কি চাইছে বিজেপি?

সি এ এ নিয়ে বিজেপির সাম্প্রতিক কৌশল প্রসঙ্গে

Gautam-Roy

গৌতম রায়

পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভার ভোট মিটতে না মিটতেই কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক গুজরাট, পাঞ্জাব, রাজস্থান, ছত্তিশগড়ে সি এ এ লাগুর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।সেই মোতাবেক ওই রাজ্যগুলিতে মুসলমান ব্যাতীত হিন্দু, শিখ, খ্রিষ্টান , বৌদ্ধ- যাঁরা পাকিস্থান, আফগানিস্থান, বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাঁদের ভারতের নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন জানাতে বলা হয়েছে। গত ২০২০ সালের  ১০ ই জানুয়ারী থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল কে কেন্দ্রীয় সরকার আইনে রূপান্তরিত করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরালা, তামিলনাডু , গোয়ার নির্বাচনে আশানুরূপ ফল করে নি বিজেপি।পশ্চিমবঙ্গ দখলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েলেন।দিল্লি আর পশ্চিমবঙ্গের নিত্যযাত্রী তে পরিণত হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি ভোটের আগে।এক ই কথা বলতে পারা যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্পর্কেও।এই ভোটেই সীমান্ত অধ্যুষিত জেলাগুলিতে এই সি এ এ র বিষয়টিকে প্রচারে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল বিজেপি।কিন্তু ভোটের ফলে দেখতে পাওয়া গেল, সীমান্তবর্তী জেলার মানুষদের নাগরিকত্বের লালিপপ শেষ পর্যন্ত খাওয়াতে পারে নি বিজেপি।

পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমে হিন্দু- মুসলমানের বিভাজনকে তীব্র করে তুলতে এই সি এ এ কে সবরকম ভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল বিজেপি।অসমে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে।কিন্তু বিভাজনের রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গে তারা সফল হয় নি। অথচ এই বিভাজনের রাজনীতিই রাজনীতির পরিমন্ডলে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে, প্রাসঙ্গিক করে রাখতে গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের অন্যতম ইউ এ পি হল এই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন।

বিজেপির মস্তিষ্ক এম এস গোলওয়ালকর ' সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে' র ধারণা দেওয়ার মূল শর্ত হিসেবে ' মুসলমান শূন্য' ভারতের কথা বলেছিলেন। হিন্দু রাষ্ট্রে মুসলমানের যে কোনো নাগরিক অধিকার থাকবে না- গোলওয়ালকরের রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত ই ছিল সেটা।সেই হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতাকে ধীরে ধীরে গত সাত বছর সময়কালে আর এস এস- বিজেপি পরিণত করেছে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদে।এই সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদকে রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোতে স্থাপন করে , ভারতীয় সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয়, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কে সমূলে উৎপাটিত করে, সেই জায়গাতে আত্মঘাতী রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনা করতে হলে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে এখন চাই মুসলমান বিযুক্ত ভারত।আর হিন্দুত্ববাদীদের সেই কাঙ্খিত ভারত উপস্থাপনার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হল এই সি এ এ।

আগামী ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট যতো এগিয়ে আসতে থাকবে বিজেপি কৌশলগত ভাবেই প্রতিবেশী পাকিস্থানের সঙ্গে ততোই সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করবে।কারণ, পাকিস্থানের জুজু আর পাকিস্থানের নাগরিক মুসলমান , আর ভারতের মুসলমান মাত্র ই পাকিস্থানের সমর্থক তর্কবিদ্যার ফ্যালাসি পর্যায়ের এই অপব্যাখ্যার ভিতর দিয়ে দেশপ্রেম- পাকিস্থান বিদ্বেষ আর মুসলমান বিদ্বেষকে সমার্থক করে তুলবে গোটা হিন্দু  সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদী শক্তি আরো উগ্রভাবে।সেই কারণেই সি এ এ লাগুর ক্ষেত্রে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রথমেই বেছে নিয়েছে গুজরাট, রাজস্থানের মতো পাকিস্থানের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিকে।গুজরাটের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে এই সি এ এ লাগুর উদ্দেশে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে বিজেপি একটা, দুটো দিনের ভিতরেই।

দেশপ্রেমের নামে উগ্রতার একটা প্রথম ধাপ হিসেবেই এই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন টিকে ব্যবহার করতে চাইছে বিজেপি।ইসলামীয় রাষ্ট্র পাকিস্থানে  হিন্দুদের কোনো মানবাধিকার নেই- এই অজুহাতের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গ্রিস্টান, বৌদ্ধ , শিখদের ও ন্যুনতম নাগরিক অধিকার নেই।সেই কারণে ই পাকিস্থান থেকে চলে আসা এইসব সম্প্রদায়ের মানুষদের নাগরিক অধিকার দেওয়ার লক্ষ্যেই বিজেপি সি এ এ আনছে-- এটাই তুলে ধরা হচ্ছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের উদ্দেশ্য।পাকিস্থান তাদের সংখ্যালঘুদের ন্যুনতম অধিকারের স্বীকৃতি দেয় না কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারত তাদের সংখ্যালঘুদের অধিকারের স্বীকৃতি দেয়-- শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে এই প্রেক্ষিতে টেনে আনবে বিজেপি, অথচ ভারতের বৃহত্তর সংখ্যালঘু মুসলমানেদের নাগরিকত্ব  যে তারা কেড়ে নিচ্ছে- এই বিষয়টিকে তারা গোপন করে যাবে অবলীলাক্রমে। এই ভাবে দেশের ভিতরে ও বাইরে সংখ্যালঘুদের ছদ্মবন্ধু হিসেবে নিজেদের মেলে ধরে আসলে পালন করে যাবে সংখ্যালঘুদের চরম শত্রুর ভূমিকা।

গত লোকসভা ভোটের আগে মোদি পুলওয়ামা করেছিলেন।তার ও আগে তের মাসের সরকার হেরে যাওয়ার পর ভোটে জেতার স্বার্থেই কার্গিল করেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। সেই পথেই দ্বিতীয় দফা থেকে তৃতীয় দফাতে হাঁটার উপক্রম করছেন নরেন্দ্র মোদি। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বিক ব্যর্থ নরেন্দ্র মোদি।গত সাত বছরে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ব্যাতীত আর একটি কাজ ও নরেন্দ্র মোদি বা তার সহকর্মী রা করেন নি।তীব্র বেকারি।ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কট।নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের আগুনছোঁয়া দাম।লাফিয়ে বাড়ছে পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দাম।কোভিড মোকাবিলায় চূড়ান্ত ব্যর্থ মোদি।অতিমারী মোকাবিলায় বিজ্ঞানসম্মত উপায় অবলম্বনের বদলে থালা বাজানো, লাইন নেবানো, শাঁখের আওয়াজের মতো চরম অবৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বনের কথা প্রকাশ্যে বলছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।আর তার সহযোগীরা গোমূত্র, গোবর সেবনে ভাইরাস মোকাবিলার কথা বলছেন।দেশের মানুষের কাছে ভ্যাক্সিন পৌঁছে দেওয়ার বিন্দুমাত্র আন্তরিক প্রচেষ্টা নেই সরকারের।ভ্যাক্সিন নিয়ে চলছে চরম কালোবাজারি।মূলতঃ বেসরকারি স্তরের ব্যবসায়ীরাই প্রধান নিয়ন্ত্রক ভ্যাক্সিনের।সরকারি জায়গাগুলিতে ভ্যাঈঅসিন অমিল।সেগুলিই দেদার টাকায় বিকোচ্ছে তারা বিশিষ্ট্য বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে।

এই অবস্থায় দাঁড়িয়েও বিজেপি যে বিজেপিতেই আছে তা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারা গেল গুজরাট, রাজস্থান সহ চারটি রাজ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক সি এ এ লাগুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর। শহিনবাগ , কৃষি আইন সংশোধনীর বিরুদ্ধে গোটা দেশের কৃষক সমাজের প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, পশ্চিমবঙ্গে পরাজয়-- এতোসব কিছুর পরেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ই যে তাদের কাছে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখবার  একমাত্র পথ্য , সি এ এ নিয়ে সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ভিতর দিয়ে বিজেপি তা আবার ও বুঝিয়ে দিল।

দেশের পশ্চিমাঞ্চল , বিশেষ করে পাকিস্থানের সীমান্ত লাগোয়া রাজ্যগুলিতে হিন্দু- মুসলমানের সংঘাত কে তীব্র করে বিজেপি এই আভাস ই দিচ্ছে যে , আগামী লোকসভার ভোট যতো এগিয়ে আসতে থাকবে ততোই এই নাগরিকত্ব ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে তীব্র করে তুলবে।আর সেই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে পাকিস্থান বিদ্বেষ এবং মুসলমান বিদ্বেষের সমতুল করে তুলে ভোটে জেতার কৌশল হিসেবেই সীমান্ত উত্তেজনার পথেও তারা হাঁটতে পারে।দেশপ্রেমের নামে উগ্রতার ডিমে তা দিয়ে পাকিস্থান বিদ্বেষ এবং মুসলমান বিদ্বেষ কে সমার্থক করে তুলে অচিরেই সেই আগুনকে তারা ছড়িয়ে দেবে দেশের পূর্বাঞ্চলে।

ত্রিপুরায় ক্ষমতা ধরে রাখতে এখন বাংলাদেশ থেকে খেতে না পেয়ে দলে দলে মুসলমান ভারতে চলে এসে , ভারতের হিন্দুদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছে।ভারত আবার মুসলমানদের অধীন হলো বলে-- এইসব প্রচার কে তীব্র করে তুলতে সি এ এ ঘিরে জোরদার তৎপরতা পশ্চিম ভারত থেকে পূর্ব ভারতের দিকে নিয়ে আসাটাও এখন বিজেপির কাছে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখার প্রশ্নে খুব ই জরুরি।বস্তুত বাবরি মসজিদের জমি দখল করে , মসজিদের ধ্বংসস্তুপের উপর মসজিদের শিলান্যাস করবার পর মন্দির ইস্যু নামক তালপুকুরে আর এস এস - বিজেপির তো এখন আর ঘটি ডুবছে না।তাই এখন দরকার নতুন ইস্যু।

এই দেশকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে আর এস এস- বিজেপির দরকার মুসলমান শূন্য ভারত।সেই মুসলমান শূন্য ভারতের জন্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হল এই নাগরিকত্ব সংশোধনী  আইন। এই আইনের সুযোগ নিয়েই দেশের সমস্ত সহনাগরিক মুসলমানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার তোড়জোর করছে আর এস- বিজেপি।মুসলমান মাত্রেই পাকিস্থান বা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাই তারা কোনো অবস্থাতেই ভারতের নাগরিক থাকতে পারবেন না- এটাই হল বিজেপির মোদ্দা কথা।সেই লক্ষ্যেই হিন্দু ছাড়াও শিখ, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান, যাঁরা পাকিস্থান , বাংলাদেশ, আফগানিস্থান থেকে ভারতে এসেছেন, তাঁরা ভারতের নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করতে পারবেন , নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে সেই সংস্থান বিজেপি রেখেছে।কিন্তু মুসলমানেরা নাগরিকত্বের কোনো কোনো রকম আবেদন করুক-- তার বিন্দুমাত্র সংস্থান সি এ এ তে বিজেপি রাখে নি।

আগামী বছর ত্রিপুরা বিধানসভার ভোট।উত্তরপ্রদেশেও সামনের বছর ভোট।উত্তরপ্রদেশ এবং ত্রিপুরা- দুটি রাজ্যেই ক্ষমতা ধরে রাখা আগামী লোকসভা ভোটের নিরিখে বিজেপির কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।মন্দির - মসজিদ ইস্যুর একটা পরিণতির পর উত্তরপ্রদেশে সাধারণ মানুষদের ক্ষেপিয়ে তোলার জন্যে, বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্যে মুসলমানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জিগির তোলাটা বিজেপির ভোট রাজনীতিতে সাফল্য আনবার নিরিখে খুব ই গুরুত্বপূর্ণ।উত্তরপ্রদেশে হিন্দু ভাবাবেগকে সাম্প্রদায়িক পথে পরিচালিত করতে পারলে গোটা দেশের হিন্দু ভাবেবেগকে সাম্প্রদায়িক খাতে বইয়ে দিয়ে ভোট রাজনীতিতে সুবিধা করাটা অনেকবেশি ইতিবাচক হয়ে উঠবে বিজেপির কাছে। তাই যেমন গুজরাট, তেমন ই উত্তরপ্রদেশ আবার ঠিক সেই এক ই গুরুত্ব বিজেপির কাছে ত্রিপুরাতেও এই সি এ এ ঘিরে।

প্রশ্ন হল, দেশভাগ জনিত কারণে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল বাংলা।অথচ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন লাগু করা হল এমন পাঁচটি রাজ্যে যাদের ভিতরে পাঞ্জাব ব্যাতীত অন্য কোনো রাজ্যেই সেভাবে নাগরিকত্ব ঘিরে তেমন কোনো বিতর্ক নেই। দেশভাগের প্রত্যক্ষ আঁচ ও সেইসব রাজ্যগুলির উপরে কার্যত আসে নি। আসলে পাকিস্থানের সঙ্গে এই নাগরিকত্বৃর বিষয়টিকে ঘিরে একটা অহেতুক বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি করাই হল এই রাজ্যগুলিতে সবার আগে সি এ এ লাগু করবার আসল উদ্দেশ্য।বিজেপির এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য টা বুঝে যে রাজনৈতিক দল , সংগঠন বা ব্যক্তি বিষয়টির বিরোধিতা করতে যাবে, খুব সহজেই সেই রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা ব্যক্তির গায়ে দেশদ্রোহিতার লেবেল সেঁটে যাওয়া খুব সুবিধাজনক কাজ হবে বিজেপির পক্ষে।সেই সঙ্গে তাদের ভূষিত করা হবে পাকিস্থানের দালাল হিসেবেও।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন