সুফিয়া কামাল: উপমহাদেশের এক নক্ষত্র

পুরনো ঢাকার অভয় দাশ লেনে তখন থাকেন কামালউদ্দিন খান, তাঁর পত্নী সুফিয়া কামাল(জন্ম--১৯১১ র ২০ শে জুন , মৃত্যু-- ১৯৯৯, ২০ শে নভেম্বর।এবং তাঁদের সন্তানেরা। দেশভাগের পরবর্তী সময়।একদিকে নোতুন করে দেশের মানুষের ক্ষত নিরাময়ে সুফিয়া কামাল তখন আত্মনিয়োগ করেছেন। সওগাত সম্পাদক মহম্মদ নাসিরুদ্দিন মেয়েদের জন্যে ' বেগম' প্রকাশ করেছেন।মন্বন্তর , যুদ্ধ, দাঙ্গা, দেশভাগের অভিজ্ঞতা কে বুকের রক্তে অক্ষরমালাতে 'বেগম' কে সাজাচ্ছেন সম্পাদিকা সুফিয়া।দেশভাগের পর জাতিগঠনে নারী সমাজের ভূমিকা ঘিরে বাঙালি সমাজে প্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি।' বেগমে' লিখলেন; জাতি গঠনে নারী সমাজের ভূমিকাকে সুসংহত করতে হলে;" এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হলে, পৃথিবীর কোনো দিক থেকেই চোখ ফিরিয়ে থাকলে আমাদের চলবে না, এইকথাও মানতে হবে।শিল্প, বিজ্ঞান থেকে আরম্ভ করে গৃহকর্ম ও সন্তান পালনে - সর্বক্ষেত্রে আমরা সত্যিকারের নারী রূপে গড়ে উঠতে চাই।" কিন্তু এই নারী হিশেবে নিজেদের হৃদয়বৃত্তিকে বিকশিত করতে পুরুষের সঙ্গে বিবাদ- বিসংবাদ নয়।কোনো প্রতিযোগিতা নয়।সুষ্ঠু দাবি উত্থাপন।সেই দাবি পালনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পক্ষ থেকে বাঁধার সন্মুখীন হলে, দৃঢ়তার সাথে সেই জগদ্দল পাথর কে সরিয়ে দেওয়া-- এই বোধের নাম ই সুফিয়া কামাল।কেবল মাত্র দুই বাংলার প্রেক্ষিতেই নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ, তথা দক্ষিণ এশিয়াতে কেবল নারীর স্বাধিকারের প্রশ্নকেই তুলে ধরে , সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে সুসংবদ্ধ করেন নি সুফিয়া কামাল।বাঙালি জীবনের সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে ঠেলে সরিয়ে, বাঙালি নারীকে, হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে বাংলার মানবিকী চেতনাকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার প্রতিটি আধুনিকতা র সঙ্গে পরিচিত করা র সমার্থক হল সুফিয়া কামালের জীবন।
দেশভাগের অব্যবহিত আগে কলকাতা মহানগরীর বুকে দাঙ্গা নিরসনে সুফিয়া কামালের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা , দুঃখের বিষয়, সেই পর্যায় ঘিরে এপার বাংলাতে প্রায় আলোচনাই হয় না।তেতাল্লিশের মন্বন্তর মোকাবিলাতে , স্বামী কামালউদ্দিন খানের তৎকালীন কর্মস্থল বর্ধমানে ত্রাণ থেকে শুরু করে লঙ্গরখানা খোলা এবং সেই ধারাবাহিক পরিচালনা তে সৈয়দ শাহেদুল্লা, সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহের পরিবারের মেয়েদের সাথে , নারী আত্মরক্ষা বাহিনীকে সঙ্গে করে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন সুফিয়া।বস্তুত , হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে রাঢ় বাংলাতে মেয়েদের ভিতরে ব্রিটিশের অর্থনীতির ভয়ঙ্কর পরিণতি হিশেবে , মানুষের তৈরি সেই দুর্ভিক্ষ এবং তাকে আরো সংহত করতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির ভূমিকা, শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জীদের ভূমিকা- এইসব বিষয়ে যে সচেতনতা সুফিয়া কামালের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল, সেটি পরবর্তীতে দাঙ্গার সামান্য ফুলকির প্রবেশ ও রাঢ় বঙ্গে আটকে দিয়েছিল।
