রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণকে লক্ষ্য করে আক্রমন কোন উদ্দেশ্যে?

রবীন্দ্রনাথ, শ্রীরামকৃষ্ণকে ঘিরে দিলীপ ঘোষের বিষোদগারের রাজনৈতিক তাৎপর্য

Gautam-Roy

গৌতম রায়

ভারতের প্রবাহমান সমন্বয়ী , বহুত্ববাদী ধারার বিপরীত মেরুতে নিজেদের মতাদর্শকে স্থাপন করেই আর এস এস যাত্রা শুরু করেছিল বিগত ১৯২৫ সালে। একশো বছর প্রায় অতিক্রান্ত। প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদযাপনে এখন থেকেই নানা কৌশল এবং পরিকল্পনা গোটা সঙ্ঘ পরিবার এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি নিতে শুরু করে দিয়েছে। '২৪ সালের লোকসভা ভোটের প্রচারেও আর এস এসের শতবর্ষ পূর্তির বিষয়টি যাতে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে বিজেপিকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা দরকার- এই হুজুগটা হিন্দি বলয়ে এর ভিতরেই সঙ্ঘ পরিবার জোরদার ভাবে তুলতে শুরু করে দিয়েছে।

গত একশো বছর ধরেই আর এস এস ভারতের বহুত্ববাদী চেতনাকে ধ্বংসে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। সমন্বয়ী ধারার মূল উচ্ছেদে সবথেকে বেশি সক্রিয় থেকেছে। জন্মসূত্রে হিন্দু , অথচ ভারতের চিরাচরিত বহুত্ববাদী ধারায় বিশ্বাসী, এমন কোনো মানুষ, এমন কোনো মতাদর্শকেই জন্মলগ্ন থেকে আক্রমণ করে গিয়েছে সঙ্ঘ। কবীর, নানক, তুকারাম, দাদূ র মতো মধ্যকালীন ভারতের সমন্বয়ী ধারার চিন্তার অগ্রবর্তী পথিকদের সম্পর্কে কখনো এতোটুকু শ্রদ্ধাপূর্ণ মানসিকতার পরিচয় রাখে নি তারা। শ্রীচৈতন্যদেব থেকে শুরু করে শ্রীরামকৃষ্ণ, যাঁরা সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় বিভাজন, জাতপাতের উর্ধে উঠে মানবপ্রেমের কথা বলেছিলেন, প্রকাশ্যে তাঁদের ঘিরে খুব একটা অনীহা না দেখালেও সাংগঠিক স্তরের যাবতীয় প্রশিক্ষণ শিবিরেই সমন্বয়ী সাধকদের সম্পর্কে সঙ্ঘকর্মীদের কাছে তারা বিকৃত বার্তাই দিয়ে গেছে। স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বের কথাগুলিকে প্রাসঙ্গিকতা শূন্য ভাবে উদ্ধৃত করে দেখাবার চেষ্টা করেছে, বহুত্ববাদী চিন্তা বিরোধী যে রাজনৈতিক হিন্দু ধর্মের কথা বলে, যার সঙ্গে প্রবাহমান সনাতন ধর্মের এতোটুকু সাদৃশ্য নেই, সেই হিন্দুত্বেরই প্রতিভূ হলেন বিবেকানন্দ।

এই মানসিকতা সংগঠনের ভিতরে এতোকাল পোষণ করলেও প্রকাশ্যে এসব নিয়ে সঙ্ঘ নেতৃত্ব আগে কখনো সরব হয় নি। কিন্তু অতি সম্প্রতি বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষাগত যোগ্যতা ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথকেও অত্যন্ত অশালীন ভাবে আক্রমণ করেছেন। এই আক্রমণের পর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গিয়েছে। আর এস এস বা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির পক্ষ থেকে দিলীপ ঘোষের এই রুচিহীন, অনৈতিহাসিক বক্তব্যের এতোটুকু বিরোধিতা করা হয় নি। প্রতিবাদ কিংবা দিলীপ ঘোষকে ভৎসনা তো দূরের কথা, সতর্ক পর্যন্ত করা হয় নি। বিজেপি নেতা বা প্রথমে বিধায়ক, পরে সাংসদ হিশেবে দিলীপ ঘোষের যাই পরিচয় তৈরি হয়ে থাকুক না কেন, তিনি কিন্তু একজন আত্মনিবেদিত সঙ্ঘকর্মী। নিবিড় সঙ্ঘ কর্মী হওয়ার কারণেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যে সময়কালটাতে বিজেপির ভোট রাজনীতিতে সম্ভাবনা ঘিরে সঙ্ঘ খুবই আশাবাদী ছিল, ঠিক সেই সময়কালটাতেই কিন্তু দিলীপ ঘোষকে তারা দলের প্রাদেশিক শাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দিলীপ ঘোষ সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা ভোটের(২০২১) প্রচার পর্বে যে ধরণের অসংসদীয় কথাবার্তা বলেছেন, লিঙ্গাত্মক আক্রমণ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি- এইসব কিছু ও সঙ্ঘের অঙ্গুলি হেলনেই হয়েছিল। কারণ, গত বিধানসভার ভোটে সঙ্ঘ তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি চাইলেও, বিপদের অদৃশ্য বন্ধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই যে ক্ষমতায় ফিরে আসুন, সেটাই চেয়েছিল। কারণ, ভুলে গেলে চলবে না, দিলীপ ঘোষের ওই ধরণের লিঙ্গবাদী, অশালীন আক্রমণের পরেও তাঁকে কোনো ভাবেই তিরস্কার করে নি সঙ্ঘ বা বিজেপি।

দিলীপ ঘোষের বিধানসভা ভোটের আগে ওই মন্তব্যগুলি তৃণমূল কংগ্রেস বা তাদের নেত্রীর প্রতি সহানুভূতিকে সংহত করতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। আর এস এসের একদম ঘরের লোক দিলীপ ঘোষ, সঙ্ঘের নির্দেশের বাইরে গিয়ে সেই কাজগুলি করেছিলেন, দিলীপের এবং তার পরামর্শদাতাদের রাজনৈতিক মাত্রা সম্পর্কে এতো তরল ধারণা করবার কোনো বাস্তবতা নেই। অনেকেই হয়তো বলতে পারেন, এইসব মন্তব্যের জেরেই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব দিলীপ ঘোষ কে দলের প্রাদেশিক সভাপতির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।

এই ধারণার বাস্তবতা থাকলে কিন্তু দিলীপ ঘোষের ওই মন্তব্যের বিরুদ্ধে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বা আর এস এসের শীর্ষ নেতৃত্বের কারো না কারো, কোনো না কোনো কথা শোনা যেত। তেমন কিছু কিন্তু আদৌ শোনা যায় নি। কারণ, সঙ্ঘের সঙ্গে একটু দূরত্ব তৈরি হওয়া প্রধানমন্ত্রী মোদিকে একটু শিক্ষা দিতেই হোক বা বিজেপির জায়গায় মতাদর্শের দিকথেকে বিভাজনের রাজনীতিতে মানসিক ভাবে বিশ্বাসী মমতা ক্ষমতায় থাকলেই গোটা পূর্বাঞ্চলে সঙ্ঘের মতাদর্শগত প্রচার এবং কাজের সুবিধা হবে- সেই সমীকরণ থেকেই হোক বা আগামী ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই রাজ্য থেকে বিজেপিকে অনেকটাই ওয়াকওভার দেবেন মমতা- সেই বোঝাপড়ার তাগিদ থেকেই হোক, মমতা ক্ষমতাচ্যুত হন - এটা সঙ্ঘের শীর্ষ নেতৃত্ব চায় নি। আর মমতাও বিজেপির বিরুদ্ধে মেজাজ হারিয়ে অনেক সময়েই অনেক অসংসদীয়, অরাজনৈতিক কথা বলেছেন। কিন্তু একটি বারের জন্যেও কোনো কটুকথা আর এস এসের উদ্দেশে বলেন নি। নিজেদের অরাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন বলে দাবি করা আর এস এসের শীর্ষ নেতৃত্বও কিন্তু ভোটে জেতার পর মমতাকে অভিনন্দন জানাতে ভোলেন নি।

তাই দিলীপ ঘোষকে পদচ্যুত করে সাংসদ সুকান্ত মজুমদারকে প্রাদেশিক সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার পিছনে আর এস এস - বিজেপি সহ গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের আরো অনেক বড়ো অঙ্ক কাজ করছে। আর সেই অঙ্কের ছকেই শ্রীরামকৃষ্ণ থেকে রবীন্দ্রনাথ, এঁদের সম্পর্কে দিলীপ ঘোষের এই স্পর্ধোক্তি। বিষয়টা অনেকটা সেই বাজপেয়ী জামানার বাজপেয়ী আর আডবাণীর ভিতরে মুখ আর মুখোশের খেলার মতো আর কী!

আর এস এসের এখনকার লক্ষ্য হল, সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের নগ্ন প্রয়োগের মাধ্যমে ভারতের বহুত্ববাদী চেতনায় আঘাত করা। সেই আঘাতের ভিতর দিয়েই তারা রাজনৈতিক হিন্দুত্বে বিশ্বাস করে এমন লোকেদের বাদ দিয়ে বাকি সব নাগরিকদেরই কার্যত নাগরিকতা কেড়ে নিতে চায়। সেই উদ্দেশেই এন আর সি, সি এ এ ইত্যাদি আইন। সেই উদ্দেশেই আসামে তৈরি হয়েছে ডিটেনশন ক্যাম্প। বিদেশি নাগরিক- এই দোহাই দিয়ে মুসলমান সহ বহুত্ববাদী চেতনায় বিশ্বাসী বৈধ ভারতীয়দের ও সেই ক্যাম্পে ভরছে আসামের বিজেপি সরকার।

আর এস এসের তাত্ত্বিক ভিত্তির মূলে রয়েছে এই চেতনা; "বর্তমানে মানুষ  Anarchism - withering away of the state  ইত্যাদির স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এজন্য আধারস্বরূপ ধর্মের আদর্শ না জানার জন্য ঐ অবস্থা কিভাবে সৃষ্টি হবে? এবং কী ধরণের ব্যক্তি সমাজরূপে অবস্থান করবে? সমাধানরূপে এ সবের উত্তর ঐ ব্যক্তিদের কাছে নেই। ঐ অবস্থার যথার্থ বর্ণনা এবং তা লাভ করার পন্থা কেবলমাত্র হিন্দুসংস্কৃতিই সম্পূর্ণ সমাধানকারক রীতিতে বর্ণনা করেছে।" ( ১৯৫০ সালের জানুয়ারী মাসে কল্যাণ হিন্দু সংস্কৃতি নামক একটি পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় এম এস গোলওয়ালকরের লেখা। এই লেখাটি গোলওয়ালকরের রচনাবলীর ষষ্ঠ খন্ডে সংযোজিত হয়েছে। পৃষ্ঠা - ৬)।

মনে রাখা দরকার,'ধর্মের আদর্শ',' হিন্দু সংস্কৃতি' ইত্যাদি শব্দাবলীর ভিতর দিয়ে যে বহুত্ববাদী ভারতকে আক্রমণ করেছেন গোলওয়ালকর, শ্রীরামকৃষ্ণকে মুর্খ, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে রুচিহীন মন্তব্যের ভিতর দিয়ে সেই ধারাতেই বহুত্ববাদী চেতনার মূলে আঘাত করে সমন্বয়ী ভারতকে রাজনৈতিক হিন্দু ভারতে পরিণত করবার লক্ষ্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের ষড়যন্ত্রেরই একটা পূর্বাভাস দিলীপ ঘোষ দিয়েছেন। কারণ, বহুত্ববাদকে যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক আধ্যাত্মচেতনাতে ভক্তিরসের ধারাতে উপস্থাপিত করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, সেটা তো কখনোই সর্বাত্মক বিভাজনের মানসিকতায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

