নিবেদিতা ও জাতীয় আন্দোলনের একটি ধারার অংশবিশেষ

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের(১৯০৫) আগেই ১৯০০ এবং ১৯০১ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে মিস ম্যাকলাউডকে নিবেদিতা যেসব চিঠিপত্র লিখেছিলেন, সেগুলির ভিতরেই তাঁর ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে মনোভাবের সুস্পষ্ট পরিচয় মেলে।রাজনীতির সঙ্গে যখন তিনি নিবিড় ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, সেই পর্যায়কালে কৌশলগত কারণেই রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্যপদ থেকেও তিনি স্পষ্টত ই দূরত্ব রচনা করেন।রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জাতীয় আন্দোলনের কোনো ধারার ই সংশ্রব না থাকলেও পরাধীনজাতির স্বাধীনতা লাভের প্রবল আকাঙ্খার প্রতি সহানুভূতি রামকৃষ্ণ মিশন কোনোদিন গোপন রাখে নি।প্রবাহমান ভারতবর্ষের জাতীয় ভাবধারার উন্মেষে রামকৃষ্ণ মিশন যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল তার জন্যে মিশনকে কতোখানি রাজরোষে পড়তে হয়েছিল টেগার্টের রিপোর্ট ই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।মিশন কর্তৃপক্ষ বার বার নিজেদের কর্মপন্থা, উদ্দেশ্য ইত্যাদি ব্যখ্যা করা স্বত্ত্বেও ব্রিটিশের নানা রকম হেনস্তার স্বীকার হয়েছিল।

কয়েকজন বিপ্লবী রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দিয়েছিলেন।ফলে মিশনের প্রতি ব্রিটিশের সন্দেহের তীর আরো তীক্ষ্ণ হয়েছিল।দেবব্রত, শচীন প্রমুখ বিপ্লবীরা সশস্ত্র বিপ্লবের পথ থেকে সরে এসে পরবর্তীকালে মিশনে যোগ দেন। ফলে ব্রিটিশের সন্দেহ আরো তীব্র হয়। এই পর্যায়কালে মিশনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিন্ন করবার পর জাতীয় কংগ্রেসের চরমপন্থী ও নরমপন্থী উভয় গোষ্ঠীর নেতৃত্বের সঙ্গেই ঘনিষ্ট সংযোগ তৈরী হয়েছিল নিবেদিতার।তবে বিপ্লবী নেতেত্বের প্রতি বুঝি বা অতিরিক্ত ই পক্ষপাতিত্ব ছিল তাঁর।তরুণ সম্প্রদায়ের ভিতর দেশপ্রেমের আগুণ জ্বালাতে নিবেদিতা তাঁর গুরু বিবেকানন্দর বাণীকে অবলম্বন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই সময়ে বহু অগ্নিময়ী বক্তৃতা করেন।বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষকেও অনুপ্রাণিত করবার ক্ষেত্রে এই সময়ে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন নিবেদিতা।অনুশীলন সমিতির সঙ্গে এই সময়কালে নিবেদিতার একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠে।সমিতির নানা গোপন সভা সমিতিতে তখন নিবেদিতার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। অনুশীলন সমিতির ছত্রছায়ায় থাকা বহু তরুণকে এই সময়কালে স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষিত করবার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন নিবেদিতা।ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতাতেই যে এদেশের একমাত্র মুক্তি সম্ভব -- একথা নিবেদিতা মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতেন বলে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় লিখে গেছেন( উদ্বোধন।১৩৩৫ বঙ্গাব্দ।পৃ-২০) ।

দেশের এক মহা সঙ্কটে দেশের সবথেকে আলোকপ্রাপ্ত মানুষরা মুখ বুজে থাকতে পারেন না।জাতীয় আন্দোলনের এক চরম ব্যাপ্তির কালে স্বামী বিবেকানন্দ যদি জীবিত থাকতেন তাহলে যে সেই অগ্নুৎপাত থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখা যেত না, তিনি ঝাঁপ দিতেন সেই আগুণে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে শ্রীশ্রী মা সারদামণি দেবীর একটি ঐতিহাসিক উক্তিতে। জাতীয় আন্দোলনের একটি পর্যায় কালে তিনি বলেছিলেন; আমার নরেন যদি আজ বেঁচে থাকতো ইংরেজ কি আর তাহলে তাকে বাইরে রাখতো? ঠিক জেলে পুরে রাখতো।

সন্তান নরেন যে বৈরাগ্য সাধনেই কেবল মুক্তির পথ খোঁজেন নি তা জননী সারদা ছাড়া এমন যথার্থভাবে আর কে বুঝবে? তাই স্বামীজীর মানসকন্যা নিবেদিতার পত্রাবলী একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যায় যে, বিবেকানন্দের মানসলোকে যে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার স্বপ্ন বিরাজমান ছিল, তাকে বাস্তবায়িত করবার প্রশ্নে নিবেদিতা কতোখানি আত্মনিবেদিত ছিলেন।ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে প্রয়োজন হলেএ সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ই একমাত্র পথ হয়ে উঠুক-- এ ব্যাপারে তাঁর পত্রাবলীর ভিতর দিয়ে খুব পরিচ্ছন্ন ভাবেই নিজের অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন লোকমাতা নিবেদিতা।কোনো কোনো স্তর থেকে পরবর্তীকালে তিনি প্রত্যক্ষ ভাবে সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন -- তার কোনো প্রমাণ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে( ভগিনী নিবেদিতা-- প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা।পৃষ্ঠা-২৭০) ।এ ধরনের উক্তি সম্পুর্ণভাবে অনৈতিহাসিক।প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক শঙ্করী প্রসাদ বসু তাঁর অসামান্য গবেষণা " নিবেদিতা লোকমাতা" তে দেখিয়ে দিয়েছেন বিস্তারিতভাবে যে, আমাদের দেশের জাতীয় আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার সঙ্গে কতোখানি একাত্ম সংযোগ নিবেদিতার ছিল। একথা ভাবলে খুব ই খারাপ লাগে যে, অরবিন্দ ঘোষের মতো বিপ্লবী ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব হিশেবে মেলে ধরতে নিবেদিতার ঐতিহাসিক ভূমিকাকে যথেষ্ট খাঁটো করে দেখিয়েছেন।

মাতৃভূমিতে প্রথম জীবনে নিবেদিতার ভিতরে যে বৈপ্লবিক স্ফুলিঙ্গ ছিল তা প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল তাঁর গুরু স্বামী বিবেকানন্দর সংস্পর্শে।অনেক বিপ্লবী তাঁকে সেই সময়েই চরমপন্থীদের ভিতরেও চরমপন্থী বলে মন্তব্য করেছিলেন(শ্রীঅরবিন্দ ও বাংলায় স্বদেশীযুগ-- গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী।পৃষ্ঠা-৩২৬) ।স্বামীজীর দেহাবসানের পর সুরেন্দ্রনাথ হালদারের যোগাযোগের ভিতর দিয়ে অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিষ্টার পি মিত্র এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে নিবেদিতার যে ঘনিষ্ট সংযোগ তৈরি হয়েছিল তা আমাদের জাতীয় আন্দোলনের বিপ্লবীধারার ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ রকমের উল্লেখযোগ্য বিষয়।এই সময়কালে ব্রিটিশের বহু ষড়যন্ত্রের ও শিকার নিবেদিতা কে হতে হয়েছিল।গ্রেপ্তারি এড়াতে তাঁকে ছদ্মবেশ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ফেরার পথে জাহাজে ধারণ করতে হয়েছিল। নিবেদিতাকে এই ছদ্মবেশ সম্পর্কে অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁর পরম হিতাকাঙ্খী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু।

স্যার জগদীশ ১৯০২ সালে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসেন। এই সময়কাল থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত সময়কালে যখন তিনি উদ্ভিদ বিজ্ঞানচর্চাতে রত , সেই সময়কালে তাঁর গবেষণাকাজে নিবেদিতা বিশেষ রকম সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন।পরবর্তী সময়ে রামকৃষ্ণ মিশন বা তাঁদের ভাবানুরাগী সারদা মঠ ভারতের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সশস্ত্রধারার সঙ্গে নিবেদিতার সংযোগকে খানিকটা অস্বীকার করতে চাইলেও( মুক্তিপ্রাণা মাতাজীর পূর্বোল্লিখিত বই) বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের ভাই বারীন্দ্র কুমার ঘোষ খুব স্পষ্ট ভাবেই বলেছিলেন যে, অরবিন্দ ঘোষ বরোদাকে শিক্ষকতা করবার সময়কালে সেখানে নিবেদিতার ভ্রমণকে কেন্দ্র করে অরবিন্দ এবং তাঁর বিপ্লবী অনুরাগীদের সঙ্গে নিবেদিতার ঘনিষ্ঠ সংযোগ গড়ে উঠেছিল( গিরাজাশঙ্করের পূর্বোক্ত গ্রন্থের পৃ-২৮৩) ।বারীন্দ্র কুমার ঘোষ খুব স্পষ্ট ভাষাতেই লিখে গেছেন যে; ভগিনী নিবেদিতা চরমপন্থী নেতা হিশেবে শ্রীঅরবিন্দের অগ্রগামী( অগ্নিযুগ-- বারীন্দ্র কুমার ঘোষ।প্রথম খন্ড।পৃষ্ঠা- ১৮৫)।বস্তুত নিবেদিতার অনুরোধেই ধর্ম ও কর্মযোগিনের কাজ অসমাপ্ত রেখে অরবিন্দ ঘোষ গ্রেপ্তারি এড়াতে চন্দননগরের পথে পন্ডিচেরী চলে গিয়েছিলেন।

বাংলার বিভিন্ন গুপ্ত সমিতির সঙ্গে সেই সময়ে নিবিড় সম্পর্ক ছিল নিবেদিতার।বারীন ঘোষ লিখছেন;" একাধিকবার তাঁর কাছে গুপ্তচক্রের কাজে গিয়ে বাগবাজারের স্কুল বাড়িতে দেখা করেছি।:::: নিবেদিতার প্রদত্ত লাইব্রেরীই ১০৮ নং আপার সার্কুলার রোডের চক্রের ছিল প্রাণ ও প্রেরণার উৎসমূল।"( ঐ।পৃ-- ৬৫)।কবলমাত্র অনুশীলন সমিতি ই নয়, যুগান্তর দলের সঙ্গেও যে নিবেদিতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তা বোঝা যায় বারীন ঘোষের ০৪\০৫\১৯৫২ সালে লেখা একটি চিঠির ভিতর দিয়ে।দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অক্লান্ত ভাবে নিজে ঘুরে ঘুরে নিবেদিতা যে গুপ্ত বিপ্লবী দলের জন্যে সদস্য সংগ্রহ করতেন সেকথা স্বয়ং অরবিন্দ ঘোষ স্বীকার করে গিয়েছেন।

শ্রীমতী ওলি বুলকে নিবেদিতা ১৯০৬ সালের ২রা মে লিখছেন;" :::: এখানে তিন সপ্তাহ ধরে রিক্রুট করছি, এবং কয়েকদিনের মধ্যে কাজ আরম্ভ করার আশা রাখি।" এই সময়কালে পূর্ববঙ্গের বরিশালেও গুপ্ত সমিতির সদস্য সংগ্রহের জন্যে যাওয়ার কথা ছিল নিবেদিতার। সেই সময়ে(১৯০৬) বরিশালে জাতীয় কংগ্রেসের যে প্রাদেশিক সন্মলন হয় তাতে চরমপন্থি আর নরমপন্থীদের ভিতরে প্রকাশ্য সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই পরিবেশের কারণেই যে তখন আর তিনি বরিশালে যান নি তা শ্রীমতী বুলকে লেখা নিবেদিতার একটি চিঠি থেকে পরিস্কার ভাবে বোঝা যায়।সেই সময়কালে বিপ্লবী সমিতিতে কর্মী সংগ্রহের উদ্দেশে নিবেদিতা কি কি কৌশল অবলম্বন করতেন তার একটি মর্মস্পর্শী বিবরণ রেখে গিয়েছেন নিবেদিতার বিশেষ অনুগামী নাগপুরের সি ইউ দেশমুখ।

কেবলমাত্র বাংলার বাইরে নয় , বাংলার বিতরেও এই গুপ্ত সমিতির কর্মী সংখ্রহের কাজে কি কঠোর পরিশ্রম নিবেদিতা করতেন তার একটি বিবরণ তাঁর ই ১৯০৩ সালের ২০ শে মের লেখা থেকে আমরা পাই।এই সময়কালে তিনি গোটা মেদিনীপুর চষে বেরিয়েছিলেন কর্মী সংগ্রহের উদ্দেশে।তিনি লিখছেন;" মনে হয়, মেদিনীপুরে কাজের কিছুটা ফল হয়েছে।" এই কাজের ফল ই কি ক্ষুদিরাম? ক্ষুদিরামের প্রথম জীবনের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না তথ্যনিষ্ঠভাবে। তবে জ্ঞান বসু, নিরাপদ রায়, সত্যেন বসু, হেমচন্দ্র কানুনগো--- মেদিনীপুরের এইসব সন্তানরা এই সময়কালে যেভাবে ধারাবাহিকতার সঙ্গে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন তাতে এই ভাবনাকে একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, ভগিনী নিবেদিতার ১৯০৩ সালের মেদিনীপুরে কর্মী সংগ্রহের সফরের অন্যতম ফসল ছিলেন ক্ষুদিরাম। বিশেষ করে পরবর্তী সময়ে যখন আমরা দেখি হেমচন্দ্র কানুনগো লিখছেন; " She ( nivedita) was a staunch advocate of swadeshi movement, adopted Bandemataram as national cry.she tourned several parts of bengal and lectured on Swadeshi movement.In1909(1903) she went to Midnapore delivered lectures on politics through the medium of religion continually for five days attracting thereby increasing number of audience .She encouraged the society by personal demonstration of shord play and other athletic exercises , presented the works of Mazzini and Prince Kropotkin( Account of revolutionary movement in Bengal by Hemchandra Kanungo.এখানে উদ্ধৃত করা হলো--Ramakrishna Mission.Paper No-45.Freedom Movement Papers থেকে।হেমচন্দ্রের মূল বই" বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা" তে এই নিবেদিতা অংশ টি যে কেন নেই -- তা আজ ও রহস্যাবৃত) ।

হেমচন্দ্রের এই মূল্যায়ণ থেকেই এই অনুমান আশাকরি কষ্টকল্পনা হবে না যে; ১৯০৩ সালে নিবেদিতার মেদিনীপুর সফরের প্রভাব কোনো না কোনো ভাবে ক্ষুদিরামের উপরেও পড়েছিল।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যুব সমাজকে ঔপনিবেশিক শাসনের কদর্যতা বোঝাতে নিবেদিতা যে সফর করছিলেন তার ই অঙ্গ হিশেবে তিনি ১৯০৪ সালের জানুয়ারী মাসে পাটনা যান।বিহার থেকে প্রকাশিত" হোরল্ড" পত্রিকা নিবেদিতার এই বিহার সফর সম্পর্কে লেখে;" নিবেদিতা হিন্দুধর্মের সূক্ষ্ম জটিল তত্ত্বের ব্যাখ্যার ভিতরে একটিবারের জন্যেও প্রবেশ করেন নি।ভারতবর্ষের মানুষ কিভাবে একটি যথার্থ জাতি হিশেবে সঠিক পদ্ধতিতে প্রগতিশীল ভাবনার ভিতর দিয়ে এগিয়ে যেতে পারে-- তার ই বাস্তব দিকনির্দেশে তিনি তাঁর বিহার সফরের যাবতীয় বক্তৃতাবলীকে বিস্তৃত করেছিলেন।" পাটনার সভাতে ভগিনী নিবেদিতা বলেন; আমি যদি দেখি বালকদের মুখে অপরিসীম শান্তি বিরাজ করছে, তাহলে কিন্তু শান্তি পাবো না।দুঃখ ই পাবো।বালকেরা, আমি চাই, তোমরা নিজেদের ভিতরে মল্লযুদ্ধ করো।তরবারি চালানো অভ্যাস করো। বকাসিং অভ্যাস করো।আমি চাই শক্তিধর পুরুষ।কোনোরকম শান্তশিষ্ট গোবেচারা লোক আমি একটিবারের জন্যেও চাই না।
নিবেদিতা খুব স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন; লড়াই যে করতে পারে- সেই হলো বীর।লড়তে যে ভালৌবাসে সেই হলো বীর।লড়াই করো- লড়াই করো- কেবলমাত্র লড়াই করো।তবে সবসময়ে মনে রাখবে - লড়াইতে যেন নীচতা বা তিক্ততা না থাকে।সংগ্রামের ডাক যখন আসবে-- তখন যেন ঘুমিয়ে থেকো না"( নিবেদিতা রচনাবলী।পঞ্চম খন্ড।পৃষ্ঠা-৩৩৩-৩৩৪)

নিবেদিতা কেবলমাত্র ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করবার কাজের ভিতরেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। তিনি নিজেও একটি বিপ্লবী দল পরিচালনা করতেন - সেই বিষয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। যদিও বিপ্লবীদলের রীতিনীতি অনুযায়ী তাঁদের কোনো প্রামাণ্য নথিপত্র না রাখবার প্রবণতার কারণেই নিবেদিতার এই বিপ্লবীদলে ঠিক কতোজন অন্তর্ভূক্ত ছিলেন এবং তাঁরা কে কে-- সে সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারা যায় না।তবে নিবেদিতার একটি চিঠি থেকে নিশ্চিত ভাবে বলতে পারা যায় যে, বিপ্লবী ইন্দ্রনাথ নন্দী একটা সময়ে তাঁর দলে ছিলেন।নিবেদিতার দলের সদস্য হিশেবেই জাপানে গিয়েছিলেন অমূল্যচন্দ্র গুপ্ত। ইনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দর অত্যন্ত প্রিয় শিষ্য। অমূল্যচন্দ্রের সন্ন্যাস নাম ছিল স্বামী শঙ্করানন্দ। পরবর্তী সময়ে তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষের আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন।তিনি রামকৃষ্ণ ভিশনের ই অপর প্রাচীন সন্ন্যাসী স্বামী সদানন্দের ভাগ্নে ছিলেন।বিবেকানন্দের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন; অমূল্যচন্দ্র --- বিখ্যাত বৈপ্লবিক জাতীয় সঙ্গীত আও মর্দানো , হিন্দ জওয়ানো, জলদি তোলো হাতিয়ার, ফৌজ করো তৈয়ার-- জাপান থেকে এনেছিলেন।গানটি লিখেছিল লক্ষৌয়ের একটি ছেলে ।তাঁর নাম ছিল প্রসাদ। সে তখন থাকতো জাপানে।এই গানটি ব্যাপক প্রচার লাভ করেছিল। আলিপুর বৌমার মামলার সময়ে বন্দিরা এই গানটিকে ফরাসী লা মার্সেলিজ এর ধ্যানে গাইতো( পেট্রিয়ট প্রফেট-- ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত।পৃ-১১৯) । রহস্যজনক কারণে স্বামী শঙ্করানন্দের নিবেদিতার বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগের ব্যাপারটিকে রামকৃষ্ণ মিশন এড়িয়ে যায়।শঙ্করানন্দ পরবর্তীকালে এই বিষয়ে নীরব ই থেকেছেন। এমনকি প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা তাঁর গ্রন্থে এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, শঙ্করানন্দ এই প্রসঙ্গটিকে আদৌ স্বীকার করেন না।

বিপ্লবী সমিতিগুলির সদস্যদের চেতনার মান উন্নয়ণে নিবেদিতা খুব ই যত্নবান ছিলেন। তাই বহু গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি গুলিকে তিনি রাজনৈতিক বই দিতেন। সেই সঙ্গে দিতেন দেশ- বিদেশের বহু বিদ্রোহ- বিপ্লব সম্বন্ধীয় বই।বিপ্লবী সমিতিগুলিকে নিবেদিতার বই দেওয়ার অনেক বিবরণ পাওয়া যায় বারীন ঘোষের নানা স্মৃতিচারণ থেকে। স্বামীজীর ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন; জোসেফ মাৎসিনীর আত্মজীবনীর প্রথমখন্ড বিপ্লবীদলকে দিয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতা।সেই বইটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।বইটির ভিতরে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং পরিকল্পনার সুলুক সন্ধান ছিল।এইসব বইপত্তর আমি গচ্ছিত রেখেছিলাম আমাদের ই সহকর্মী কেশবচন্দ্র গুপ্তের( ইনি স্বামী শঙ্করানন্দের বড়ো ভাই) কাছে।কেশব আলিপুর বোমার মামলার সময়ে আত্মগোপন করবার আগে অন্যদের কাছে বইগুলি রেখে গিয়েছিল।গোটা দেশব্যাপী পুলিশের তল্লাশীর ফলে এক এক করে বইগুলি বেরিয়ে যায়। এই সময়ে নিবেদিতাই বলতেন; আমার বইগুলোসব এক এক করে আবির্ভূত হচ্ছে( ভূপেন্দ্রনাথের পূর্বোল্লিখিত বই।পৃ- ১১৯) ।

অরবিন্দ ঘোষের পরবর্তী সময়ে বাংলার সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিপ্লবী নেতা হলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ইতিহাসেশযিনি খ্যাত " বাঘাযতীন" হিশেবে। বাঘাযতীনের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভগিনী নিবেদিতার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ও যোগাযোগ তৈরী হয়েছিল ১৮৯৯ সাল থেকে। এ বিষয়ে ঐতিহাসিক তথ্যাদি রয়েছে অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসু ও সুনীলবিহারী ঘোষ সম্পাদিত নিবেদিতা জন্মশতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থে( দ্বিতীয় খন্ড।পৃ-৫ থেকে ১৭) ।সংশ্লিষ্ট গ্রন্থে পৃথ্বিন্দ্রনাথ মুখার্জীর প্রবন্ধ;" স্বামীজী, নিবেদিতা, যতীন মুখার্জী" অবলম্বনে খুব স্পষ্ট ভাবেই বলতে পারা যায় যে, ভারতের জাতীয় আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার সঙ্গে কেবলমাত্র নিবেদিতা নয়, তাঁর গুরু স্বামী বিবেকানন্দের প্রত্যক্ষ সংযোগ ও সম্পর্ক ছিল।

নিবেদিতার সঙ্গে বাঘাযতীনের প্রথম পরিচয় প্রলয়ঙ্কারী প্লেগের সময়ে। সেই পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।বাঘাযতীনের পুত্র তেজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে বিপ্লবী ভূপতি মজুমদারএক চিঠিতে ১৯৫৬ সালের ৭ ই জুলাই লিখেছিলেন; বাগাযতীন গোপনে বহু বার মিলিত হয়েছিলেন বিবেকানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা, ব্যারিষ্টার পি ভিত্র, সতীশ মুখোপাধ্যায়, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে। স্বামীজী , নিবেদিতা, ব্রহ্মবান্ধব, পি মিত্র, সতীশ মুখার্জী প্রমুখের সঙ্গে বাঘাযতীনের ঘনিষ্ঠ সংযোগের কথা ভূপতি মজুমদার খুব জোরের সঙ্গেই বলে গিয়েছেন।ব্রিটিশের অত্যাচারে আত্মগোপনকালে চন্দননগরের গোন্দলপাড়াতে অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে স্বামীজী ও নিবেদিতার সঙ্গে বাঘাযতীনের ঘনিষ্ট সংযোগের কথা ভূপতি মজুমদার আরো স্পষ্ট ভাবে জেনেছিলেন।বাঘাযতীনের প্রথম বিপ্লবী শিষ্য ভবভূষণ মিত্র ও বাঘাযতীনের সঙ্গে নিবেদিতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এবং তাঁর উপর নিবেদিতার প্রভাব বিষয়ে পরবর্তীতে অনেক তথ্য দিয়েছেন।যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নাম হয়" বাঘাযতীন" , সেই একটা ছোট ছোরা নিয়ে বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঘ মারবার পর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিবেদিতার কাছে বাগাযতীনের শিষ্য ভবভূষণ মিত্র ও বেশ কয়েকবার গিয়েছিলেন।গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, এই ভবভূষণ মিত্র ছাড়াও বাঘাযতীনের অন্যতম শিষ্য কুঞ্জলাল সাহা( ইনি মাণিকতলা বোমার মামলাতে ধরা পড়েছিলেন) এবং সতীশ মজুমদার নিয়মিত বেলুড় মঠে যেতেন(Freedom Movement Papers.No-45.StateArchives, West Bengal) ।

একদা রামকৃষ্ণ মিশনের এক ব্রহ্মচারী ( তাঁর নাম ছিল শঙ্কর) বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে স্বামীজীর প্রভাব বিষয়ে প্রবীণ বিপ্লবীদের কিছু স্মৃতিকথা সংগ্রহ করেছিলেন।সেই স্মৃতি সংগ্রহে বাঘাযতীনের আর এক বিশিষ্ট সহকর্মী নলিনীকান্ত কর খুব পরিস্কার ভাবেই বাঘাযতীনের সঙ্গে নিবেদিতার রাজনৈতিক সংযোগের কথা বলেছিলেন।বারাণসী এবং উড়িষ্যার বাণপুরে ১৯০৮ সালে বিপ্লবীদল সংগঠিত করবার কাজে নিবেদিতাকে রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথ প্রভূত সাহায্য করেছিলেন।গণেন্দ্রনাথ ছিলেন নিবেদিতার দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত।ব্যক্তিগত স্তরে তিনি মা সারদামণির অন্যতম সেবক ছিলেন। শ্রীশ্রী মায়ের বহু আলোকচিত্র পরবর্তী জীবনে এই বহ্মচারী গণেন্দ্রনাথের ব্যবস্থাপনাতে তোলা হয়েছিল।নিবেদিতার বৈপ্লবিক কাজকর্মের সঙ্গে লিজের রেঁমর সেতুবন্ধনের কাজ এই ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথ করেছিলেন।পরবর্তী সময়ে রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ নানা স্বকল্পিত অভিযোগ এনে এই গণেন্দ্রনাথকে মিশন থেকে বিতারিত করেন।ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথ প্রথাগত ভাবে আর রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে না থাকলেও শ্রীরামকৃষ্ণের সমন্বয়ী ভাবধারা এবং বিবেকানন্দ- নিবেদিতার স্বদেশ মুক্তি আন্দোলনের ব্রতকে সারাজীবন লালন করে গিয়েছেন পরম যত্নভরে।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র ধারার সঙ্গে ভগিনী নিবেদিতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হেতু স্বামী বিবেকানন্দের জীবদ্দশাতেই নিবেদিতার উপর তীক্ষ্ণ নজরদারি শুরু করে দিয়েছিল ব্রিটিশ।নিবেদিতা নিজে সেকথা বুঝতে পেরে লিখছেন;" পুলিশ আমার চিঠি খোলবার অনুমতি পেয়ে গিয়েছে।পুলিশের এই অভিসন্ধি র কথা জানিয়ে আমার বন্ধুরা আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন।তবে পুলিশের চোখের আরাম হয়, তেমন কিছু লিখতে অবশ্য আমি আদৌ প্রস্তুত নই!"( ১৯০২ সালের ৩রা মার্চ নিবেদিতার লেখা চিঠি) ।ব্রিটিশ পুলিশের এই শ্যেনদৃষ্টি সম্পর্কে অবশ্য নিবেদিতাকে আমৃত্য সতর্ক থাকতে হয়েছিল।নিবেদিতার বহু চিঠিতে পুলিশের এই নজরদারির প্রসঙ্গটি নানাভাবে উল্লিখিত হয়েছে।নিবেদিতার অজস্র চিঠিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অনেক সময়েই তিনি চিঠিপত্র আদান-প্রদানের জন্যে ডাক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যেতেন পাছে সেগুলি পুলিশের নজরদারিতে পড়ে যায় এই ভয়ে।অনেকক্ষেত্রে ই পুলিশের নজরদারি এড়াতে ব্যাঙ্ক ফারফত চিঠিপত্র আদানপ্রদান করতেন নিবেদিতা।আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পুর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি বা মাধ্যমের সাহায্য গ্রহণ করতেন চিঠিপত্র দেওয়া- নেওয়া করতে।নিবেদিতা ব্রিটিশ পুলিশের অভিসন্ধি জেনে এই চিঠিপত্র দেওয়া- নেওয়ার ব্যাপারে বন্ধু-বান্ধবদের খুব সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিতেন।নির্দিষ্ট ঠিকানার বদলে ঠিকানা এবং উদ্দিষ্ট ব্যাক্তির নামধাম পর্যন্ত ওলোটপালট করে দেবার পরামর্শ দিতেন।নিবেদিতার চিঠিপত্রগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বহুক্ষেত্রে ই তিনি পুলিশের নজর এড়াতে চিঠির ভাষা,আঙ্গিক কে অস্পষ্ট এবং কিছুটা এলোমেলো রেখেছিলেন।পুলিশের চোখে ধুলো দিতে অনেক সময়েই নিবেদিতা তাঁর চিঠিপত্রে নানা সাঙ্কেতিক ভাষা,শব্দ ইত্যাদি ব্যবহার করেছিলেন।এই সঙ্কেত ব্যবহারের ক্ষেত্রে ও তিনি রীতিমতো পেশাদার বিপ্লবীর মতোই অল্পদিন অন্তর ই সঙ্কেতের শব্দাবলী, আঙ্গিক ইত্যাদি অদলবদল করেছেন- যাতে পুলিশ কোনো কিছুই সহজে বুঝতে না পারে।তাঁর বৈপ্লবিক কার্যকলাপের বিন্দুবিসর্গ যাতে ব্রিটিশ পুলিশ বুঝে উঠতে না পারে সে জন্যে নিবেদিতা তাঁর চিঠিপত্রগুলিতে বার বার ইচ্ছাকৃত ভাবে লিখতেন যে, তিনি কোনো অবস্থাতেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।নিজের দিনলিপি নিয়ে তিনি তাঁর সহোদরাকে বার বার সতর্ক করেছেন।গোয়েন্দারা কিভাবে চিঠিপত্র খুলে পড়ে সে সম্পর্কে অতি সতর্কতার সঙ্গে নিজের বোনকে পর্যন্ত সাবধান করেছিলেন নিবেদিতা।কেবলমাত্র প্রিয়জন বা পরিচিতজনদের কাছেই ব্রিটিশের এই গুপ্তচরবৃত্তির কথা বলে দমে যাওয়ার মতো মানুষ নিবেদিতা ছিলেন না।ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের এই অপকীর্তির প্রতিবাদ তিনি পোস্টমাস্টার জেনারেলকেও পর্যন্ত জানিয়েছিলেন।

বিজ্ঞানাচার্য স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে ভগিনী নিবেদিতার ছিল অত্যন্ত প্রীতি ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক।হয়তো নিবেদিতার সঙ্গে স্যার জগদীশের এই যোগাযোগের কারণেই ব্রিটিশ তাঁর বিজ্ঞানচর্চাকে আদৌ সোজা ভাবে দেখতো না। ব্রিটিশের ধারণা ছিল যে, স্যার জগদীশের বিজ্ঞানচর্চার আড়ালে কোনো না কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধি আছে। এই কারণে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নানা প্রতিবেদনে স্যার জগদীশের বিজ্ঞানচর্চাকে সরাসরি " রাজনৈতিক" আখ্যা পর্যন্ত দেওয়া হতো।স্যার জগদীশের প্রতি ব্রিটিশের এই মনোভাব সম্পর্কেও নিবেদিতা সম্পুর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন।তাই কোনো চিঠিপত্রে " রাজনৈতিক " শব্দটি ব্যবহার করলে পাছে বন্ধু স্যার জগদীশ কোনো রকমের অসুবিধার সন্মুখীন হয়ে পড়েন, তাই এই " রাজনৈতিক" শব্দটির ব্যবহার সম্পর্কেত নিবেদিতা অত্যন্ত বেশি রকমের সতর্ক ও সচেতন ছিলেন।নিবেদিতার এই সতর্কতার ছোঁয়া আমরা পাই ৩রা এপ্রিল , ১৯০৯ সালে মিস ম্যাকলাউডকে লেখা একটি চিঠিতে।

সেই চিঠিতে নিবেদিতা লিখছেন;" 'রাজনীতি' শব্দটা যেভাবে তুমি কথায় কথায় ব্যবহার করে ফেলো, তেমনটা আর করবে না।চিঠিপত্রে এই ' রাজনীতি' শব্দটা হুটপাট করে আর লিখো না ।এই ' রাজনীতি' শব্দটা তোমার চিঠিতে দেখতে পেলে হয়তো কোনো গোয়েন্দাবাবাজীবন জোর গলাতেই বলে বসবে যে, যিনি এই চিঠি লিখছেঅন, সেই মহিলা নিশ্চয় ই জানেন যে; চিঠি যাঁর কাছে পৌঁছচ্ছে, তিনি রাজনীতির কর্মকান্ডের সঙ্গে ঘোরতরভাবে যুক্ত হয়ে আছেন।সেই গোয়েন্দার এমন ধারণাও হয়তো জন্মাবে যে; পত্রপ্রাপক নিশ্চয় ই এমন কোনো মারাত্মক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছেন যে যার জেরে তাঁর টিকিটির সন্ধান ও আমি এতো চেষ্টাচরিত্তির করেও ঠিক মতো জেনে বুঝে উঠতে পারছি না।আমি যে 'রাজনীতি' তে নেই, আ
আর জন্যে ই এই ভাবটা বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।তাই তোমার প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ রইলো যে, চিঠিপত্রে ভুলে ও তুমি এই ' রাজনীতি' শব্দটাকে ব্যবহার করতে যেও না।"

নিবেদিতার যেসব ভক্তিরসাশ্রিত জীবনী এযাবৎ প্রকাশিত হয়েছে, সেইসব জীবনী গুলিতে নিবেদিতার এই কৌশলগত কারণে 'রাজনীতি' শব্দটির প্রতি সতর্কতাকে ই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের দৃষ্টি এড়াতে নিবেদিতা নিজে ' রাজনীতি' শব্দটি ব্যবহার করছেন না বা তাঁর বন্ধু, সহমর্মীদের সেই ' রাজনীতি' শব্দটি ব্যবহার করতে তাঁর চিঠিপত্রে নিষেধ করছেন-- এই বিষয়টিই প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা সহ বেশ কিছু ভক্তিরসাশ্রিত নিবেদিতার জীবনীকার ইতিহাসের অপব্যাখ্যা করে এটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, নিবেদিতার কোনো রাজনৈতিক সংশ্রব ছিল না।

১৯০৯ সালের ১১ই মে নিবেদিতা মিস ম্যাকলাউডকে আর একটি চিঠি লেখেন।সেই সময়ে তাঁর ইউরোপ থেকে ফেরার পথে এদেশে পাঠানো চিঠিগুলি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা তিনি মিস ম্যাকলাউডকে দিয়ে লিখছেন;" আমার জন্যে কলকাতাতে যেসব চিঠিপত্র গুলো যাবে, সেগুলো কখনোই সরাসরি আমার নামে যাবে না। সেগুলি সরাসরি আমার নামে না গিয়ে যাবে ক্রিস্টিনের ঠিকানাতে এবং অবশ্য ই ক্রিস্টিনের নামে। কেবলমাত্র আমার জন্যে নির্দিষ্ট চিঠিগুলির কোণের দিকে সাঙ্কেতিক ভাবে লেখা থাকবে ২। এইসব করবার এই কারণেই প্রয়োজন যে, যতোক্ষণ না আমি গিয়ে পৌঁছচ্ছি ততোক্ষণ সব রকমের নজর এড়িয়ে চলাই একান্তভাবে বুদ্ধিমানের কাজ।জাহাজে থাকার সময়ে খোকার ঠিকানায় চিঠি দেবে।"

এই " খোকা" হলেন স্যার জগদীশ।ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখ এড়াতে নিবেদিতা তাঁর চিঠিপত্রে স্যার জগদীশ সহ তাঁর একান্ত আস্থাভাজনদের বেশ কিছু ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।জাহাজে ও যে নিবেদিতা ব্রিটিশের নজরদারির বাইরে ছিলেন না, তা বুঝতে পারা যায় তাঁর চিঠি তাঁকে স্বনামে না দিয়ে স্যার জগদীশের নামে দেওয়ার জন্যে মিস ম্যাকলাউডকে অনুরোধের ভিতর দিয়ে।কোনো কোনো মহল থেকে আমাদের জাতীয় আন্দোলনের সময়কালে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু নিস্পৃত ভূমিকা পালন করেছিলেন-- এই রকম অপপ্রচার করা হয়।মজার কথা হলো সশস্ত্র বিপ্লববাদী কাজে নিবেদিতার সক্রিয় সহযোগী স্যার জগদীশ ও কৌশলগত কারণেই বিপ্লবাত্মক কাজের সঙ্গে নিজের সংযোগের বিষয়ে গোয়েন্দাদের চোখ এড়াতেই অবলম্বন করতেন যথেষ্ট সতর্কতা।১১ ই মে ১৯০৯ সালে মিস ম্যাকলাউড কে লেখা চিঠিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, স্যার জগদীশকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিতে নিবেদিতা সম্বোধন করছেন" খোকা" নামে। আবার ওই বছরের ই ২৬ শে জুন রাটক্লিফ কে নিবেদিতা লিখছেন;
( সেই সময়ে তিনি ইউরোপ থেকে ফিরছেন) " আশাকরি বৃহষ্পতিবার রাতেই মার্সেলিজের দিকে যাত্রা শুরু করতে পারবো।এস এস ইজিপ্ট জাহাজটা ছাড়বে সকাল দশটা নাগাদ।সেখানে বা যাওয়া- আসার পথে সব চিঠিপত্র দেবে ' হিমসেলফে' র নামে এবং তাঁর ই ঠিকানায়( এই ' হিমসেলফ ' হলেন স্যার জগদীশ-গৌরা) ।আমার মনে একটা ব্যাপার ভিড় করে আছে যে, কলকাতা থেকে পাঠানো চিঠিপত্র খুব পরিষ্কার করে, আমাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে লেখা একদম ঠিক না।কলকাতা থেকে পাঠানো চিঠিপত্রে সব বিষয়গুলি যেন খানিকটা অস্পষ্ট ভাবেই থাকে।"

রাটক্লিফ কে লেখা নিবেদিতার এই চিঠি থেকেই পরিস্কার যে, নিবেদিতার বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে স্যার জগদীশ কতোখানি সহায়ক ছিলেন।নিবেদিতার যাবতীয় চিঠিপত্র তখন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা খুলে পড়ছে।বহু ক্ষেত্রে ই চিঠিগুলি নানা রকম কাটা ছেঁড়ার পর সেগুলি নিবেদিতার হাতে এসে পৌঁছচ্ছিলো।তাঁর এই আশঙ্কা ও অনুমানের কথা নিবেদিতা খুব স্পষ্ট ভাবেই মিসেস উইলসনকে লিখছেন ১৯০৯ সালের ১ লা জুলাই।সেই চিঠি তে তিনি " হিমসেলফ" ছদ্মনামের আড়ালে স্যার জগদীশকে তাঁর সব চিঠি পাঠাবার নির্দেশ দিচ্ছেন।তারপর শ্রীমতী ক্রিস্টিনকে চিঠির কোণে ২ সংখ্যা লিখে চিঠি দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন( যেমন নির্দেশ তিনি মিস ম্যাকলাউডকে সেই বছরের ই ১৫ ই মে দিয়েছিলেন) ।মিসেস উইলসনকে লেখা এই চিঠিতে খুব পরিস্কার ভাবেই নিবেদিতা লিখছেন;" গ্রিন্ডলের মারফতে চিঠিগুলো পাঠালে নিরাপদে আসতে পারে সে গুলো।কারণ; চিঠিগুলো হারিয়ে যাক বা খুলে পড়া হোক-- তা আমি কোনোমতেই চাই না।"

এই " হারিয়ে যাক" বলতে কি চিঠিগুলি গায়েব হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনার কথাই নিবেদিতা ওই চিঠিতে বলতে চেয়েছিলেন? ওই চিঠিতেই নিবেদিতা লিখছেন;" ১৬ ই জুলাই নামবো বোম্বাইতে।ক্রিস্টিন বলেছে বোম্বাইতে দেখা করতে আসবে।২০ তারিখ নাগাদ কলকাতায় পৌঁছবার কথা।চিঠিপত্র সব পাঠাবে ডঃ বসুর ঠিকানাতে।ভিতরে থাকবে আমার নাম।" নিবেদিতাকে কেন এতোখানি সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়।ইউরোপে থাকাকালীন তাঁর চিঠিপত্রে যেটুকু ঢিলেমি ছিল তার বিন্দুমাত্র যে ইউরোপত্যাগের পর করা চলবে না তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিবেদিতা জানিয়ে দিচ্ছেন রাটক্লিফ দম্পতিকে ১৯০৯ সালের ১ লা জুলাই লেখা একটি চিঠির মাধ্যমে।শ্রীমতী ওলি বুলকে ১৯০৯ সালের ই ২২ শে জুলাই লিখছেন;" চিঠিপত্রে আমার নামটি পর্যন্ত উল্লেখ করো না।আমি চুপচাপ রয়েছি। বাইরে বেরোবার চেষ্টা পর্যন্ত করছি না।"
ভগিনী নিবেদিতা তাঁর চিঠিপত্রের উপর ব্রিটিশ সরকার জোরদার নজরদারি চালাচ্ছে অনুমান করে পোস্ট মাস্টার জেনারেল কে একটি চিঠি দেলেন।অত্যন্ত চ্যাঁছাছোলা ভাষায় লেখা সেই চিঠিটি লিখেছিলেন নিবেদিতা।সেই চিঠিতে অত্যন্ত সাহস , ব্যঙ্গ এবং শ্লেষের সঙ্গে নিবেদিতা লিখছেন;" আমার বোনের বাচ্চাকাচ্চাদের এবং বোনেদের রান্নাবান্নার গোপন খবরাখবর সম্বন্ধে আপনার অধস্তন কিছু কিছু কর্মচারী আজকাল অত্যন্ত বেশি রকমের কৌতুহল বোধ করছেন।আপনার অধিনস্থ কর্মীদের সেই কৌতুহলের বিষয়টা জানবার পর থেকেই আমি খুব সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারছি।চিঠিগুলো সব খুলে দেখা এবং পড়বার পর আবার যদি সেই চিঠিগুলিকে বন্ধ করে আমার কাছেই পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আপনি আপনার অধস্থন কর্মচারীদের অনুগ্রহ করে দেন, তাহলে আমি খুব ই কৃতজ্ঞ হবো।আপনারা এই সময়ে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা একান্তভাবেই আমার কাছে বিরক্তির সৃষ্টি করছে।আপনাদের এই পদ্ধতির জন্যে আমার প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র ও সব হারিয়ে যেতে বসেছে।এই যে অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার থেকে আমি পরিত্রাণ চাইছি।
আজ সকালেই একটি চিঠি আমি পেয়েছি। সকালে পাওয়া সেই চিঠিটিই গোটা পরিস্থিতি বোঝবার জন্যে আমি আপনার কাছে পাঠাচ্ছি।এই চিঠিটি আমি যে আকারে পেয়েছি, সেই আকারটি অক্ষুন্ন রাখতে আমাকে যথেষ্ট পরিমাণে বেগ পেতে হয়েছে।এছাড়াও আমার অভিযোগের একটা দীর্ঘ তালিকা রয়েছে।আমি আজকাল যেসব চিঠিপত্রগুলি পাচ্ছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ই দেখতে পাচ্ছি যে, সেইসব চিঠিগুলোর প্রথম পাতাটি ছেঁড়া।সাহিত্যিক রচনা সমূহ যেগুলি আমি পাচ্ছি সেগুলির উপরের মোড়কটি অদ্ভূত ভাবে ছেঁড়া অবস্থায় গোটাটা আমার হাতে আসছে।আমি এটা আশা করছি যে, এই যে চিঠিটি একটি নকল রেখে আমি আপনার কাছে পাঠাচ্ছি, সেটি সরাসরি ই আপনার হাতে গিয়ে পৌঁছবে।" ( এই চিঠিটি পোস্ট মাস্টার জেনারেলকে নিবেদিতা লিখেছিলেন ১৯১০ সালের ১৭ ই এপ্রিল।)
তার আগের বছর , অর্থাৎ ১৯০৯ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর রাটক্লিফ দপ্ততিকে নিবেদিতা লিখছেন;
" আমাকে যদি চিঠিপত্রে সব সময়ে তুমি '২' নম্বর ক্রমিকটি লিখে চালিয়ে দাও, তাহলে খুব ই কৃতজ্ঞ থাকবো।এই ভূমিকাটাই চমৎকার হবে।এডেন থেকে বোম্বাই অবধি ' পি অ্যান্ড ও' কোম্পানির ফার্স্ট ক্লাস কেবিনটি ই আমাকে ব্যাপার- স্যাপার গুলো সব বুঝিয়ে দিয়েছে।সেখানে দশ থেকে পনের জনের মতো লোক সব চিঠিপত্রগুলো নিয়ে দারুণ খাটছে।রেজিস্টার্ড চিঠি ও আর নিরাপদ নয়।রেজিস্টার্ড চিঠিকেও আর ছাড়ছুড় দেওয়া হচ্ছে না।বিভিন্ন ধরণের লোকজন সব নিয়োগ করা হয়েছে।নানা সময়ে আমি ঘরটার সামনে দিয়ে গিয়েছি।যাতায়াতের পথে দেখেছি উঁচুদরের কেরানীদের একজন চিঠিপত্র সব উঁচুতে তুলে মনযোগ দিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে চলেছে।সেভাবে নিরীক্ষণ করে তারা দেখছে যে, ওই চিঠিটি খুলে পড়বার দরকার আছে কি না, সেই সম্পর্কে।"

রাটক্লিফ দম্পতিকে পরের বছর ১৯১০ সালের ১৭ ই ফেব্রুয়ারি নিবেদিতা লিখছেন;" এই ঠিকানা কেন আমি ব্যবহার করি না , তা তোমাকে আলাদা ভাবে ব্যাখ্যা করে বোঝাবার নিশ্চয় ই তেমন কোনো প্রয়োজন আর নেই।যতোক্ষণ না তোমাকে শহরের কোনো নিরাপদ মানুষের হাত দিয়ে চিঠিগুলো ফেলবার ব্যবস্থা না করতে পারি ততোক্ষণ যেন এই ঠিকানার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি।এইসব কারণেই কেটি ( শ্রীমতী রাটক্লিফ) তাঁর বিয়ের আগে যে ঠিকানাতে থাকতো , সেই ঠিকানাতে তোমাকে চিঠি পাঠাই।এছাড়াও অন্য উপায়ে তোমাকে চিঠি পাঠাই।যখন ই নোতুন কোনো বিপ্লবাত্মক ঘটনা ঘটে তখন ই যেন কর্তৃপক্ষ বেশ ভালোরকমের একটা নয়া উৎসাহ নিয়ে ডাক ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটাতে কাজে নেমে পড়ে।মজার কথা হলো , সেই সময়ে আমার সব মানুষজনেরা, আমার সব বোনেরা কেমন যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন।"
সেই বছরের ই এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখে এই রাটক্লিফ দম্পতিকে নিবেদিতা যে চিঠিটি লেখেন , সেটির থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি লোকমাতা নিবেদিতার কর্মকান্ডের উপরে কি ভয়ানক গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়েছিল। নিবেদিতা রাটক্লিফ দম্পতিকে লিখছেন;" কয়েক সপ্তাহ আগে আমি একটা চিঠি পেয়ে বেশ অবাক হয়ে গেলাম।ভাবতেই পারবে না যে, আমার সেই চিঠিটির একটা কোনা এমন ভাবে ছেঁড়া হয়েছে যে সেই চিঠিটা আমি পোস্ট মাস্টার জেনারেলকে পর্যন্ত পাঠিয়ে আমার অভিযোগ জানিয়েছি। পোস্ট মাস্টার জেনারেল কে সেই ছেঁড়া চিঠি পাঠিয়ে আমি অনুরোধ করেছি যে, আমার সব চিঠিপত্রগোলি খুলে পড়ে তারপর সেগুলি আবার মুখবন্ধ করে আমার কাছে পাঠাবার জন্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশ যেন তিনি তাঁর অধস্তন কর্মচারীদের ভালোভাবে দিয়ে রাখেন।
পোস্ট মাস্টার জেনারেল আমার কাছে রেজিস্টার্ড চিঠিতে তাঁর জবাব পাঠিয়েছেন।আর একজন ব্যক্তির কাছে ও পাঠিয়েছেন।তাঁদের কাছ থেকেই সবকিছু আমি সঠিক ভাবে জানতে পেরেছি।আমার নাম যে বিদ্রোহী বা সন্দেহভাজন মানুষদের তালিকায় প্রকাশ্যে এবং সরাসরি এই মুহুর্তে যুক্ত হয় নি-- সে কথা ও আমি জেনেছি।তবে এটা বুঝেছি যে, এই পোস্ট মাস্টার জেনারেল তাঁর লোকজনদের মাধ্যমে ট্রেনে, জাহাজপথে বা অন্যকোনো উপায়ে এইসব চিঠিপত্রের উপর হস্তক্ষেপের ব্যাপারে কার্যত কোনো ই ক্ষমতা রাখেন না।তাঁদের এই অবস্থাটা আমি বেশ ভালো রকম ই হৃদয়ঙ্গম করতে পারছি বলা যেতে পারে।তবে তাঁদের অবস্থাটা বুঝতে পারলেও আমার চিঠিপত্র সম্পর্কে ঠিক মতো নিশ্চিন্ত হয়েছি-- এ কথা বলতে পারি না। যদি কখনো তোমার আমাকে বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিঠি বা অন্য কিছু পাঠাবার দরকার হয়, তাহলে তুমি সেগুলো খুব ভালোভাবে সিল করে সেসব আমার প্রতিনিধির হাতে দিও।আমার প্রতিনিধিদের আমি বলে দেবো, তাঁরা যেন জানান যে, আমি নিজে র হাতে সেইসব জিনিষ গুলো গ্রহণ করবো। সেটি পাঠাবার জন্যে তাঁরা ডাকটিকিট চাইতে পারে ,তবে কি না ইংলন্ডের ডাক টিকিট হলে পড়েও চলবে। এটা বলছি , যদি কোনো বিশেষ রকমের জরুরি কোনো বিষয় ঘটে তবে কেবলমাত্র তার ই জন্যে।"

রাটক্লিফ দমপতিকে লেখা নিবেদিতার এই চিঠি থেকেই বুঝতে পারা যাচছে যে, ব্রিটিশের নজরদারি থেকে বাঁচতে তাঁকে কি ধরণের সতর্কতার ভিতরে কেবল ভারতের মাটিতেই নয়, ইউরোপেও দিন কাটাতে হতো।এই চিঠির অল্প কিছুদিন পরেই মিঃ রাটক্লিফ কে লেখা একটি চিঠিতে ব্রিটিশের গুপ্তচরবৃত্তির প্রতিবাদে আরো দীপ্ত কন্ঠে লেখেন;" একটা চিঠি আর একটা পোস্টকার্ড এক সপ্তাহে আমার কাছে এসে পৌঁছিয়েছে।সবটাই একসঙ্গে আমি পেলাম।এমন হওয়ার কারণ এই যে , যে ঠিকানা রয়েছে, সেই ঠিকানা আমি কখনোই ব্যবহার করি না( ওই চিঠিতে বাগবাজারে ভগিনী নিবেদিতার যে বাসভবন, ১৭ নমবর বোসপাড়া লেনের উল্লেখ ছিল।সতর্কতার কারণে সাধারণ ভাবে নিবেদিতা ওই ঠিকানা কখনোই ব্যবহার করতেন না- গৌরা) ।শহরে যদি নিরাপদ কারো হাতে চিঠিটি পেয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা থাকে, তাহলেই আমি এখানকার ঠিকানাটা ব্যবহার করি।ওই সময়ে আমি খুব আশ্চর্য বোধ করে চিঠি গুলো নেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম।কোনো পরিচারক উৎসুক হয়ে উঠতেই পারে গোপন ব্যাপার স্যাপার সম্পর্কে।এসবের ভার তো কোনো ভদ্রলোকের উপরেই দিতে হবে।" ( চিঠিটি ১৯১০ সালের ৬ ই জুলাই নিবেদিতা লিখেছিলেন) । পরিস্থিতি এতোটাই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল যে, শ্রীমতী রাটক্লিফের কাছে শ্রী রাটক্লিফের উদ্দেশে নিবেদিতা যে চিঠিটি ওই দিন লিখেছিলেন তাতে খুব স্পষ্ট ভাষাতেই তিনি জানিয়েছিলেন যে, রাটক্লিফ কে যে চিঠি তিনি লিখছেন সেই চিঠির নীচে কোনো অবস্থাতেই তিনি তাঁর নিজের নাম লিখবেন না।সেই চিঠিটা যাতে শ্রী রাটক্লিফকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তেমন অনুরোধ ওই চিঠির মাধ্যমেই শ্রীমতী রাটক্লিফ কে নিবেদিতা করেছিলেন।

শ্রী রাটক্লিফকে নিবেদিতা লিখছেন; কলকাতার পোস্ট আপিস কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃত ভাবে বিশ্বাসভঙ্গের কাজ করছে বলে তিনি সরাসরি মনে করছেন না।তিনি লিখছেন;" পুলিশশের কাছে যেখানে কোনো ব্যক্তি বিশেষের চিঠি পাঠাবার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা না থাকে, সেখানে কিন্তু জাহাজী পোস্টাপিসে এই চিঠি খোলার কাজটি হয়( এই প্রসঙ্গে জাহাজে চিঠি খোলা নিয়ে নিবেদিতার ব্যক্তি অভিজ্ঞতার কথা এই নিবন্ধের শুরুতে বর্ণনা করা আছে)। আমার নিশ্চিত ধারণা এই যে জাহাজী পোস্টাপিস সাধারণ মানুষদের দ্বারা পরিচালিত হয় না।আমি নিশ্চিত যে, একদম পেশাদার গোয়েন্দারাই জাহাজী পোস্টাপিস গুলি সম্পুর্ণ ভাবে পরিচালনা করে থাকেন।তবে এই জাহাজী পোস্টাপিসগুলি পেশাদার গোয়েন্দাদের দিয়ে পরিচালনা করবার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ গোটা ব্যাপারটা কতোখানি মন থেকে সমর্থন করেন-- সে সম্পর্কে আমার একটা ধন্দ কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকেই যাচ্ছে।এখানকার পোস্ট মাস্টার জেনারেল তো ট্রেনে চিঠি খোলা বন্ধ নিয়ে এক্কেবারে সরাসরি হাত তুলে নিয়েছেন।বড়বাজারে তো হরবখত চিঠিপত্র চুরি হয়।পোস্টমাস্টার জেনারেল এই বড়বাজারে চিঠি চুরি সম্পর্কে সব কিছু করেও কেমন যেন হতবুদ্ধি হয়ে যান।হয়তো সহজ বিশ্বাসেই পোস্ট মাস্টার জেনারেল সব কথা বলেন।" নিবেদিতা এখানে ই তাঁর এই চিঠিটি শেষ করে শেষে কেবলমাত্র একটি " কিন্তু" শব্দটি এঁকে রেখেছিলেন( চিঠি ১৯১০ সালের জুলাই মাসের ১৯ এবং ২০ তারিখ ধরে লেখা হয়েছিল!) ।

এই সময়কালে পরিস্থিতি এতোটাই জটিল হয়ে উঠতে শুরু করে যে নিবেদিতার অনুগামী ধরে নিয়ে শ্রীমতী উইলসন এবং আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর উপর খানা তল্লাশীর সম্ভাবনা ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠেছিল।সেই সম্ভাবনার কথাই লিখছেন শ্রীমতী উইলসনকে নিবেদিতা;"( চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯১০ সালের ২২ শে সেপ্টেম্বর তারিখে) আমি ভাবছি যে বেশ কতকগুলো পুরনো ডাইরি পাঠিয়ে দেবো তো।মার কাছে।অন্যান্য সব ডাইরির সঙ্গে বেশ একটু সাবধান করে এই ডাইরি গুলোকে একটু যত্ন করে তুমি রেখে দেবে।মিন্টোরা চলে যাবার আগেই যদি এইসব কাগজপত্রগুলো ঠিকঠাক তোমাদের হাতে পৌঁছে যায় , তাহলে অনেকটাই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।যদি তেমন কিছু সত্যি সত্যি ই ঘটে তাহলে আমি কিন্তু চাইবো অন্যদের উপর তল্লাশি না হয়ে তোমার বা ডাঃ বসু বা ক্রিস্টিনের উপরেই তল্লাশির খাড়াটা নেমে আসুক।"

শ্রীমতী ম্যাকলাউডকে লেখা পরের একটি চিঠিতে নিবেদিতা স্যার জগদীশের ও ছদ্মনাম ব্যবহার করছেন।তিনি লিখছেন;" খোকাকে এই কথা বলতে যে , সে যেন ক্রিস্টিনকে বলে খোকাই ব্যাঙ্ককে যা নির্দেশ দেওয়ার দেবে।মোড়কের ভিতরে তাঁদের নামে পাঠানো চিঠি ও খোকার কাছেই পাঠাতে হবে।এটা কিন্তু অবশ্য ই একটা অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়া। এটা আমার এখন বোঝা হয়ে গেছে যে, ক্রিস্টিনকে যে সঙ্কেত আমি দিয়েছিলাম, সেই সঙ্কেত এই চিঠির বিষয়ে আদৌ খাটবে না।তাই এই চিঠিতেই আমি আর একটা নোতুন সঙ্কেত তৈরি করে ক্রিস্টিন কে পাঠাতে চাইছি।" ( এই চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯১০ সালের ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে। চিঠিতে যে " খোকা" উল্লেখ আছে , তিনি ই হলেন স্যার জগদীশ।এই চিঠিতে যে নোতুন একটি সঙ্কেত চিহ্ন উদ্ভাবন করে ক্রিস্টিনকে পাঠাবেন বলে নিবেদিতা লিখছেন,সংশ্লিষ্ট চিঠিটিতে আর শেষপর্যন্ত সেই সঙ্কেত চিহ্ন নিবেদিতা লেখেন নি-গৌরা) । এই চিঠির ঠিক দুমাস আগে ও শ্রীমতী রাটক্লিফকে লেখা একটি চিঠিতে নিবেদিতা লেখেন যে, তাঁর ধারণা তাঁর স্থানত্যাগের পর যদি রাটক্লিফের সাপ্তাহিক কাগজ আসে তাহলে সেই কাগজ খুলবেন স্যার জগদীশ। নিবেদিতা ১৯১০ সালের অক্টোবর মাসের ১৪ তারিখে শ্রীমতী রাটক্লিফকে লেখা এই চিঠিতে অবশ্য স্যার জগদীশকে " হিমসেলফ" বলেই অভিহিত করেছিলেন।

গৌতম রায়


শেয়ার করুন

উত্তর দিন