বাংলাদেশ শহীদ বুদ্ধিজীবী

বাংলাদেশের শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা

পাক হানাদার বাহিনী তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঠিক অব্যবহিত আগে , সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে বুদ্ধিদীপ্তবিভাষার লড়াই কে সংগঠিত করতে বুদ্ধিজীবী সমাজ একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন,  সেই বুদ্ধিজীবী সমাজের উপর চরম হামলা  চালিয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ই ডিসেম্বর। বাংলাদেশ জুড়ে স্বাধীন মুক্তবুদ্ধির পক্ষে যে সমস্ত মানুষ  মহান মুক্তিযুদ্ধের বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন  ,  এই দিনে তাঁদেরকে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। বুদ্ধিজীবী সমাজের উপর পাকহানাদার বাহিনীর এই হামলা  কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু  সাহিত্যিক,  সাংবাদিক ,শিল্পী কে হত্যা করা-- এমনটা ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতীয় উপমহাদেশে  যে ঐতিহাসিক লড়াই শুরু করেছিলেন  তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের  মুক্তবুদ্ধির মানুষজনেরা ,  সেই লড়াই যাতে কোনো অবস্থাতেই জয়লাভ করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই , যুদ্ধে নিজেদের চূড়ান্ত বিপর্যয় জানা সত্ত্বে ও , আত্মসমর্পণের অব্যবহিত আগে , বুদ্ধিজীবীদের উপরে এই নির্মম  অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল পাক হানাদার বাহিনী।                  

দেশভাগের পর ১৯৪৭  সালে  পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়কাল থেকেই  ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের বিরুদ্ধে যে সংগঠিত মতবাদ ,সেই মতবাদ , যা মুসলিম জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত , তাকে সমূলে উৎপাটিত করতে এই বুদ্ধিজীবী সমএর যে অবদান, তার প্রতি পাক হানাদারদের অন্যতম প্রতিশোধের কদর্যতা হল এই বুদ্ধিজীবী হত্যা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়কালে আগ্রাসনের যে সমস্ত ষড়যন্ত্র, তাকে সমূলে উৎপাটিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ।                   

এই কারণে বুদ্ধিজীবী সমাজ যাতে কোনো অবস্থাতেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর , সেই দেশের চিন্তা-চেতনা , গণতান্ত্রিক লক্ষ্য , ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে পরিচালিত করতে না পারে , সেই গভীর ষড়যন্ত্র থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতে হানাদার পাকবাহিনী  বুদ্ধিজীবীদের উপর এই নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল। মহান  মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই সঙ্গে  গণতান্ত্রিক চেতনা আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তাও ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের  চেতনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।                       

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই চারটি প্রধান স্তম্ভ কে বিকশিত করার ক্ষেত্রে ,পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টির পর থেকেই, সেই দেশের  মুক্তবুদ্ধির, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্রপ্রিয় বুদ্ধিজীবী সমাজ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাহান্নোর মহান ভাষা আন্দোলন   যে 'মুসলিম জাতীয়তাবাদে'র চিন্তা-চেতনার বুকে  আঘাত করতে সক্ষম হয়েছিল ,তার ভিত্তি ছিল কিন্তু  ভাষা কে কেন্দ্র করে ,  তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ভেতরে , পশ্চিম পাকিস্তানের  হানাদার বৃত্তির বিরুদ্ধে একটি জ্বলন্ত প্রতিবাদ। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা, সেই দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে  যেভাবে বিনষ্ট করতে শুরু করেছিলেন ,  মহান ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সেই গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করার একটি প্রাথমিক লক্ষণ ,  বাংলাদেশের ছাত্র-শিক্ষক মেহনতী মানুষকে সাথে নিয়ে , বুদ্ধিজীবী সমাজ , প্রতিষ্ঠিত করবার দিকে  একটা বড় রকমের পদক্ষেপ রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেও বাংলাদেশ ,  অর্থাৎ ; তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে  হোসেন শহিদ  সোহরাওয়ার্দী , এ কে ফজলুল হক , আবুল কাশেম ,  মাওলানা ভাসানী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন , সেই সমস্ত পদক্ষেপের ভেতরে  গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানসিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে,  মনোজগতের চেতনা সরবরাহ করার ক্ষেত্রে  বুদ্ধিজীবী সমাজ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।                      

পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ,    ছয় দফার  আন্দোলন  বা উনসত্তরের আইয়ুব বিরোধী গণঅভ্যুত্থান -- ইত্যাদি সংগঠিত করবার ক্ষেত্রেও যে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা-চেতনা কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন , সেই কাজে তাঁকে এই বুদ্ধিজীবী সমাজ সমস্ত ধরনের মানসিক সমর্থন যুগিয়ে ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের যে  অ সাম্প্রদায়িক  চেতনা,  যে চেতনা পাক হানাদারদের  সবথেকে বেশি বুকে আঘাত হেনেছিল, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান থেকে শুরু করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর। সেই ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে সব থেকে বড় ভূমিকা ছিল কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের।                       তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক সামাজিক ব্যবস্থায় দেশভাগের বৌদ্ধির উপাদান '  মুসলিম জাতীয়তাবাদে' র বিষ প্রবেশ করিয়ে ,  পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক ক্ষেত্রটিকে ইসলামীকরণের  মৌলবাদী পদক্ষেপ পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় সময় থেকেই পাকিস্তানের শাসকেরা নিয়েছিল , ছয়ের  দশকের শুরুতে  ফৌজি শাসক আইয়ুব খান , অবিভক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে তাকে দ্রুত ত্বরান্বিত করেন।হিন্দু- মুসলমান, বাঙালি - অবাঙালি বিভাজনের , সেই সার্বিক পরিস্থিতিকে রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে  বুদ্ধিজীবী সমাজের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ,ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি একটা বড় রকমের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল  বাঙালি জাতীয়তাবাদের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে। 

আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেই পূর্ব পাকিস্তানের  রাজনৈতিক, সামাজিক , আর্থিক সহ সার্বিক ক্ষেত্রকে  ইসলামীকরণের লক্ষ্যে সবকিছুকে পরিচালনা করেছিল । গণতন্ত্র ধ্বংস করে যেভাবে আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল , তার বিরুদ্ধে যাতে কোনো প্রতিবাদ - প্রতিরোধ সংঘটিত না হতে পারে ,সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই  ইসলামীয় মৌলবাদক কে কায়েম করা  ছিল আইয়ুব খানের লক্ষ্য ।সেই লক্ষ্যেই  অবিভক্ত পাকিস্তানের পরবর্তী শাসকরা  হিন্দু-  মুসলমান এবং বাঙালি-অবাঙালি   এই বিভাজনের ভিত্তিতে ,  একদম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কায়দায় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন তথা শোষণ  কায়েম করতে চেয়েছিল  তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ;  আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের উপর।                      

মুসলিম জাতীয়তাবাদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে, মহান ভাষা আন্দোলন যে চিন্তা-চেতনার বিজয় বৈজয়ন্তী উড়িয়েছিল, সেই ' বাঙালি জাতীয়তাবাদে' র উপর ভিত্তি করে  বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক, সামাজিক  সাংস্কৃতিক ,ধর্মীয় সহ সার্বিক রাজনৈতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই কে সংগঠিত করবার ক্ষেত্রে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যে ঐতিহাসিক  ভূমিকা,  সেই ভূমিকা কে সংগঠিত করার  ক্ষেত্রে এবং বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনার প্রসারণ করবার লক্ষ্যে ,এই বুদ্ধিজীবী সমাজ , ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই কারণেই ,  পরাজয় অবশ্যম্ভাবী বুঝতে পেরে , পাক হানাদার বাহিনী , মিত্র শক্তি ভারতের কাছে পরাজয়ের  জানি  গ্লানি ভুলতে ,  আত্মসমর্পণের ঠিক দু'দিন আগে,  গোবিন্দ গুহ, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরৈ , জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, শহীদুল্লাহ কায়সার ,মুনীর চৌধুরী সহ বাংলাদেশের সোনার সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে।                    

