ধর্মনিরপেক্ষতা এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফজলুল হক

বিভাগপূর্ব ভারতের রাজনীতিতে আবুল কাশেম ফজলুল হক( ১৮৭৩,২৬ শে অক্টোবর-১৯৬২,২৭ শে এপ্রিল ) এক বিশেষ বর্ণময় চরিত্র।একাধারে প্রখ্যাত আইনজীবী, কলকাতার মহানাগরিক ( '৩৫) , অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার (১৯৩৭-১৯৪৩) , পূর্ব পাকিস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ('৫৪) , সমগ্র পাকিস্থানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ('৫৫) , পূর্ব পাকিস্থানের গভর্নর (' ৫৬-'৫৮) ইত্যাদি নানা পদে কর্মরত থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর আজীবন ক্লান্তিহীন লড়াই, রাজনীতিকে উচ্চবিত্ত, অভিজাতের আওতা মুক্ত করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ফজলুল হক

১৯২০ সালের ১২ ই জুলাই কাজী নজরুল এবং মুজফফর আহমদের যুগ্ম সম্পাদনায় ' নবযুগ' যখন প্রকাশিত হয়, তখন পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন ফজলুল হক।কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাকাবাবুর যে সলতে পাকানোর কাজ , নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে সেই কাজ তিনি শুরু করেছিলেন এই 'নবযুগ' পত্রিকার ভিতর দিয়েই।'নবযুগ'ই হল বাংলা ভাষায় প্রথম পত্রিকা , যেখানে সরাসরি শ্রমিক , কৃষক , মেহনতি জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল।ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কে ভারতছাড়া করতে শ্রমিক ,কৃষকের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো সহজ রাস্তা নেই-- একথা প্রথম 'নবযুগ' ই বলে।ব্রিটিশ বিতাড়িত হলে, শ্রমিক- কৃষকের হাতে শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করে দেশের সার্বিক সমস্যার সমাধান করতে হবে-- এইসব কথা 'নবযুগে'প্রকাশিত হতে থাকে।ফলে ব্রিটিশের রোষানলে পড়ে ' নবযুগ'।ব্রিটিশ সরকার 'নবযুগে'র জামানত বাজেয়াপ্ত করে এবং পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ করে দেয়।আইনি লড়াই করে ব্রিটিশের থাবা থেকে 'নবযুগ 'কে মুক্ত করে এনেছিলেন ফজলুল হক। সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নছরুল , কাকাবাবুর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত ,ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট 'নবযুগে'র ভূমিকা ঐতিহাসিক।মার্কসীয় দর্শনে নজরুলকে স্থিত করবার ক্ষেত্রে এই 'নবযুগ' কে কেন্দ্র করেই কাকাবাবু বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবির প্রতি।

বঙ্কিমচন্দ্র যে সাম্প্রদায়িক সাহিত্যের আঙ্গিকের অবতারণা করেছিলেন, তা গত শতকের বিশের দশক পর্যন্ত কেবল সাম্প্রদায়িকতাকেই উৎসাহ জোগায় নি, বর্ণবাদকে পুষ্ট করতেও বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছিল।উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বিশেষ সুযোগ সুবিধার বিষয়টির অবতারণা করে বাংলায় '২৩ সালে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভা তৈরির পথকে সহজ করে দেওয়া হয়েছিল। এই অবস্থাতেও দেশবন্ধুর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে জাতীয় কংগ্রেস হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির লক্ষ্যে দেশবন্ধুর করা ' বেঙ্গল প্যাক্ট' বাতিল করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তিন দশকের সূচনা পর্ব থেকেই আঈনসভায় মুসলমান সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফজলুল হক '৩৫ সালে কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করে নিম্নবর্গের হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে রাজনীতির প্রাঙ্গনে নিয়ে আসার পর ,বাংলার রাজনীতি একটা মানুষের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টির মাধ্যমে নোতুন ধারায় প্রবাহিত হতে শুরু করে।বস্তুত কমিউনিষ্ট দের নেতৃত্বে পরবর্তীকালের যে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন, তার পরিবেশ রচনার ক্ষেত্রে ফজলুল হকের কৃষকদের পক্ষে আন্দোলন এবং ক্ষমতায় এসে কৃষকস্বার্থে আইন প্রনয়ণ, বিশেষ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল।

