Ranesh Dasgupta

রণেশ দাশগুপ্ত - এই ভারতে সমাজতন্ত্রের দীপশিখা প্রজ্জ্বলনই ছিল যার একমাত্র লক্ষ্য

রণেশ দাশগুপ্ত: প্রজ্জ্বলিত দীপশিখা

রণেশ দাশগুপ্ত( ১৫ই জানুয়ারী, ১৯১২ - ৪ই নভেম্বর, ১৯৯৭) বিগত শতাব্দীর সাম্যবাদীসমানচিত্রের চিরসবুজ দ্বীপ। ভৌগলিক দ্বীপ হওয়ার জন্যে জীবনে কখনো এক মুহূর্ত সময় খরচ করেন নি তিনি। এই ভারতে সমাজতন্ত্রের দীপশিখা প্রজ্জ্বলনই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু ত্যাগ, তিতিক্ষা আর মনীষার সন্মিলনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন উপমহাদেশে সমাজতন্ত্র চর্চার একটি সবুজ বনভূমি। আত্মত্যাগ একজন কমিউনিস্টকে কোন পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে রণেশ দাশগুপ্তের জীবন হয়ে উঠেছিল তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর শৈল্পিক রুচির চর্চাকে সব অর্থেই সাধনা বলে চিহ্নিত করা যায়। আজ যখন চারিদিকে সততার বিজ্ঞাপন, তখন মনে হয়, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাঁকে সমুচিত মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে যেতে চাইলেও নিজের ভিতরে নিজেকে গুটিয়ে রাখা রণেশ দাশগুপ্ত, নিজের অতি সাধারণ জীবনযাত্রাটাকে ঠিক তেমনটা রেখেই নীরবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। তাই কোনো কিছুই যেন আর তাঁকে কোনো অবস্থাতেই শেষ দিকে আকর্ষণ করতো না। তাঁর সারল্য ও ছিল কার্যত রূপকথার মতো।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অসুস্থ অবস্থায় কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলে র কংগ্রেস এক্সজিবিশান রোডে সাংবাদিক নাজেশ আফরোজের খালার বাড়িতে আছেন। শরীর- বয়সের বাধাকে অস্বীকার করে রণেশ দাশগুপ্ত গিয়েছেন ইলিয়াস কে দেখতে।দেখে ফেরার পথে আমীর আলি অ্যাভিনিউ তে জিশান রেস্টুরেন্ট অবধি এসে ,পাশে রোলের দোকানটি দেখে অতি সহজ স্বরে বললেন; কি করছে গো? কাবাব? 

রোলের চল হয়তো তাঁর যৌবনকালে তেমন ছিল না।তাই কাবাব ঘিরেই আগ্রহ? জিজ্ঞাসা করা হলো ; খাবেন? ঠিক শিশুর মতো মাথা নাড়লেন।

যখন রোল খাচ্ছিলেন, খাওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হয়েছিল,ওই বয়সে খাওয়াদাওয়ার যতোটা যত্নের দরকার ছিল তাঁর,ততোটা যত্ন হয়তো পান না।

আজকেল প্রজন্ম ,দুই বাংলার যুব সমাজ ভাবতেই পারবে না জাগতিক মোহ জয়ের জীবন্ত প্রতিমূর্তি হিসেবে রণেশ দাশগুপ্ত কোন স্তরের মানুষ ছিলেন। জীবনের মোহের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার একটা অদ্ভূত কৌশল তিনি আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন।আল তাই হয়তো সহকর্মী সত্যেন সেন, শহিদুল্লাহ কায়সারদের কথা ভেবে ভেবে মেধাকে কি ভাবে আরো আরো অত্তুঙ্গ পর্যায়ে উপনীত করতে পারা যায়, সেই সাধনাই করে গিয়েছেন। কখনো কখনো মনে হতো যাপনচিত্রের সুবিদাবাদী চরিত্র আর শঠতা- এই দুটো জিনিষকে বোধহয় বিষ্ঠার মতো ত্যাগ করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি রণেশ দাশগুপ্ত। শেষ জীবনে দীর্ঘ সময়ে যেখানে তিনি থাকতেন, দেখেছি, ঊষা গাঙ্গুলীর নাটকের দলের মহলা চলছে, দলের নতুন ছেলেরা সেভাবে চেনেও না ওই শশ্রুশোভিত বৃদ্ধকে।মলিন পোষাক দেখে কেউ কেউ হয়তো তাঁকে বিড়ি, সিখারেট পর্যন্ত আনতে বলছে নাটকের দলের উর্ধতন কেউ না থাকবার  সময়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের শাহাদাত বরণের মাত্র কয়েকদিন আগে যে মানুষটি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের অনুবাদ করে,' বিদীর্ণ হৃদয়' নেমের পান্ডুলিপি দিয়ে চমকে দিয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধুকে, সেই মানুষ টি মহলার ছেলেদের বেতমিজি তে কোনো প্রতিক্রিয়াই জানালেন না।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ উত্তর কালকে সমসাময়িক অনেকেরই মতো রণেশ দাশগুপ্ত ও ধরেছিলেন ধনতন্ত্রের অস্তমিত হওয়ার কাল হিসেবে। তার পাশাপাশি , সেই সময়টাকে চিহ্নিত করেছিলেন সমাজতন্ত্রের অভ্যুদয়ের উদয়াচল হিসেবে। এইপর্বটাকে কালসন্ধি হিসেবে ধরে নিয়েই রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর বৌদ্ধিক চেতনার স্তরকে পরিচালিত করেছিলেন। তবে এই কালসন্ধি যে শিল্পী সাহিত্যিকদের জীবন ও সাধনাতে নানা রকম পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্বের সংযোগ ঘটাবে, 'আকর্ষণ- বিকর্ষণের' একটা লীলাভূমি নির্মাণ করবে - এটা বুঝে নিতে তাঁর কখনোই এতোটুকু অসুবিধা হয় নি। যুগসন্ধির দোলাচলকে ধরতে পেরেছিলেন বলেই সমাজচেতনায় কখনোই অতীতের দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্ধের মতো অনুসরণের যেমষ তিনি পক্ষপাতী ছিলেন না, তেমন ভাবেই, যা কিছু পুরনো,সেটাই বাজে, সেটাই খারাপ,নতুন দৃষ্টিভঙ্গি মানেই খুব ভালো- এককথায় এইসব মেনে নেওয়ার মতো মানুষ ও তিনি ছিলেন না।বিচার শক্তির নিত্যনতুন চর্চাকে চিরকাল অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত।

শিল্পীচিত্তের স্বাতন্ত্রবোধের প্রতি মর্যাদা দেওয়া ছিল রণেশ দাশগুপ্তের  ভাবনাজগতের একটা বড়ো বৈশিষ্ট্য। শিল্পীর স্বাতন্ত্রবোধ থেকে সৃষ্টির সার্বজনীনতার বিকাশ ঘটে- এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়েই রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর চর্চার  দিগন্তকে আকাশে মেলে দিয়েছিলেন। স্বাতন্ত্রবোধ না থাকলে শিল্পে বা সৃষ্টিতে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না- এটা তিনি অন্তর থেকে বিশ্বাস করতেন।তাই মেকি কোনো সৃষ্টি ,যার ভিতরে স্বতঃস্ফূর্ততা নেই,তেমন কোনো সৃষ্টি কখনোই চিরকালীন হতে পারে না- এই বিশ্বাস জীবন- মৃত্যুর মতো একটা চিরন্তন বিশ্বাস হিসেবেই ঠাঁই করে নিয়েছিল তাঁর মানসলোকে। স্বতঃস্ফূর্ততা যে দায়িত্ববোধের উপর শিল্পীর মানসলোককে প্রতিষ্ঠিত করে, সেই দায়িত্ববোধই একজন শিল্পীকে স্রষ্টার আসনে অভিষিক্ত করে- এইবোধের উপরেই রণেশ দাশগুপ্তের গোটা জীবনের নির্মাণ।

শিল্পী জীবনের আকর্ষণ- বিকর্ষণের দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে যে নির্মাণ, তাকে একালের মূল সমস্যাকে সামনে আনার ক্ষেত্রে একটা বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে মনে করতেন রণেশ দাশগুপ্ত।সেই আকর্ষণ- বিকর্ষণের মাধ্যমে যে স্বাতন্ত্রবোধ তৈরি হয়, সেটাই সৃষ্টিকে স্বতঃস্ফূর্ত একটা গতিপথে খুব সহজে প্রবাহিত করে- এই ভাবনা থেকেই তিনি গোটা জীবনের সমস্ত চিন্তাকে, ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।সেই ভাবনার প্রসারণ স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে খুব সহজে ঘটবে বলে যে বিশ্বাস তাঁর ছিল,সেই বিশ্বাসে ভর করেই স্বাধীন বাংলাদেশে পাখির মতো তিনি উড়ে বেড়াতেন। কিন্তু '৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শাহাদাত বরণের পর রণেশ দাশগুপ্ত বুঝে গিয়েছিলেন পাকিস্থানের দোসর খুনি মেজরচক্র বা তাদের শাগরেদরা যতোদিন সক্রিয় থাকবে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে থাকবে ততোদিন শিল্পীর স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না। তাই গভীর যন্ত্রণা নিয়ে তিনি ভারতে চলে আসেন।জীবিতাবস্থায় আর বাংলাদেশে ফিরে যান নি। 

শিল্পী , সাহিত্যিকদের পূর্ণতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিক অস্থিরতার বিপদ কে রণেশ দাশগুপ্ত যতোটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন, সমসাময়িককালে অনেকেই তেমনটা গুরুত্ব বিষয়টির উপরে দেন নি। শিল্পীর বা স্রষ্টার ব্যক্তিত্ব নিরাপত্তা যে তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি পরত নির্মাণ করবে, ব্যক্তিক নিরাপত্তা না থাকলে সৃষ্টিকে চিরকালীন করবার জন্যে মনের তাগিদ, আত্মনিবেদন যে সেইভাবে শিল্পীর মননলোকে জাগে না- এই উপমহাদেশে রবীন্দ্রনাথ, কাজী আবদুল ওদুদ, মুজফফর আহমদ, নজরুল ইসলাম, অন্নদাশঙ্কর রায়, মুলুকরাজ আনন্দ, উমাশঙ্কর যোশী,সুফিয়া কামাল,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, সমরেশ বসু, কবীর চৌধুরীর মতো হাতে গোনা দুইচার জনের বাইরে, সেটা গভীর ভাবে কেউ ই ভাবেন নি। এই ভাবুকের তালিকায় অবশ্যই রণেশ দাশগুপ্তের নাম অন্তর্গত করতে পারা যায়। শিল্পীর এই পরিপূর্ণ  ব্যক্তিক নিরাপত্তা নির্মাণ কেবলমাত্র সমাজতন্ত্রের অভ্যুদয়ের মাধ্যমেই সম্ভব - এইকথা রণেশ দাশগুপ্ত চিরদিনই জোরগলাতে বলে গিয়েছেন। শিল্পীর ব্যক্তিক স্থিরতার পরিপূর্ণতা প্রাপ্তি ঘিরে পথ অনুসন্ধানে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ বা অন্নদাশঙ্কর বা সুফিয়া কামালের ভাবনার সঙ্গে রণেশ দাশগুপ্তের ভাবনার ঐক্য ছিল না। রণেশ দাশগুপ্ত যে ভাবে  সমাজতন্ত্রের কার্যক্রমের পরিপূর্ণতাই শিল্পীর ব্যক্তিক পরিপূর্ণতা আনতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন, তেমনটা মানিক বা রণেশের বন্ধু সোমেন চন্দ ছাড়া বেশি মানুষ ভাবতে পারেন নি।

Gautam-Roy

গৌতম রায়


শেয়ার করুন

উত্তর দিন