'৪৬ এর দাঙ্গার সময়কালে কলকাতার পার্ক সার্কাসের বর্তমান সোহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউয়ের দিকে থাকতেন কামালউদ্দিন খান, সুফিয়ারা।সেই অঞ্চলেই থাকতেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পিতা।সেই সময়কাল থেকেই এই দুটি পরিবারের ভিতরে আত্মার আত্মীয়তার সূচনা।এখান থেকেই দাঙ্গা বিধ্বস্ত মেয়ের সামাজিক , আর্থিক পুনর্বাসনে আত্মনিয়োগ করেছিলেন সুফিয়া।এই পর্যায়ক্রমে কমিউনিস্ট পার্টির বৃহত্তর পরিমন্ডল, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে থাকা কলিম শরাফি, মহঃ জ্যাকারিয়া, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন , কলিম শরাফির সূত্র ধরে সুচিত্রা মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র - প্রমুখদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়েছিল সুফিয়ার।তিনি যে দাঙ্গাক্লিন্ন মহিলাদের সার্বিক পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বেগম রোকেয়ার নামাঙ্কিত একটি প্রতিষ্ঠান সেই সময়ে পার্ক সার্কাস অঞ্চলে খুলেছিলেন, সেটির সঙ্গে জয়নুল আবেদিন, কলিম শরাফি, সুচিত্রা মিত্র( তখন মুখোপাধ্যায়) প্রমুখের একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সুফিয়া কামাল এবং তাঁর কর্মকান্ডের সঙ্গে।
দেশভাগের পর ,তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্থানে, সেখানকার সংখ্যালঘুদের উপর যে অত্যাচার শুরু হয় , তার মোকাবিলাতে ও সুফিয়া কামালের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী লিলা নাগ( রায়) , দাঙ্গা মোকিবিলাতে , পুনর্বাসনে যে সংগঠিত ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার কাজে সুফিয়া কামালের ছিল বিশেষ ভূমিকা।লীলা রায়ের ' শ্রী সঙ্ঘে' র ভূমিকা ঘিরে সুফিয়া কামাল কতোখানি পরিতৃপ্ত ছিলেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।কারন, সুফিয়া কামাল বা তাঁর কর্মকান্ডের সঙ্গে যাঁদের পরিচয়ের সৌভাগ্য ঘটেছিল, তাঁদের কাছে সুফিয়ার ঔদার্য, ধর্মনিরপেক্ষতা, পবিত্র ইসলামের প্রতি গভীর অনুরাগ স্বত্ত্বেও সংখ্যালঘুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আত্মনিবেদন, মানবাধিকারের জন্যে লড়াই, এই বৈশিষ্ট গুলি বিশেষ ভাবে স্মরণীয়।তাই লীলা নাগেরা দেশভাগের অব্যবহিত আগে কমিউনিস্টদের সঙ্গে যে রাজনৈতিক বিবাদ তৈরি করেছিলেন, কমিউনিস্টদের গুপ্ত হত্যার সঙ্গে যে সংযোগ তাঁদের তৈরি হয়েছিল, কমিউনিস্ট কর্মী , তথা উদীয়মান কথাসাহিত্যিক সোমেন চন্দকে প্রকাশ্যে খুন করার ঘটনার সঙ্গে এঁদের যে সংযোগ, সেগুলি কোনো অবস্থাতেই সুফিয়া কামালের মতো মানবিকবোধের মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তবে ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইতে লীলা রায়ের যে অবদান, তার প্রেক্ষিতে , লীলা রায় সম্পর্কে সুফিয়া কামাল , কখনোই নেতিবাচক একটি শব্দ ও বলেন নি।যদি ও লীলা রায়ের সঙ্গে ডলি ঘোষ, আনোয়ারা খাতুন, দৌলতউন্নিসা প্রমুখকে নিয়ে , দেশভাগের অব্যবহিত পরে, পূর্ব পাকিস্থানের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সার্বিক পুনর্বাসনে বৃহত্তর ঢাকাতে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা সুফিয়া কামাল রেখেছিলেন, সেটি র সাংগঠনিক কর্মধারাতে তিনি পরিবর্তন আনেন।