ফজলুল হক ই হলেন বাংলার প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি নির্বাচনী রাজনীতিতে জমিদারি উচ্ছেদ এবং সাধারণ মানুষের জন্যে ভাত ডালের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জমিদারি উচ্ছেদের ভাবনাকে আইনসভার প্রাঙ্গন পর্যন্ত টেনে আনার বিষয়টি ভারতীয় রাজনীতিতে প্রথম করেছিলেন ফজলুল হক।জমিদারি উচ্ছেদের স্বার্থে হক সাহেব '৩৮ সালে যে ' ফ্লাইড কমিশন ' গঠন করেছিলেন, তেমন সামন্ততন্ত্র বিরোধী পদক্ষেপ তাঁর আগে বাংলায় , এমন কি গোটা ভারতে কোনো রাজনীতিক নিতে সক্ষম হন নি।পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্থানে '৫০ সালে যে 'পূর্ব বাংলা প্রজাস্বত্ত্ব অধিগ্রহণ আইন ' প্রনোদিত হয়, সেটি অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হিশেবে ফজলুল হক প্রবর্তিত ' ফ্লাইড কমিশনে'র সিদ্ধান্তের ই বাস্তবায়ন।

আইনসভাকে সাধারণ মানুষের স্বার্থে পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলার রাজনীতিতে ফজলুল হকের বিশেষ অবদান আছে।বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব সংশোধনী আইন('৩৮) -- বাংলার সংসদীয় রাজনীতির প্রেক্ষিত থেকে শুরু করে আর্থ- সামাজিক- রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য একটি পর্যায়।কৃষিখাতক আইন, মহাজনী আইন, বঙ্গীয় চাকরি নিয়োগ বিধি('৩৯) -- এই যে আইন গুলি দুটি পর্যায়ে বাংলার প্রিমিয়ার হিশেবে ফজলুল হক প্রনয়ণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেগুলির প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে তিনি ক্ষমতায় না থাকার ফলে তিনি তেমন সফল না হলেও, এই আইনগুলি তৈরির প্রেক্ষিত রচনার ভিতর দিয়ে কৃষকের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তিনি।কমিউনিষ্টরা পরবর্তীতে শ্রমিক- কৃষক - মেহনতি জনতার লড়াইকে সঙ্গবদ্ধ করবার ক্ষেত্রে যে সামাজিক প্রক্রিয়া শুরু করেন, সেই প্রক্রিয়ার একটা ভিত্তিভূমি হিশেবে ফজলুল হকের কৃষক স্বার্থবাহী আইনি এবং রাজনৈতিক উদ্যোগ গুলিকে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়।

প্রজাস্বত্ত্ব সংশোধনী আইনের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের জন্যে জমিদারকে যে অতিরিক্ত সন্মানী দিতে হতো, সেটি বাতিল করেন ফজলুল হক। জমিদারদের জমি কেনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের প্রচলন ছিল সেই সময়ে।জমিদার যদি কোনো জমি কিনতে চাইতেন, তা যে মূল্যেই হোক না কেন, আইনত সেই জমির মালিক , জমিটি , জমিদারকে বিক্রি করতে বাধ্য থাকতো।এই আইনের কালো দিকটিই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ' দুই বিঘা জমি' তে দেখিয়েছিলেন।সেই কালাকানুনটি ফজলুল হক বাতিল করেছিলেন।সার্টিফিকেটের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের যে প্রচলন তখন ছিল, যাতে নানা ভাবে নিরক্ষর কৃষককে ফাঁকি দেওয়া হতো, সেই প্রথা হক সাহেব বাতিল করেছিলেন।চাষীদের কাছ থেকে ' আবওয়াব' হিশেবে পুজো,পার্বণ , পুন্যাহ ইত্যাদি উপলক্ষ্যে জবরদস্তি আদায়ের ব্যবস্থা ছিল।এই ব্যবস্থার ভয়ঙ্কর দিক অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর ' পল্লীগ্রামস্থ প্রজাদের দুরবস্থা' বর্ণনে' লিখে গেছেন।এই অন্যায় ' আবওয়াব' প্রথা আইন করে বাতিল করেছিলেন ফজলুল হক।