পাক হানাদার বাহিনীর মূল মদদদাতা , মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে তখন এই বিষয়টি  বড় হয়ে উঠেছিল যে,  স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পর, সেই দেশের রাজনৈতিক ,সামাজিক, আর্থিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে , অসাম্প্রদায়িক,  গণতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা-চেতনার উৎসস্থল এই বুদ্ধিজীবী সমাজ যদি  সক্রিয় থাকে,  তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশ ,তথা দক্ষিণ এশিয়ায়  সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ঘটানো অত্যন্ত মুশকিল হয়ে পড়বে। মৌলবাদের বিকাশ ঘটানো অত্যন্ত মুশকিল হয়ে পড়বে।                    

হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত ধরনের মৌলবাদী শক্তির কাছে তাই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অভিসন্ধি নিয়েই  আত্মসমর্পণের ঠিক দু'দিন আগে, পাকহানাদার বাহিনী এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। একাত্তরের  পঁচিশে মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার বাংলাদেশের উপর ,  গোটা বিশ্ববাসীকে স্তম্বিত করে দিয়েছিল। এই গণহত্যা ,  গোটা বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকের দেশকেই ,  বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য যে লড়াই,  সেই লড়াইয়ের ক্ষেত্রে কখনো ইতিবাচক,  কখনো নেতিবাচক একটা সম্পৃক্ততা তৈরি করেছিল। তেমনি কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের উপর পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাকান্ড ,  বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশকেই  হানাদার পাকবাহিনীর যে কদর্য,  অমানবিক রূপ,  তাকে পরিস্ফুট করার ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের ভূমিকা পালন করেছিল।                      

সাম্রাজ্যবাদ যে গণতন্ত্রের সব থেকে বড় শত্রু ,  ধর্মনিরপেক্ষতার সব থেকে বড় শত্রু ,  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রসারের ক্ষেত্রে সব থেকে বড় অপশক্তি এবং অন্তরায়,  সেটাই যেন সাম্রাজ্যবাদ প্রমাণিত করেছিল মিত্রশক্তি ভারতের কাছে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনেও, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের এভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে।                      রণনীতি হোক বা নিরাপত্তা প্রশ্নই হোক , এই ব্যাপারগুলি যেকোন অবস্থাতেই সার্বজনীন হাতিয়ার হিসেবে শেষ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় না। এ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ভাবনা  আছে । সাম্রাজ্যবাদী  শক্তির ও  নানা ধরনের কুভাবনা চিন্তা আছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যে কৌশলগত আচরণ এবং নিরাপত্তাজনিত দৃষ্টিভঙ্গি, যাকে মার্কিন শাসকেরা চিরদিন মার্কিন জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে চালিত হয় বলে দাবি করে আসে ,  সেই স্বার্থ গুলির মূল লক্ষ্য হিসেবে কিন্তু পরিলক্ষিত হয় ;  অর্থনৈতিক স্বার্থ। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সেই অর্থনৈতিক স্বার্থের যে চাপান-উতোর থাকে , তাকে ভিত্তি করেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ,  তাদের মিত্র শক্তির উপর নানা ধরনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।                    

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কালের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যে সার্বিক অবস্থান ,  সেই অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে  ঠান্ডা লড়াই উত্তর  গোটা বিশ্বের  রাজনৈতিক পরিবেশের দিকে আমাদের  ভাবনা কে যদি প্রসারিত করি,  তাহলেই বুঝতে পারা যাবে গোটা বিষয়টা।সেই সময়ে  সোভিয়েত ইউনিয়নের উপস্থিতি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক ,সেটিকে  একটা বড় রকমের আতঙ্কের কারণ হিসেবে গ্রহণ করে  পাকিস্তান । তাই তারা তাদের নিজেদের দেশের একটি অংশ ,  পূর্ব পাকিস্তানের উপর এই নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল। সেই অত্যাচারের সমস্ত ধরনের কৌশলগত দিক পরিচালনা এবং  মানসিক  সাহস  যুদ্ধ সরবরাহ ইত্যাদির ভেতর দিয়ে মার্কিনীদের সাহায্য প্রসারিত হয়েছিল পাকিস্থানের পক্ষে।                      

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতি, তার একটা বড় কারণ ছিল কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কে  বিনষ্ট করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পরিস্থিতিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের ক্ষেত্রে  ধর্মীয় মৌলবাদকে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তারা রেখেছিল। নিজেদের অর্থনৈতিক শোষণ কে প্রসারিত করার ক্ষেত্রেও এই ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রসার ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম রণনীতি এবং কৌশল। সেই একই কৌশলে বিশ্বাস করত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসোর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরি । সেই বিশ্বাস পাকিস্তানের শাসকদের আজও আছে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পরবর্তী পরিস্থিতিতে,  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমস্ত ধরনের রীতি নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে ' কমিউনিস্টের ভীতি ছিল একটা বড় বিষয়।              

সেই সময় কালের সংগটিত কমিউনিজম ,গোটা বিশ্বে এক ধরনের  পরিস্থিতি তৈরি করেছিল । সেই  পরিস্থিতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শ্রেণি  স্বার্থ বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। কমিউনিস্টের সশস্ত্র শৃংখলাবদ্ধ যে অবস্থান , সেই অবস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা এবং   সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা। বলাবাহুল্য,  এই দুটি বিষয় ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর আগ্রাসন , বিশেষ করে অর্থনৈতিক আগ্রাসনের ক্ষেত্রে সবথেকে বড় অন্তরায়। মুক্তিযুদ্ধে যে বুদ্ধিজীবী সমাজ ,  বৌদ্ধিক এবং শারীরিক নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন , সেই অংশের মানুষদের ভিতরে কমিউনিস্ট মতাদর্শের একটা বড় রকমের  ভূমিকা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল।                     শহীদুল্লাহ কায়সার , মুনীর চৌধুরীর মতো বুদ্ধিজীবীরা , সবক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে ,তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট দলগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলেও , কমিউনিস্ট মতাদর্শের দিক থেকে তাদের  অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। এই কমিউনিস্ট মতাদর্শের লোকেরা বাংলাদেশ সৃষ্টির পর , সেই দেশের প্রধান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর বিশেষ রকমের প্রভাব বিস্তার করবে। যে প্রভাব  ওটা ভারতীয় উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ গুলিক চিন্তাচেতনার ক্ষেত্র কে  আন্দোলিত করবে এটাই ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে স্বপ্ন। তাদের দোসর পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী ধর্মান্ধ শক্তির কাছে অন্যতম বড় ভয়ের কারণ।             

সেই ভয়ের জায়গা থেকেও কিন্তু পাক হানাদার বাহিনীর , নিজেদের আত্মসমর্পণের মাত্র দু'দিন আগে, বাংলাদেশের সোনার টুকরো ছেলেদের এভাবে নির্মম হত্যা করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে,  সাম্রাজ্যবাদের  কেন্দ্রস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবর্তিত হলেও ,ছয়ের  দশকে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে , সোভিয়েত ইউনিয়ন পাল্টা জবাব দেওয়ার শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেছিল।                  

সেই প্রেক্ষিতে কিন্তু  পাক-হানাদার বাহিনীর মাধ্যমে , মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা  আর সার্বিকভাবে ,  পূর্ব পাকিস্তানের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করা, বাঙালি জাতীয়তাদের ভিতাতি কে দুর্বল করা ছিল ,  পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার  বাহিনীর  একটি বড় কারণ ছিল। সেই কারণটিই কিন্তু  আত্মসমর্পণের মাত্র দুদিন আগে বুদ্ধিজীবি  সমাজের উপর পাকিস্তানের এই নির্মম অত্যাচারের অন্যতম প্রধান কারণ।              বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে ,  স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ,  গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা, ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করার হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি নষ্ট করবার , আড়াল সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করার কৌশল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান নিয়েছিল।                        

এই অপচেষ্টা কে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাহাত্তর  সালের মহান ভাষা আর  ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বাংলাদেশের জন্য প্রণয়ন করে। মাত্র  চার  বছর স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টির পর বঙ্গবন্ধু জীবিত ছিলেন। এই চার বছরের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি  মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল স্তম্ভ ; ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক চেতনা , হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধীতার যে আদর্শ ,তাকে সার্বিকভাবে স্বাধীন দেশের প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটা বড়ো প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেই প্রচেষ্টা কে ধ্বংস করার লক্ষ্যেই  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ , দোসর  পাকিস্তানের  ঘাতক বাহিনী কে ব্যবহার করে ,  সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে,  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের পনের ই আগস্ট।            

একাত্তরে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের অব্যবহিত আগে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে ,  স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক,  ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা চেতনাকে ধ্বংস করার যে ষড়যন্ত্র করেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দোসর হানাদার পাকবাহিনীর সাফল্য লাভ করতে পারে নি , সেই সাফল্য তারা  পেয়েছিল , বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করার পর।                

শহীদুল্লাহ কায়সারেরা বাংলাদেশের  ধর্মনিরপেক্ষতা হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। সেই চিন্তা চেতনায় পরবর্তীকালে ,  বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর , জিয়াউর রহমান। এইচ এম এরশাদ ,  বেগম খালেদা জিয়া হত্যা  করেছিল। বাংলাদেশের মহান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান কে ধ্বংস করে জিয়াউর রহমান ,  মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে । একাত্তরের বুদ্ধিজীবীসহ গোটা  বাংলাদেশের তিরিশ লক্ষ শহিদের  আত্মত্যাগকে কার্যত  বুড়ো আঙুল দেখায়।                  

গোটা বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত গ্রহণের পর  পাক হানাদার বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধকালে  সবথেকে বড় সহায়ক ,ঘাতক-দালালদের  কার্যত মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়। যুদ্ধাপরাধী ঘাতক দালালদের অবাধ মৃগয়া ভূমিতে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যে সমস্ত শাসকেরা  শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশকে শাসন করেছে ,  সেই সব লোকেরা , বিভিন্ন রকম ভাবে পুনর্বাসিত করে রাজাকার , আদবদর , আলশামস সহ সমস্ত একাত্তরের ঘাতক দালালদের মতত  অপরাধীদের ।                 

ওইসব শাসকেরা মন্ত্রী,  রাষ্ট্রপতি ,রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে সমস্ত ধরনের সামাজিক পুনর্বাসন দিয়েছিল জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ('৯৬)  বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করা যাবে না বলে,  বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খুনী খন্দোকার মোশতাক যে 'ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স'  এনেছিল,   তাকে বাতিল করে,  বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করেন।                     

বাহাত্তরের  ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের এখনো শেখ হাসিনি পুনরুদ্ধার করতে না পারলেও , পাকিস্তানের আমলে ' শত্রু সম্পত্তি আইন ' টিকে বাতিল করেছেন। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের আর্থিক সামাজিক ধর্মীয় নিরাপত্তা অনেকখানি নিশ্চয়তা নিয়ে আসেন এই কালাকানুনটি বাতিলের ভিতর দিয়ে। নিঃসন্দেহে এই সব পদক্ষেপ  একাত্তরের চোদ্দ ই  ই ডিসেম্বর ,  শহিদ বুদ্ধিজীবীদের যে আত্মত্যাগ এবং তাঁদের ধর্ম নিরপেক্ষ চিন্তা চেতনার প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন।                  

ভারতে  শত্রু সম্পত্তি আইন আজও বলবৎ রয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে  সেই আইনটিকে বাংলাদেশে  বাতিলের ভেতর দিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে সুনিশ্চিত করেছেন শেখ হাসিনা। মহান মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী সমাজসহ গোটা বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান - শিখ-  জৈন-  ক্রিশ্চিয়ান নির্বিশেষেআপামর যে  বাঙালির আত্মত্যাগ  তার প্রতি যথার্থ  মর্যাদা প্রদান এই কালাকানুনটিকে বাতিল করা।শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে, বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা টিকিয়ে রাখতে লড়াই , গোটা উপমহাদেশেই ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিশেবেই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

লেখায় - গৌতম রায়


শেয়ার করুন

উত্তর দিন