কমিউনিস্ট নেতা খোকা রায়ের পত্নী যুঁইফুল রায়, এবং অপর এক কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ব নেপাল নাগের পত্নী , নিবেদিতা নাগকে নিয়ে গড়ে তোলেন ('৪৮ সালের আগস্ট মাসে) , ' পূর্ব পাকিস্থান মহিলা সমিতি' । সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষে হিংসাশ্রয়ী ধারার সঙ্গে এই যে সুফিয়া কামালের দূরত্ব এবং নিজে ঘোষিত কমিউনিস্ট না হয়েও, কমিউনিস্ট পরিমন্ডলের মানুষদের নিয়ে নোতুন আঙ্গিকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা-- এই মানবিক গুণের কারনেই দলমত, জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে , সুফিয়া কামাল, মানুষের কাছে একটা বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
যে অভয় দাশ লেনে তাঁর থাকার সময়ের কথা দিয়ে নিবন্ধ শুরু হয়েছিল, সেই পর্যায়ে ফিরে গিয়ে বলতে হয় , শেখ মুজিব যখন ধীরে ধীরে পূর্ব পাকিস্থানের অবিসংবাদী নেতা হিশেবে উঠে আসছেন, তখন পশ্চিম পাকিস্থানের সামরিক শাসকেরা একদিকে বঙ্গবন্ধুকে জেলে ভরে , তাঁর উপর নানা রকম অন্যায় আচরণ করে চলেছে।অপর দিকে , বঙ্গবন্ধুর পরিবারের উপর নানা ধরণের সামাজিক চাপ তৈরি করছে।এই অবস্থাতে , যখন বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিব কে , শেখ মুজিবের পত্নী হওয়ার কারনে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চাইছে না, তাঁর কন্যা, আজকের বাংলাদেশের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কোনো ইস্কুল ভর্তি নিচ্ছে না, তখন স্নেহের রেণুর জন্যে বাড়ির জোগার করে দেওয়া, শেখ হাসিনার ইস্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করা, প্রতিটি বিষয় সরাসরি নিজে করেছিলেন সুফিয়া কামাল।
কোনো রাজনৈতিক দল যখন পাকিস্থানের শাসকদের বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিবাদী টুকু হতে চাইত না, তখন, দেশভাগে মাত্র দেড় বছরের মাথায় পাকিস্থানের শাসকদের নারী সমাজের প্রতি নেতিবাচক ভূমিকা ঘিরে প্রথম সোচ্চার হয়েছিল সুফিয়া কামাল যে সংগঠনটির সভানেত্রী, সেই ,' পূর্ব পাকিস্থান মহিলা সমিতি' ।সুফিয়া কামাল ই হলেন অবিভক্ত পাকিস্থানের প্রথম মহিলা, যিনি শাসকের অমানবিক আচরণ, নারী বিদ্বেষী মানসিকতার প্রতি প্রথম প্রতিবাদী।সুফিয়ার সংগঠনের সংগঠিত প্রতিবাদের উপর '৪৮ সালের ১১ ই সেপ্টেম্বর , ঢাকার করোনেশন পার্কে ব্যাপক লাঠি চার্জ করে পূর্ব পাকিস্থানের পুলিশ।বেশ কয়েকজন মহিলা নেত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।এই ঘটনার প্রতিবাদে সুফিয়া কামাল যে দীপ্ত প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে , তা একটি ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ হিশেবে চিহ্নিত।
নারীর স্বাধিকারের দাবিটি যে কোনো অবস্থাতেই সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাক্রম নয়, সুফিয়া কামালের প্রতিবাদী ভূমিকা,সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের ভিতর দিয়েই তা সব সময়ে পরিস্কার হয়ে যেত।প্রতিটি সামাজিক ঘটনাস্রোতের পিছনে সমাজের সমকালীনতার যে একটা বিরাট ভূমিকা থাকে, সেই ভূমিকাকে চিরদিন মুক্তকন্ঠে তিনি স্বীকার করেছিলেন।তাই সুফিয়া কামালের একটি সামাজিক অবস্থান ও কখনো সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো আলটপকা ঘটনা বলে মনে হয় নি।প্রাচ্যের নারী মুক্তি, নারীর স্বাধিকারের প্রশ্ন আর এই প্রেক্ষিত পাশ্চাত্যের সামাজিক পটভূমিকাতে যে ভিন্ন, বাংলা তথা বাঙালির জীবনে এই চরম সত্যটিকে সুফিয়া কামাল যে ভাবে বুঝেছিলেন, আর সেই উপলব্ধি কে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রয়োগ করেছিলেন, তাঁর সমসাময়িককালের নারী- পুরুষ নির্বিশেষে খুব কম মানবপ্রকৃতিবেত্তার ভিতরে তা দেখতে পাওয়া গেছে।
যে স্বপ্ন নিয়ে একাংশের মানুষ পাকিস্থানের জন্যে মুখর হয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন যে দুঃস্বপ্ন, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ও আগে সুফিয়া কামাল সেটি নিজের হৃদয়বৃত্তির উন্মীলনে উপলব্ধি করেছিলেন।বিভাজিত বঙ্গে সংখ্যালঘুর উপর অত্যাচারে তাঁর মতো সাহস এবং স্থৈর্য নিয়ে খুব কম মানুষ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানে পথে নেমেছিলেন।সেই সমস্ক্রের প্রতিষ্ঠিত বা উদীয়মান রাজনীতিকদের কাছে নোতুন সৃষ্ট পাকিস্থান ঘিরে ভাষা আন্দোলনের আগের সময় পর্যন্ত উচ্চাশা ছিল গগণচুম্বী।ফলে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্থানের রাজনীতির প্রায় কোনো অংশের মানুষ ই সেদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর ,সেখানকার সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদীদের অত্যাচার আর , ব্রিটিশের আঙ্গিকে পশ্চিম পাকিস্থানের মুসলিম জাতীয়তাবাদের উগ্র সমর্থকদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল , নীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না।বা ওয়াকিবহাল থাকলেও নানা ভাবনা থেকে সেই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতেন না।এই কথা ,চারের দশকের মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিনিধি, যাঁদের কর্মকান্ডকে বাংলার নবজাগরণের শেষ প্রতিনিধি অন্নদাশঙ্কর রায়, বাংলার দ্বিতীয় জাগরণ বলে অভিহিত করেছিলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, ভাষা আন্দোলনের ভিতর দিয়ে প্রথম আগল ভাঙার আগে পর্যন্ত , প্রকাশ্যে কেউ একটি শব্দ ও উচ্চারণ করতেন না।এই ঈঅষেত্রেও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল।
১৯৫১ সালে বিভাগ উত্তর পূর্ব পাকিস্থানে র ঢাকা শহরে র মেডিকেল কলেজে নার্স দের উপর নানা আর্থিক এবং সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে ধর্মঘট হয়।কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ঘিরে মুসলিম জাতীয়তাবাদের সমর্থক, গোটা পাকিস্থানের শাসককুলের ই ছিল ভয়ঙ্কর নেতিবাচক মানসিকতা।তবে নার্সদের ক্ষেত্রে সেই আপত্তিকে বেশি গুরুত্ব দিলে গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে, তাই পূর্ব পাকিস্থানের শাসকেরা , নার্সদের উপর পাশবিক পেশাগত অত্যাচার শুরু করে।মিটফোর্ড হাসপাতালের মহিলা বিভাগ তুলে দিয়ে, সেই অংশটি পুরুষ চিকিৎসকদের আবাসন তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।এই অমানবিক ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক নেতারা সেভাবে প্রতিবাদী হন না।পূর্ব পাকিস্থানের শাসকেরা মেয়েদের পেশা জীবনে যে লিঙ্গগত বৈষম্য এবং অব্যবস্থা আনছে, তা অচিরেই সেখানকার নারী সমাজকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথে অনেকখানি পিছিয়ে দেবে- কেবল নারী সমাজ নয়, নারী- পুরুষ নির্বিশেষে , গোটা বাঙালি সমাজকে এই ঊপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রথম সচেতন করেছিলেন সুফিয়া কামাল।কামরুন্নেছা লাইলি, রাইসা হারুনের মতো সমাজকর্মীদের সাথে নিয়ে '৫১ র জানুয়ারীতে যে উত্তাল আন্দোলন সুফিয়া কামাল গড়ে তুলেছিলেন , তার ফলে মিটফোরাড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তথা পূর্ব পাকিস্থানের স্বাস্থ্য দপ্তর , নার্সদের প্রতি বঞ্চনামূলক আচরণ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।পরের বছর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্থানের নারী সমাজ যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার সলতে পাকানোর কাজ টি সুফিয়া কামাল এই নার্সদের সফল ধর্মঘট সংগঠিত করবার ভিতর দিয়ে করেছিলেন।
ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সুফিয়া কামালের অবদান ঘিরে বলতে হয়; ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর বুকে এক ইতিহাস তৈরি করলো।মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহিদ হলো ফরকত, রফিক, জব্বার সহ কত সন্তান।স্বৈরাচারি শাসক গোষ্ঠী দেখলো বাঙালির বিক্রম, তার আত্মত্যাগ।মেয়েরা, মায়েরা , বধূরা আর শুধু শোকাকুলা নন।তাঁরা সাহসিকা।পথে পথে শোক মিছিল।নগ্ন পদে , কচি বাচ্চার হাত ধরে ,পুলিশের আক্রমণ তুচ্ছ করে, মানুষকে নিয়ে , বিশেষ করে মেয়েদের নিয়ে বের হলেন সুফিয়া কামাল।তাঁর এই ভূমিকার ফলেই কাজী মোতাহার হোসেনের পত্নী, কন্যা সনজিদা, লায়লা সামাদেরা পথে নামলেন।কামরুনানেছা লাইলি, ছাত্রী সুফিয়া লিলি, নাদেরা, হালিমা খাতুন, আফসারী খানম, নূরজাহান মুরশিদ প্রমুখেরা পথে নেমে কেবলমাত্র রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করলেন না।উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার ভিতর দিয়ে , ব্রিটিশের আদলে পশ্চিম পাকিস্থানের যে ভয়াবহ আর্থ- সামাজিক- রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক- ধর্মীয় শোষণ, সে সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্থানের মানুষদের প্রথম সচেতন করবার কাজটি করেছিলেন সুফিয়া কামাল।তাঁর এই কাজটি পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্থানের ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে , স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিশেবে মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।
ভাষা আন্দোলনে বাঙালির সাফল্যে ভেস্তে দিতে পশ্চিম পাকিস্থান তৎপর ছিল মারাত্মক ভাবে।অবিভক্ত পাকিস্থানের আসন্ন প্রথম সাধারণ নির্বাচনে (১৯৫৪) যাতে মুসলিম জাতীয়তার ধারক বাহক মুসলিম লিগ ই একক গরিষ্ঠ হয়, সেই লক্ষ্যে , পবিত্র ইসলামকে বিকৃত করে, অর্থনীতির মূল অঙ্গনে নারী সমাজের ভূমিকাকে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যার ভিতর দিয়ে আটকে দেওয়া ছিল পাকিস্থানের উলেমা সমাজের লক্ষ্য।নারী যাতে কোনো অবস্থাতেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করে পুরুষের সমকক্ষ না হয়ে ওঠে, ভাষা আন্দোলনের পর , সেই ভাবনাকে সফল করতে গোটা পাকিস্থানের উলেমা সমাজ আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে।পুরুষতান্ত্রিক এইধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যাকারীদের বিরুদ্ধে ,তখন অবিভক্ত পাকিস্থানের প্রগতিশীল রাজনীতিকেরাও আসন্ন ভোটের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে দ্বিধান্বিত ছিলেন।উলেমা সমাজের ধর্মের এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদ করেই সেদিন চুপ করে থাকেন নি সুফিয়া কামাল।প্রতিবাদকে প্রতিরোধে সুসংবদ্ধ রূপটি ও তাঁর ই নেতৃত্বে পেয়েছিল।