কৃষক যদি কুড়ি বছর খাজনা দিতে নাও পারেন, তাহলে কুড়ি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগে , বকেয়া সময়কালের ভিতরে , মাত্র চার বছরের খাজনা পরিশোধ করে সে জমি পুনরুদ্ধার করতে পারবে-- ফজলুল হক কৃত এই আইন বাংলার কৃষকদের স্বার্থে একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য পর্যায়।বকেয়া খাজনার উপর আগে নির্দিষ্ট করা সুদের হার ছিল ১২.৫% ।ফজলুল হক সেই সুদের হার কমিয়ে করেন ৬.২৫%। জমিদার নানা ভাবে প্রজার জমির স্বত্ত্বাধিকারীর উপর খাজনা বৃদ্ধি করতে পারতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সহযোগী আইনের সাহায্যে।এই খাজনা বৃদ্ধির বিষয়টিও ফজলুল হক দশ বছরের জন্যে স্থগিত রাখার আইন তৈরি করেছিলেন।ঋণ সালিশি বোর্ড - কৃষকের স্বার্থে ফজলুল হকের আর একটি ঐতিহাসিক অবদান।বাংলার এই ঋণ সালিশি বোর্ডকে পরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ অনুসরণ করে। মহাজনদের আগে কোনো নিবন্ধীকরণের ব্যবস্থা ছিল না।ফলে ঋণগ্রহীতাকে ছলে বলে কৌশলে সর্বস্বান্ত করার সুযোগ টা মহাজনদের অনেক বেশি ছিল।মহাজনদের জন্যে বাধ্যতামূলক ট্রেড লাইসেন্সের প্রবর্তন করেন ফজলুল হক।ফলে মহাজনদের অত্যাচার কিছুটা হলেও সংযত হয়েছিল।যেমন খুশি সুদের হার নির্ধারণে মহাজনদের একচ্ছত্র ক্ষমতাকেও নিয়ন্ত্রিত করে দিয়েছিলেন হক সাহেব।সুদের হার সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হবে- এটা আইন বলে স্বীকৃত করেছিলেন তিনি।

বহু সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও কৃষকের স্বার্থে ফজলুল হক যেসব আঈন তৈরি করেছিলেন, সেই আইনগুলি বাংলার কৃষকদের ভয়াবহ ঋণের জাল থেকে বের হয়ে আসতে অনেকখানি সাহায্য করেছিল।মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা যেভাবে বাংলার কৃষি অর্থনীতিকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল, সেই অচলাব্যস্থা থেকে কৃষকের দুরবস্থার অবসানে ফজলুল হকের সময়কালের আইনগুলির বিশেষ ভূমিকা ছিল।মহাজনদের বিভিন্ন ধরণের অবেধ আদায় থেকে কৃষক সহ বাংলার জাতিধর্ম নির্বিশেষে গরীব মানুষকে বের করে আনার ক্ষেত্রে ফজলুল হকের অবদান ঐতিহাসিক। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা হিন্দুর একচেটিয়া অধিকারের অবসান ঘটিয়ে পেশাক্ষেত্রে হিন্দু- মুসলমানের সমতা আনার ক্ষেত্রে প্রথম ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ফজলুল হক নিয়েছিলেন।চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হক সাহেবের যে কার্যক্রম ,সেটি যদি সঠিক ভাবে অনুসৃত হতো , তাহলে অর্থনৈতিক বঞ্চনার দিকটি মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকখানি উপশম হতো।মুসলমানের সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হক সাহেব যে ' লাহোর প্রস্তাব' পেশ করেছিলেন, সেটিকেই ভোল পাল্টে ' পাকিস্থান প্রস্তাবে' পর্যবসিত করেছিলেন জিন্না।জিন্নার সেই উপক্রমকে ব্যঙ্গ করে ফজলুল হক বলেছিলেন, আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করা হয়েছে।কৃষকের স্বার্থে, ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে ফজলুল হকের রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং আইন ও প্রশাসনিক উদ্যোগকে ভেস্তে দিতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বহু ষড়যন্ত্র করেছে।শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী , হক সাহেবের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কটিকে ( স্যার আশুতোষের কন্যা কমলার গৃহ শিক্ষক ছিলেন হক সাহেব।তাছাড়াও আইনজীবী হিশেবে তিনি স্যার আশুতোষের শেষ জুনিয়ার ছিলেন) ব্যবহার করে তাঁর মন্ত্রীসভাতে ঢুকেছিলেন।মন্ত্রী হিশেবে তেতাল্লিশের মন্বন্তরে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে, সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে ফজলুল হককে সবরকম ভাবে হেনস্থা এবং অপদস্ত করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।

গৌতম রায়


শেয়ার করুন

উত্তর দিন