হিন্দুত্ববাদীরা কৌশল বদলাচ্ছে

মুসলমানদের ঘিরে হিন্দুত্ববাদীরা কৌশল বদলাচ্ছে

Gautam-Roy

গৌতম রায়

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত সম্প্রতি বলেছেন; গোরক্ষার নাম করে যারা গণপিটুনিতে জড়িত, তারা হিন্দুত্ব বিরোধী। সরসঙ্ঘ চালক মোহন ভাগবতের হঠাৎ এই বোধদয় দেখলে রবীন্দ্রনাথের পঙতি ই মনে পড়ে যায়; এ যে দেখি জলে ভাসে শীলা। গত ২০১৪ সালে একক গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মবলিঞ্চিং আর হিন্দুত্ব কার্যত একাকার হয়ে গিয়েছে।মোদির শাসন যতো বিস্তার লাভ করেছে, দেশের আনাচে কানাচে গোরক্ষার নাম করে পরিকল্পনা মাফিক মুসলমান হত্যা ততো বেড়েছে। সেই বর্বরতার ভিডিও তুলে সামাজিক গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে সঙ্ঘ পরিবার ই।দেশের বাইরে বার বার এই কথাই উঠে এসেছে যে, ভারতে কি আদৌ আইনের শাসন আছে? ধর্মের দোহাই দিয়ে এই পরিকল্পিত নরহত্যার প্রতিবাদ শাসক বিজেপি শিবির থেকে কখনোই উচ্চারিত হয় নি।
গোরক্ষার নাম থেকে শুরু করে ঘর ওয়াপসি, লাভ জেহাদ ইত্যাদির নাম করে গত সাত বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে পরিকল্পিত মুসলমান হত্যা চলেছে তার মূল সংগঠক হল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ।তাদের বিভিন্ন শাখা সংগঠন গোটা উত্তর ভারত জুড়ে এই দানবীয় তান্ডব ঘটিয়ে চলেছে। সেই তান্ডবের রেশ পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলাতে পর্যন্ত পড়েছে। একটি ক্ষেত্রেও এই মব লিঞ্চিংয়ে অভিযুক্তরা বিন্দুমাত্র সাজা পায় নি।সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ লোকজনেরাই এইসব পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধেই পুলিশ- প্রশাসন এতোটুকু সক্রিয় ভূমিকা নেয় নি। এইসব অপরাধগুলি যে সংগঠনটির মূল অঙ্গুলি হেলনের ফলে হয়েছে, সেই আর এস এস প্রধান মোহন ভাগবত যখন হঠাৎ করে প্রকাশ্যে বললেন; গরু পবিত্র প্রাণী ।কিন্তু গণপিটুনিতে যারা যুক্ত তারা হিন্দুত্ব বিরোধী। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।এই সঙ্গেই মার্চেন অফ ভেনিসে পোর্শিয়ার সাওয়ালের ধাঁচেই মোহন ভাগবত বলে রেখেছেন; কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণপিটুনিতে খুনের ভুয়ো অভিযোগ ও ধরা পড়ছে।-- তখন আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছে না কি শেয়ালপন্ডিত আর কুমির ছানাদের গল্পটি? এই বোধদয়ের জন্যে মোহন ভাগবত বেছে নিয়েছেন ,' মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ' নামক সংগঠনটির মঞ্চকে। সঙ্ঘ পরিবারের অন্তর্ভূক্ত এই সংগঠনটির জন্ম ২০০২ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মুসলমান সমাজের ভিতর নিজেদের একটা ছোট গোষ্ঠী নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে তৎকালীন সরসঙ্ঘচালক কে এস সুদর্শনের মস্তিস্কপ্রসূত এই সংগঠন টির এখন প্রায় দশ হাজারের উপর সদস্য সংখ্যা। হিন্দু ভারতের সঙ্গে মুসলমানদের পরিচিত করফার লক্ষ্য নিয়ে আর এস এস এই সংগঠন টি তৈরি করেছে। মুসলমান সমাজের ভিতরে একটা নিজস্ব গোষ্ঠী তৈরি করে সাধারণ মুসলমান, যাঁদের ভিতর আর এস এস সম্পর্কে একটা তীব্র বিতৃষ্ণা আছে, সেইসব মানুষদের ভিতর চরম বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশ্য নিয়েই আর এস এস এই এম আর এম নামক শাখা সংগঠন টি তৈরি করেছে। এককথায় বলতে গেলে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকেই এই সংগঠন টি আর এস এস তৈরি করেছে।আর সেই সংগঠনের মঞ্চ থেকে যখন গণপিটুনিকারীদের উদ্দেশে মোহন ভাগবত কঠিন শব্দ ব্যবহার করছেন, তখন খুব সহজেই বুঝতে পারা যায় যে, সাধারণ মুসলমানদের ভিতরে একটা আন্তর্কলহ তৈরি করাটাই মোহন ভাগবত এবং আর এস এসের প্রধান উদ্দেশ্য। যখন গোটা দেশ জুড়ে গোরক্ষার নাম করে গণহারে পরিকল্পিত মুসলমান হত্যা, নির্যাতন ঘটছে, তখন এই ' মুসলিম রাষ্ট্রীয় মোর্চা'কেন শীত ঘুমে ছিল? - লব লিঞ্চিং নিয়ে এই সংগঠনের মঞ্চ তে মোহন ভাগফতের নতুন বোধদয়ের প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নটাই প্রথম উঠে আসে।
যে সংগঠনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মোহন ভাগবত তার এতোদিনের বলা কথার একশো ডিগ্রি বিপরীতে গিয়ে কথা বললেন, সেই' মুসলিম রাষ্ট্রীয় মোর্চা' কিন্তু গোরক্ষা ঘিরে আর এস এসের মতের পরিপূর্ণ সমর্থক।২০০২ সালে গোধরা কান্ডের ঠিক পরেই মহঃ আফজল কে সামনে রেখে এই সংগঠনটিকে আর এস এস তৈরি করেছিল। দেওবন্দ পন্থী জামায়েতে ইলেমা ই হিন্দ, যাদের ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা ছিল, কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ এই সংগঠনটি ২০০৯ সালে সিদ্ধান্তে আসে ' বন্দেমাতরম' ইসলাম বিরোধী। ' মুসলিম রাষ্ট্রীয় মোর্চা' বা ' এম আর এম' দেওবন্দীদের বিপরীত অবস্থান নেয় বন্দেমাতরম ঘিরে। এম আর এম প্রকাশ্যে জামায়াতে উলেমা ই হিন্দের বন্দেমাতম ঘিরে সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার আহ্বান জানায় মুসলমান সমাজের প্রতি।তারা পাল্টা বলে; যারা বন্দেমাতরম গাইতে অস্বীকার করবে তারা এক ই সঙ্গে ইসলাম এবং ভারত বিরোধী। আর এস এস তাদের এই শাখা সংগঠন এম আর এমের মাধ্যমে ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে ' পয়গম এ আমন ' ( শান্তিবার্তা) নামক একটি অভিযান করেছিল দিল্লির লালকেল্লা মুখী। সেই অভিযানে কাশ্মীরের অমরনাথে জমি বিতরণ কে সমর্থন জানানোর আওয়াজ উঠেছিল।পরবর্তীতে জম্মু- কাশ্মীরের সীমানা পর্যন্ত ঝাড়খন্ডের তৎকালীন শাহি ইমাম মৌলানা হাইজাব রেহমান মেরঠির নেতৃত্বে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি অভিযান ও হয়েছিল।জনা পঞ্চাশেক মানুষ নিয়ে সেই অভিযান জম্মুর সীমান্ত পর্যন্ত যায় ।সেখানে ' শ্রীঅমরনাথ সংঘর্ষ সমিতি' র নেতৃত্বের সঙ্গে তারা আলোচনা ও করে। ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে এম আর এম মুম্বাইয়ের গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি শোভাযাত্রা ও করেছিল। এই ধরণের একের পর এক কর্মসূচির ভিতর দিয়ে আর এস এস তাদের নিজেদের কর্মসূচিগুলি এম আর এমের ভিতর দিয়ে পালন করে মুসলমান সমাজের ভিতরে একটা বিভ্রান্তির পরিবেশ তৈরি করে।সঙ্ঘের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে যে তীব্র মুসলমান বিদ্বেষ রয়েছে, সেটি সম্পর্কে মুসলমান সমাজের ভিতরে বিভ্রান্তি তৈরি করাই হল এই এম আর এমের একমাত্র লক্ষ্য। মোহন ভাগবত যে বলেছেন; যদি কোনো হিন্দু বলেন, এ দেশে কোনো মুসলমান থাকতে পারবে না, তবে সেই ব্যক্তি হিন্দু নন।সঙ্ঘ প্রধানের এই বক্তব্যের ভিতরে অত্যন্ত সূক্ষ ভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাদের ' গুরুজী' এম এস গোলওয়ালকরের কথার ই প্রতিধ্বনি। গোলওয়ালকর তার ' সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ' তত্ত্বে এই দেশে মুসলমানদের বসবাসের উপরে কখনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেন নি, করেছিলেন মুসলমানদের নাগরিক অধিকারের উপর  ফতোয়া জারি।গোলওয়ালকার অত্যন্ত পরিস্কার ভাবে বলেছিলেন; ভারতে বসবাসকারী মুসলমানেরা হবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।
আজ মোহন ভাগবত ও যে গোলওয়ালকরের কথার ই পুনরুক্তি করছেন- এটা ভুলে গেলে চলবে না।মুসলমানদের থাকা ঘিরে সঙ্ঘ প্রধানের আপত্তি নেই।কিন্তু সঙ্ঘ প্রধান চান; ভারতে বসবাসকারী মুসলমানদের রাজনৈতিক হিন্দুদের ' জিম্মি' হয়ে থাকা।তাই উত্তরপ্রদেশ- উত্তরাখন্ড- গুজরাট- ত্রিপুরার আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া দরকার।সেই কারণেই সঙ্ঘের নিবিড় নিয়ন্ত্রণের কিছুটা বাইরে চলে যাওয়া নরেন্দ্র মোদি- অমিত শাহ জুটিকে উগ্র হিন্দুত্বের পথে কৌশলগত কারণেই সাময়িক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হবে।তাই অনেকটা ভুতের মুখে রামনামের প্রচলিত লব্জের মতোই গোরক্ষা ইত্যাদির নাম করে মব লিঞ্চিং ঘিরে এই ধরণের কথা বলছেন মোহন ভাগবত। ভারতীয় মুসলমান সমাজের আর্থ- সামাজিক- সাংস্কৃতিক দাবি দাওয়া এবং যাবতীয় অবস্থান ও ভাবাবেগের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেয় এম আর এম। গত লোকসভা ভোটের অল্প কিছু আগে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই সংগঠন টি আর এস এস - বিজেপির ভারতীয় সংবিধানে র ৩৭০ নম্বর ধারা অবলুপ্তির যে দাবি ছিল, সেই দাবির সমর্থনে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে নেমেছিল।সেই অভিযানে তারা প্রায় সাত লক্ষ স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫! এ ধারা বাতিল করেন।এই সময়ে সঙ্ঘ - বিজেপি বার বার দাবি করেছিল; মুসলমান সমাজ ও নাকি এই দুটি ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত।এই দাবি হিন্দু সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদী শিবির করেছিল এম আর এমের ওই কর্মসূচির উপর ভিত্তি করেই।বস্তুত আর এস এসের কর্মসূচি গুলিকেই সমর্থন করা এবং সেইসব কর্মসূচির পিছনে মুসলমান সমাজের আকুন্ঠ সমর্থন আছে- এটা দেখানোই হল সঙ্ঘ পরিবারের এই শাখা সংগঠন টির একমাত্র উদ্দেশ্য। এইভাবেই তারা ভারতের মুসলমান সমাজের ভিতরে বিভ্রান্তি তৈরি করে চলেছে।আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে ও ভারতীয় মুসলমান সমাজ সম্পর্কে এম আর এম এভাবেই একটা ভুল ধারণা তৈরি করে চলেছে। যে সংগঠনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত পরিকল্পিত ভাবে গণপিটুনি র মাধ্যমে যারা মুসলমান হত্যা করছে , তাদের বিরোধিতার সুদক্ষ অভিনয় করেছেন, সেই এম আর এম সংগঠন টি কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে সবরকম ভাবে বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদিকে সমর্থন করেছিল। এই এম আর এম প্রধান মহঃ আফজল গত লোকসভা ভোটের আগে মোদি এবং বিজেপির সমর্থনে পঞ্চাশ মিলিয়ন মুসলমানের কাছে পৌঁছবার টার্গেট নিয়েছিল। গুজরাট গণহত্যায় মোদির ভূমিকা ঘিরে মহঃ আফজল কে প্রশ্ন করা হলে সে বলেছিল; মোদি যদি সত্যিই দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত থাকতেন, তাহলপুলিশ কে ১২০০ রাউন্ড গুলি চালাতে হতো না আর ২০০ জন দাঙ্গাকারী ও নিহত হতো না। গত ১২ বছরে গোটা গুজরাটে একটাও সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা নেই( দি হিন্দু-০৫\১০\২০১৪)। এই হেন সংগঠনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে গোরক্ষার নাম করে মুসলমান হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মোহন ভাগবতের অভিনয়ের স্বরূপটা সহজেই বুঝতে পারা যায়।
শেয়ার করুন

উত্তর দিন