মহিলারা ঘরের বাইরে কাজ করতে পারবেন না, ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের অব্যবহিত পরেই('৫৩) এই ফতোয়া জারি করে পাকিস্থানের উলেমা সমাজ।এই ব্যবস্থা কায়েম হলে , নারী পুরুষের সমান অধিকার যে সমূলে উৎপাটিত হবে-- একজন পুরুষ রাজনৈতিক নেতা যখন এ কথা বলার সাহস পান নি মোল্লাতন্ত্রের ভয়ে, তখন প্রকাশ্যে কেবল এ কথা বলেই থেমে যান নি সুফিয়া।গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি, পাক কৃষ্টি সংসদ, পুরানো পল্টন মহিলা সমিতি প্রমুখ সংগঠন কে নিয়ে রাজপথে প্রতিরোধের সংকল্পে নেমেছিলেন তিনি।কমিউনিস্ট নেত্রী আশালতা সেন, লুৎফুন্নেছা আব্বাস, কাজী মোতাহার হোসেনের পত্নী , কামরুন্নেছা লাইলি প্রমুখদের নিয়ে গণ প্রতিরোধ সুফিয়া কামাল সংগঠিত করেছিলেন। '৫৪ তে , অবিভক্ত পাকিস্থানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের গোহারা হেরে যাওয়ার পিছনে, এই আন্দোশনের ব্যাপক ভূমিকা আছে।
দেশভাগের পর চা শিল্পের নিয়ন্ত্রণে ভারত এবং পাকিস্থানে অনেককাল পর্যন্ত ব্রিটিশ বাগিচা মালিকদের অত্যাচার ছিল ভয়ঙ্কর।এই অত্যাচারের সবথেকে বেশি শিকার হথেন নারী শ্রমিকেরা।তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানের শ্রীহট্ট জেলাতে যেসব চা বাগান ছিল, তার বেশিরভাগের ই নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ মালিকদের উপর।এইসব ব্রিটিশ মালিক এবং তাদের দেশিয় দালালেরা সবথেকে বেশি অত্যাচার করতো নারী শ্রমিকদের উপর।সেই অত্যাচার ঘিরে পূর্ব পাকিস্থানে প্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন সুফিয়া কামাল।'৫৩ সালে শ্রীহট্টের চা বাগানে মহিলা শ্রমিকদের উপর অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং শারীরিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে সুফিয়া কামালের যে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের সংকল্প, বিভাজনের পর, কমিউনিস্টদের শক্তি ক্ষয়ের পর, পূর্ব পাকিস্থানে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করবার ক্ষেত্রে এই ঘটনাক্রম ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।এইদিক থেকে বিচার করে , সুফিয়া কামাল কে পূর্ব পাকিস্থান, তথা আজকের স্বাধীন, সার্বভৌম পাকিস্থানের শ্রমিক আন্দোলনের আধুনিক পর্বের অন্যতম স্থপতি বলতে হয়।
আজ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই সাম্প্রদায়িকতার বিষে জর্জরিত।মৌলবাদের দাপটে বিদীর্ণ।এইরকম একটি কঠিন সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতার , সম্প্রীতির মূর্ত বিগ্রহ সুফিয়া কামালের জীবন ও কর্মধারার চর্চা , আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগোনোর একটি সঙ্কেত।পবিত্র ইসলামকে ধারণ করে কিভাবে মানবিক মূল্যবোধের পরাকাষ্ঠা হয়ে ওঠা যায়, পড়শি হিন্দু সম্প্রদায়ের আত্মার আত্মীয় হওয়া যায়, সুফিয়া কামালের জীবনটাই তার জীবন্ত উদাহরণ।এমন অসাম্প্রদায়িক মানুষের সাথে তুলনা চলে বিশ শতকে তাঁর সহপথিক মুজফফর আহমদ, কাজী নজরুল, অন্নদাশঙ্কর রায়, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখের।তাঁদের উত্তরাধিকারী হিশেবে সুলতানা কামালের মতো আত্মনিবেদিত মানবাধিকার নেত্রীর সঙ্গে এক পৃথিবীর জল বায়ু আগুনকে ঘিরে আমরা বেঁচে আছি-- এ আমাদের অহঙ্কার।

গৌতম রায়


শেয়ার করুন

উত্তর দিন