দেশমাতৃকার অভিষেকে জাতি- ধর্ম- বর্ণ- লিঙ্গ- ভাষা নির্বিশেষে মানুষকে আহ্বান করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার তীব্র বিরোধী হয়েও দুয়ার খোলা পশ্চিমের জ্ঞানবিজ্ঞানের উপহার ঘিরে পরম শ্রদ্ধাশীল ছিলেন কবি। আর্য- অনার্য - দ্রাবিড় - হিন্দু- মুসলমানের সন্মিলিত অভিষেকে দেশমাতৃকার সেজে ওঠার যে রণতুর্য রবীন্দ্রনাথ বাজিয়েছিলেন- সেটিও তো মতাদর্শগত বিচারে আর এস এস - বিজেপির কাছে কখনো ই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই না হতে পারার নিদর্শন রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে, কবির স্বপ্নের বিশ্বভারতীতে প্রতি পলে পলে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিযুক্ত উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী দিয়ে চলেছেন। দিলীপ ঘোষ খানিকটা যেন নগ্নভাবেই বিদ্যুৎ চক্রবরূতীর কথা, কর্মকান্ডের আভাস দিয়ে ফেললেন রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে!

Rabindranath-Tagore-ili-153-img-4

গোলওয়ালকরের যে লেখাটি উদ্ধৃত করা হলো, সেই লেখাটিতেই তিনি বলেছেন;" রাজসত্তা ব্যতীত সমাজকে রক্ষা করা যাবে না"। আর সেই সমাজকে রক্ষা করবার জন্যে রাজসত্তার প্রয়োজনীয়তার কথাও নাকি তথাকথিত হিন্দু সংস্কৃতি স্বীকার করে নিয়েছে বলে সেখানে গোলওয়ালকর মন্তব্য করেছিলেন (ঐ)। আর এস এস বেকায়দায় পড়লেই নিজেদের অরাজনৈতিক , সামাজিক সংগঠন বলে দাবি করে। গান্ধীজীকে হত্যার দায় থেকে বাঁচবার জন্যে মতাদর্শগত বন্ধু সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের কাছে বার বার নিজেদের অরাজনৈতিক , সামাজিক সংগঠন , যাদের ধর্মকর্ম নিয়েই বেশি মাথাব্যথা- এমনটাই বার বার দাবি করেছিলেন গোলওয়ালকর। অথচ সেই গোলওয়ালকরই গান্ধী হত্যার পর আর এস এসের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর সঙ্ঘ পরিবারের শাখা সংগঠনের পত্রিকা থেকে সঙ্ঘ কর্মীদের কাছে এই বার্তাই দিয়েছিলেন যে, রাজসত্তা ছাড়া সমাজকে রক্ষা করা যাবে না।

এই পরস্পর বিরোধী দ্বৈততার ভিতর দিয়েই নিজেদের সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, ফ্যাসিবাদী ধ্যানধারণাকে প্রসারিত করে চলে আর এস এস। তাই রাজশক্তিকে করায়ত্ত করবার এই যে প্রক্রিয়া আর এস এস গত কয়েক দশকের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে সম্ভব করতে পেরেছে, সেটিকে অব্যাহত রাখার তাগিদেই প্রয়োজন ভারতের চিরন্তন বহুত্ববাদের বুকে ছুরি মারা। গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাজশক্তিকে কুক্ষিগত করতে দীর্ঘদিন ধরে যে সামাজিক প্রযুক্তির ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক হিন্দুরা, সেই প্রযুক্তিকে আরো উগ্র, আরো নগ্ন করে তুলতে দরকার সমন্বয়ী সাধনার কুশীলবদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভিতর ধীরে ধীরে একটা বীতরাগ তৈরি করা। সেই উদ্দেশ্যেই আর এস এসের অঙ্গুলি হেলনে একদিন বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিশেবে বিদ্যুৎ চক্রবর্তীকে নিয়োগ করেছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। ঠিক সেই একই উদ্দেশ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতে নেমেছেন আর এস এসের ঘরের লোক দিলীপ ঘোষ।

গোলওয়ালকর মনে করতেন, ধর্ম বিচারকর্তা আর শাসনকর্তাকে পৃথক করে রেখেছিল। সেই কারণেই নাকি অত্যাচারী আর দুঃখদানকারী রাজক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রিত রাখার সুব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল (ঐ) । ধর্মকে ঘিরে এই বিকৃত ব্যাখ্যার ভিতর দিয়ে শাসনক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে ধর্মের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন গোলওয়ালকর। রাষ্ট্র পরিচালনার যে কোনো পর্যায় থেকে ধর্মকে পৃথকীকরণের যে দিকনির্দেশ আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞান দিচ্ছে, আর এস এসের মতাদর্শগত অবস্থান যে সেই দিকনির্দেশের এতোটুকু তোয়াক্কা করে না- গোলওয়ালকরের এই ব্যাখ্যা থেকেই দিনের আলোর মতো পরিস্কার। এখানেই হিন্দুত্ববাদীদের মতাদর্শের সঙ্গে ভারতের চিরন্তন ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের মৌলিক ফারাক। শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে মানুষের ভাবাবেগ, বিশেষ করে একটা বড় অংশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের যে ভাবাবেগ, দিলীপ ঘোষ তাকে আঘাত করতে চেয়িছেন নিজের স্পর্ধোক্তির ভিতর দিয়ে।

M S Golwalkar

এই আঘাতের উদ্দেশ্য হলো, মধ্যবিত্ত পরিমন্ডল এখন অর্থনীতির ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে ক্রমশঃ মুখ ফেরাচ্ছে বিজেপি থেকে। সদ্য সমাপ্ত উপনির্বাচনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটছে। এই পরাজয়ের ভিতর দিয়েই মধ্যবিত্তের মূলত অর্থনৈতিক সঙ্কট, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের অত্যাধিক মূল্য বৃদ্ধি, রান্নার গ্যাস, কেরোসিন, পেট্রোল , ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, করোনার কারণে লক ডাউনের ফলে ভয়াবহ বেকারি, ছাঁটাই, পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা, সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস- এইসবের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যবিত্তের ভিতরে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ঘটিয়ে বিজেপি  নিজেদের যে প্রসার ঘটিয়েছিল , তা থমকে গেছে। কৃষি আইন সংশোধনীর প্রতিবাদে ধারাবাহিক আন্দোলন উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাবের আসন্ন বিধানসভার ভোটে প্রভাব ফেলবেই- এমন সম্ভাবনা তীব্র হয়ে উঠছে।

এইরকম একটা সময়ে মধ্যবিত্তের উপর বেশি ভরসা না করে সমাজবিজ্ঞানে যাঁদের সাবালটার্ন বলা হয়, সেই নিম্নবর্গীয়দের রাজনৈতিক হিন্দুত্বে আরো বেশি করে উত্তোরণের পথে হাঁটতেই শ্রীরামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথের মতো মধ্যবিত্ত আইকনের উপর আঘাত হানছে বিজেপি। বহুত্ববাদী ধারার উপর আঘাতের পাশাপাশি এই আক্রমণের আর একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হলো; পিছড়ে বর্গের উপর একটা নোতুন ধরণের সামাজিক প্রযুক্তির পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো।সেই পরীক্ষানিরীক্ষার অঙ্গ হিশেবে যে লোকায়ত দেবদেবীকে আজ পর্যন্ত ন্যুনতম স্বীকৃতি দেয় নি রাজনৈতিক হিন্দুরা, সাবালটার্নদের মন জয়ের উদ্দেশেই সেই নিম্নবর্গের দেবদেবীদের নিয়ে নোতুন করে একটা ভাবাবেগ তৈরি করবে তারা। উদ্দেশ্য একটাই; মধ্যবিত্তের সমর্থনে ধ্বস নামার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ার ফলে ভোট রাজনীতির ঘাটতি তারা পুষিয়ে নিতে চায় নিম্নবর্গীয়দের নিজেদের সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। তাই দিলীপ ঘোষের এই আক্রমণ। আর সেই জন্যেই দিলীপ ঘোষের এই অসভ্যতা ঘিরে সঙ্ঘ- বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের এই হেন নীরবতা।

*মতামত লেখকের নিজস্ব


শেয়ার করুন

উত্তর দিন