Gandhi

মহাত্মা এবং সুভাষচন্দ্র বসুঃ একটি আলোকপাত

গান্ধীজী ও সুভাষচন্দ্র: সম্পর্কের খতিয়ান

Gautam-Roy

গৌতম রায়


গান্ধীজী এবং সুভাষচন্দ্রের  ভিতর যে মতপার্থক্য, সেটির সময়কাল কিন্তু দু বছরের কম। কিন্তু তার পরিব্যক্তি সময়কে অতিক্রম করে ,মহাকালের বুকে এক পদচিহ্ন অঙ্কন করেছে। ১৯৩৯  সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ১৯৪১  সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ,অর্থাৎ;  সুভাষ চন্দ্রের অন্তর্ধানের সময়কাল এই মতপার্থক্যের ব্যপ্তি। এই দুটি বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস বহু তিক্ততার আগলে আবদ্ধ।


                           ১৯৩৯ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ভারতবর্ষ এবং বিশ্বের প্রবাহমান রাজনীতি সম্পর্কে ওয়ার্ধার  সেবাশ্রমে গান্ধীজির সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের দীর্ঘ আলোচনা হয়। সুভাষচন্দ্র তখন কংগ্রেস সভাপতি। মনে রাখা দরকার সুভাষচন্দ্র যখন প্রথমবার কংগ্রেস সভাপতি হন, তখন, গান্ধীজীর অনুমোদনক্রমে জওহরলাল নেহরু তাঁর নাম উত্থাপন করেছিলেন।  সকলের বিপুল উৎসাহের মধ্য দিয়ে সেই নাম সমর্থিত হয়েছিল ।


                      ঘটনার অল্প সময়ের ভেতরেই গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক পর্যায়ক্রমে একটা বড় রকমের পরিবর্তন দেখা দেয় যা ভারতবর্ষের রাজনীতিকে ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করবার ইঙ্গিতবাহী ছিল। সুভাষচন্দ্র তাঁর অতীতের ইউরোপ অবস্থানকালের  অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন যে, জার্মানির পক্ষ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটা জোরদার প্রস্তুতি চলছে। জার্মানির এই শক্তি সঞ্চয়ের  বিষয়টি যে অন্য দেশগুলোর কাছে অজানা নয় সেটি সুভাষচন্দ্র বুঝেছিলেন। ফ্রান্স , সোভিয়েট ইউনিয়ন, ইতালি, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশগুলি নানা আতংকের ভেতর দিয়েও  যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটা উপলব্ধি করেই  সুভাষচন্দ্র মনে করেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ ভারতবর্ষকে নিতে হবে পরাধীনতার শৃংখল মুক্তির জন্য। এটা ভারতবর্ষের সামনে একটা বড় রকমের সুযোগ। পরাধীন জাতির কাছে শত্রুর  শত্রু ,তার মিত্র, রিয়েল পলিটিক্সের এই সূত্র সুভাষ চন্দ্রের কাছে খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল।


                     আর গান্ধীজী শত্রুর বিপদের  সুযোগ নেওয়া র বিষয়টিকে কোনো অবস্থাতেই অহিংসার আদর্শ হিসেবে পরিগণিত করতে পারেন নি। জওহরলাল ও তৎকালীন ফ্যাসিবিরোধী প্রগতিবাদীদের অভিমত ছিল যে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সঠিক কাজ নয়, যা ফ্যাসিবাদি হিটলারের পক্ষে যায়। কারণ; ভারতবর্ষে যে ফ্যাসিবিরোধী চিন্তা-চেতনা অঙ্গীভূত হয়েছিল সে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি রাখার প্রতি তাঁরা  সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে যাচ্ছিলেন।


                    '৩৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি গান্ধীজির সঙ্গে বৈঠকে সুভাষচন্দ্র প্রস্তাব রাখলেন, অবিলম্বে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতের স্বাধীনতার দাবি একটি আল্টিমেটাম হিসেবে রাখা হোক, এবং সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেশকে আইন অমান্য আন্দোলন ও সত্যাগ্রহের জন্য প্রস্তুত করা হোক। গোটা নেতৃত্ব গান্ধীজী নিজের হাতে তুলে নিন ।


                  দেশের সাতটি রাজ্যে তখন কংগ্রেস সরকার। ব্রিটিশের  পক্ষ থেকে গোটা দেশের জন্য কেন্দ্রীয় ফেডারেশানের প্রস্তাব ইতিমধ্যেই উপস্থাপিত হয়েছে। ফেডারেশনে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত একটা স্পষ্ট রূপ নিলেও ,কংগ্রেসের ভেতরকার দক্ষিণপন্থী এবং সংগ্রাম বিরোধী অংশ, তাঁরা কিন্তু ফেডারেশানের প্রস্তাব একটু অদল-বদল করে নেওয়ার  লোভ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে পারছিলেন না ।


              ব্রিটিশের  সঙ্গে একটা আপসের  ভেতর দিয়ে দিল্লিতে শাসন ক্ষমতায় বসার প্রতি তাঁদের একটা মোহ কিন্তু তৈরি হয়ে গিয়েছিল তখন। যে সাতটি রাজ্যে কংগ্রেস সরকার পরিচালনা করছিল সেখানকার মন্ত্রীরাও ক্ষমতা ভোগে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে নেমে এসে ,আবার সংগ্রামের রাস্তায় আসার পক্ষে তাঁরা আদৌ রাজি ছিলেন না। ব্রিটিশের পক্ষ থেকেও নানা ধরনের দালালদের রাজনীতির আসরে  নামিয়ে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের  কার্যক্রমকে ওলট-পালট করে দেওয়ার একটা ভয়াবহ চেষ্টা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল।
                        এই পরিস্থিতির মধ্যেই পন্থ প্রস্তাব রাজনীতির সামগ্রিক প্রেক্ষাপটটিকে বদলে দেয়। এই প্রস্তাবটি ত্রিপুরী কংগ্রেসের সামনে উপস্থাপিত করা হয় এবং সেটি ভোটে জিতে যায়। সুভাষচন্দ্রের পক্ষের লোকেরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতায়  পরাজিত হয়। ব্রিটিশ এই সময়ে সুভাষচন্দ্রের অনুগামীদের উপর নানা ধরনের অত্যাচার চালিয়ে কংগ্রেসের ভেতরের বিভাজন প্রক্রিয়াকে তীব্র করে তোলার জন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করে। এই চেষ্টার একটি বড় পর্যায় হলো;  বিহারের বিখ্যাত কৃষক নেতা স্বামী সহজানন্দকে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে, কংগ্রেসের সঙ্গে সুভাষ চন্দ্রের দূরত্ব এবং গান্ধীজির সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের দূরত্ব তৈরিতে  ব্রিটিশ  প্রাণপণ শক্তিতে আত্মনিয়োগ করে।


                   কংগ্রেস সোস্যালিস্ট  নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণকে বন্দি করা হয়। এই বন্দিদশা থেকে জয়প্রকাশ গোপনে লোক মারফত সুভাষচন্দ্র কাছে একটি দীর্ঘ চিঠি পাঠিয়েছিলেন। যেখানে জয়প্রকাশ তাঁর ভুল স্বীকার করে, সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে কতগুলি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। দুঃখের বিষয় হল;  জয়প্রকাশের এই চিঠি যখন সুভাষচন্দ্রের হাতে পৌঁছোয়, তখন তাঁর দেশ ত্যাগ করে, বিদেশে গিয়ে সশস্ত্র পদ্ধতিতে ব্রিটিশ বিরোধী অভিযানের সমস্ত পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে।


                       তাই সুভাষচন্দ্রের পক্ষে জয়প্রকাশ চিঠি কে কেন্দ্র করে আর নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভবপর হয়নি। একথা মনে রাখা দরকার যে;  জাপানে চলে গিয়ে আজাদ হিন্দ  ফৌজ পুনর্গঠন করে, রেডিও মারফত যখন প্রথম বক্তৃতা করেন সুভাষচন্দ্র, সেখানে তিনি প্রথমেই গান্ধীজিকে তাঁর প্রণাম জানিয়ে, ভারতের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের ঘোষণা করেছিলেন।


                     আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার বহু তিক্ততার পরেও সুভাষচন্দ্র কিন্তু টোকিও থেকে তাঁর প্রথম বক্তৃতাতে সবার আগে গান্ধীজিকে স্মরণ করেছিলেন। এমনকি তাঁকে,'জাতির পিতা' বলে সম্মোধন করতে এতটুকু দ্বিধান্বিত  হন নি।


                অপরপক্ষে গান্ধীজী এবং সুভাষচন্দ্রের ব্যক্তিগত ভক্তেরা এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের ভেতর সংঘাত ঘিরে ইতিহাসবোধের  প্রকৃত সত্ত্বা থেকে সরে গিয়ে ,বহু মনগড়া তত্ত্বের অবতারণা করলেও ,ব্যক্তি গান্ধী, কিন্তু ব্যক্তি সুভাষচন্দ্রের প্রতি তাঁর স্নেহ- ভালোবাসা কোন দিনের জন্য সংকুচিত করেননি। এমনকি সুভাষ চন্দ্রের মৃত্যু ঘিরে গান্ধীজী চরম সংশয়ী পর্যন্ত ছিলেন।


                 এই পর্যায়ে, এই দুই মহান নেতৃত্বের  ভেতর রাজনৈতিক বিরোধের  প্রভাব  জনিত বিষয়গুলি আমাদের একটু ভেবে দেখা দরকার। পন্থ প্রস্তাব সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর মতামত চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। গান্ধীজীর তখন রাজকোট সমস্যা ,সেখানকার সত্যাগ্রহ' এবং সেই কারণ জনিত অনশন ইত্যাদি ব্যাপার নিয়ে যথেষ্ট ব্যস্ত এবং তিনি তখন অসুস্থ। গান্ধীজীর সম্পূর্ণ অগোচরে একাংশের দক্ষিণপন্থীরা এই প্রস্তাব ঘিরে এমন একটি প্রচার চালিয়েছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল যে ,গান্ধীজিকে দেখিয়ে ,তাঁর সম্মতিক্রমে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে ।


                    বাস্তবে কিন্তু আদৌ তা হয়নি। প্রস্তাবটি উত্থাপিত হওয়ার অনেক পরে এলাহাবাদে এসে গান্ধীজী সেটি দেখেন। সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয়বার কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার পর গান্ধীজি যখন রাজকোট নিয়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে রয়েছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে যথেষ্ট অসুস্থ, সেই রকম একটি পরিস্থিতিতে  গান্ধীজীর এক অনুগামী তাঁকে বলেন; কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের মান সম্মান রক্ষার জন্য একটি প্রস্তাব অনুমোদন করা হবে। সেই প্রস্তাবটি যে আদৌ পন্থ প্রস্তাব, সে ব্যাপারে গান্ধীজী কোন রকম কিছু জানতেন না।


                     প্রস্তাবটির  বিষয়বস্তু কিছু না জেনেই গান্ধীজি সেই প্রস্তাব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে আপত্তিজনক কোন কথা বলেননি। এরপরে সুভাষচন্দ্র যখন একাধিকবার গান্ধীজীর এই প্রস্তাব  সম্পর্কে স্পষ্ট মতামত দাবি করেন, তখন '৩৯  সালের ১০ ই এপ্রিল রাজকোট থেকে একটি চিঠিতে গান্ধীজি খুব পরিস্কার ভাবে বলে দেন ; পন্ডিত পন্থের প্রস্তাব আমার দ্বারা ইন্টারপ্রেট করা নয়, প্রস্তাবটিকে আমি যত অনুধাবন করেছি, তার থেকে বেশি এটিকে অপছন্দ করেছি।


                   এই অবস্থায় কংগ্রেসের সংবিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক এই প্রস্তাবটি কে কংগ্রেস সদস্যদের সম্মান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দিক থেকে বিচার করে ,সেটির অনুমোদনের ক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্র কোনরকম অন্তরায় হয়ে দাঁড়ান নি। এই প্রস্তাব অনুযায়ী কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির নতুন সদস্যদের বেছে নেওয়ার পূর্ণ অধিকার গান্ধীজীর হাতে অর্পণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অধিকার নিজের হাতে তুলে নিতে গান্ধীজী কোন অবস্থাতে সম্মত ছিলেন না। গান্ধীজি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন;  সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে নিজের পছন্দ অনুযায়ী নতুন সদস্য মনোনীত করে নেবেন এবং অকুতোভয়ে  নিজের কর্মসূচি অনুযায়ী কংগ্রেস এবং দেশকে পরিচালিত করতে অগ্রসর হবেন।


                         এই অবস্থায় সুভাষচন্দ্র বুঝেছিলেন যে;  কেবল তাঁর নিজের পক্ষের লোক আর বামপন্থীদের নিয়েই যদি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি তিনি তৈরি করেন ,তাহলে কংগ্রেসে একটি বড় ধরনের ভাঙন নেমে আসবে। আর তার ফলে দেশের ক্ষতি হবে। পন্থ প্রস্তাব সম্পর্কে  একাধিকবার  গান্ধীজীর কাছে তাঁর  মনোভাব জানতে চাওয়ার পর, গান্ধীজি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় '৩৯  সালের ১০ ই এপ্রিলের  চিঠিতে বলেছিলেন;


                আমাকে কেউ তোমার বিরুদ্ধে নিযুক্ত করেনি। সেবাগ্রামে আমি তোমাকে যা বলেছিলাম ,তা সম্পূর্ণভাবে আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। তুমি যদি মনে করো যে, তোমার একজন একক, ব্যক্তিগত শত্রু এই বৃদ্ধটির মধ্যে লুকিয়ে আছে, তাহলে তুমি তোমার মূল্যায়নে খুব ভুল করছো।

Mahatma-Gandhi


                    এই পরিস্থিতির ভিতরে ১৯৩৯  সালের ১৭ই  এপ্রিল জামাডোবা থেকে ইংল্যান্ডে  অবস্থানকারী ভাইপো অমিয়নাথ  বসুকে সুভাষচন্দ্র যে চিঠি লেখেন ,সেই চিঠিতে জওহরলাল নেহরুর প্রতি নিজের  ব্যক্তিগত অসূয়া স্পষ্ট করে তুলেছিলেন। সুভাষচন্দ্র ,নেহরুর  সাথে নিজের অবস্থানকে বর্ণনা করেছিলেন;  ত্রিপুরির সেই বৃদ্ধ পাহারাদারের সঙ্গী হিসেবে । স্পষ্টতই তিনি বলেছিলেন নেহেরু নাকি সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ভাবে নেতিবাচক প্রচারে লিপ্ত রয়েছেন।


                        নেহেরুকে লেখা সুভাষচন্দ্র চিঠিটি থেকে খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা যায় যে ; নেহরুর  সঙ্গে একটা বড় রকমের ব্যক্তিত্বের সংঘাতে নিজেকে লিপ্ত করে ফেলেছিলেন সুভাষচন্দ্র। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিরোধের  থেকেও অনেক ঊর্ধ্বে ব্যক্তিত্বের সংঘাতে এই দুই রাজনীতিক পরস্পর পরস্পরের মধ্যে জড়িয়ে পড়ার ফলে, ভারতের রাজনীতির তৎকালীন গতিপ্রকৃতি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত যে হয়েছিল, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই ।


                    গান্ধীজীর যে গভীরতম লক্ষ্য ছিল বিশ্বের লড়াইয়ের ইতিহাসে একটি নতুন হাতিয়ার হিসেবে অহিংসাকে উপস্থাপিত করা, একটি সংগ্রামের নতুন অভিমুখ রচনা করা, যার নাম অহিংস সংগ্রাম, সেই লক্ষ্যে সুভাষচন্দ্রের আস্থার জায়গায় যে দোদুল্যমানতা ছিল, সেই বিষয়টিকে যদি আমরা আমাদের বোধের মধ্যে উপস্থাপিত না করে, এই দুই রাজনীতিকের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে ইতিহাসের প্রতি আমরা সুবিচার করব না।


                    রাজকোটের প্রজা আন্দোলন এবং সেই উপলক্ষে গান্ধীজীর যে অনশন, কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে কিন্তু সুভাষচন্দ্র সেটিকে কখনোই ভালো চোখে নিতে পারেননি ।এমনকি রাজকোটের ঘটনাবলী সম্পর্কে তৎকালীন বড়লাটের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা বা ফেডারেল কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার মরিস গাওয়ারের  মধ্যস্থতা, সুভাষচন্দ্র অনুমোদন করতে পারেননি। আর রাজকোটের  বিষয় গান্ধীজিও সাফল্য আনতে পারেননি ।


                    এটি সুভাষচন্দ্রের পক্ষে গান্ধীজীর রাজনীতিকে একটি নেতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে  বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল। গোটা দেশের রাজন্যবর্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন না করে, রাজকোটের রাজা ঠাকুর সাহেবের বিরুদ্ধে গান্ধীজীর লড়াই, তার সামগ্রিকতার বিচারে সুভাষচন্দ্র আদৌ পক্ষপাতী ছিলেন না। অথচ গোটা দেশের রাজন্যবর্গের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি প্রতীক হিসেবে যে গান্ধীজী রাজকোটে রাজা ঠাকুর সাহেবের বিরুদ্ধে লড়াইকে তুলে ধরেছিলেন এবং সেখানকার প্রজা আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন, এই বিচার-বুদ্ধির সঙ্গে সুভাষচন্দ্র কখনো নিজের সাযুজ্যতা অনুভব করতে পারেননি। এমনকি রাজকোটে প্রজাদের নিজের দায়িত্ব পালনের পথ থেকে তাদেরকে বিরত রেখে, কেবলমাত্র গান্ধীজি একা তাঁদের হয়ে লড়াই করে, বা অনশন  করে কেন মরে যাবেন-- এটাই ছিল সুভাষচন্দ্র যুক্তি।


                      গান্ধীজীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মূল্যবোধ  এখানেই নিহিত আছে যে , তিনি সর্বসাধারণকে, এমনকি গ্রামের মেয়েদের পর্যন্ত টেনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন সংগ্রামের ময়দানে।  এই সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে কোথায় ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটছে, সেই প্রশ্নে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ থাকলেও, গান্ধীজীর নেতৃত্বে সংগ্রাম দেশের আপামর জনসাধারণকে, আন্দোলন -লড়াইয়ের পথে নিয়ে যেতে সেভাবে উদ্বুদ্ধ করেনি সুভাষচন্দ্রের এই অভিযোগের ইতিহাস গত কোন সার্থকতা আছে কিনা তা আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করে দেখা দরকার।


                 সুভাষচন্দ্র এবং তাঁর দাদা শরৎচন্দ্র ও তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পর্যায়ক্রমের  ক্ষেত্র আলোচনা প্রসঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি মওলানা আজাদকে ঘিরে এমন কিছু অনৈতিহাসিক আলাপ-আলোচনা উঠে আসে ,যা কেবল বিকৃত ইতিহাস ই  নয়, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের প্রশ্নেও  একটি অত্যন্ত নেতিবাচক অধ্যায়।

সুভাষ চন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা, আনুগত্য প্রকাশের ভেতর দিয়ে এক ধরনের বাঙালি শ্যভিনিজমকে চাগিয়ে তুলে ,মওলানা আজাদকে গান্ধীজীর সমর্থক হিসেবে উপস্থাপিত করে, এক ধরনের হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ-সংঘাতের অভিপ্রায় তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের  বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ব্যবস্থা গ্রহণ করবার পর ১৯৪০  সালের ২৩ শে ডিসেম্বর গান্ধীজী কে একটি চিঠি লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র।
                       

সেই চিঠির  জবাবে গান্ধীজী ২৯  শে ডিসেম্বরের চিঠিতে  সুভাষকে  প্রথমেই লেখেন;  ইউ আর ইরেসপনসেবল হোয়েদার ইল অর ওয়েল। সেই চিঠিতে গান্ধীজি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন; আই হ্যাভ নট বিন ইন কনসালটেশন উইথ মাওলানা সাহেব।  সেখানে গান্ধীজী আরো লেখেন;       

বাট হোয়েন আই রিড  ইন দি পেপার এবাউট দি  ডিসিশন আই কুড নট হেলপ  অ্যাপ্রুভিং অফ ইট । আই অ্যাম  সারপ্রাইজড  দ্যাট ইউ ওন্ট  ডিস্টিঙ্গুইস বিটুইন ডিসিপ্লিন এন্ড ইনডিসিপ্লিন।


                তাই গান্ধীজী এবং সুভাষ চন্দ্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টিকে অন্ধ ভাবাবেগের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ না করে, সমসাময়িক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ,অত্যন্ত নিরপেক্ষ ভাবে আমাদের বিচার করে দেখা দরকার। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় সুভাষ চন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের তাগিদ থেকে যেমন অনৈতিহাসিক ভাবে গান্ধীজীর মূল্যায়ন করার একটা প্রবণতা বাঙালি সমাজের মধ্যে রয়েছে ,তেমনিই  পন্ডিত নেহরু সম্পর্কে অনৈতিহাসিক মূল্যায়ন করার একটা প্রবণতা ও বাঙালি সমাজের ভেতরে রয়েছে ।


                  এই প্রবণতা বৃদ্ধিতে সুভাষচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত দল ফরওয়ার্ড ব্লক, যাকে পরবর্তীকালে সেভাবে গুরুত্ব দেয়ার কোন পথেই সুভাষচন্দ্র আর হাঁটেননি, সেই দলটিও অত্যন্ত বড় রকম অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে এসেছে। বস্তুত রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা যেভাবে হিন্দুত্বকে তাদের রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে ,নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করে থাকে, ঠিক তেমন ভাবেই, ফরওয়ার্ড ব্লক সুভাষচন্দ্র কে তাদের রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে গান্ধী এবং পন্ডিত নেহরুর বিরোধিতাকে একটি প্রধান উপজীব্য হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড পাওয়ার চেষ্টা করে ।             

ক্ষমতার রাজনীতির এই পারস্পরিক টানাপোড়েনের দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে ,আমাদের ইতিহাসে এইসকল ঐতিহাসিক ব্যাক্তিত্বদের সম্পর্কে বিচার-বিশ্লেষণ একান্ত জরুরী।

*মতামত লেখকের নিজস্ব


শেয়ার করুন

উত্তর দিন