mamatabbanerjee

On Women Empowerment

মমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ণ

Gautam-Roy

গৌতম রায়

নারী যদি শাসনক্ষমতার শীর্ষে থাকে, তবে কি সেটাকেই নারীর ক্ষমতায়ণ বলে আমরা ধরে নেবো? গোটা সমাজপরিকাঠামোটা পুরুষতান্ত্রিক, অথচ শাসনক্ষমতার শীর্ষে আছেন একজন নারী, তাহলে সেই নারীর পক্ষে কি নারীর স্বাধিকার একক ভাবে প্রতিষ্ঠা করা কখনো ই সম্ভব? বিশ্বের বহু দেশেই শাসন ক্ষমতার শীর্ষে একাধিক বছর নারীরা থেকেছেন।ভারতে ইন্দিরা গান্ধী, ইংলন্ডে মার্গারেট থ্যাচার, শ্রীলঙ্কায় সিরিমাভো বন্দরনায়েক, বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা, পাকিস্থানে বেনজির ভুট্টো, তাছাড়াও বিভিন্ন দেশে কোরাজন আকুইনো, আন সান সু কি প্রমুখের নাম করা যায়। ইন্দিরা গান্ধী শেষ দফায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিধাহিত নারীর উপর অত্যাচার রোধে ভারতীয় ফৌজদারি দন্ডবিধি সংশোধন করে ৪৯৮ এ সংযোজিত হয়েছিল।এই সংযোজনের ফলে কি প্রকৃত নির্যাতিতারা রা সঠিক আইনী সহায়তা সম্যক ভাবে পাচ্ছেন? সত্যিকারের অপরাধ যারা করছে, তা কঠোর সাজা পাচ্ছে? না অর্থ- পেশিশক্তি, সামাজিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে আইনের ফাঁক গলে তারা খুব সহজেই বেরিয়ে যাচ্ছে? এমন কি এই আইনটির সুযোগ নিয়ে একাংশের নারীরা পুরুষসমাজের উপর অহেতুক আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে বলে যে অভিযোগ উঠছে, সেই অভিযোগকে আমরা একেবারেই সারবত্তাহীন বলে উড়িয়ে দিতে পারি? নারী ক্ষমতার শীর্ষে থেকে মেয়েদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার প্রয়াসে একটি আইন করলেই যে মেয়েরা সার্বিকভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারে না, তা ইন্দিরা গান্ধীর তৈরি করা এই আইন থেকেই পরিস্কার।মেয়েদের সুরক্ষার জন্যে আইনের অপব্যবহার করে পুরুষ সমাজ এমন কে মেয়েদের পর্যন্ত হেনস্থা করবার যে অভিযোগ উঠছে, নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এই বিষয়গুলিকে আমরা কখনো কি অযৌক্তিক বলতে পারি?

নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্ন কে উগ্র নারীবাদীরা কার্যত নারীর হাতে অধিক ক্ষমতা হিশেবেই দেখতে চান, দেখাতেও চান।পুরুষ বা নারী কারোর ই স্বাধিকারের প্রশ্নে ‘উগ্রতা’ কখনো কোনো রকম মানদন্ড হতে পারে না। একাংশের নারীবাদীরা প্রকাশ্যে ধূমপান বা মদ্যপান কিংবা শরীর খোলা পোষাক পরিধান কে স্ত্রী স্বাধীনতার এক একটি মানদন্ড হিশেবে ধরতে চান।একাংশের পুরুষ ও তেমনই উগ্রতা, স্বেচ্ছাচারিতাকে স্বাধীনতা হিশেবে দেখতে পছন্দ করেন।এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশ শতকে নারীর স্বাধিকারের প্রশ্নে কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব সুফিয়া কামালের কথা।তিনি বলেছিলেন; আমি ঘর ভাঙার নারীবাদে বিশ্বাস করি না।

নারী স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার উচ্চারণ অন্নদাশঙ্করের ‘ রত্ন ও শ্রীমতী’ ।সেখানেও সমাজের পরিকাঠামোগত উন্নয়ণ ছাড়া নারীর হাতে ক্ষমতা হলে গোটা নারী সমাজের অর্থনৈতিক বা সামাজিক মুক্তি যে ঘটতে পারে না- এ কথা খুব পরিস্কার ভাবেই বলা হয়েছে।বাংলার সামাজিক জীবনে উনিশ বিশ শতকে নারীর স্বাধিকারের প্রশ্নে যে তিনটি ধারা প্রবাহিত হয়েছিল, তার প্রথম টি ইউরোপীয় মিশনারী দের প্রচেষ্টা, দ্বিতীয় টি ব্রাহ্ম সমাজের উদ্যোগ আর তৃতীয় টি বেগম রোকেয়া র নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ।তবেএর বাইরেও পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ পটভূমিকায় স্ত্রী শিক্ষা যথেষ্ট ই প্রচলন ছিল এবং নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটি যথেষ্ট ই গুরুত্ব পেতো।তাই রবীন্দ্রনাথের জীবনসায়হ্নের সৃষ্টি ‘ ল্যাবরেটারী’ তে যে নারীর স্বাধিকার, বিশেষ করে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলা হয়েছে, সেটি কেবল যে দন্ডমুন্ডের কর্তা একজন নারী হলেই সম্ভব, গোটা সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার অবসানের প্রয়োজন নেই, পুরুষের সঙ্গে সংঘাতের ভিতর দিয়েই নারীর ক্ষমতায়ণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছে– এমনটা মনে করবার কোনো বাস্তবসম্মত প্রেক্ষিত দেখতে পাওয়া যায় না।

ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর মতো মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে আসার আগেও সরোজিনী নাইডু, তাঁর কন্যা পদ্মজা, সুচেতা কৃপালনী, নন্দিনী শতপথী, আনোয়ারা তৈমুরেরা রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রাদেশিক স্তরে শীর্ষে এসেছিলেন। এমন নয় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই প্রথম নারী , যিনি একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন।স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই একজন নারী হিশেবে অবিভক্ত উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কি নারীদের জন্যে বিশেষ কিছু করা তো দূরের কথা, সামাজিক ক্ষেত্রে পুরুষ আধিপত্য রোখবার প্রশ্নে এতোটুকু অগ্রবর্তী হতে পেরেছিলেন সুচেতা কৃপালনী? বরংচ পুরুষতান্ত্রিকতার জেরে তাঁকে কুর্শি হারাতে হয়েছিল।পন্ডিত নেহরুর ছত্রছায়া সরে যাওয়ার পর পদ্মজা নাইডু কি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব আর টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন?জরুরি অবস্থার কালে উড়িষ্যা তে নারী সমাজের উপর যে ধরণের অত্যাচার চলেছিল, নারী মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কি তার একটি র ও প্রতিকার করতে পেরেছিলেন নন্দিনী শথপথী? পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কার্যত  বোড়ের গুটি হয়েছিলেন আসামের আধোয়ারা তৈমুর। তাঁর নিজের মুখ্যমন্ত্রীত্বের পদ ই সুরক্ষিত থাকে নি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক চাপে।

অপরপক্ষে নারী- পুরুষের সমানাধিকারের মূল্যবোধে নিজের রাজনৈতিক জীবন পরিচালিত করা বামপন্থী ব্যক্তিত্ব গীতা মুখোপাধ্যায় , বামপন্থী সাংসদ হিশেবে সংসদে মেয়েদের জন্যে আসন সংরক্ষণের প্রশ্নে যৌথ সংসদীয় কমিটির সভানেত্রী হয়ে বহু বিরোধিতা স্বত্ত্বেও ৩৩% মেয়েদের জন্যে সংসদে আসন সংরক্ষণের প্রশ্নে দৃঢ় চিত্ত ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে একজন নারী হয়েও সেই যৌথ সংসদীয় কমিটির সভায় মাত্র একদিন উপস্থিত থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন , নারীর ক্ষমতায়ণের প্রশ্নে তিনি কি ভাবে পুরুষতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।সেই জেপিসি তে সমাজবাদী পার্টির সভ্যা ছিলেন।নীতিগত ভাবে সংসদে মেয়েদের জন্যে আসন সংরক্ষণের তীব্র বিরোধী সমাজবাদী পার্টির নেতা মূলায়ম।ফলে তাঁর দলের যে সভ্যারা গীতা মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন জেপিসি তে ছিলেন, তাঁরা ভয়ঙ্কর রকম ভাবে এই সংরক্ষণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। সেদিন কিন্তু ওই জেপিসির সদস্যা হিশেবে মমতা একটি বারের জন্যেও নারীর ক্ষমতায়ণের বিপক্ষে অবস্থানরত সমাজবাদী পার্টির মহিলা সাংসদের অবস্থানের বিরোধিতা করেন নি।

নারী নির্যাতন ইত্যাদি সম্পর্কে বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন মমতার যে অতি সক্রিয়তার অভিনয়, তার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতার শাসনকালে ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, অর্থনীতির মূল প্রবাহ থেকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার জেরে নারীকে অর্থনৈতিক বৃত্তের বাইরে বের করে দেওয়া– এই পর্যায়গুলির নির্মোহ আলোচনা প্রয়োজন। নারীর অধিকার, নিরাপত্তা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি ঘিরে মমতার যে শীবাকীর্তন , তা তাঁর ক্ষমতাদখলের একটি অন্যতম কৌশল নয় কি? নারীর ক্ষমতায়ণের প্রশ্নে, নারীর উপর ক্রমবর্ধমান অবিচার- নির্যাতন ঘিরে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ঘিরে মমতা বা তাঁর দল যদি সত্যিই এতোটুকু আন্তরিক হতো, তাহলে গীতা মুখার্জী কমিটির সুপারিশ রূপায়ণ ঘিরে একটি দিন ও কি মমতা নিজে বা তাঁর দলের সাংসদেরা সংসদের ভিতরে বা বাইরে সোচ্চার হতেন না? 

নারীর ক্ষমতায়ণের প্রশ্নে মমতা কি তাঁর শাসনকালের প্রায় দশ বছরের বেশি সময়ে পুরুষের এককেন্দ্রিক ক্ষমতায়ণের প্রতি ই বেশি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন নি? সংখ্যালঘু নারীর জন্যে যে অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বিগত বামফ্রন্ট সরকার করে গিয়েছিলেন, সেগুলির ধারাবাহিকতা কেন নারী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বজায় রাখলেন না? স্বামী পরিত্যক্তা মুসলমান মেয়েদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নে যে স্থায়ী আমানত বামফ্রন্ট সরকার করে গিয়েছিলেন, কেন মমতা সেই আমানত টিকে অবলুপ্ত করে দিলেন? শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নে যে ধারাবাহিক বিশৃঙ্খলা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় এগারো বছরের শাসনকালে একটা স্বাভাবিক পর্যায় হয়ে উঠেছে, সেটি কি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ণকে রুদ্ধ করেদেওয়ার একটি দুর্বিনীত প্রয়াস নয়? লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য দূর করবার রাজনৈতিক অভিষ্পা যে দলের নেই, সেই দলের নেত্রী মমতা নারীর ক্ষমতায়ণ ঘটাচ্ছেন– এই বোধটাই একটা সোনার পাথরবাটি।

ডঃ ফুলরেণু গুহ কে পন্ডিত জওহরলাল নেহরু নিজের মন্ত্রীসভার নারী ও শিশুকল্যাণ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী করেছিলেন।যখন ফুলরেণু মন্ত্রী হন, তখন তিনি সংসদের কোনো কক্ষের সভ্য ছিলেন না।আইন অনুযায়ী ছয় মাসের ভিতরে তাঁকে সংসদের যে কোনো একটি কক্ষের সভ্য হতে হতো।নেহরু সেই সুযোগ ফুলরেণুকে দেন নি।ফলে ছয়মাস পরে ফুলরেণুর মন্ত্রীত্ব চলে যায়।এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, সমাজকাঠামোর অদলবদল না ঘটলে নারীর ক্ষমতায়ণ সম্পূর্ণ ভাবে পুরুষের মেজাজমর্জির উপরই নির্ভর করে।

mamatabbanerjee

মমতা নিজে একজন নারী হয়েও মহিলা সংরক্ষণ বিল ঘিরে তাঁর যে আচরণ, তা সম্পূর্ণ ভাবেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার সমার্থক।গীতা মুখার্জীর নেতৃত্বাধীন যৌথ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মাত্র একদিন উপস্থিত থেকেও কি তিনি সমাজবাদী পার্টি সহ যে রাজনৈতিক দলগুলির মহিলা সাংসদেরা সেদিন মেয়ের সংসদে আসন সংরক্ষণের বিরোধিতা করেছিল, মমতা তার প্রতিবাদ করেছিলেন? আজ পর্যন্ত ওই বিল ঘিরে মমতার কোনো সদর্থক ভূমিকা কি আমাদের চোখে পড়েছে? একটি বারের জন্যেও কি মমতা যারা পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার হয়ে অবয়বে নারী হয়েও ওই বিলের বিরোধিতা করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি এতোটুকু কঠিন বাক্য কি আজ পর্যন্ত কখনো মমতার কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়েছে?

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Spread the word

Leave a Reply