এ কে গোপালন-প্রয়ান দিবসে শ্রদ্ধা

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) এর 'নবরত্ন'-এর অন্যতম ছিলেন এ.কে.গোপালন,পুরো নাম - আইল্লাথ কুট্টেরী গোপালন নাম্বিয়ার। জন্ম ১ অক্টোবর,১৯০৪ সালে কেরালার মালাবার অঞ্চলের মাকেরী গ্রামে। গোপালনের বাবা ছিলেন একজন সমাজসংস্কারক,তিনি মালাবারের নায়ার সোসাইটির সম্পাদক ছিলেন।

শৈশব থেকেই গোপালনের উপরে পিতার প্রভাব ছিল যথেষ্ট। তার পিতা আঞ্চলিক নির্বাচনে যোগদান করেন ও জয় লাভ করেন, সেইসময় থেকেই গোপালনের নির্বাচন ও মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে যোগাযোগের সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা গড়ে ওঠে যা ভবিষ্যতে তার ও সামগ্রিকভাবে পার্টির কাজে আসে।

উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে লেখাপড়া করাকালীন তিনি প্রথাগত শিক্ষালাভ থেকে অব্যাহতি নিয়ে প্রাথমিক স্তরে শিশুদের শিক্ষআদানের কাজে যোগ দেন ও সাত বছর এই কাজ করেছিলেন। এই বিষয়েও তার পিতার প্রভাব ছিল। ধীরে ধীরে তিনি স্বাধীনতার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন।

১৯৩০ সালে গান্ধীজি লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করলে কেরালায় কংগ্রেস কে. কালাপ্পনের নেতৃত্বে একটি জাঠা সংগঠিত করে যেখানে গোপালন উৎসাহের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। এই সময়েই তিনি তার শিক্ষকতার পেশা ত্যাগ করে কান্নানোরে গিয়ে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যুক্ত হন এবং গ্রেফতার হন। গোপালনের গ্রেফতারির খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে তিনি যে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন সেখানকার পড়ুয়াদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় ও তারা হরতাল শুরু করে। এরপর গান্ধী-আরউইন চুক্তির ফলে গোপালন সহ সকলে মুক্তিলাভ করেন।

১৯৩৪ সালে পাটনাতে কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টি তৈরি হয়,কৃষ্ণ পিল্লাই,নাম্বুদিরিপাদ সহ কেরালা কংগ্রেসের বেশ কিছু নেতৃত্ব এই সংগঠনের যুক্ত হন, ১৯৩৫ এ কৃষ্ণ পিল্লাই গোপালনকে এই পার্টিতে যুক্ত করেন। কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির উদ্যোগে দক্ষিণ ভারতে ট্রেড ইউনিয়ান গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়, গোপালন ,কেরালা জুড়ে এই কাজে যুক্ত হন ও সাফল্যের মুখ দেখেন। এই সময়ে কেরালায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়, এ কে গোপালনের নেতৃত্বে এই দুর্ভিক্ষপীড়িত দের নিয়ে একটি জাঠা মাদ্রাজ থেকে শুরু হয় , এই আন্দোলনে ব্যাপাক সাড়া পড়েছিল। রামমূর্তি ও অন্যান্যরা এই আন্দোলনকে সমর্থন করলেন। এই জাঠার জন্য গোপালন গ্রেফতার হন ও তার ৯ মাসের কারাদন্ড হয়।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্রতর হয়, কিন্তু গান্ধীজি সেইসময় ব্রিটিশদের পক্ষে অবস্থান নেন এবং এই নিয়ে কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির (সিএসপি) মধ্যেও তীব্র বিতর্ক শুরু হলে জয়প্রকাশ নারায়ন সিএসপি-এর কমিউনিস্ট ভাবধারার নেতৃত্বকে বহিষ্কার করেন, এর মধ্যে ইএমএস,গোপালন প্রমুখরা ছিলেন। এরা পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। এই সময়কালে গোপালন একাধিকবার গ্রেফতার হন, ১৯৪২ সালে তিনি জেল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং ১৯৪৫ অবধি ব্রিটিশ পুলিশের নজর এড়িয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও তিনি কারাগারে ছিলেন।কয়েক সপ্তাহ পরে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। এরপরে তিনি ২২ শে মার্চ ১৯৭৭,মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, টানা ৫ বার লোকসভার সদস্য ছিলেন এবং ভারতের সংসদে বিরোধী দলের অন্যতম নেতা ছিলেন। ১৯৫১-৫২ এর প্রথম লোকসভা নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি গোটা দেশে ৩১টি আসনে জয়লাভ করে, গোপালন কান্নানোর কেন্দ্র থেকে ৯৪হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন ও লোকসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হন।

১৯৬৪ সালে অবিভক্ত পার্টির জাতীয় পরিষদ থেকে যে ৩২জন প্রতিনিধি সভা ত্যাগ করেছিলেন গোপালন ছিলেন তাদের অন্যতম। ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে কোলকাতাতে পার্টির সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় সেখান থেকে ৯ জনকে নিয়ে সিপিআই(এম) এর যে পলিট ব্যুরো গঠিত হয়েছিল গোপালন ছিলেন তাদের অন্যতম। এই ৯ জনই সিপিআই(এম)এর 'নবরত্ন' হিসাবে খ্যাত। পার্টি তৈরি ও গণ আন্দোলনে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ফলে গোপালনের শরীর ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছিল, আগেও তিনি একাধিকবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু ১৯৭৫-৭৬ থেকে তার শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়তে থাকে এবং ২২ মার্চ ১৯৭৭ তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যু দিনে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই অমূল্য রত্নের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য রইল।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন