Stalin: A Legacy

জোসেফ ভিসারিয়ানোভিচ স্তালিনঃ পৃথিবীতে প্রথম সমাজতন্ত্রের অন্যতম নির্মাতা

রাশিয়ায় কমিউনিস্ট বিপ্লবের দুইটি পর্ব, দুইটি যুগ। প্রথমটিতে বিপ্লবের প্রধান লক্ষ্য পুরানো যা কিছু, পিছনের দিকে টেনে রাখে এমন যাবতীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ঐতিহাসিক জঞ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা। দ্বিতীয় পর্বে বিপ্লবের লক্ষ্য গঠনমূলক, সমাজতন্ত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে।

লেনিনের নয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনা (NEP) ছিল সেই নির্মাণকার্যের প্রথম ধাপ। শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর উপরে ভিত্তি করে সর্বহারা শ্রেণী সবেমাত্র দেশের ক্ষমতা দখল করেছে, সোভিয়েত রাষ্ট্রের চারপাশে সেসময় সাম্রাজ্যবাদের বেষ্টনী। শিশু সমাজতন্ত্রকে জন্মের পরেই টুঁটি টিপে খুন করতে পুঁজিবাদের আক্রমন অব্যাহত, ভিতরে – বাইরে দুদিক থেকেই। এই অবস্থাতেই দেশ এবং কমিউনিস্ট পার্টির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা দেশ রক্ষার কাজে অভাবনীয় সাফল্য দেখালেন। প্রতিবিপ্লবকে পরাস্থ করা হয়। বিল্পব বেঁচে থাকে। লেনিনের নেতৃত্বের আরেকটি সাফল্য – বলা যায় সবচেয়ে বিল্পবের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা ছিল প্রতিবিপ্লবের মোকাবিলা।

রাইফেলের বোল্ট টেনে ধরে লক করার শব্দই হল স্তা…. লি….ন।

প্রস্তুতির শব্দ স্তালিন, প্রতিরোধের শব্দ স্তালিন।

সেই স্তালিন এই প্রতিবিপ্লবের যুগেই প্রথম গড়ে তোলেন লাল ফৌজ। শ্বেত সন্ত্রাসকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে – তখন ট্রটস্কির কেন্দ্রীয় সমরবিভাগ ছিল কার্যত দিশাহীন। সমরবিজ্ঞানের কেতাবি কায়দা কানুনের মুখাপেক্ষী হয়ে না থেকে স্তালিন নির্মাণ করেন সময়োপযোগী রণকৌশল। আজকের পৃথিবীতে সেইসব যুদ্ধবিদ্যার শিক্ষার্থীদের অবশ্যপাঠ্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ত আক্রমনের সামনে রাশিয়ার সেনাবাহিনী যে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাতে “There is no land behind Volga” স্লোগানের ভূমিকা নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে, এখনও সেইসব লেখা চলছে। আধুনিক যুগের একজন অন্যতম সমরশাস্ত্রবিদ হিসাবে স্তালিন-কে চিহ্নিত করতে এক মূর্খ ছাড়া কারোর অসুবিধা নেই।

এই নিবন্ধের বিষয়বস্তু সমরশাস্ত্র নয়। একজন অতি দক্ষ কমিউনিস্ট সংগঠক হিসাবে স্তালিনের উদাহরণ আজকের দিনে কার্যত কিংবদন্তী। সেই নিয়ে কোন পুনরাবৃত্তিও এই লেখায় নেই। এই লেখার ভিত্তি স্তালিন কিভাবে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের ভিত তৈরি করেছিলেন। রাশিয়া ছিল একটা পশ্চাদপদ থাকা রাষ্ট্রকাঠামো। পুঁজিবাদী দুনিয়ায় টিপ্পনিসহ বলা হত ‘রাশিয়া আসলে ইউরোপের পিছনের উঠোন’ – প্রাচীন সামন্তবাদী চেহারা নিয়ে জারের রাশিয়া দাঁড়িয়েছিল পুঁজিবাদের দোরগোড়ায়। এই রাশিয়াকেই সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার শপথ নিয়েছিলেন লেনিন, জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, ট্রটস্কি, রাদেক এবং স্তালিনসহ গোটা পার্টি।

১৯১৮ সালের ৩০ শে অগাস্ট সোশ্যালিস্ট রেভোলিউশনারি পার্টির আততায়ীর গুলিতে জখম হলেন লেনিন। উদ্দেশ্য ছিল হত্যার। লেনিন ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, ১৯২৪ সালে মারা যান –  NEP-এর সাফল্য সেভাবে দেখে যেতে পারেন নি। এই NEP আসলে ছিল তৎকালীন রাশিয়ার পশ্চাদপদতার বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে কিছুটা পিছনে ফিরে শুরু করার মতো ব্যাবস্থপনা। রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে অনভিজ্ঞ প্রলেতারিয়েত তখনও জানেনা কিভাবে ব্যাংক পরিচালনা করতে হয়, কিভাবে অর্থনীতি গড়ে তুলতে হয় কিংবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসাবে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। মুনাফার গন্ধ শুঁকে ততদিনে বিরাট বিরাট ধনবাদীদের রাশিয়ায় আনাগোনা শুরু হয়ে গেছিল।

ট্রটস্কি রাশিয়ার পরিস্থিতির অনেকটাই সদর্থক বিশ্লেষণ করেছিলেন। কিন্তু সেই গবেষণার ফলাফল নির্ধারণ করলেন উল্টো! সাম্যবাদের দিকে এগোতে সবচেয়ে বড় বাধা যে পশ্চাদপদ মানসিকতা তার গোড়ায় রয়েছে কৃষিভিত্তিক সামন্তবাদী সমাজকাঠামো। এই মানসিকতা বাধাস্বরূপ, কারন এতে ব্যাক্তি পুঁজি, ব্যাক্তি মালিকানার প্রতি ভীষণরকম ঝোঁক থাকে। তখন রাশিয়ার সমাজের সর্বত্র সেই চাষাসুলভ মেজাজ। তাই রাতারাতি সেই বাধাকে ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে বিপ্লবী বুলির জোরে সাম্যবাদের দিকে এগোতে গেলে ফল হবে উল্টো – এই বাস্তবতা লেনিন, স্তালিন বুঝেছিলেন। ট্রটস্কি সবটা বুঝেও বিপরীত সিদ্ধান্ত নিলেন, সাম্যবাদী রাশিয়া নির্মাণের পথে দেশের কৃষককূলকেই প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করলেন। অথচ তার অজানা নয় রাশিয়ায় বিপ্লব সফল হবার প্রধান শর্তই ছিল শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী। ট্রটস্কির পরিকল্পনায় বিশ্ববিপ্লবের তত্ত্বগত ভিত ছিল এরকমই উল্টানো বোঝাপড়া। বুখারিনও কিছু পরে ট্রটস্কিকে সমর্থন করতে গিয়ে নিজেদের তত্ত্বে গোঁজামিল খুঁজে পেয়েছিলেন – তাই চুপ করে যান। ততদিনে তারা সবাই স্তালিন নিন্দায় আলোচনা সমালোচনার নামে ‘খেউড়’ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

ট্রটস্কি
রাদেক
বুখারিন

লেনিনের মারা যাবার পরে পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন স্তালিন। ততদিনে NEP নিজের সুফল দেখাতে শুরু করেছে, যদিও সারা পৃথিবীর উন্নত পুঁজিবাদী উৎপাদনের সামনে রাশিয়ার অবস্থান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। স্তালিন নিজে উপলব্ধি করেছিলেন বাজারে উৎপাদন এবং বেচাকেনার কর্মকাণ্ডে একচেটিয়া অধিকারের জোরে, উদ্বৃত্তের জোরে পুঁজিবাদ অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এই অসম যুদ্ধে আক্রমনের মুখে না পেছিয়ে তাকে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। নতুন রণকৌশলের রূপরেখা তৈরি করলেন যার কেতাবি নাম হতে পারে ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অ আ ক খ’।

সেসময় পার্টির ভিতরে অনেকগুলি তাত্বিক বিতর্কের অবতারনা করা হয়, সেসবের কিছুটা জেনে বুঝে বাকিটা মূলত সমাজতন্ত্র এবং অর্থনীতি সম্প্রকে ভ্রান্ত ধারণা থেকে। কথা উঠল সমাজতন্ত্রে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ কিভাবে হবে, উৎপাদনের উপকরনে ব্যাক্তি মালিকানা আর নেই, তাহলে সমাজতন্ত্রের কাজ প্রায় শেষ – এবার নিশ্চিন্তে সাম্যবাদের দিকে এগিয়ে যাওয়া হোক, এমনকি এই অবধিও বলা হল রাশিয়াতে পুঁজিবাদ একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর ফিরে আসতে পারবে না। এসব আলোচনাই হয়েছিল পার্টির ভিতরে, বাইরে তখন কোন দেশের সাথে সোভিয়েতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক যাতে না তৈরি হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে পুঁজিবাদ – সাম্রাজ্যবাদের ম্যান্ডেট চলছে। কেউ প্রযুক্তিগত সাহায্য দেবে না, কেউ রাশিয়ার সাথে ব্যাবসাবাণিজ্য করবে না এমন অবস্থাতেই স্তালিন এবং সোভিয়েতের পার্টি সিদ্ধান্ত নেয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাশিয়াকে স্বনির্ভর হতে হবে। আগাগোড়া কৃষিভিত্তিক একটা দেশ নিজেদের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিল ভারি শিল্প নির্মাণকে – কেতাবি পন্ডিত সমাজের অনেকেই তখন হেসেছিল, অনেকেই ভেবেছিল এতে দ্রুততর হবে সোভিয়েতের পতন। ইতিহাস তাদের কাউকেই মনে রাখেনি, মনে রেখেছে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্যকে। টুকরো টুকরো সম্ভাবনাগুলিকে একজায়গায় এনে সঠিক পরিকল্পনা আর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির সাহায্যে সেই নির্মাণের মালা গেঁথেছিলেন স্তালিন।

প্রথম কথা স্তালিনের সময়কার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কোন আকস্মিক ভাবনা ছিল না। NEP পরবর্তী রাশিয়ার বাস্তবতায় সেই পরিকল্পনা ছিল NEP এর সবচেয়ে স্বাভাবিক এবং অনুসারী অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসাবে সবচেয়ে কার্যকরী আর্থিক কর্মকাণ্ড।

মার্কস বলেছিলেন সমাজতন্ত্রের উন্নত ধাপে বা সাম্যবাদী সমাজের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট সেই সমাজে শ্রম একটা বিরক্তিকর ব্যাপার থেকে মানুষের জীবনে প্রাথমিক প্রয়োজনে পরিণত হবে।

এঙ্গেলস লিখে গেছেন কমিউনিস্ট সমাজে বোঝা হবার বদলে শ্রম পরিণত হবে আনন্দে। 

স্তালিনের পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল গোটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেশের জনসাধারনকে যুক্ত করে নেওয়ার ব্যাপারটি। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির কারনে তিনি বুঝেছিলেন পুঁজিবাদ উৎপাদনের সমস্যার সমাধান যেভাবে করে সমাজতন্ত্রে তা খাটবে না, অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাথমিক শর্তই হবে কার্যকরী এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান যার ফলে মানুষ মানুষের মতো বাঁচার অধিকার পাবে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পুঁজিবাদের সাথে মোকাবিলাও করতে হবে। তাই রাশিয়ায় উৎপাদনের উপাদানগুলির উন্নতিসাধনের কাজটিকে তিনি এড়িয়ে যান নি, বলেছিলেন উৎপাদনের উপাদানসমূহের প্রসার ঘটাতে হবে উচ্চহারে এবং একইসাথে সামাজিক উৎপাদনের যে প্রক্রিয়া তাকে নিরবিচ্ছিন্নরুপে প্রসারিত করতে হবে। অর্থনীতিবিজ্ঞান সেভাবে না জানা থাকলেও যে কেউ বুঝে যাবেন এতে একদিকে উৎপাদন প্রক্রিয়ার চরিত্র হবে আধুনিক কিন্তু সেই আধুনিকতায় কারোর রোজগার চলে যাবে না বরং ক্রমশ নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়ে বেকারি এবং বেরোজগারি সমস্যার সমাধান করবে। পুঁজিবাদ কখনো এই দুই সমস্যার একইসাথে সমাধান করতে পারে না, আজও না। স্তালিন পেরেছিলেন, সোভিয়েত পেরেছিল। ট্রটস্কি যখন ঐক্যমতে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছেন সেই সময়কে ১৯২০ সালের সময়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় কলকারখানায় উৎপাদন বেড়েছে ১৭৬ শতাংশ এবং গোটা দেশেই শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি (বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে হিসাব করে মজুরি বাড়ার পরিমাণকে বিচার করলে তাকে বলা হয় Real Income বা প্রকৃত মজুরি) বেড়েছে ৭৫০ শতাংশ।

বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার সমাজে সর্বত্র যে চাষাসুলভ মেজাজ ছিল সেই সমস্যার সদর্থক সমাধান না করে সমাজতন্ত্রের দিকে এগোন যাবে না একথা স্তালিনের চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ বোঝেনি। আর তাই তিনি লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন চাষাসুলভ পাতিবুর্জোয়া মানসিকতাকে, ট্রটস্কির মতো তিনি কৃষকদের উন্নয়নের শত্রু বলে দাগিয়ে দেন নি। স্তালিন নির্দেশ দিলেন বা বলা চলে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় কৃষিক্ষেত্রে যৌথখামারগুলির জন্য সুবিধাজনক হবে এমন এক ক্রমিক ব্যাবস্থার পত্তন করতে হবে যাতে পণ্য-বেচাকেনার ব্যাবস্থাকে ক্রমশ প্রতিস্থাপিত করবে সামগ্রী-বিনিময় ব্যাবস্থা। এর ফলে ধীরে ধীরে উৎপাদনে পুঁজিবাদী প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। একইসাথে ছোট ছোট জমির মালিকানায় কৃষকদের চেতনায় যে ব্যাক্তিমালিকানার মোহ থাকে তাও কেটে যাবে। সবাই পরিণত হবে কৃষিমজুরে – অর্থাৎ শ্রমিকে। রাশিয়ার সমাজের চিত্রটাই যাবে পাল্টে। এই ঘোষণায় বড় বড় জমির মালিকদের রাতের ঘুম চলে গিয়েছিল – তারাই সেদেশে কুলাক বলে চিহ্নিত ছিল এবং প্রত্যাশা মতোই তারা এর বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণাও করেছিল। কিন্তু ততদিনে ছোট জমির কৃষক, ক্ষেতমজুররা বুঝে গেছেন এই ব্যাবস্থা আখেরে বেশিরভাগের মাথা তুলে বাঁচার সুযোগ। আর তাই কুলাকদের প্রতিবিপ্লবে বেশিরভাগ চাষিরা অংশগ্রহণ করেন নি, সোভিয়েত প্রশাসনের পক্ষে সহজেই সেই প্রতিবিপ্লবী চক্রান্ত রুখে দেওয়া গেছিল। কুলাকরা পরাজিত হয়ে ব্যাগভর্তি সম্পত্তিসহ দেশ ত্যাগ করে নাহয় নতুন ব্যাবস্থা মেনে নিতে বাধ্য হয়।

উপরে বলা এই দুই হাতিয়ারে একদিকে পুঁজিবাদী দুনিয়ার সাথে লড়াই করার মতো উৎপাদন ব্যাবস্থা গড়ে তোলা হল আরেকদিকে দেশের এই নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পথে সবচেয়ে বড় যে বাধা ছিল তাকে নিকেশ করে দেওয়া গেল। কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠন ব্যাপারটা কাকে বলে তা বুঝতেন বলেই স্তালিন সফল হয়েছিলেন, স্বপ্নালু বিষয়ীগত বিপ্লবীরা ( ট্রটস্কী, রাদেক কিংবা বুখারিন-দের মতো) যতই সাম্যবাদের কথামালা জপে যান না কেন আসলে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করতে হয় মাটির উপরে, বইয়ের পাতায় নয়। স্তালিন সেটাই করেছিলেন।

এই নির্মাণকল্পের শেষ পর্যায়ে ছিল স্তালিন এবং সোভিয়েত পার্টির ক্রান্তিদর্শী রাজনৈতিক বোধ। স্তালিন বঝেছিলেন নতুন সমাজের যে ব্যাখা সমাজতন্ত্রের তাত্বিকরা হাজির করেন তাতে সমাজতন্ত্রের আগাগোড়া চেহারাটা ঠিক কেমন হবে সেই নিয়ে জনগণের ধোঁয়াশা রয়ে গেছে, রয়ে যাবে – এমনকি পার্টির ভিতরেও একটি অংশের সেই দোলাচল থাকে। পুঁজিবাদ যতই শোষণ নিপীড়ন করুন যেহেতু সেই ব্যাবস্থার মধ্যে মানুষ বাস্তবের মাটিতে বেঁচে রয়েছেন সেই সম্পর্কে তাদের কষ্টকল্পনা তুলনামূলকভাবে অল্প (অবশ্য সেই কারনেই পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে বিপ্লবের প্রয়োজন বুঝতে জনগণকে বেশি মাথা খাটাতে হয় না)। আর তাই নতুন সমাজ নির্মাণের কাজে নতুন চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষের প্রয়োজন। নতুন মানুষই নিজেদের উপলব্ধি থেকে উন্মোচন করবে নতুন দিগন্তের। এই লক্ষ্যেই স্তালিনের পরিকল্পনা সামাজিক জীবনে প্রগতির ধারণাসমৃদ্ধ এমন এক সংস্কৃতির অগ্রগতি সুনিশ্চিত করতে হবে, যা সমাজের সব অংশের শারীরিক এবং মানসিক ক্ষমতাসমূহের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটাবে। এর ফলে জনগন সামাজিক বিকাশের প্রতিটি ধাপে সক্রিয় কর্মী হিসাবে অংশগ্রহন করআর উপযুক্ত শিক্ষায় অভ্যস্ত হবে। চলতি ব্যাবস্থার (পুঁজিবাদী) বাঁধাধরা নিয়ম অনুযায়ী একটি কাজে আটকে থেকে জীবন অতিবাহিত না করে এই নতুন মানুষ প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ বেচে নিতে পারবে।

এই কাজে সফল হতে সোভিয়েত সরকারের পক্ষে কয়েকটি সাধারণ পদ্ধতির প্রচলন করা হয়।

১) শ্রমিকদের কাজের সময় (শ্রম সময়) কমানো হয়।

২) জনগন যাতে নিজেদের পছন্দমতো শিক্ষালাভে সর্বোচ্চ অবসর পান তা সুনিশ্চিত করা হয়।

৩) আধুনিক প্রযুক্তিসম্মত সর্বজনীন বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যাবস্থা গৃহীত হয়।

৪) জনগণের বাসস্থানের অবস্থার আমূল উন্নয়ন সাধন।

৫) ক্রমাগত মজুরি বাড়িয়ে এবং ব্যাবহার্য দ্রব্যাদির দাম কমিয়ে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি (Real Income) অন্ততপক্ষে দ্বিগুন করে তোলা।

আজকের পৃথিবীতে পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে হাঁসফাঁস করা যেকোনো দেশের জনগন মাত্রেই বুঝবেন যদি উপরের পাঁচটি কাজ কোনো সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক নীতি হিসাবে প্রচলিত হলে জনজীবনের সাধারণ মানের সূচক কোন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

এভাবেই স্তালিন সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ভিত প্রস্তুত করেছিলেন। এই সত্য মাথায় রাখলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কিভাবে রাতারাতি পাউরুটির কারখানা রূপান্তরিত হয় বন্দুক ও গুলি সরবরাহের কাজে কিংবা যুদ্ধাস্ত্রে মজুতের অবস্থা ভাল না থাকা সত্বেও কিভাবে প্রেমিক প্রেমিকা, ছাত্রছাত্রী এবং গোটা দেশের অসামরিক জনগন একসাথে ফ্যাসিস্তদের রাইফেলের সামনে বুক পেতে লড়ে যায় তা বুঝতে অসুবিধা থাকে না। এসবকিছুই সম্ভব হয়েছিল কারন স্তালিনের পরিকল্পনা অনেকটাই সফল হয়েছিল। সেই কারনেই হিটলার মুসোলিনির বিভীষিকাময় যুদ্ধবাজ রাজনীতিকে পরাস্থ করার পরে যে বিধ্বস্ত সোভিয়েত প্রায় ২০ বছর পেছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল সেই দেশই পুনরায় নিজের জোরে নিজের পায়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। 

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির চেহারা কেমন হতে হয় সেই নিয়ে একটি কর্মকাণ্ডের উদাহরণ স্তালিন নিজেই তার Economic Problems of Socialism in the USSR বইতে উল্লেখ করেছেন। একবার খুব দ্রুত তুলার উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়েছিল। তুলা উৎপাদনকারীদের কথা মাথায় রেখে তুলা এবং শস্যের যথার্থ দাম নির্ধারণের দরকার হয় যাতে কম দামে তারা শস্য ক্রয় করতে পারে এবং সঠিক দামে সরকার উৎপাদিত তুলা কিনে নিতে পারে । সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের কমিশার এবং প্রশাসনিক দপ্তর সিদ্ধান্ত নেয় একই দামে তুলা এবং শস্য বিক্রয় করা হবে এবং আরও পরে সেই মূল্যকে এক টন পাউরুটির সাথে সমান করে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। এই সমাধান বাস্তবিক অসম্ভব ছিল – কেননা শস্যের ক্ষেত্রে এবং এক টন পাউরুটির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যাবৃত্ত উৎপাদনের চক্রে যে বাড়তি শ্রম এবং মুল্যের প্রয়োজন হয় তাতে কখনো এক টন তুলো এবং এক টন পাউরুটির সমান দাম হতে পারে না। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। সিদ্ধান্ত হল তুলার বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং শস্যের দাম কমানো হবে। এতে তুলা চাষিরা উৎসাহিত হয় এবং বাড়তি তুলার চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। যদি প্রশাসনিক প্রস্তাব মেনে শস্য কিংবা পাউরুটির দামের সাথে তুলার দাম সমান করে দেওয়া হত তবে ফলাফল হতো উৎপাদনের লক্ষ্যে চরম ব্যার্থতা।

একথা ভুললে চলে না সমাজতন্ত্রিক রুপান্তরকরণের কাজে কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোভিয়েত প্রশাসনের সব অংশ একই প্রকার বিচক্ষনতা দেখাতে পারেনি। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবই তার প্রধান কারন। দীর্ঘদিনের সামন্তবাদী অভ্যাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম সরকারি পদ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগকেই বাধা পেরোনোর কাজে সহজ সমাধান মনে করে নেয়। সেইকারনেই কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত রুপায়নে যান্ত্রিকতার ত্রুটি রয়ে যায়, কিছু সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে আমলা নির্ভর পুলিশি সমাধানের পথে চলার ফলে জনগণের বিরুপ প্রতিক্রিয়া হয় – এইসব ঘটনাকেই পুঁজি করে জর্জ অরওয়েলের সাহিত্য কীর্তি, সলঝেনিতসিনের রুপকথা নির্মাণ।

সমাজতন্ত্র কখনো স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোন রুপকথা নয় – তাকে গড়ে তুলতে হয় পৃথিবীর বুকে। বরং সেই যাত্রার অভিমুখ স্বর্গের দিকে একথা বলা যেতেই পারে। মাটির উপরে সেই মানুষের স্বর্গ (দেবতার নয়) নির্মাণের কাজে যেমন দরকার যাবতীয় জীর্ন পুরাতনকে ভেঙ্গে ফেলা তেমনই প্রয়োজন নতুনকে গড়ে তোলার। স্তালিন এই নতুন পৃথিবীর প্রথম সফল রুপকার ছিলেন।

কয়েকগাছা বিকিয়ে যাওয়া চক্রান্তকারী কিংবা ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের পাতার পর পাতা মিথ্যের বেসাতিতে নির্বিত্ত্ব, দুঃখী, নিপীড়িত জনগণের বুকে মানুষের মতো বেঁচে থাকার যে স্বপ্ন তিনি বুনে দিয়ে গেছেন তার প্রত্যেকটি সুত্র ততটাই সমর্থ যেমনটা কমিউনিস্ট ইস্তাহারে পুঁজিবাদের পতন এবং সমাজতন্তের উত্থান বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কেতাবি মেধার যুক্তিবোধে স্তালিনের সবটা মেপে নেবার সামর্থ্য নেই – সমাজতন্ত্র আসলে অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার বিজ্ঞান। স্তালিনের গোটা জীবন সেই সত্যেরই স্বার্থক ইতিহাস। 

ওয়েবডেস্কের পক্ষে

সৌভিক ঘোষ

তথ্যসুত্রঃ

১) Economic Problems of Socialism in the USSR – J V Stalin

২) আপিলা চাপিলা – অশোক মিত্র

৩) স্তালিন যুগ – আনা ল্যুইস স্ট্রং

৪) হাতির দাঁতে খুঁত তবুও হাতির দাঁত – হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

৫) স্তালিনের উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে মাও সে তুং

৬) লেনিনবাদের ভিত্তি এবং সমস্যাবলিঃ জে ভি স্তালিন

৭) দ্বন্দমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদঃ জে ভি স্তালিন

৮) Stalin and the Future: Rajani Palme Dutt

৯) The Russian Revolution: M N Roy

Spread the word

Leave a Reply