অমিত শাহের সাম্প্রতিক বাংলা সফর ও বিভাজনের রাজনীতি

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গ সফর করে গেলেন।তাঁর এই সফর মূলত মূলত মধ্যবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গেই সীমাবদ্ধ ছিল।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর ছিল, একদম বিজেপি নেতা অমিত শাহের সফর।কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদমর্যাদার সবটুকু সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে এই সফরে অমিত একটি ও প্রশাসনিক শব্দ ব্যবহার করেন নি।রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যে টুকু প্রকাশ্য মন্তব্য করেছেন, সেই মন্তব্যের নির্যাস দেখে মনে হয় না, সেটি দেশের গৃহমন্ত্রীর বক্তব্য।মনেহয় পাড়ার কোনো উঠতি বিজেপি নেতার কথাবার্তা।সাধারণ মানুষের করের টাকায় রাজ্য সফর করতে গিয়ে এইধরণের মেকি হূংকার অপছন্দের রাজ্যসরকারের উদ্দেশে দেওয়াটা অমিত শাহের গত ছয় বছরের একটা প্রচলিত দস্তুর হয়ে গেছে, এইকথা আর আলাদা করে বলবার দরকার হয় না।                     

কোভিদ ১৯ এর এই ভয়াবহকতার ভিতরে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যাঁর পদমর্যাদা কার্যত দেশের প্রধানমন্ত্রীর পরেই, তাঁর মুখ থেকে সঙ্কট মোকাবিলা ঘিরে একটি শব্দ ও কি রাজ্যবাসী শুনলেন? ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কট রাজ্যে।তীব্র বেকারি।ব্যাপক ছাঁটাই।কর্মহীনতা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের অগ্নিমূল্য।আলু পঞ্চাশ টাকা কেজি ছুঁল বলে।পিঁয়াজ তো একশো টাকা কেজি ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে।ব্যাপক কালোবাজারি।তেতাল্লিশের মন্বন্তরের  সময়ে যেভাবে ফড়ে আর কালোবাজারিতে গোটা বাংলা ছেঁয়ে গিয়েছিল, আজ ঠিক তেমনটাই পরিস্থিতি হয়েছে। প্রতি টি পাড়ায়, মহল্লাতে পর্যন্ত চলছে ভয়াবহ ফড়ে রাজ।এই ফড়ে দোকানদার দের কার্যত পাহাড়া দিয়ে চলেছে শাসক তৃণমূলের মদতপুষ্ট ক্লাব গুলি। এইসব ফড়েদের কাছে ফসল, ডিম, ফল ইত্যাদি বেঁচা ছাড়া বাইরে থেকে আসা বিক্রেতাদের কোনো উপায় নেই।একজন ডিমওয়ালা যদি ফড়ে দোকানদারকে এড়িয়ে পঞ্চাশ পয়সা দাম কম নেয় ক্রেতাদের কাছ থেকে তাহলে , ফড়েদোকানদারের তল্পিবাহক ক্লাব এসে গলা টিপে ধরছে সেই ডিমবিক্রেতার।                           

এইসব ভয়াবহ পরিস্থিতি ঘিরে অমিত শাহের গত দুদিনের বাংলা সফরে আমরা কি একটাও শব্দ শুনতে পেলাম? রাজ্যের ক্রমবর্ধমান সমস্যা সম্পর্কে কি তাঁর মুখ থেকে আমরা একটি শব্দ ও উচ্চারিত হতে শুনলাম? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ওঠা সারদা, নারদা, টেট , মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন, স্কুল সার্ভিস কমিশন ইত্যাদি ঘিরে ওঠা পর্বতপ্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ, যে অভিযোগগুলির সমাধানের কার্যত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অনেকদিন আগেই, সে সম্পর্কে কি একটি শব্দ ও তিনি খরচ করলেন? প্রশ্নটি হল এই যে, এইসব সমস্যাগুলি কি আদৌ মিটে গেছে? নারদার অভিযুক্তেরা আইনমাফিক শাস্তি পেয়েছেন? সারদা তে যেসব সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়েছিলেন, সেইসব সাধারণ মানুষ তাঁদের গচ্ছিত অর্থ ফেরত পেয়ে গেছেন? কুনাল ঘোষের মতো তৃণমূল সাংসদ কে ঘিরে পর্বতপ্রমাণ অভিযোগ।সেই কুনাল ঘোষ জেলে থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই কেলেঙ্কারীতে সরাসরি সংযুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন।কুনালের সঙ্গে মান অভিমানের পালা ঘুচিয়ে তাঁকে তৃণমূল আবার ' ঘরওয়াপসি' করে নিয়েছে।এই কুনাল সম্পর্কে কেন একটি শব্দ উচ্চারণ করেন না এখন অমিত শাহ বা তাঁর সহকর্মীরা? কুনাল কি মমতা আর অমিত শাহের ভিতরে কোনো গোপন সমঝোতা সূত্র?               

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিজের রাজনীতির কথা বলবেন- এতে কোনো নোতুনত্ব নেই। আপত্তির ও কারন থাকতে পারে না।কিন্তুষরাজনীতির নাম করে যদি বিভাজনের কথাই প্রচার করা হয়, সাম্প্রদায়িকতার প্রচার করা হয়, জাতিবিদ্বেষকে চাগিয়ে দেওয়া হয়-- স্বাভাবিক ভাবেই আপত্তি উঠবে।অমিত শাহ রাঢ়বঙ্গ সফর কালে অভিযোগ করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে জাতিবৈষম্য বেড়েছে।এই প্রসঙ্গে তিনি কিছু পিছিয়ে পড়া জাতির কথা উল্লেখ করে , মমতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণের নাম করে ভয়ঙ্কর জাতি বিদ্বেষের কথা বলে এই রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে রাজনৈতিক পরিবেশ কে বিকৃত উত্তপ্ততার ভিতরে ঠেলে দিতে চেয়েছেন। জাতিবিদ্বেষ আর ধর্মীয় প্রতিযোগিতাকে ই যে মমতা ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের একমাত্র উপায় করে মেলে ধরেছেন, আর সেই উপায়কে অবলম্বন করেই যে বিজেপির মূল মস্তিষ্ক আর এস এস , গত প্রায় দশ বছর ধরে এই রাজ্যে নিজেদের হাজারো রকমের শাখা সংগঠনের বাড়বাড়ন্ত ঘটিয়ে চলেছে, যে বাড়বাড়ন্তের সুদেই আজ এই রাজ্যে বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য-- এইসব সম্পর্কে গত দশ বছরে কি অমিত শাহ বা তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থ কারো গলা থেকে একটি শব্দ শোনা গেছে?                 

অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনকে শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।ফলে আলু ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য খাদ্য সামগ্রীর উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই।আলু থেকে চাল , আনাজ - সব কিছুর দাম এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে খোলা বাজারে ফড়েদের মাধ্যমে।কোবিদ ১৯ জনিত পরিস্থিতিতে গত প্রায় আটমাস ধরে গোটা দেশের মতোই আমাদের রাজ্যে ও পাড়ার দোকানগুলিতে সাধারণ আনাজপত্রের দাম নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই ফড়েদের হাতে।আর এই ফড়েরাই হল, পাড়ায় পাড়ায় রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত ক্লাবগুলির মূল কর্মকর্তা।সেই কর্মকর্তারাই পাড়াতে এসে সরাসরি চাষী একদানা শষ্য পর্যন্ত বিক্রি করতে দিচ্ছে না। পাড়ার ক্লাব যে দোকানটির অনুমোদন করছে, চাষী একমাত্র সেই দোকানটিতেই তাঁর উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রি করতে পারবে, গত প্রায় আট মাস ধরে এই সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়েছে।অথচ এইসব রাজনৈতিক দুরাচার , যেগুলি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানা টা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার, তবু দুদিনের পশ্চিমবঙ্গ সফরে রাজ্য সরকারের এই সামাজিক ব্যভিচার সম্পর্কে অমিত শাহ একটি কথাও বললেন না।                         

দলিতদের উপর আচার আচরণে সহৃদয় নন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার , এই অভিযোগ করেছেন অমিত শাহ।বিজেপি নেতা অজয় সিং বিশোয়াত ওরফে স্বঘোষিত ' যোগী ' আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশের হাসরথের ঘটনাক্রমের স্মৃতি মানুষের মন থেকে এখনো আলগা হয়ে যায় নি।ধর্মান্ধতা আর জাতপাতভিত্তিক রাজনীতি করবার ক্ষেত্রে মমতা আর অমিত শাহ যে কোনো ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করেন না, সেটা আলাদা করে বলে বোঝানোর দরকার নেই। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের স্বার্থেই যে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তুপের উপর , তথাকথিত রামমন্দিরের শিলান্যাসের ক্ষেত্রে রাস্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, যিনি বিজেপির দলীয় কর্মী হিশেবে দীর্ঘদিন নিজের পরিচয় রেখেছেন,তিনি আমন্ত্রিত হন না।তাঁকে আমন্ত্রণ না জানানোর একমাত্র কারন, রাষ্ট্রপতি জন্মসূত্রে দলিত।তাই মমতার দলিত বিদ্বেষ কে কটাক্ষ করার আগে অমিত শাহের দরকার , তাঁর নিজের এবং দলের দলিত বিষয়ক অবস্থানগুলিকে পর্যালোচনা করা।             

দলিত প্রীতি দেখাতে গিয়ে , কোনো দলিত পরিবারের বাড়িতে লোকদেখানো মধ্যাহ্নভোজন সারলেই যে দলিত মানুষদের আর্থ- সামাজিক জীবনে এতোটুকু পরিবর্তন আসতে পারে না- এটা বোঝার মতো রাজনৈতিক বোধ নিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতিকরা কখনো রাজনীতি করেন না।মোদি- শাহ- মমতা, কেউ ই কখনো এই বোধ নিয়ে রাজনীতি করেন নি। ধর্ম আর জাতপাতকে রাজনীতির মূল বিষয়বস্তু হিশেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে পরিচালিত করবার লক্ষ্যে মোদি, অমিত শাহ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রত্যেকেই নিজেদের রাজনীতির গতিপ্রকৃতিকে পরিচালিত করেছেন।মোদি - শাহের এই রাজনৈতিক রীতিনীতির সঙ্গে তো মমতার এতোটুকু ফারাক নেই।ধর্মান্ধতাকে উগ্র করে তুলতে আর এস এস ,তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করছে।আবার এই আর আর এস এস ই নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি' সাম্প্রদায়িকতা' কে পরিপূর্ণতা দিতে মমতাকে ব্যবহার করছে, আর এক আঙ্গিকে।               ডঃ মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয়দফার ইউ পি এ সরকারের রেল মন্ত্রী হিশেবে মমতা তাঁর বাজেটে ঘোষণা করেছিলেন , কেবলমাত্র মুসলমানেদের জন্যে নার্সিং ট্রেনিং কলেজ। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সংবিধানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরির ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক কোনো সংরক্ষণের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।অথচ নিজেকে ছদ্মমুসলিমপ্রেমি হিশেবে উপস্থাপিত করতে স্পষ্টতঃ ই নাগপুরের রেশমবাগের কেশবভবনের নির্দেশে এই সংবিধান বহির্ভূত রেল প্রকল্পটির তিনি উদ্বোধনে শামিল করলেন নাখোদা মসজিদের ইমাম বরকতিকে।এই বরকতি কে হঠাৎ ই একদম আর এস এসের ফর্মুলা অনুযায়ী উপিধি দিয়ে দেওয়া হল, ' শাহী ইমাম' হিশেবে।বরকতির পিতা ছিলেন রেলের একজন সাধারণ টিকিট পরীক্ষক।আর এই ' শাহী' উপাধি প্রধানের হক একমাত্র'বাদশাহে' আছে।এখন কোথায় বাদশাহ? কোথায় সম্রাট? অথচ আর এস এসের প্রয়োজন, তারা এই বরকতির মাধ্যমে মুসলিম অস্মিতাকে এমন একটা জায়গাতে তুলবে, যার জেরে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা বল্গাহীন হয়ে উঠবে।আর সেই ছিদ্রপথেই বিজেপির শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে।

গৌতম রায়


শেয়ার করুন

উত্তর দিন