মানুষের কবি শামসুর রাহমান

লেখায়ঃ গৌতম রায়

শামসুর রাহমান( ১৯২৯, ২৩ শে অক্টোবর--২০০৬, ১৭ ই আগস্ট) কে ১৯৫৩ সালে শান্তিনিকেতনের ' সাহিত্যমেলা'য় আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলা কবিতার কালপর্বে একটি নোতুন আঙ্গিক সংযোজন করেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়।ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ যে সংস্কৃতি, ভাষার ভিত্তিতে সুসংবদ্ধ বাঙালিকে কোনো চরম কাঙ্খিত বোধে স্থিত করতে পারবে না, দেশভাগের কালে বুদ্ধিজীবীদের ভিতর সেটি একমাত্র অনুভব করেছিলেন অন্নদাশঙ্কর।তাই দেশভাগের বিরোধিতাতে তিনি সর্বতোভাবে স্থিত থেকেই দেশভাগ উত্তরকালে দুই বাংলার বাঙালির ভিতর ভাষার ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের একটি ধাপ নির্মাণে আয়োজন করেছিলেন ' সাহিত্যমেলা' শান্তিনিকেতনে। মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতিকে বাঙালির আত্মিক সঞ্জীবনের মূল উপপাদ্য হিশেবে মেলে ধরে '৫২ র মহান ভাষা আন্দোলন আগামীদিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে ধর্মনিরপেক্ষতার উন্মীলনে কতোখানি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে, তা বোঝাতেই বিশুদ্ধ শিল্পচর্চার সমর্থক অন্নদাশঙ্কর আয়োজন করেছিলেন সাহিত্যমেলার।আর এই মেলায় শামসুর রাহমানকে আমন্ত্রণ এবং বিশেষ গুরুত্বপ্রদানের ভিতর দিয়ে বাংলা র সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সমাজসংবদ্ধ ঋদ্ধ বাস্তবতা কিভাবে মানবমুক্তির হাতিয়ারে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে, তার সংস্থাপক হিশেবে শামসুর কে আগামীদিনে একটি মাইল ফলক হবেন, তার ই যেন আগাম বিজয়বার্তা ঘোষণা করেছিলেন অন্নদাশঙ্কর।

অন্নদাশংকর রায়, সুরজিত দাশগুপ্ত এবং শামসুর রাহমান

                  সাহিত্যমেলায় অংশ নিয়েই শামসুরের প্রথম গন্তব্য হয়েছিল কলকাতায় বুদ্ধদেব বসুর বাসগৃহ। শামসুরের জন্ম পুরোনো ঢাকারমাহুতটুলি। পুরোনো ঢাকা গত শতকের বিশ, তিরিশের দশকে হিন্দু মুসলমানের যৌথ সাধনার লীলাক্ষেত্র হিশেবে বাঙালি সংস্কৃতির একটি পীঠস্থান ছিল।বুদ্ধদেব বসু থেকে ডঃ অশোক মিত্র ,পুরোনো ঢাকা কে কেন্দ্র করে সমন্বয়ী সংস্কৃতির বিস্তারের ধারাবিবরণী রেখে গেছেন।চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেনের 'জিন্দাবাহার' শামসুরের শৈশব, কৈশোরের উপবন , পুরোনো ঢাকার স্মৃতিমেদুর চিত্রের একটি আকরগ্রন্থ।এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক সমন্বয়ী চেতনাকে কেন্দ্র করে একদিকে মুহররমের মিছিল, সেই মিছিলে শোনা শব্দের নৈব্যক্তিক উৎসরণ;' একনাড়া , দোনাড়া, বোলো বোলো ভেস্তা' ( কবি তাঁর আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ ' স্মৃতির শহরে' এই উন্মীলনের স্মৃতিবিহ্বল সময়চিত্র খোদাই করে রেখেছেন) থেকে জন্মাষ্টমীর মিছিল কিংবা স্কুলে অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ' গিন্নি'গল্পের মুখ্য চরিত্রের মতো ,' চিন্তাহরণবাবুর জামাই' বলে সে যুগের রাগিংয়ের অদ্ভূত অনুভূতির ভিতর দিয়ে বড়ো হয়েছিলেন, যে বয়ঃবৃদ্ধি তাঁর মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক স্থৈর্যকে সিংহাবলোকনে উপনীত করলেও , সেই উপবিষ্টনে ' সুপ্রিয়া গৌরী' র প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাও একটি বারের জন্যে ম্লান হয় নি। স্পর্শ বাঁচায়ে পুন্যের পথে হাঁটতে দেখেছিলেন সেই শৈশবেই, ইস্কুল জীবনে জল খাওয়ার জায়গার বাহ্যিক শুদ্ধতা কে দেখে ক্ষত বিক্ষত হয়ে।আবার মজাও পেয়েছিলেন এক সহপাঠীর ব্লেড চিবিয়ে খাওয়ার উদ্ভূতুড়ে বিষয়কে ঘিরেও। সেই বোধের অনুবর্তনে বুদ্ধদেব বসুর ' কবিতা ভবনে'র দরজায় কড়া নাড়ার পর স্বয়ং বুদ্ধদেবের নিজে এসে  দরজা খোলার মুগ্ধতার আবেশ বজায় রেখেই তাঁর প্রয়াণের পর শামসুর লিখেছিলেন;" 

বার বার স্বেচ্ছাচারী জ্যোৎস্না কেটে গিয়েছেন হেঁটে/

সম্পূর্ণ একাকী, সঙ্গী মত্তবোধ।চোখে নাগরিক/

গেঁথে নস্টালজিয়ায় মেরুর গলায়/

কবিতার ডাকনাম ধরে ডেকেছেন কি ব্যাকুল।" 

বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে দেখা করার পরই শামসুর রাসবিহারী অ্যাভিনিউ থেকে ছুটে গিয়েছিলেন ল্যান্সডাউনে জীবনানন্দের বাড়িতে। সেই সাক্ষ্যৎকার খুব বেশি সময় ধরে হয় নি।অথচ ক্ষণস্থায়ী দেখা হওয়া জীবনানন্দের সঙ্গে শামসুরের ,বাংলা কবিতার জগতকে একটা যেন অনুভূতি র দীপ্যতায়, বোধের উন্মীলনে নোতুন দিগন্তের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।নিজের প্রথম জীবনের কবিতায় জীবনানন্দের যে প্রভাব ছিল, সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে , স্বকীয় শামসুরের সার্বিক প্রকাশে এই সাক্ষাৎকার যেন একটা দিগন্তবিস্তৃত সবুজ মাঠ হয়ে উঠে এসেছিল। প্রথম জীবনে অপার বিস্ময়ে, সারারাত জেগে জীবনানন্দের ' ধূসর পান্ডুলিপি' পড়েছিলেন শামসুর।এই পড়া যেন তাঁকে নিজের সঙ্গে নিজের পরিচয়ের একটা সোনালী ডানার চিল হয়ে , পরিচয়ের নিবিড় বন্ধনের আবর্তন রচনা করেছিল।

    " তোমাকে দীর্ঘ করে যারা আসে, প্রস্ফুটিত/ 

পদ্মের মতো সৃজনী আভায় কামসুরভি/:

ছড়ায় হৃদয়ে, কোটি জ্যোতিকণা বিলায় মনে,/ 

সমস্ত রাত একা একা ঘরে চার-দেয়ালে/

মাথা খুঁড়ে তুমি মরছ যাদের প্রতীক্ষায়,/ 

চিনেছ তাদের বহুবার তবু কেন যে এই/ 

লগ্নে রক্তে কুমারীর ভীরু চঞ্চলতা,/

আসবেই ওরা - পারবে না তুমি ফেরাতে আর।/ 

ভেবেছ কখনো সুরের সভায় আসন পাওয়া/

 সম্ভব হবে? এই যে ছড়ানো কথার কালো/

দুরাশায় আজো জোনাকি জীবন, কখনো তারা/ 

দূরের শরতে স্মৃতিগন্ধার পাবে কি আলো?/

একথা কখনো জানবে না তবু মৃত্যু হবে।"( আত্মজীবনীর খসড়, কাব্যগ্রন্থ-- প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে) 

                    একাত্তরের পঁচিশে মার্চ, ক্রাক ডাউনের ঠিক পরের দিন, কবিকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার উদ্দেশে তাঁর বাড়ির কাছে নয়াবাজারে ব্যাপক আগুন লাগিয়ে দেয় হানাদার পাক বাহিনী।কবি তখন থাকতেন পুরোনো ঢাকার অশোক লেনে।এরপর বাধ্য হয়ে শামসুর চলে যান গ্রামের বাড়িতে।সেখানে এক গ্রীষ্মের  মধ্যদুপুরে স্নান খাওয়া ভুলে , রচনা করেন যমজ কবিতা,'তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা ' আর' স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান'। পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের ভিতরেই আবার ঢাকাতে ফিরে এসে রচনা করেন;' তুমি বলেছিলে' নামে কবিতার একটি মাইলফলক। শামসুর লেখেন;

" দাউ দাউ করে পুড়ে যাচ্ছে ওই নয়াবাজার/

পুড়ছে দোকানপাট কাঠ,/

লোহালক্করের স্তুপ, মসজিদ এবং মন্দির।/

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার।/

বিষম পুড়ছে চতুর্দিকে ঘরবাড়ি।/ 

পুড়ছে টিয়ের খাঁচা, রবীন্দ্র রচনাবলী, মিষ্টান্ন ভান্ডার,/ 

মানচিত্র, পুরোনো দলিল।/ 

মৌচাকে আগুন দিলে যেমন সশব্দে/ 

সাধের আশ্রয়ত্যাগী হয়/

মৌমাছির ঝাঁক/

তেমনি সবাই/

পালাচ্ছে শহর ছেড়ে দিগ্বিদিক।নবজাতককে/

বুকে নিয়ে উদ্ভ্রান্ত জননী/ 

বনপোড়া হরিণীর মতো যাচ্ছে ছুটে ।/ 

অদূরে গুলির শব্দ , রাস্তা চষে জঙ্গি জীপ।আর্ত/ 

শব্দ সবখানে। আমাদের দুজনের মুখে আগুনের খরতাপ।আলিঙ্গনে থরথরো/ 

তুমি বলেছিলে,/ 

'আমাকে বাঁচাও ওই বর্বর আগুন থেকে, আমাকে বাঁচাও' / 

আমাকে লুকিয়ে ফেলো চোখের পাতায়/ 

বুকের অতলে কিংবা একান্ত পাঁজরে,/

শুষে নাও নিমেষে আমাকে/

চুম্বনে, চুম্বনে।/ ' 

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ওই নয়াবাজার,/

আমাদের চৌদিকে আগুন,/ 

গুলির ইস্পাতী শিলাবৃষ্টি অবিরাম।/ 

তুমি বলেছিলে,/ 

' আমাকে বাঁচাও।' / 

অসহায় আমি তাও বলতে পারি নি।" ( ' তুমি বলেছিলে' ।' বন্দি শিবির থেকে' কাব্যগ্রন্থ) ।

                 কাব্যচর্চাকে নিছক আর্টের বিশুদ্ধতার নিগড়ে আবদ্ধ রেখে , মানূষের যন্ত্রণা, সত্যের অবমূল্যায়ণ, সম্প্রীতির সঙ্কট, ধর্মনিরপেক্ষতার অবক্ষয়, গণতন্ত্রের সঙ্কট -- মানবতার এইসব নিগূঢ় সমস্যা থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকার মতো মানুষ শামসুর রাহমান ছিলেন না।ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে জীবনকে বাজি রেখে লড়াইকেই তিনি জীবনের ধর্ম বলে বিশ্বাস করতেন।মেহনতী জনতার মুক্তির প্রশ্নে সীমান্তের কাঁটাতার কখনো মানেন নি শামসুর।তাই কলকাতায় এসে সি পি আই( এম) এর রাজ্য দপ্তরে ' দেশহিতৈষী' র ঘরে অনাবিল আড্ডাতেও তিনি সব সময়েই স্বচ্ছন্দ থেকেছেন। এই ভন্ডামিশূন্য যাপনচিত্রের জন্যেই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে দেখতে ময়দানে একটি মেলাতেও তিনি ছুটে গিয়েছিলেন।এই শামসুর ই নিজের গদ্য সংগ্রহ তাই উৎসর্গ করেছিলেন,' মুখ্যমন্ত্রী নন, আমার পাঠক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কে।' 


শেয়ার করুন

উত্তর দিন