গ্যালিলিও'র সাজা - ইতিহাসের শিক্ষা

ওয়েবডেস্ক প্রতিবেদন

গ্যালিলিওকে স্মরণ : বিজ্ঞান এবং ধর্মের দ্বন্দ্ব সম্পর্কিত কিছু সমস্যা

গ্যালিলিও গ্যালিলি (জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৫৬৪ - মৃত্যু ৮ জানুয়ারী, ১৬৪২ সালে) ছিলেন একজন ইতালীয় দার্শনিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ যিনি মেকানিক্স, জ্যোতির্বিদ্যা এবং পদার্থের শক্তি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশে মৌলিক অবদান রেখেছিলেন। টেলিস্কোপ আবিস্কারের জন্য তিনি বিখ্যাত। শুক্রের পর্যায়গুলির উপর তার পর্যবেক্ষন ও গবেষণার মাধ্যমে কোপার্নিকান সিস্টেমকে সমর্থন করেছিল, যা বলেছিল যে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। গ্যালিলিও ইউরোপের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। সপ্তদশ শতকের ইউরোপে ধর্মীয় কর্তৃত্বের সাথে তার বিরোধ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কোনো ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান ব্যবস্থা এবং ধর্মের মধ্যে মৌলিক অসঙ্গতিপূর্ণ প্রকৃতির কথা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

প্রাচীন যুগে বেশ কিছু মৌলিক বস্তুবাদী চিন্তাধারার বিকাশের সাথেও ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। এক্ষেত্রে চার্বাকের উল্লেখ করা যায়, চার্বাক একটি বস্তুবাদী দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি যা প্রাচীন ভারতে ‘পবিত্র’ ধর্মগ্রন্থের মূল সারমর্ম এবং কর্তৃত্বকে খণ্ডন করে। ষোড়শ শতক থেকেই ইউরোপে জ্ঞানের আরেকটি শাখা হিসাবে আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশ হতে থাকে, এই পর্বেই ধর্মীয় গোঁড়ামিসহ ‘পবিত্র’ ধর্মগ্রন্থের শিক্ষাগুলি আরও গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। রেনেসাঁর (পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দী) সময় সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ক্রমবর্ধমান উত্থানের দ্বারা যুগ যুগের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মের মৌলিক আখ্যান যাকে পৌরাণিক কাহিনীও বলা যেতে পারে সেইসব প্রবল সমালোচনার শিকার হতে শুরু করে। অসংখ্য ইউরোপীয় পণ্ডিত ধর্ম, শিল্প, সমাজ, মানবপ্রকৃতি, আইন এবং স্বাধীনতা সম্পর্কে সমালোচনার ভিত্তিতে চিন্তা করতে শুরু করেন। গ্যালিলিও রেনেসাঁ এবং সেই সময়ের সমালোচনামূলক চিন্তাধারার সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।

গ্যালিলিও আসলে যা করেছিলেন

Facsimile of telescope by Galileo with main tube measuring 2-foot, 8 1/2-inches and magnification of 21 times. Full view, graduated grey background

ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যার দুটি প্রতিযোগী ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল। একদিকে, টলেমির প্রাচীন ব্যবস্থায় পৃথিবী ছিল মহাবিশ্বের কেন্দ্র। অন্যদিকে, কোপার্নিকাসের তত্ত্ব ( ১৫৪৩ ) সূর্যকে কেন্দ্রে রেখেছিল। সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে, টলেমির বিপরীতে কোপার্নিকাসের দৃষ্টিভঙ্গি অন্তত ইউরোপের শিক্ষিত বৃত্তে গৃহীত হয়েইছিল। ১৫৯৭ সালে জোহানেস কেপলারের কাছে গ্যালিলিওর লেখা চিঠিটি কোপারনিকান তত্ত্বের সাথে তার পরিচিতি এবং গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত দেয়। ১৬১৩ সালে প্রকাশিত সানস্পট সম্পর্কিত গ্যালিলিওর ইতিহাস এবং বিক্ষোভ, কোপারনিকান দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণের সাক্ষ্য দেয়। কোপারনিকান দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি চার্চ কর্তৃপক্ষের মনোভাব ১৬১৫-১৬ সালে প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পবিত্র কর্তব্যের পরামর্শদাতারা দর্শনের অন্তর্গত দুটি প্রস্তাবকে “অযৌক্তিক” বলে নিন্দা করেন। প্রথমটি সূর্যের অবস্থান এবং গতিশীলতার, যা পৃথিবীর অবস্থান ও গতির সাথে সম্পর্কিত। এই প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করেই ঐ দুটি প্রস্তাবনা রয়েছে এমন যেকোনো বইয়ের প্রকাশনা ও শিক্ষাদান নিষিদ্ধ করা হয়। লক্ষণীয় যে গ্যালিলিওর কাজ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা না হলেও, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোপারনিকান তত্ত্বের ব্যাপক নিন্দা করা হয়েছিল। গ্যালিলিওর কাজের জন্য তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল, ১৬৩৩ সালে সেই বিচার চূড়ান্ত রূপ নেয়। বিচারে কোপার্নিকান তত্ত্বকে মিথ্যা প্রমাণ করার উপর আদৌ কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি বরং গ্যালিলিওকে তার লেখা বই “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেম”-এর জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৬৩২ সালে এই বই প্রকাশিত হয়। বিচারকরা সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ১৬১৬ সালে গ্যালিলিওকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তিনি সেইসব পালন করেছিলেন কিনা। বিচারপর্বে গ্যালিলিওর লেখা বইয়ের যুক্তি খারিজ করে বলা হয় “এই যুক্তিসমুহ এখনও অত্যন্ত গুরুতর এক ত্রুটি, কারণ পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বিপরীতে কোনও মতামত প্রতিষ্ঠা এবং সংজ্ঞায়িত হওয়ার সম্ভাবনাই নেই”। রোমান ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টিতে, “ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের বিরোধিতা করে এমন যেকোন কিছুকেই মিথ্যা বলে বর্ণনা করা যেতে পারে।“ গ্যালিলিও তার “অপরাধ” স্বীকার করতে বাধ্য হন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে গ্যালিলিওর আবিষ্কার এবং কোপার্নিকান তত্ত্বের প্রতি তার অদম্য সমর্থন অবশ্যই তার গাণিতিক যুক্তি এবং আকাশের পর্যবেক্ষণ উভয় দ্বারাই অবহিত ছিল। ১৬০৯ সালের শরত্কালে গ্যালিলিও তার টেলিস্কোপের মাধ্যমে “স্বর্গ” পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন এই টেলিস্কোপ তারাদের রহস্য বুঝতে সহায়ক হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে রোমান চার্চের কর্তৃত্বের কাছে অনিচ্ছাকৃত হয়েও সেই যন্ত্রটি জমা দিতে হয়। বিচার শেষে গ্যালিলিওকে তার জীবনের বাকি নয় বছর গৃহবন্দী করা হয় এবং ৮ই জানুয়ারী, ১৬৪২ তারিখে তিনি মারা যান। আজকের পৃথিবীতে, গ্যালিলিও আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসাবে স্বীকৃত।

বিজ্ঞান এবং ধর্মঃ মূলগতরুপেই বিরোধী দুই ধারা

এই হল সংক্ষেপে গ্যালিলিওর জীবনের ঘটনা। গ্যালিলিও এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের মধ্যেকার মতবিরোধ আসলে ধর্মনিরপেক্ষ বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ ।

বিজ্ঞান এবং ধর্ম অবশ্যই দুটি ভিন্ন বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবেই তাদের বিচার করা উচিত। এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বৈশিষ্ট এতটাই আলাদা যে উভয়ের মধ্যে কোনরকম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ভাবা কঠিন। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ধর্ম আসলে পৌরাণিক কাহিনী এবং বিভিন্ন গল্পকে ভিত্তি করে তৈরি। নিজেদের  বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা একটি জাতি কর্তৃক বিবিধ আচার ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনগুলিকে ধর্মের অন্তর্ভুক্ত এবং ‘নির্দেশিত’ হয়। নৃতাত্ত্বিকদের দ্বারা উত্থাপিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনীগুলিকে ভিত্তিমূলক আখ্যান হিসাবে উল্লেখ করা হয় যা দৃশ্যত মহাবিশ্বের উৎপত্তি বা রূপান্তর সম্পর্কে বিভিন্ন পবিত্র কাহিনী শোনায় এবং সম্প্রদায়ের আচার-অনুষ্ঠানগুলি রচনা করার সাথেই নৈতিকতারও বিকাশ করে। এমন পুরাণ বিশ্বের প্রতিটি ধর্মেই খুঁজে পাওয়া যেত। উল্লেখ করা যেতে পারে খ্রিস্টধর্মে সৃষ্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট গল্পের, এতে পৃথিবীর প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা শোনায় এবং যৌনতা ও পাপ সম্পর্কে খ্রিস্টানদের ধারনা দেয়। একইভাবে, হিন্দু ধর্মগ্রন্থের পৌরাণিক কাহিনীতে পাওয়া যায়, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন ব্রহ্মা। তিনিই সৃষ্টিকর্তা, নিজের শরীর থেকেই তিনি মহাবিশ্ব তৈরি করেছিলেন। অন্যদিকে, বিজ্ঞানে মিথের কোন স্থান নেই। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সত্য এবং প্রমাণের উপরেই ভিত্তি করে এগোয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বিজ্ঞান কখনো মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি ‘নির্দিষ্ট’ এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার দাবি করে না। এই অর্থে, বিজ্ঞান মহাবিশ্বের ব্যাখ্যায় কিছুটা আনুমানিক এবং সত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, কারণ বিজ্ঞান প্রকৃতির দ্বৈততাকে স্বীকৃতি দেয়। প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানের মহিমা নিহিত রয়েছে কোন বিষয়ের অভ্যন্তরীণ ভ্রান্তিকে চিনতে পারার ক্ষমতার মধ্যে। এইভাবে, বিজ্ঞান, ধর্মের বিপরীতে, কোন ‘পবিত্র’ ধর্মগ্রন্থ এবং পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয় না এবং যে কোন অসঙ্গতির মুখে সত্যের উপর ভিত্তি করে কোন তত্ত্ব বা জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ‘পৌরাণিক কাহিনী বনাম তথ্য’-এর সীমানা পেরিয়ে, নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে পার্থক্য বোঝা সহজ। বিজ্ঞান প্রাকৃতিক জগতের সাথে সম্পর্কিত। বিজ্ঞানের কাজ হল আমাদের প্রকৃতি জগতকে বুঝতে সাহায্য করা (এর সাহায্যে প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণকারী নিয়মগুলির আবিষ্কার করতে সহায়তা মেলে) এবং সেই বোঝার প্রক্রিয়ায়, আমরা প্রকৃতিলব্ধ সামগ্রীর পরিবর্তন সাধন করি। যা কিছু অতিপ্রাকৃত, তার সমালোচনাতেই বিজ্ঞান নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। বৈজ্ঞানিক অনুশীলন আমাদের চেনা পৃথিবীকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা দেয়, এর বিপরীতে ধর্মীয় অনুশীলন বিশ্ব যেমন আছে তেমনই থাকবে - এই প্রচার করতে সাহায্য করে। এই অর্থে, বিজ্ঞান হল এনলাইটেনমেন্ট। কান্ট বলেছেন, “এনলাইটেনমেন্ট হল পরনির্ভরশীল শিক্ষা হতে মানুষের মুক্তি” – অর্থাৎ অসীমের অভিমুখে নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা। সুতরাং, অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিজ্ঞান এবং ধর্মীয় বিশ্বাস একসাথে সহাবস্থান করতে পারে না। বৈজ্ঞানিক ধারণা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্যে এই ধরনের দ্বন্দ্বের পটভূমিতেই গ্যালিলিওর কর্ম-জীবনকে বুঝতে হয়।

আজকের প্রেক্ষাপটে এই ধারনার মধ্যেকার প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্ব কিছুটা অস্পষ্ট হয়েছে, কারণ গোটা পৃথিবীই বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব বিকাশের সাক্ষী। কিন্তু তা সত্ত্বেও, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কিছু অতি দক্ষিণপন্থী-সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি বিজ্ঞান ও ইতিমধ্যে প্রমানিত বৈজ্ঞানিক তথ্যসমুহকে অস্পষ্ট ধর্মীয় পরিভাষায় ব্যাখ্যা করে, এবং লব্ধজ্ঞানকে ভুল প্রমান করার চেষ্টা করে। আজকের ভারতে যা ঘটছে তা হলো আরএসএস হিন্দুত্বের পরিভাষায় আধুনিক বিজ্ঞানকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে এবং হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের সামঞ্জস্যতা ‘খুঁজে বার করার’ চেষ্টায় ক্রমশ গাজোয়ারি করে যাচ্ছে। এ হল এক বিপজ্জনক প্রবণতা যা প্রতিহত না করলে দেশের বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধ ধ্বংস হবে।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন