Jahanara Imam

শহিদ জননী জাহানারা ইমামের জীবন ও কর্মধারা

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের আইকন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম

Gautam-Roy

গৌতম রায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে শহিদ জননী জাহানারা ইমাম( ৩রা মে, ১৯২৯-২৬ শে জুন, ১৯৯৪) একটি ঐতিহাসিক নাম। একজন বিদূষী রমণী কি ভাবে এই উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, যুদ্ধাপরাধের মতো মানবতাবিরোধী কাজের বিরোধী ব্যক্তিত্ব হিশেবে একজন প্রবাদপ্রতিমের জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যোগ্যতা অর্জন করেন, তা বোঝার জন্যে আমাদের দরকার শহিদ জননী জাহানারা ইমামের জীবন ও কর্মধারা পর্যালোচনার।

অবিভক্ত ভারতের মুর্শিদাবাদের কান্দির নিকটবর্তী একটি গ্রামে জাহানারার জন্ম।বিবাহ সূত্রে তিনি ঢাকার বাসিন্দা।বিয়ের পর শিক্ষকতার সূত্রে কিছুদিন বাংলাদেশের উত্তরপ্রান্তে ও তাঁকে থাকতে হয়েছে।অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন।শিক্ষিকা হিশেবে ও তিনি অত্যন্ত সফল এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। ডাকসাইটে সুন্দরী বলে তাঁর নামডাক ছিল।এককালে তিনি ' ঢাকার সুচিত্রা সেন ' বলে সম্বোধিত হতেন।তাঁর প্রথম জীবনের কিছু ছবি দেখলে আজ ও অনেকে অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ভুল করে বসেন।

বিদূষী জাহানারার সঙ্গে রাজনীতির তেমন একটা যোগ তাঁর প্রথম জীবনে ছিল না।তবে সামাজিক, সংস্কৃতিগত ধারার প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে জাহানারার প্রথম জীবন থেকেই গভীর সংযোগ।বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে জাহানারার পূর্ব পাকিস্থানের আমল থেকেই একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল।জাহানারা ইমাম তাঁর ' একাত্তরের দিনগুলি' র পাতাতে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকালে , ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের বক্তৃতার দিনটির ডায়রির অংশ হিশেবে যে ভাবে অগ্নিকন্যা মোতিয়া চৌধুরীর রাজনৈতিক ক্ষিপ্রতা, অনলবর্ষী বক্তৃতার কথা উল্লেখ করেছেন, তা থেকেই বোঝা যায় , নয়ের দশকে নিজের সামাজিক - রাজনৈতিক কর্মকান্ডের প্রকাশ্য স্ফুরণের অনেক অনেক আগেই তিনি কতোটা পরিণত রাজনৈতিক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহ্বানকে তাঁর ও রেসকোর্সের মাঠে মানুষের কাছে তুলে ধরবার পূর্বে অগ্নিকন্যা কি উচ্চ রাজনৈতিক বাঁধনে সুর টিকে বেঁধে দিয়েছিলেন, তার আনুপূর্বিক ইতিহাস যখন জাহানারা ইমাম তুলে ধরছেন, তখন ই বুঝতে হয় সমাজবীক্ষণের কোন গহীনে ডুব দিয়ে তিনি আসন্ন মুক্তিযুদ্ধ কে দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন।এমন গভীর আত্মবিশ্লেষণী মা পেয়েছিলেন বলেই তো তাঁর পুত্র রুমী নিজেকে সঁপে দিতে পেরেছিলেন পাক হানাদারমুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে।

বঙ্গবন্ধুর '৭১ সালের ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতা ঘিরে জাতীয় , আন্তর্জাতিক স্তরে বহু আলোচনা হয়েছে।সেই বক্তৃতার স্বীকৃতি জাতিসঙ্ঘ থেকে পাওয়া গেছে।কিন্তু সেইদিন বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের মাঠে পৌঁছানোর আগে রাজনৈতিক উত্তাপকে মতিয়া চৌধুরী কোন জায়গায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার নিরপেক্ষ বিবরণ জাহানারা ইমাম ব্যাতীত আর খুব অল্প মানুষ ই ব্যক্ত করেছেন।প্রদীপ জ্বালাবার আগে সলতে পাকানো টা যে প্রদীপের আলোর উদ্ভাষণে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেটি জাহানারা ইমাম তাঁর গোটা জীবন ধরে দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটা সার্বিক ভাবে নোতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে তিনি উৎসর্গ করেছেন আপন আত্মজ রুমীকে।মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে নানা কৌশল করে যে চাল, খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, সেসব তুলে দিতে হয়েছে বন্দি নয়মাস সময়কালেই স্বামীর কুলখানির জন্যে।বুক ভেসে গেছে চোখের জলে, তবু দৃঢ়তা হারান নি।সাহস হারান নি। তাই আটের দশকের শেষ লগ্নে যখন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু করলো, তখন সেই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব হিশেবে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নাম প্রস্তাব করলেন সুফিয়া কমাল। বস্তুত উপমহাদেশে পাক হানাদারিত্বের ভিতর দিয়ে যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বকলমে করবার পরিকল্পনা তৈরি করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, মুক্তিযুদ্ধের এক দশকের ও বেশি সময় পরে সেই ষড়যন্ত্রের শিকড় ধরে টান দেওয়া সম্ভব হয়েছিল জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক দালাল নির্মূল সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাধারণ ক্ষমার ভিতর দিয়ে সমস্ত রকমের যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, স্বাধীন- সার্বভৌম  বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এইভাবেই তিনি সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপোষ করেছেন-- বঙ্গবন্ধুর জীবিতাবস্থাতেই তাঁর বিরোধীরা এই প্রচার চালাতো।পাক হানাদারদের বাংলাদেশের প্রতিনিধি রা , যারা প্রকাশ্য ভাবে রাজাকার- আলবদর- আল শামসের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলেও সেই মানসিকতার ই লোক ছিল,বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এই প্রচার ছিল তাদের ই।বামপন্থী বলে নিজেদের পরিচয় দেওয়া একাংশের লোক, যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার পাক বাহিনীর প্রতিই অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ছিল- এই প্রচার তাদের পক্ষ থেকেও জোরদার ভাবে চালানো হয়েছিল।যে কোনো ভাবে বঙ্গবন্ধুর ঐরিত্র হনন করা ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দোসর পাকিস্থানের একমাত্র উদ্দেশ্য।এই কাজে তারা বাংলাদেশের ভিতরে সমমনষ্ক লোকেদের বেছে নিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশে তাঁর জনপ্রিয়তাহানি করে , তাঁর সম্পর্কে কুৎসা রটানো ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য।এই অপপ্রচারের শিকার বহু স্বনামধন্য মানুষ ও হয়েছিলেন।অনেকের ই ধারণা হয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু তাঁর এই সাধারণ ক্ষমার ভিতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাক হানাদার বাহিনীর ভোগ্যবস্তু হিশেবে বাঙালি নারীদের তুলে দিয়েছিল, নিজেরাও তাদের ভোগ করেছিল, সেইসব নরপিশাচদের ও ক্ষমা করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু।যারা খুন লুঠতরাজ ইত্যাদি অপকর্মে যুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে পাক হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করেছিল, সাধারণ ক্ষমার ভিতর দিয়ে তাদের কেও ক্ষমা করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।এইভাবে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পরিকল্পিত মিথ্যাচারের ভিতর দিয়ে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে তাঁকে ঘিরে একটা মিথ্যার কারবার চালু করে এই যুদ্ধাপরাধী, হানাদার পাকিস্থানের ই সমর্থক বাংলাদেশের নাগরিকদের একাংশ।আওয়ামী লীগ সেই সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও এই অপপ্রচারকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করবার পথে তারা হাঁটে নি।আত্মবিশ্বাসের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ তখন অতিরিক্ত নিশ্চিন্ততায় ভুগছিল।ফলে এইধরণের অপপ্রকার বঙ্গবন্ধুর ইমেজে এতোটুকু কালি লাগাতে পারে- এটা স্বয়ং বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি।আর এই বাস্তবতাটাকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারার মাশুল জীবন দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁদের দিতে হয়েছিল।

আটের দশকের শেষে এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে আন্দোলনকে সংহত করতে প্রথমেই তৈরি হয়েছিল গণতদন্ত কমিশন বঙ্গজননী সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে। এই গণতদন্ত কমিশন ই সাধারণ ক্ষমা ঘিরে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে মিথ্যা প্রচারের ফানুস টিকে তথ্য প্রমাণ সহযোগে প্রথম ফাটায়।বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ঘৃণ্য অপপ্রচারকে অসত্য প্রমাণ করতে জাহানারা ইমাম এবং গণতদন্ত কমিশনের সভানেত্রী সুফিয়া কামাল ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।এই মিথ্যার জালকে ভেদ করতে না পারলে পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে অতো বড়ো আন্দোলন, গণ আদালত(২৬শে মার্চ, ১৯৯২) ইত্যাদি সংগঠিত করা যথেষ্ট কঠিন কাজ হয়ে পড়তো।সাধারণ মানুষদের কাছে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পুত্রদ্বয়ের নামে যে অপপ্রচার বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকাকালীন ই চালাতে শুরু করে , সেটা তাঁর সপরিবারে শাহাদাত বরণের পর একদম প্যতিবাদ, প্রতিরোধ হীন ভাবেই কার্যত তারা চালাতে শুরু করেছিল।ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করে পাক হানাদার এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দক্ষিণ এশিয়াতে নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখার রাজনীতি বিশেষ সুবিধা জনক জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছিল।মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কে সব রকম ভাবে সাহায্য করে বাংলাদেশ কে পাকিস্থানের ছায়া উপনিবেশে পরিণত করতে ইসলামিক সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি বিশেষ ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।এই যাবতীয় অপচেষ্টাকে ঘিরে কেবল প্রতিবাদ করাই নয়, প্রতিরোধের সংকল্পে রাস্তায় নামিয়ে আনার কৃতিত্ব গণ তদন্ত কমিশনের সভানেত্রী সুফিয়া কামাল এবং নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক শহিদ জননী জাহানারা ইমামের।   

সুফিয়া কামালের নিজের ও এই সাধারণ ক্ষমা ঘিরে কিছুটা ভুল ধারণা প্রথম দিকে ছিল। বঙ্গবন্ধু যে এই সাধারণ ক্ষমার ভিতর দিয়ে কখনোই নারী হত্যা , ধর্ষণ, লুঠতরাজ, অগ্নি সংযোগের মতো ফৌজদারী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত লোকেদের ক্ষমা করেন নি-- এই বিষয়ে স্পষ্ট অভিমত সুফিয়া কামালের গড়ে ওঠে আটের দশকের শেষ প্রান্তে, নয়ের দশকের সূচনা লগ্নে গণ তদন্ত কমিশনের সভানেত্রী হিশেবে কাজ করতে গিয়ে।পরবর্তীতে এই কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর সুফিয়া কামালের দৃঢ় প্রত্যঅ্যা জাগে যে,বঙ্গবন্ধুকে বিকৃত করতেই কেবলমাত্র সাধারণ ক্ষমা ঘিরে এইধরণের অপপ্রচার চালানো হয়েছিল।এক অপবাদ মুক্ত বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরবার ক্ষেত্রে সহোদরাপ্রতিম শহিদ জননী জাহানারা ইমামের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন