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আদিম রিপু উপন্যাসে বর্ণনা করেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোলকাতায় অবাধে অস্ত্র পাওয়া যেত। তিনি উল্লেখ করেন যে, অব্যাহতিপ্রাপ্ত সৈনিকেরা অপরাধ জগতের বসদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করত। শরদিন্দু অমনিবাস, খণ্ড ২, পৃ. ২।

24. যেসব হিন্দু সংগঠনের কাছে অস্ত্র আছে তাদের সম্পর্কে মেমো; জিবি এসবি 'পিএইচ' সিরিজ, ফাইল নং ৫০৭/৪৬।

25. মেমো, তারিখ ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬। জিবি এসবি 'পিএম' সিরিজ, ফাইল নং ৮২৯/৪৫।

26. আটককৃত পত্র, পানাগড়ের প্রাক্তন হিন্দু সামরিক কর্মকর্তাদের সেক্রেটারির কাছ থেকে এস. পি. মুখার্জীর কাছে লেখা, তারিখ ৭ই নভেম্বর ১৯৪৬। জিবি এসবি 'পিএম' সিরিজ, ফাইল নং ৯৩৭/৪৬।

27. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী পেপার্স, ২-৪ অংশ, ফাইল নং ৭৫/১৯৪৫-৪৬

28. সুরঞ্জন দাশ, কমিউনাল রায়টস ইন বেঙ্গল, পৃ. ১৮৩। দাশের গবেষণার সম্ভবত উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল, ১৯৩০ সালে ঢাকার দাঙ্গা থেকে শুরু করে ১৯৪৬ সালের কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোতে ভদ্রলোকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ-এসব তথ্য পুস্তকের মূল বক্তব্যকে সমর্থন করে।

29. বর্ধমানের ওন্ডাল থানার ড. মহেন্দ্র নাথ সরকারের বিবৃতি। জিবি এসবি 'পিএম' সিরিজ, ফাইল নং ৬২/৪৭।

30. সুরঞ্জন দাশ, কমিউনাল রায়টস ইন বেঙ্গল, পৃ.৩২৭ এবং ৩৩৯।

31. আটককৃত পত্র, অমৃত বাজার পত্রিকার সম্পাদকের কাছে প্রেরিত মৃন্মায়ী দত্তের লেখা, তারিখ ১৯শে এপ্রিল ১৯৪৭। জিবি এসবি 'পিএম' সিরিজ, ফাইল নং ৯৩৮/৪৭-৩

32.বাঙলা ভাগ হল, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭, জয়া চ্যাটার্জী,

1) Awake Hindusthan- Shyama Prasad Mookherjee.Dr.Shyama Prasad Mookherjee Research Foundation.New Delhi.1St Edition.1945.

2) Leaves from a Diary -Shyama Prasad Mookherjee.Oxford University Press.New Delhi.1st edition.1993.

3) Shyama Prasad Mookherjee- Dr Reena Bhaduri Edited.kolka.2003.

4) Selected Speeches in Bengal Legislative Assembly.by Shyama Peasad Mookherjee.kolkata.2002.

5) Was India's Partition Unavoidable- Hirendra Nath Mukherjee. 1987.

6) My Country, My Life-L K Adbani.2008.

7)Dr Babasaheb Ambedkar's Writings and Speaches .Vol 8.

8) The Brotherhood in Saffron- Walter Andersen & Shridar Damle.1987.

9)  শ্রী গুরুজি সংগ্রহ- গোলওয়ালকর।দ্বাদশ খন্ড।ভারতীয় সংস্কৃতি ট্রাস্ট।কলকাতা।২০০৭।

১০) যুক্তবঙ্গের স্মৃতি- অন্নদাশঙ্কর রায়।মিত্র ঘোষ।কলকাতা।১৯৯০।

১১) নোয়াখালির দুর্যোগের দিনে - অশোকা গুপ্তা।নয়া উদ্যোগ।কলকাতা।

১২) আর এস এস ও বর্তমান ভারত- গৌতম রায়

১৩) পরাধীন ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা-গৌতম রায়।যুবশক্তি।কলকাতা।

১৪) পাক ভারতের রূপকার- প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ি।চাকদহ।

১৫) শ্যামাপ্রসাদের ডাইরি ও মৃত্যু প্রসঙ্গ- উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত।মিত্র ঘোষ।কলকাতা।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন