Samaresh-Basu

সময়- সাহিত্য- সমাজ - বোধ- চেতনাকে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দেওয়ার নামই সমরেশ বসু

সমরেশ বসু: বিশ শতকের কথক ঠাকুর


তখন ও জীবন সম্পর্কে একটা পরিপূর্ণ বোধ তৈরিরই বয়স হয় নি ঢাকার ছোট্ট ছেলেটার। আর দশটা ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের মতোই বেড়ে উঠছেন তিনি। রাজনীতির উত্তাপ ঢাকা শহরে থাকলেও , ভাঙাভাঙির ভাগাভাগির হরির লুঠের পর্ব শুরু হতে তখন ও অনেকটাই দেরি। বাড়ির পরিমন্ডলে মেজদার হিরোশিপের প্রতি ছোট্ট ছেলেটা আকর্ষণ বোধ করে। মেজদা প্রমথনাথ বসু তাই হয়তো মনের গোচরে- অগোরে সমরেশকে দোলা দিয়ে যেতেন। মেজদার প্রভাবের থেকেও ঢাকার মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুরের গ্রামীণ পরিবেশ সমরেশের মনে বাউল সত্তার উন্মীলনে হয়তো অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।

কিন্তু মেজদার কিশোর মানসিকতার ভিতরে যে একটা ডাকাবুকো ব্যাপার আছে, আজকের ভাষায় যাকে বলে ' দাদাগিরি' তারথেকে ছেলেটি শতহস্ত দূরে। মেজদার ' বীরত্বভাব' ঠিক পছন্দ ও নয়।মেজদার সঙ্গে কখনো সম্পর্কের খুব নিবিড়তা ছিল না সমরেশের।পরবর্তী জীবনেও সম্পর্কে সেই গভীরতা আসে নি।তবু ও গ্রহণের একটা অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল সমরেশের।সেই শিশু বয়সেই নিজের মননলোকের উদ্ভাসনে কোথায় যেন একটা মেজদার ক্ষীণ ছায়া কে পড়তে দিয়েছিলেন তিনি। তাই আবার মেজদাকে উপেক্ষাও করতে পারেন নি কিশোর শিশু সমরেশ।

এই দোলাচালের মধ্যেই বিন্যস্ত বোধের ভিতর দিয়ে ভাবনাটা মনে গেঁথে না গেলেও, 'জীবনটাকে একটা স্বপ্নের চোখে দেখা' র নেশা ছোট ছেলেটিকে ঢাকা শহর, গত শতকের দুইয়ের দশকের পুরাণ ঢাকা , কেমন যেন একটা স্বপ্নের কাজল পড়িয়ে দিল সেই কিশোরটির দীঘল চোখ জোড়ায়।যে চোখ আগামী অনেকগুলো দশক বাংলা- বাঙালির অসীম অখ্যানকে অতিক্রম করে বিশ্বমানবের ভিতর শাশ্বত বাঙালির অনুধ্যান শোনাবে।সেই স্বপ্নের চোখ অক্ষয় করে রাখবে ' সময়' কে। সেই ডিকেন্সখুড়োর দিকনির্দেশবাহী ' সময়' এর মহাকাব্য রচনার বিধিলিপি মহাকাল যাঁর ললাটরেখায় সযত্নে লিখে দিয়েছে।

সমরেশ বসু। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট। কিন্তু সাম্রাজ্যের দাবিতে মশগুল থেকে মানুষের সাথে মেকি সম্বন্ধ গড়ে তোলবার মানুষ কখনো সমরেশ ছিলেন না।বিশ শতকের বৃহত্তর ঢাকার গ্রামীণ পরিমন্ডল, নিজের গাঁ বা ভিন গাঁয়ে গানের আসর- সমরেশের ভিতর শিল্পী সত্তার উন্মেষে যেন ডাক দিয়ে যেত। ধর্ম ঘিরে কোনো বোধ তৈরির অনেক অনেক আগের বয়সেই নিজেদের পরিবারের ভিতরে শাক্ত রসাত্মক নানা গান, গানের আঙ্গিক, সুর, নিবেদন- শিশু সমরেশের মনকে উদাস করে দিতো।শাক্ত ভাবধারার পারিবারিক আঙ্গিকে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিকতার বদলে ভক্তিবাদী ধারা ই ছিল আধিপত্য।গত শতকের প্রথমভাগে ও সেই সময়ের পূর্ববঙ্গের হিন্দু সমাজের একাংশের ভিতরে শাক্ত ভাবধারায় যে বীরাচারী আঙ্গিকের প্রাবল্য ছিল, তেমন প্রাবল্যের রেশ মাত্র সমরেশের পরিবারে ছিল না।শান্ত স্নিগ্ধ ভক্তিরসের ভিতর দিয়ে সঙ্গীতের মাধুর্যে টইটম্বুর বাড়ির পরিবেশ, বাবার কন্ঠের ' মালসী ' গান, শিশু সমরেশ কে উদাস করে দিতো।ভাবলে আজ ও দুঃখ হয়, বাংলার লোকায়ত ধারা থেকে এই ' মালসী' গান এখন প্রায় অবসৃত।স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে লোক সংস্কৃতির ধারা সংরক্ষণে একটা যত্নবান প্রয়াস আছে। তবে দেশভাগ ইত্যাদির কারণে ' মালসী' গানের ধারা যাঁরা বহন করতেন, তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে চলে এসে আর সেই লোকায়ত ধারার চর্চায় খুব একটা মনোনিবেশ করতে পারেন নি জীবনযুদ্ধের তাগিদে। খ্যাতির শীর্ষে বিরাজ করতে থেকে ও সমরেশ খুব আক্ষেপ করতেন; ভক্তিরসের সাথে শ্রমসংস্কৃতির মিশ্রণে হিন্দু - মুসলমানের সম্প্রীতির ভাবে ভরপুর এই মালসি গান কেন তিনি নিজে ভালো করে শিখে রাখেন নি- সেই জন্যে।অসুস্থ শরীরেও বাবার কাছে সেই ছেলেবেলায় শোনা মালসি গানের সুরগুলো গুনগুন করতেন।যদিও কালের স্রোতে মালসী গানের কথা গুলো আর তাঁর স্মৃতিপটে তখন আঁকা ছিল না।

'বিবর' ,' প্রজাপতি'তে উচ্চবিত্তের প্রেক্ষাপট এঁকেও 'জগদ্দল' ,'গঙ্গা' ,'ছিন্নবাধা' ,'ভানুমতী'র লোকায়ত জীবন আবার 'দেখি নাই ফিরে'তে লোকজীবন আর রবীন্দ্র পরিমন্ডলের সন্মিলন রচনার সব্যসাচী লেখক সমরেশ বসুর মানসলোকের উদ্ভাসনে কিন্তু থেকেই গিয়েছিল জন্মভূমি ঢাকা। থেকে গিয়েছিল বাবা - কাকাদের ছবি আঁকবার সেই অসামান্য তুলির স্পর্শ, আর থেকে গিয়েছিল; দেখার চোখ। প্রকৃতি- মানুষ- বই, সবকিছুকেই দেখা আর পড়ার এক অদ্ভূত সন্মিলনে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন সমরেশ।

তাঁর পরিবার ধনী ছিল না। প্রথাগত শিক্ষার ও খুব একটা চল ছিল না ঢাকায় বসবাসের সময়কালে। কিন্তু শিল্পচর্চায় একটা অসামান্য বোধ নিয়ে চলতেন বাড়ির প্রায় সকলেই। লোকায়ত ধারার গানের চর্চার পাশাপাশি কেবল কাকার ছবি আঁকাই নয়, সমরেশের বাবার লোকচিত্রকলায় ছিল দারুণ দক্ষতা। গৃহসজ্জা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে মাঙ্গলিক চিন্তার পাশাপাশি শৈল্পিক সুষমায় উৎসবটিকে মুখরিত করে তোলবার ক্ষেত্রে সব দায় দায়িত্ব যেন সমরেশের বাবা নিজের হাতেই তুলে নিতেন।
হিন্দুদের বিয়েতে পিঁড়ি সাজানো ছিল এককালে একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আজকের প্রজন্ম ভাড়াকরা বিয়ে বাড়িতে স্থায়ী ভাবে রেখে দেওয়া পিঁড়ির কথাই জানে। সমরেশ যখন এই বিয়ের পিঁড়ি আঁকায় তাঁর বাবার অসামান্য দক্ষতার কথা বলেছিলেন, তখন ও বাড়িতে পিঁড়ি চিত্রিত করার রেওয়াজ প্রায় উঠে গেলেও কিছু পেশাদার মানুষ ছিলেন, যাঁরা এই কাজটি করতেন। তাঁদের কিন্তু কোনো আর্ট কলেজের প্রথাগত শিক্ষা ছিল না। সার্টিফিকেট তো নয়ই। তেমনই এক লোকশিল্পী ছিলেন সমরেশের পিতা। কোনো প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই সমরেশের যে অসামান্য ছবি আঁকার দক্ষতা ছিল, তা তাঁর পিতার কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার- একথা জোর দিয়েই বলা যায়।

শিশুকাল থেকে জীবনের শেষপর্ব পর্যন্ত সমরেশ বসু ছিলেন একজন অক্লান্ত পাঠক। একাংশের লেখকদের ভিতরে যখন অন্যের লেখা পড়বার অভ্যাস প্রায় উঠেই গিয়েছে, তখন ভাবতে আমাদের বেশ অবাকই লাগে, সমরেশের শৈশবকাল, ঢাকার জীবনে পড়ার বইয়ের বাইরে পড়াটাই ছিল জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তখন তাঁর বয়স কতো? বড়োজোর বারো, কারণ; ১৯৩৭-৩৮ সাল, যখন তাঁর বয়স মাত্র বারো - তেরো, তখনই বাউন্ডুলে ছেলেকে একটু নাগরিক কেতায় পড়াশুনো শিখিয়ে ঘরমুখো করবার জন্যে তো পরিবারের মানুষেরা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নৈহাটিতে। সেখানে তখন তাঁর বড়দা থাকতেন।
ঢাকাতে থাকতেই প্রথাগত পড়াশুনায় তেমন মন ছিল না সমরেশের ।প্রথাগত পড়াশুনায় তেমন মন নেই তাঁর মেজদার ও।তবে অঙ্কে মেজদার দারুণ আগ্রহ। ইস্কুলের পরীক্ষায় আর কোনো সাবজেক্টে তিনি ভালো নম্বর পান বা না পান, অঙ্কে কিন্তু বেশ ভালো নম্বরই পেতেন। এজন্যে বাড়িতে গুরুজনদের কাছে শিশু সমরেশকে বেশ গঞ্জনাও সইতে হতো। অনেকেই বলতেন; সমরেশের থেকে তাঁর মেজদাই ভালো লেখাপড়া শিখবেন। সমরেশের আর লেখাপড়া হবে না।
                 

এইসব কথায় শিশু সমরেশের সাময়িক মন খারাপ হতো বই কী। তবে সেই মন খারাপকে কখনোই তিনি মনের ভিতরে পুষে রাখতেন না। মেজদার সঙ্গে পরবর্তী জীবনে চিন্তা জগতের উদভাসনে সমরেশ বসুর খুব একটা সাদৃশ্য না থাকলেও সেই ঢাকার যাপনকালে মেজদার স্কুল পালানো টা সমরেশের ভিতরে জীবন বাউলের অবিকল্প ছবি তৈরিতে একটা প্রভাব নিশ্চয়ই ফেলেছিল। মেজদা স্কুল পালিয়ে দল বেঁধে ঘোরা, খেলাধুলো, মারামারি - এইসবে ব্যস্ত ছিলেন। ডানপিটেপনার এইসব তদাকথিত ধারা উপধারার পাশ দিয়ে কখনো চলাফেরা করতেন না সমরেশ। স্কুল পালিয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে বসে থেকে ঢেউয়ের পর ঢেউ, তরঙ্গ আর নিস্তরঙ্গের মাঝে সেই বয়সের বোধেই জীবন কে দেখতে চাইতেন।বুঝতে চাইতেন সমরেশ। পরবর্তী সময়ে 'গঙ্গা' ( রচনাকাল ১৯৫৭) র রচনাকালে ভাটপাড়ার মুক্তারপুর খাল থেকে চিৎপুরের লকগেট হয়ে ধলতিতা গ্রাম, মাছমারা জীবন , 'ধলতিতের পঁচানন মালো মারা পল হে - এ - এ -এ'  এর চিত্রকল্প নির্মাণ, কোথায় যেন থেকে গিয়েছিল, মুন্সিগঞ্জে সেই কিশোরবেলায় ইস্কুল পালিয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে বসে বসে মনটাকে জলের তোড়ে ভাসিয়ে দেওয়ার নির্মাণ - বিনির্মাণের বিনিসুতোয় গাঁথা কামিনীফুলের মালা।

ঢাকার যাপনচিত্রেই গৃহশিক্ষক একদিন সমরেশের কাছে জানতে চাইলেন, তাঁর কি পড়তে ভালো লাগে।অকপটে জবাব দিলেন সমরেশ; রবীন্দ্রনাথ।তখন ও কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কে বোঝার মতো বয়সে তিনি পৌঁছান নি। তা বলে পাঠক কিন্তু ভাববেন না, আট - দশ বছরের ছেলেটি তাঁর প্রাইভেট টিউটরের কাছে গ্যাঁজাখুড়ি দিয়ে বিজ্ঞ সাজতে চেয়েছিল।সে বুঝুক আর নাই বুঝুক , ওইটুকুনি বয়সেই কিন্তু সত্যি সত্যিই রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়া শেষ করে ফেলেছিল। আর কেবল পড়াই নয়।রবীন্দ্রনাথের ' অনধিকার প্রবেশ' পড়ে মনের ভিতরে ওঠা গভীর হিল্লোল কে কাগজকলমে জড়ো করে কাঁচা হাতে হলেও লিখে ফেলেছিল ,' অনধিকার প্রবেশ' নামেই একটা গল্প। রবীন্দ্রনাথকে ছেলেমানুষি আঙ্গিকে ই সম্ভবত জীবনের প্রথম গল্পের প্লট সমরেশ সাজালেও সেই গল্পটির সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল , হিংসার বিরুদ্ধে ধ্বনিত সুতীব্র প্রতিবাদ।এই প্রতিবাদী সত্তাটাই জীবনপথিক সমরেশ বসু এবং তাঁর সৃষ্টির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেই প্রতিবাদ উচ্চারণের ক্ষেত্রে সমরেশ কে কিন্তু কখনোই নিছক প্রচারবাদী প্রোপাগান্ডিস হতে আমরা একটি বারের জন্যেও দেখি না। কিন্তু ' বিবর' , 'প্রজাপতি', 'পাতকে' র মতো তাঁর বহু আলোচিত সৃষ্টিতেও যেন আমরা খুঁজে পাই ,'তুম্বো মুখো'র প্রতি একটা প্রতিবাদ। এই 'তুম্বো মুখো' চরিত্র - শব্দবন্ধ সমরেশের সৃষ্টিতে যেন একটা প্রতিবাদের প্রতিকল্প হিসেবেই বার বার ফুটে উঠেছে। তাই রবীন্দ্রনাথের গল্পের শূকরকে কচ্ছপ হিসেবে দেখিয়েও শুচিবায়ুগ্রস্থা বিধবা রমণীর মন্দিরের কাছে মাধবীকুঞ্জে প্রাণের আকুতিই মেলে ধরেছিলেন সমরেশ। শিশুচিত্তে 'হত্যা', 'রক্ত' কিন্তু ফুটে ওঠে নি। ফুটে উঠেছিল; জীবন - জীবন , অনন্ত জীবন, মৃত্যুর থেকেও বড়ো জীবনের কথা।

প্রথাগত পড়াশুনায় ছেলেকে দক্ষ করে তোলবার তাগিদেই যখন ১৯৩৭-৩৮ সাল নাগাদ নৈহাটিতে এসে সমরেশ ভর্তি হলেন রেল স্টেশন লাগোয়া মহেন্দ্র হাই স্কুলে তখন ইস্কুল থেকে ঢাকা মেলের ভোঁ শুনে তাঁর মন চলে যেত সেই মুন্সিগঞ্জে ।নিজের অলক্ষ্যেই যেন নিজে ঘুরে বেড়াতেন বুড়িগঙ্গার তীর ধরে। এই নৈহাটি রেল স্টেশন লাগোয়া অঞ্চল, যেটি পরবর্তীতে সমরেশের সৃষ্টির ভুবনে ভজুলাটের খাসতালুক হয়ে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবে, সমরেশের যৌবনের উপবন,' বসন্ত কেবিন', যার ভিতরেই সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে,'শ্রীমতী কাফে', রয়েছে ইস্কুল লাগোয়াই অরবিন্দ রোডে ঢোকার মুখের সেই মহা বটগাছ। সেই বটগাছ যেন  'মহা নিমগাছে' র মতোই অমিয় চক্রবর্তী আর জীবনানন্দের সঙ্গতি আর অসঙ্গতির দ্বৈরথের মতোই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সেই গাছ আর গাছ লাগোয়া বাজার ঘিরে এক মহাসংগ্রামের আভাস দিচ্ছে। নিজের যাপনচিত্রে বাঁধা কে অতিক্রম করতে সমরেশের প্রতিরোধের কেবল সংকল্পই নয়, তার বাস্তবায়ন ঘটানো - তার বীজ হয়তো নৈহাটি মহেন্দ্র স্কুলের অমনোযোগী ছাত্র সমরেশের সেই সময়েই ইস্কুলে হাতে লেখা পত্রিকা দেখে, নিজেরই তেমন একটা পত্রিকা প্রচাশের ইচ্ছে, আর সেই ইচ্ছের বাস্তবায়নের ভিতর দিয়ে বাংলা সাহিত্যেরই একটা বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণকালের আগমণবার্তা ঘোষণা করছিল। এই সময়কালেই তাঁর বড়দার রেলওয়ে ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরির কার্ড নিয়ে বাংলা সাহিত্যকে গুলে খেতে থাকেন  সমরেশ।

পরবর্তীতে আটের দশকের মধ্যবর্তী একটা সময়ে অন্নদাশঙ্করের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সমরেশ তাঁকে বলেছিলেন; আমার যখন তের কি চোদ্দ বছর বয়স, তখনই আপনার লেখার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। প্রথম নৈহাটি এসে অন্নদাশঙ্করের সাহিত্যকর্মের সাথে এই পরিচয়পর্বের কথা পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনে বসে লীলা রায়কে ও স্বাভাবসুলভ ভঙ্গিমায় বলেছিলেন সমরেশ। ধ্রুপদিয়ানার অভিমুখ বজায় রেখে সৃষ্টিকে ইতিহাসবোধের জাড়কে জাড়িত করে সব ধরণের পাঠকের কাছে তুলে ধরবার শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্নদাশঙ্করের 'পথে প্রবাসে' সেই প্রথম কৈশোরকাল থেকেই তাঁকে কতোটা আন্দোলিত করতো সে বিষয়ে সমরেশ চিরদিনই খুব সোচ্চার ছিলেন। আর প্রথম নৈহাটি বাসকালে রেলওয়ে ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরী  থেকে বই এনে পড়তে পড়তে গুরুজনদের হাতে ধরা পড়ে গিয়ে কেমন পিটুনি খেতে হয়েছিল- সেই গল্পও খুব রসিয়ে রসিয়ে বলতেন সমরেশ।
এক বছরও পুরো নৈহাটির মহেন্দ্র হাই স্কুলে পড়েন নি সমরেশ। প্রথাগত পড়াশুনায় অবাধ্যতা দেখে বাবা তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যান আবার ঢাকায়। চোদ্দ - পনের বছরের সমরেশ স্কুলে আর যান নি। ট্রেনি হিসেবে ঢুকলেন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে। স্পিনিং না উইভিং ডিপার্টমেন্টে ট্রেনি হিসেবে ঢুকেছিলেন, শেষ জীবনে সেটা আর তাঁর খুব একটা মনে ছিল না। আসলে এই কটন মিলে কাজ শেখার জন্যে ঢুকেও যে সমরেশের ভিতরের 'তারাপদ' সমরেশকে কেবলই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত।
                       

রবীন্দ্রনাথের 'অতিথি'র 'তারাপদে' র যেমন সুন্দরের প্রতি একটা অদম্য আকর্ষণ ছিল, তেমনটাই ছিল সমরেশেরও। আর সুন্দরের আকর্ষণে জাত- কুল- মান , কোনো কিছুকেই এতোটুকু তোয়াক্কা করতেন না তিনি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সমরেশ। নৈহাটি থেকে আবার ঢাকায় ফিরে এসে ঢাকেশ্বরী কটন মিলে শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করবার আগেই  দেখে ছিলেন, তাঁদের বাড়ির সামনে দিয়ে ভারি সুন্দর দেখতে একটা ছেলে রোজ ইস্কুলে যায়।ছেলেটার ডাক নাম' সেন্টু'। সমরেশদের বাড়ি থেকে বেশ অনেকটা দূরে একটা ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুলে পড়ে সেন্টু। স্বভাবত ই একটু উন্নাসিক। শিশু সমরেশ চায় সেন্টুর সাথে মিশতে। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, একটু বড়লোক বাড়ির ছেলে সেন্টু পাত্তাই দেয় না সমরেশকে।

নৈহাটি বাসের স্বল্পকালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসে সমরেশ শুনলেন সেই সেন্টু দারুণ অসুস্থ। সেন্টুর কুষ্ঠ হয়েছে।সমরেশ তখন ঢাকেশ্বরী কটন মিলের শিশু শ্রমিক।সেই সময়কাল টাতে সাধারণ মানুষদের ভিতরে কুষ্ঠ রোগ ঘিরে অনেক ভুল ধারণা ছিল।সেই সব ধারণার বিজ্ঞানসম্মত আদৌ কোনো ভিত্তি ছিল না। কুষ্ঠ রোড ঘিরে সেই সময়ের অবৈজ্ঞানিক ধারণা র ভিতরেই অসুস্থ সেন্টুর কাছে যাওয়ার জন্যে মন টানতো সমরেশের।

ঢাকেশ্বরী কটন মিলে যারা ট্রেনি ছিল , তাদের সকলেরই রাত দশটার ভিতরে ছুটি হয়ে যেত।সমরেশ কারখানাতে না গিয়ে, যেতেন অসুস্থ সেন্টুর কাছে। সেন্টুকে তখন তার বাড়িতে একদম আলাদা করে রাখা হয়েছে। হাতের আঙুল খসে পড়ছে সেন্টুর। মুখের চামড়া কুচকে যাচ্ছে- তবু কিন্তু বন্ধুর প্রতি ভালোলাগা থেকে কখনো নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন নি সমরেশ।বাড়িতে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিয়মিত গিয়েছেন সেন্টুর কাছে। ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধুর সাথে গল্প করেছেন।কেন অসুস্থ সেন্টুকে এভাবে তার বাবা- মা নির্বাসনে রেখেছেন, তা ভেবে ভেবে সেন্টুর বাবা, মায়ের উপর রাগ করেছেন। অভিমান করেছেন সমরেশ। তবু যাকে একদিন ভালোবেসেছিলেন, সেই সেন্টুর সঙ্গে বন্ধুত্বে ইতি টানেন নি কখনো।
                     

বাম রাজনীতির সঙ্কীর্ণতাবাদী ধারাকে দুহাত তুলে সমর্থন বা সেই ধারার চর্বিতচর্বণে সাহিত্য সৃষ্টি করে হিরো সাজার অভিনয় সমরেশ বসু কখনো করেন নি।কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত ঘিরে সমরেশের ' শহীদের মা' এর মতো গল্প ও বাংলা সাহিত্যে খুব কম রচিত হয়েছে। যাঁরা মহাশ্বেতা দেবী বা শৈবাল মিত্রের এই সঙ্কীর্ণতাবাদী আন্দোলন ঘিরে লেখাগুলিকে নিয়ে একটু বেশি মাতামাতি করেন, কেন যেন মনে হয় , ওইসব মাতামাতির কারবারিরা সমরেশের ' শহীদের মা' আদৌ পড়েনই নি। বাবা হরপ্রসাদ আর তাঁর তিন ছেলে কৃপাল, দয়াল, বাদল-- চারজন চারটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত।

ভিন্ন ভিন্ন দল করলেও মানসিকতায় বাদল একটু আলাদা রকমের। স্বভাব শান্ত বাদলের মায়ের উপরে একটা বিশেষ রকমের টান।সময়ের রাজনীতির উগ্রতা বাদলের নেই।মা বিমলা ছাড়া বাড়ির অন্য চারজন সদস্য ই যার যার নিজের পার্টি নিয়েই সদা ব্যস্ত। সেই ব্যস্ততার পরিণতি বিবাদ- বিসংবাদ থেকে শুরু করে কাদা ছোড়াছুড়ির পর্যায় পর্যন্ত ও পৌঁছায় কছনো সখনো। বিমলা কিন্তু ভাবে নি মাতৃভক্ত বাদল রাজনীতির খাতায় নাম লেখাবে। সেই বাদল নিজের পছন্দ মতো দলে ঢোকে। পরিণতিতে খুন হয়, তার দলের ভাষায়, 'শহিদ' ।

বাদল খুন হওয়ার দুদিনের মাথাতেই তার দল তৈরি করে শহিদ বেদি। বাদলের মা বিমলাকে ঘিরে শ্লোগান দেয়,' কমরেড বাদল জিন্দাবাদ। খুন কা বদলা খুন...।' কেমন যেন ঘোরের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকে বাদলের গর্ভধারিণী বিমলা। হরপ্রসাদ, বিমলার স্বামী, বাদলের বাবা বলে;" এখনকার এসব পার্টি খুনখারাপি ছাড়া কিছু জানে না। কিন্তু যার গেল, তার গেল। কেউ দেখতে আসবে না। বাদলকে তো আর ফিরে পাব না।"

তবু বাদলের মৃত্যুর দিন উনিশে শ্রাবণ, নিজের শরীরের ভিতরে হারানো সন্তানের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করতে পারেন বিমলা।বাদলের জন্মের কালের গর্ভ যন্ত্রণা যেন নতুন করে অস্থির করে তোলে বিমলাকে। বিমলা ছুটে যান ছেলের শহিদ বেদির কাছে। শহিদ বাদল আর তার গর্ভধারিণী মিলে মিশে একাকার হয়ে যান।

সময়- সাহিত্য- সমাজ - বোধ- চেতনাকে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দেওয়ার নামই সমরেশ বসু।

বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট।

Gautam-Roy

গৌতম রায়

মতামত লেখকের নিজস্ব


শেয়ার করুন

উত্তর দিন